লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ জুলাই ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৭২

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকষ্ট (জুন ২০১১)

গৃহত্যাগী জ্যোছনায় একজন চন্দ্রাহত...
কষ্ট

সংখ্যা

মোট ভোট ৭২

স্বপ্নবিলাস

comment ৫৫  favorite ৫  import_contacts ১,১৭৯
অনেকদিন পর তোমায় লিখতে বসলাম। বলতে পারো অনেক বছর পর। যদিও আমি জানিনা লেখাটা আদৌ শেষ করতে পারব কিনা! তবু লিখব, যতটুকু পারি ততটুকুই লিখব। শেষ করতেই হবে এমন নিশ্চই কথা নেই! সবকিছু পরিকল্পিতভাবে শেষও হয়না।


একটা কথা ভাবলে নিজে নিজেই বিব্রত হই খুব! তোমাকে কি তবে আমি ভুলতে বসেছি? হয়তো হ্যাঁ, হয়তোবা না। এটা ঠিক যে, তোমার কথা এখন আর আগের মত মনে পড়েনা আমার! আগের মত মন খুলে মন খারাপ করিনা তোমায় ভেবে। সত্যি কথা কি জানো, সময়!! সময় মানুষের সবকিছুই ভুলিয়ে দেয়, নিষ্ঠুর হাতে সব ক্ষত সারিয়ে দেয় চরম নির্মমতায়। । বেদনার জ্যোছনায় শিল্পীত অতীত এক সময় হারিয়ে যায় জীবনের কোলাহলে। বন্ধুদের মধ্যে অনেককেই দেখেছি, যেই প্রেয়সীর জন্য আজ আত্নহত্যা করতে চায়, কিছুদিন পর তাকেই গালি দেয় মুখ বিকৃত করে!

আমাকে হয়তো প্রতারক ভাবতে পারো। কারণ তোমার সঙ্গে সর্বশেষ যেদিন দেখা হলো, তুমি আমায় বলেছিলে-প্রতিদিন যেন তোমার কথা মনে করি। এই কথাগুলো ভাবলে এখন আমার হাসি পায় নিজের অজান্তে। কাউকে কি ইচ্ছে করে মনে করতে পারে মানুষ?? মন তো চলে মনের গতিতে। কিশোরী সুলভ পাগলামি তোমার মাঝে সব সময়ই ছিল, কিন্তু বিদায়ের অন্তিম মুহুর্তেও যে এই পাগলামি বহাল থাকবে সেটা অবশ্বিাস্য! তোমার হয়তো ভয় ছিল, আমি তোমায় ভুলে গিয়ে অন্য কারো প্রেমে পড়ব। রাত পোহালেই যেই তুমি অন্যের ঘরণী হবে, সেই তুমি আমায় বলেছিল, যেন প্রতিদিন তোমায় মনে করি! কি অদ্ভূত তাই না?? আসলে সব মানুষই চায়, প্রিয় মানুষটি একান্তই তার থাকুক। আসলে, মনের মানুষটিকে পর করতে চায়না কেউই।

সেদিন তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, প্রতিদিন তোমার কথা মনে করব, কখনো ভুলে যাবো না। কথাটা রাখতে পারিনি পুরোপুরি। আমার এই অপারগতা যদি পারো ক্ষমা করো। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো আমার। প্রতিদিন নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তে আমি আচ্ছন্ন ছিলাম তোমার মাঝে। আমার সবকিছুতেই জড়িয়ে গিয়েছিলে তুমি। এ যে কি ভয়ানক কষ্ট!! মাঝরাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যেত, তোমার ছবি কল্পনা করার চেষ্টা করতাম মনে মনে। কী অদ্ভূত!! কিছুতেই তোমার চেহারা মনে করতে পারতাম না। সব ধোঁয়াটে, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মত!!! একটা সময় জীবনটাই অসহ্য হয়ে গেল। আমি সত্যিই আর পারছিলাম না। তোমার স্মৃতির পাহাড় বয়ে বেড়ানোর সাধ্য ছিল না আমার। সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো, আমি ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছিলাম তোমাতে।

ভার্সিটিতে পার্টটাইম টি.এশিপ টা ক্যান্সেল হয়ে গেল। স্কলারশিপ ছিল ফিফটি পার্সেন্ট। বাধ্য হয়েই অন্য কাজ বেঁচে নিতে হল। অনেক রাত না খেয়ে ছিলাম। আমি মুক্তি চাইতাম এমন গতিহীন-নিশ্চল জীবন থেকে। ট্যাক্সি ড্রাইভিং, কার ওয়াশিং, হোম সার্ভিস, নিউজ পেপার সেলিং, ফুড শপের কাজ, কত্তো কী যে আমি করেছি অস্তিত্বের টানে, সে সব মনে করলে নিজেকে আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আজকাল! এবং এভাবেই চলতে চলতে অনেকটা পথ পেরিয়ে একদিন, হঠাৎ করেই লক্ষ্য করলাম মনের মাঝে তোমার ছবিটা ঠিক আগের মত নেই! বরং কিছুটা ঝাপসা হয়ে গেছে।

কষ্টের দিনগুলি ইতিহাস হয়ে গেল এক সময়। পি.এইচ.ডি'টা কমপ্লিট হলো, একাডেমিক ক্যারিয়ারে যোগ হলো আরো কিছু ভারি ভারি সার্টিফিকেট। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে আমার অবদান উল্লেখ করার মত। তুমি হয়তো কোনদিন জানবেই না, মানব-আচরণ অধ্যয়নের কোন একটি জনপ্রিয় থিওরি তোমার নামে করা। তুমি হয়তো এও কোনদিন জানবে না, তোমার নামে একটি তারা আছে আকাশে। যে তারাটি ইন্টারন্যাশনাল স্টার রেজিস্ট্রি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টাকা দিয়ে তোমার নামে নামকরণ করা হয়েছে। টাকায় সব হয়, তাই না অদিতি?? এই যে দেখো, তখন আমার টাকা ছিল না বলেই তোমাকে আপন করতে পারিনি!!! অথচ এখন আমার অনেক টাকা, বেঁচে থাকার জন্য কোনদিনই এত টাকার দরকার হবেনা।

আমি কিছুটা অস্থির প্রকৃতির ছিলাম। ছিলাম বললে হয়তো ভুল বলা হবে, আজো আমি সেরকমই আছি। যেকোন সাধারণ বিষয় নিয়ে আমি অস্থির হয়ে পড়ি এখনো। সবকিছুর ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তা চাই। তোমাকে ছেড়ে আসার সময় আমার মাঝে একটা সংশয় ছিল। আমি শংকিত ছিলাম, নিজেকে গোছাতে পারবো তো? দেবদাস হবার সুযোগ ছিল না। দেবদাসের বাবা জমিদার ছিল, আমার বাবা প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক। আমি আশাবাদী ছিলাম সব সময়, জীবনে খুব ভাল কিছু একটা করতে হবে। এজন্যই ভয় ছিল, নিজেকে সামলাতে পারবো কি না! তুমি তখন বলেছিলে, এক সময় সব সয়ে যাবে। তুমি ঠিকই বলেছিলে সেদিন, এক সময় সবই সয়ে যায়। যেই আমার একদিন তোমাকে না দেখলে দম বন্ধ হয়ে আসত, সেই আমি সাতাশ বছর ধরে পড়ে আছি সাত সাগর-তের নদীর ওপারে, অন্য এক দেশে, তুমিহীনা অন্য এক পৃথিবীতে!!!


তোমার কথা যে এখন একদমই মনে পড়েনা তা ঠিক নয়। জীবনে ভালো যা কিছু করেছি, সুন্দর যা কিছূ দেখেছি, তোমাকে মনে করেছি যতন করে। মনে মনে প্রার্থনা করেছি, আমার সারা জীবনের সমস্ত পুণ্যের বিনিময়ে হলেও যেন স্রষ্টা তোমাকে ভাল রাখেন। আমার প্রার্থনা বিধাতা হয়তো রেখেছেন। কয়েক বছর আগে একবার সুদীপ দা'র সঙ্গে দেখা হয়েছিল জ্যাকসন হাইটসে, তোমার কথা শুনেছি। সন্তান-সংসার নিয়ে তুমি সুখে আছ খুব। আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করিনি, পাছে কোন অ-সুখের খবর শুনতে হয়!!

আজ এতদিন পর আয়োজন করে তোমার কাছে লিখতে বসার পেছনে একটা কারণ আছে। একুশ শতকের কোন এক নামকরা প্রশাসন বিশেষজ্ঞ পাঁচ তারকা হোটেলের স্যুইটে বসে তার পুরনো প্রেয়সীর কাছে প্রেমপত্র লিখছে, ব্যাপারটা হাস্যকর। এখন আর কেউ প্রেয়সীর কাছে চিঠি লিখে বলে মনে হয় না। আঙ্গুলের স্পর্শেই প্রিয়জনকে কাছে পাওয়া যায় আজকাল। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আজ এত বছর পর আমি তোমারই শহরে, একই হোটেলের পাশাপাশি স্যুইটে! মাঝখানে শুধু একটা মাত্র কংক্রিটের দেয়াল, তবু কাছে যাবার কোন উপায় নেই। সময়ের অদৃশ্য দেয়াল ভেদ করার সাধ্য বিধাতা আমাকে দেননি!!

তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, কোন এক পূর্ণিমার রাতে আমরা একসঙ্গে হাঁটবো। আজ সেই আজন্ম আকাঙ্খিত পূর্ণিমা। তোমার পাশাপাশি হাঁটার সুযোগ হয়তো আর কোনদিনই হবেনা আমার, তবু কাছাকাছি তো আছি আজ, এই বা কম কীসে!!

এই রাতটির অপেক্ষাতেই আমি বহুদিন ছিলাম। সুদীপদা'র কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা। তাকে অনুরোধ করেছিলাম, আমাদের নতুন সিরামিক প্ল্যান্টের ইন-অগুরাল সিরিমনিতে যেন তোমাদের সপরিবারে নিমন্ত্রণ করেন। বলা যায় সুদীপদা'র বদৌলতেই আমার জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছেটা পূর্ণ হলো আজ। পুরো উদ্বোধনী প্রোগ্রামটা হচ্ছে নিউ ইয়র্কের পাঁচ তারকা হোটেল এন.ওয়াই.সি ব্রায়ান্ট পার্কে। তোমার মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না আমার। যৌবনের উষ্ণতা যাকে ধরে রাখতে পারেনি, কি লাভ জীবনের এই ক্রান্তি লগ্নে মিছে মায়া বাড়িয়ে! স্মৃতির ভার বহন করা কষ্টকর, এই বোঝাটা ভারী করতে ইচ্ছে করে না আর। তাই ঠিক করেছি কাল সকালের লঞ্চিং প্রোগ্রামে অংশ নেব না। আমি জানি, আমাকে ছাড়াও সুদীপ’দা ঠিকই সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারবেন।

একটু পরই ভোর হবে। জ্যোছনারা মিলিয়ে যাবে। ভোরের আলো ফুটলেই আমি চলে যাবো নর্থ ড্যাকোটা। নিউ ইয়র্ক থেকে নর্থ ডেকোটার দূরত্ব ২২৭৩ কিলোমিটার। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তিন ঘন্টা সময় লাগবে পৌঁছতে। ফিরতি পথটা দীর্ঘতর হবে সন্দেহ নেই। শুধু আজকের এই পূর্ণিমার অপেক্ষাতেই ছিলাম এতটা বছর!!

আমি জানি, ড্রয়ারে অযত্নে পড়ে থাকা হাজারো চিঠির মত এই চিঠিটিও পড়ে থাকবে হোটেলে। চন্দ্রাহত প্রেমিকের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার এই চিঠি হয়তো কোনদিনই তোমার হাতে পৌঁছুবে না...

আচ্ছা, ব্যারিস্টার পাড়ার দাপুটে সেনবাবুদের কথা মনে আছে নিশ্চই তোমার। নজরকাড়া অট্টালিকা, বিশাল পুকুর!! স্কুলে যাবার পথে আমি সব সময়ই তোমাকে বলতাম, একদিন আমারও এমন একটা প্রাসাদ হবে, বিশাল পুকুর হবে। তখন মনে মনে ভাবতাম, একদিন তুমিও আমার হবে। আমি হবো অনিরুদ্ধ রায়, আর তুমি হবে অদিতি অনিরুদ্ধ।

তুমি তখন শুধু হাসতে। হাসতে আর বলতে, অনিরুদ্ধ-তুমি যেন কেমন!! কেমন যেন তুমি। তোমার কথায় আমি খুব অবাক হতাম, আয়নায় খুঁটেয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম নিজেকে। এক এক করে সবই মনে পড়ে আমার। সেই ছায়াঢাকা মেঠোপথ, সেনবাবুদের বিশাল পুকুর, তোমার লাল সোয়েটার, ছোট কাকা আদুরে শাসন-সব মনে পড়ে, এক এক করে।

সেনবাবু হবার সাধ ছিল খুব। হয়েছিও তাই। এখন আমি অনেক বড় বাবু, অনি বাবু। নামের সঙ্গে কত্তো কী জুড়েছে! শুধু তোমার নামটাই অধরা রয়ে গেল চিরদিনের মত, আমার অর্ধেক নাম যুক্ত হয়নি তাতে। আমি অনিরুদ্ধ, অনিরুদ্ধই রয়ে গেলাম। আর তুমি হলে অদিতি বর্মন...


বি. দ্র: গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। কারো সঙ্গে মিলে গেলে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement