লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৯ মার্চ ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ১৯টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

কনক কথা
ক্ষোভ

সংখ্যা

কনিকা রহমান

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৯৪৩
২০১৩
ইদানীং আবোল তাবোল ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না কনক। কিন্তু বের হয়ে আসাটা জরুরী। সামনে বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষা। বয়স বেশি নেই। কনক ধরে নিয়েছে এবারই শেষ। তিনটা বেসরকারি পলিটেকনিকেল বদলিয়েছে সে। কোথাও এডজাস্ট হচ্ছেনা। তিন মাস ধরে বেকার। কনকের কাছে এখন বিসিএস-ই শেষ ভরসা। তবে সমস্যা হচ্ছে এই বিষয়গুলির চেয়ে কনকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে আরেকটা বিষয় যেটা বলে কিংবা লিখে সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। তাহলে তার বরকে বলে কিছুটা হালকা হতে পারতো। তার বরও আজকাল তার সব কথাই গুরুত্ব দিয়ে শুনছে, সে খেয়াল করেছে – তার পাগলামী পর্যায়ের কথাবার্তাও। কনকের সমস্যাটা হচ্ছে তার অনুভূতিগুলি নিয়ে। সে হিসাব করছে কোনগুলি ক্ষতিকর আর কোনগুলি তার জন্যে ভালো। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যেগুলি ক্ষতিকর সেগুলো তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। আর যে অনুভূতির জন্য তাকে মানুষ ভালোবাসছে, সম্মান করছে সেগুলো তার নিজের হলেও ধরে রাখতে পারছেনা কনক। আর যেগুলি তাকে আরো সামনে এগিয়ে দিতো, জীবনের ছোটছোট ভুলগুলি থেকে তাকে বাঁচাতো, তার শত্রুরা বন্ধু হতো, বন্ধুরা হারিয়ে যেতোনা - সেইসব অনুভূতি তার ভেতর মৃত। সেগুলো সম্ভবত তার মায়ের-যা সে নিজের ভেতর ধারণ করতে পারেনি। কেন পারেনি? এই প্রশ্নেরও উত্তর সে জানে। এই জীবনে এই অনুভূতিগুলি আড়ালেই থেকে গেছে-কিচ্ছু করার নেই। সে চেষ্টা করলেও তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না, এটাই হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা, এটাই তার ভাগ্য।
এই বয়সে এসে তার সামনে অনেক প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে-যেগুলোর উত্তর সে খুঁজে বের করলেও সেগুলোই যে সত্য তাতোনা। কনকের মা কনকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই মানুষটির জন্য সে কিছুই করতে পারেনি। সারাটা জীবন তিনি যে জীবন কাটিয়েছেন সেই জীবন অভিশপ্ত, সেই জীবনে কোন ভালোবাসা নেই, সেই জীবনের কোন অর্থ নেই, কোন লাভ নেই – আছে শুধু ক্ষতি। নিজের, সন্তানের, তার বাবা-মা’র, তার ভাই-বোনের … তার আজ কেউ নেই। তিনি মরতে পারেন না তার সন্তানদের জন্য।
ফার্মগেটের একজন স্বনামধন্য জ্যোতিষ যিনি কনকের মতোই একজন ইঞ্জিনিয়ার তবে এখন অবসরে আছেন। তাই এই জ্যোতিষচর্চা। তিনিই বলেছিলেন, “তোমার মা’র ভাগ্যে তোমার বাবার কোন হাত নেই এটা সম্পূর্ণই তোমার মা’র ভাগ্য।” কনকের বাবা-মা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন সাতাশ বছর আগে। আসলে আলাদা করেছিলেন কনকের নানা। কনক জিগ্যেস করেছিল, “তার নানা কি পারতো, তার মা’র ভাগ্য বদলাতে?” জ্যোতিষ বলেছিলেন, “না।” এই প্রশ্নের উত্তর কনক তার মা’র কাছে পেয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “তোমার বাবা আলাদা হলেও এখন পর্যন্ত তিনি আমার ফ্যামিলির সাথে যা করেছেন তখনো তাই করতেন। তখন শুধু তুমিই ছিলে, তোমার মামারা ভাবতো আলাদা হয়ে ভুলটা আরো বেশি হয়েছে। তোমার ভবিষ্যৎও একটা বড় ব্যাপার ছিল। তখন সমস্ত ভুলের চাপ আসতো আমার উপর এখনো সেই চাপ আসছে কিন্তু অন্যভাবে।”
জ্যোতিষ বলেছিলেন, “এই বিরোধ তোমাদের ভাগ্যে ছিলো; সম্পদের বিরোধ, সম্পর্কের বিরোধ, মানসিকতার বিরোধ, রুচির বিরোধ এটা তোমরা ঠেকাতে পারতে না। পারবেও না।”
-“আমার দাদীর কি কিছুই করার ছিল না?” কনকের প্রশ্ন।
-“উনি তো মা, উনি তো আর নিজের ছেলেকে মেরে ফেলতে পারতেন না।” জ্যোতিষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলেন।
জ্যোতিষ সাহেব কনককে সেদিন আংটিগুলি পরার প্রেসকিপশান দিলেন। কনক সেটাই পরে বসে আছে। প্রায় হাজার পঞ্চাশেক টাকা খরচ হয়ে গেছে কনকের। একটু খারাপ লাগছে তার তবে কেন যেন তার মনে হচ্ছে ভালোই হবে। কী ভালো হবে তা সে জানেনা। তিনদিন আগে বিকেলে আংটিগুলি নিয়ে আসার সময় জ্যোতিষ বলছিল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।” কী ঠিক হবে? কনক জানেনা।
আংটিগুলির ভেতর একটার পাথরের ব্যাপারে জ্যোতিষ মশায় একটু বেশি সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন- পরা অবস্থায় পরপর তিনরাতে যদি কোন দুঃস্বপ্ন দেখি তাহলে খুলে ফেলতে হবে। কনক কোন স্বপ্ন দেখেছে কিনা মনে পড়ছে না, সে আসলে আংটিগুলি নিয়ে ভাবছে না। সে এইসব জ্যোতিষ বিদ্যা তেমন বিশ্বাসও করেনা। তবে কনক সায়েন্সের ছাত্র হলেও সায়েন্সকে যে বিশ্বাস করতে হবে এমনটাও সে মনে করে না। তার ধারণা, সায়েন্স কে বিশ্বাস করার কিছু নেই - এটা পরিবর্তনশীল, এটা মানুষের সৃষ্টি। সে বিশ্বাস করে প্রকৃ্তিকে যেটা ধ্রুব, যেটা মানুষ সৃষ্টি করেনি সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ, পরম করুনাময়। মানুষ যা করে তারই ইশারায়, তার ইচ্ছায়। সে এই জ্যোতিষের কাছেও যেতে চায়নি, গিয়েছিল এক প্রতিবেশীর সাথে। জ্যোতিষকে কেন যেন ভালো লাগলো কনকের। তার উপর একই বিষয় ভদ্রলোকের আর তার। তার নিজের সম্পর্কে ভাবনাও ভদ্রলোকের সাথে মিলে গেল। “সেইজন্য এতোগুলি টাকা খরচ করলাম?” কনক ভাবলো । “অবিশ্বাস্য! এই বেকার সময়ে? আমার সঞ্চয়ের অনেক বড় অংশ চলে গেল …”

০০০০
কনকের এই মূহুর্তে যে সমস্যা হচ্ছে সেটা খুবই গুরুতর। সে যেন কোথাও আটকে গেছে। চোখের চশমাটা খুঁজে বের করতে পারলেই হয়তো সমাধান পেয়ে যাবে – ভাবলো কনক। কিন্তু চোখেতো চশমা ছাড়া কোন সমস্যা হচ্ছে না। তাহলে সমাধান অন্য কোথাও। একটু আগে কোথায় ছিলাম, এটা মনে করতে পারলেই হয়তো সমাধান পাওয়া যাবে, কনকের মনে হলো। কিন্তু মনে পড়ছে না। সারাদিনে আমি বেশি থাকি আমার বাচ্চাটার কাছে, সে কোথায়? কাজের মেয়ের কাছে হবে হয়তো। আমি কি আমার ল্যাপটপের সামনে? বিভোর হয়ে কোন কবিতা কিংবা গল্প পড়তে পড়তে সেই লেখায় হারিয়ে গেছি? না। এটা হতে পারেনা। আজ তারিখ কত? কোথাও কোন ক্যালেন্ডারও নেই। চশমা ছাড়া সবই দেখতে পাচ্ছি কিন্তু কী লাভ যদি চোখের সামনে কিছুই না থাকে, কেউ না থাকে? পড়ার টেবিলে যদিও খুব কম বসি। সামনে বিসিএস লিখিত পরীক্ষা এই জন্য কি টেবিলে বসে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি, পড়ার চাপে সেন্সলেস হয়ে গেছি? নাকি অতিরিক্ত টেনশান থেকে প্রেশার লো হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছি? কিন্তু এভাবে কতক্ষন? কনক ভেবে কূল পাচ্ছেনা। এটাকেই কি বলে চিন্তার অথৈ সাগরে ডুবে যাওয়া?
স্বপ্ন! কনক স্বপ্ন দেখছে নাতো? কোথায় স্বপ্ন? কনক স্বপ্ন দেখেও অভ্যস্থ- জেগে, ঘুমিয়ে; এই অবস্থা দু’টোর কোনটাই না। কনকের মনে হচ্ছে সে স্থির হয়ে গেছে। আটকে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা হচ্ছে এখন ক’টা বাজে? ঘরের ভেতর এখন যদি সকাল অথবা সন্ধ্যার পর হয় তার বর অবশ্যই একটা ঝাড়ি দিয়ে
তার এই তব্দা লাগা ছাড়িয়ে দিতো। “অফিস যাবো তব্দা মেরে বসে আছো কেন?” অথবা “সারাদিন পরে অফিস থেকে আসলাম তব্দা মেরে বসে আছো কেন?” কিন্তু কেউ কিচ্ছু বলছে না। তাহলে এখন দুপুর বা বিকেল? আশা, স্বর্ণ- এরা কোথায়? আশালতা, স্বর্ণলতা কনকলতার বোন। যদি দুপুর হয় আশা অফিসে আর স্বর্ণ প্রাইভেটে। তাহলে এখন দুপুর। বাবু? কারো কোন সাড়াশব্দ নেই। আর কতক্ষন নিজেকে বোঝাবে কনক? তার খুবই আতঙ্ক লাগছে, চরম আতঙ্ক… তার নিজের জন্য না। তার স্বামী, সন্তান, বোনদের জন্য। “চরম টেনশানে আমার টয়লেট চাপে, ছোট টয়লেট।” ভাবলো কনক। আমার রুমের ভেতর আমার প্রিয় ওয়াশরুম কোথায়? হিসু চাপলে কোথায় যাবো? কী অদ্ভুত আমার হিসুই চাপছে না। আমি কী বন্দি নাকি অসীম শুন্যের ভেতর আমার মুক্তি ঘটেছে? “এই মূহুর্ত থেকে আমি মুক্তি চাই আল্লাহ, আমাকে মুক্ত করো।” কনকের মনে হলো তার এখন প্রার্থনা ছাড়া অন্য কোন উপাই নেই। তার মনে হলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তাকে কেউ মুক্ত করতে পারবে না। বিপদে পড়লে সে যেসব সূরা পড়তো সেগুলোর কোনটাই মনে পড়ছে না। শুধু দু’টো লাইন চোখের সামনে ভেসে উঠলো, স্পষ্ট। ডায়েরীতে লেখা- বাংলায়। আরবীতে পড়লে বেশি ভালো হতো। কিন্তু কিছুই করার নেই। এই মূহুর্তে এই দু’টো লাইনই তার সম্বল।
“আল্লাহপাক আমাদের জন্য যথেষ্ঠ, তিনিই সকল কাজের উৎস এবং কর্মকর্তা।”
কনক কতবার যে পড়লো তার কোন হিসাব নেই। নামাযের পর এই সূরা একশবার পড়লে এবং আগে পরে দরূদ শরীফ পড়লে আল্লাহর ভয় ছাড়া আর কোন ভয় মনের ভেতর কাজ করেনা। কতবার দরূদ শরীফ পড়তে হবে মনে পড়ছে না কনকের। দরূদ শরীফও মনে পড়ছে না। নামায পড়া যায় কিন্তু মাথা চক্কর দিচ্ছে। কিসের যেন গন্ধ পাচ্ছে কনক, খুব কষ্ট পেলে+ খুব কান্নাকাটি করলে+ খুব টেনশান করলে+ সারাদিন না খেয়ে থেকে ঘুমিয়ে পড়লে কনক এই পবিত্র গন্ধটা পায়। গন্ধের উৎস সম্ভবত তার শরীর। কারণ সে তার হাত শুঁকে দেখেছে- তার জীভে জল চলে এসেছে সেই সাথে চোখেও চলে এসেছে ঘুম। কিন্তু কেন যেন তার মনে হলো চোখ বন্ধ করা যাবেনা। চোখ বন্ধ করলেই সে কোথাও হারিয়ে যেতে পারে। মুখ মোছার বাহানা করে আবার হাতটা নাকের সামনে নিল, কেন যেন লোভ হচ্ছিল আবার সেই পবিত্র গন্ধটা নেওয়ার। কনকের দু’চোখ বাঁধভা্ঙ্গা ঘুমের কাছে হার মানলো। আহ কী শান্তি! বড় গভীর এই ঘুম, বিরক্ত করবার কেউ নেই, জাগাবারও কেউ নেই।

১৯৮২
রায়হানার প্রচন্ড মাথাব্যাথা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো। মাথাব্যাথার কারণ- তিনি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। তিনি দেখলেন একটা মেয়ে বসে আছে, নিঃসঙ্গ, একলা, চারপাশে ছোটছোট পোকারা কিলবিল করে আসছে, মেয়েটা টের পাচ্ছেনা, পোকারা ঢুকে যাচ্ছে নাক দিয়ে, কান দিয়ে, মুখ দিয়ে। মেয়েটা কি যেন ভাবছে তো ভাবছেই, স্বপ্নের মধ্যে উনি যে কোথায় ছিলেন জানেননা। কিন্তু মনে হচ্ছিল তাকেই যেন কামড়াচ্ছে, তার মাথায় যন্ত্রনা দিচ্ছে, পেটের ভিতর কিলবিল করছে। হঠাৎ তিনি দেখেন দূরে বসে একজন পায়খানা করছে, আনমনে, উদাস মুখে। মেয়েটা লোকটাকে দেখতে পাচ্ছেনা। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে আছে, প্রার্থনারত অবস্থায়। তিনি ভালো করে খেয়াল করলেন সেই পায়খানা থেকেই পোকাগুলি আসছে। লোকটা বোধহয় পোকাগুলোই বের করছে, আসলে পায়খানা না। তিনি ভালো করে লোকটার মুখ খেয়াল করলেন, ওটা আর কেউ না তারই ছেলে। তার বড় ছেলে। তখনই ঘুমটা ভাঙলো। আর ধ্বড়াশ করে বুকটা কেঁপে উঠলো। বিপদের আগে তার বুকটা এভাবে কাঁপে। তার চার ছেলে দুই মেয়ে। বড়টার নামে হাজারটা বিচার। যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এই গ্রামেই থাকতো। যুদ্ধের পর ছেলেকে নিজের বোনের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন রায়হানা। ওখানে থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়েছে তার ছেলে, ময়মনসিং পলিটেকনিকেলে। কয়েকদিন হলো শেষ হয়েছে। এই ছেলেই পড়াশোনাটা করলো বাকিগুলোর পড়াশোনার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এজন্য এই ছেলেটাই তাদের ভরসা। এই ছেলের জন্য সাত খুন মাফ। ছেলের নামে যে বিচারগুলি আসে তার বেশিরভাগই মেয়েঘটিত। সমাজে মেয়েদের কোন বিচার নাই, এটাই সত্য জানে রায়হানা। তবে নিজের আত্মীয় স্বজন কোন মেয়ের দিকে হাত বাড়ালেই তার খারাপ লাগে। বাকি ছেলেগুলোর পড়াশোনা, ব্রেন কম হলেও স্বভাব চরিত্রে অতটা খারাপ না। বড়টা পড়াশোনাতে ভালো তাই, নিজের গয়না বেঁচে পলিটেকনিকেলে পড়িয়েছে। কয়দিন আগে একটা চাকরিতেও জয়েন করেছে। সবাই বাহবা দিচ্ছে। তার এই ছেলেটাকে নিজের হাতে খারাপভাবে মানুষ করেছে তারই শ্বাশুড়ি। এখন মাকেও মানতে চায়না। শাষন করার জন্য কাছে গেলে যদি বুঝতে পারে তখন উলটো মারতে আসে। অতি অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া রায়হানার সাথে তার ছেলের বয়সের পার্থক্য হবে পনেরো-ষোল বছরের। রায়হানা তার স্বামীর তৃ্তীয় স্ত্রী। আগের দু’জনের একজন মারা গেছে অন্যজন আলাদা হয়ে গেছে। আগের পক্ষের কোন ছেলে মেয়ে নেই।
কাল হঠাৎ চলে এলো তার ছেলে, বলছে বিয়ে করবে, রায়হানার বোনের বাড়ির পাশে মেয়ের মামার বাড়ি, ঘটকালি সেদিক থেকেই হয়েছে। এটাই কি আসার কারণ বুঝতে পারেনা রায়হানা, কারণ অনেক জরুরী কাজেও সে বাড়িতে আসেনা। রায়হানা কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রায়হানার ছোট বোন হয়তো বলতে পারবে কিন্তু অত দূরের পথ! গেলে হেঁটেই যাওয়া লাগবে। রাতের স্বপ্নটা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। যাবে? অন্য কোনদিন হলে যেতেন না স্বপ্নটা দেখেই মনটা অস্থির হয়ে আছে। স্বামীকে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে, মেয়েদের রান্নার দায়িত্ব দিয়ে রওনা হলেন, বলে গেলেন অন্য এক আত্মীয়ের বাড়ির কথা। মিথ্যা না। বোনের বাড়ি হয়ে আসার পথে সেখানেও একটু দেখা করে আসবেন।
বোনের বাড়িতে এসে রায়হানার মনে হলো বাড়িতে কেউ নেই। এতো নীরব। কেউ কি মরলো? না। বোনজামাই কলের পাশে বসে আছে, বোঝা যাচ্ছে মাথায় কিছুক্ষন আগে পানি দিয়েছে এখন রোদ পোহাচ্ছে। লক্ষণ ভালো না। তার বোন জামাই’এর মাথা গরম হলে উনি ঘন ঘন এই কাজ করেন। তার বোন না জানি কি করেছে। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখলেন, তার বোন মরার মত শুয়ে আছে। মাথার কাছে একজন মহিলা বসে আছে। তার বোনের কোন সন্তান নেই, সন্তান হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কবিরাজ, ডাক্তাররা তাই বলে দিয়েছে। এজন্য তার ছেলেকে নিজের ছেলের মতই থাকতে দিয়েছে। এখানেই বেশি সময় থেকেছে তার ছেলে। খালা খালুকে এই অবস্থায় রেখে সে বাড়িতে যেতে পারলো? নাকি যাওয়ার পরে কোন ঘটনা ঘটেছে? তার আদরের ছোট বোন হয়তো এই ঘটনা চেপেই যেত কোনদিনই বলতো না তার বড় বোনকে, কষ্ট পাবে বলে। আজ যদি রায়হানা না আসতো তাহলে হয়তো কোন একদিন যখন জানতো তখন অনেক কিছুই সময়ের সাথে সাথে হালকা হয়ে যেত। রায়হানা তা্র বোনের কাছে যা শুনলো তার সার সংক্ষেপ এই- “তোমার ছেলে আমারটা খেয়ে অন্য মেয়ে মানুষের ক্ষতি করছে, অন্য মানুষদের অশান্তি করছে আমি উল্টা তোমার ছেলের হয়ে মীমাংসা করেছি, নিজের ছেলে মনে করে। কিন্তু ওর মাথায় কি সমস্যা হইলো যে আমার সাথে… আমি ওর খালা। ও আমারে মা মনে না করুক আমি তো ওরে সন্তানের মতই দেখছি। আমারে কিভাবে জঘন্য প্রস্তাব দেয়? এতো বড় বেয়াদবি তোমাদের জামাই সহ্য করতে পারে নাই।” ব্যাস, রায়হানার আর কিছু শোনার প্রয়োজন নেই। তার ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, রায়হানার মাথায় আগুন ধরে গেছে। রায়হানা তার অল্প বুদ্ধির মাথা দিয়ে যা ভাবলো : তার স্বপ্নের মেয়েটি তারই বোন। সামনে অনেক কিছু তার দেখতে হতে পারে যা সে ভাবেনি, কল্পনাও করেনি। সে সামনে একটা ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অনুমান করে ফেললো। তার বোনের জীবনে যখন একটা পোকা বাসা বাঁধতে চাইছিলো সামনে অসংখ্য পোকা। এই ভুল ভাবনায় দিশেহারা হয়ে পড়লো রায়হানা। সে জানেনা তার অনুমান ভুল, সে স্বপ্নের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। তার ছেলের যেখানে বিয়ের কথা হচ্ছে সেখানে বিয়ে হয়ে গেলেই এই ছেলে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেত চিরতরে…

ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল রায়হানার। একটা ওষুধ জোগাড় করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল। রান্না-বান্না করে রেখেছে তার মেয়েরা। সবাই একসাথে খাবে। শুধু আলাদা খাবে তার বড় ছেলে যাকে দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা যেন কিছুই ঘটেনি। সবচেয়ে ভালো মাংসের টুকরাটা তার, মাছের পেটিগুলি তার, সব ভালোই তার জন্য। তার ছেলে মেয়ে-মানুষের প্রতি দূর্বল এটাই তার দূর্বলতা । বিড়ি-সিগারেটের নেশা নাই, জুয়ার আসরে যায়না, পড়াশোনাতেও ভালো। হিসাবী। সব দিক দিয়েই ভালো কিন্তু গ্রামে বড় হওয়া, অক্ষর জ্ঞানহীন রায়হানা জানেনা ভয়াবহ এক মানসিক রোগে আক্রান্ত তার ছেলে যা তার ছেলে নিজেও বুঝতে পারেনা। রায়হানা শুধু বুঝতে পারে সবই তার ছেলের ইচ্ছাকৃ্ত, সে শয়তান। এতদিনে সে বুঝেছে, সে আর তার মেয়ে দু’টোই শুধু নিরাপদ তার ছেলের কাছে আর কেউ না। ছেলের এই জঘন্য রুচির জন্য সে তার শ্বাশুড়িকেই বারবার দায়ী করছে। এই ছেলের লালন-পালনের পুরো দায়িত্বই ছিলো তার শ্বাশুড়ির হাতে। রায়হানা ভবিষ্যৎের অজানা আতঙ্কে অস্থির। এই মূহুর্তে রায়হানার পক্ষে আরো অনেক কিছুই জানা সম্ভব না, যেমনঃ এই ছেলের কাছেই ভবিষ্যৎের আরো কয়েকজন মেয়ে নিরাপদে থাকতো যারা তার সন্তা্ন, তিনি বাবা হিসেবে খুব খারাপ হতেন না। সেই সুযোগ রায়হানা তার ছেলেকে দিলো না। সবার খাওয়া শেষ হওয়ার পর কেউ স্বস্তিতে ঘুমাতে পারলো না কারণ আজ রাতেই মারা গেল আব্দুলের প্রাণপ্রিয় সন্তান আর রায়হানার প্রথম সন্তান। সব শেষ হয়ে গেলো বাপ-চাচাদের, ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেও ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলো না। তীরে এসে তরী ডুবলো।
পরদিন সবাই এলো। আত্মীয়-স্বজন, গোষ্ঠী, সমাজ সবাই এলো। এলো শিক্ষক, সহপাঠিরা। এদের মধ্যে একজন পলিটেকনিকেলের ছাত্র যার নাম আর মৃতের নাম একই এজন্য তারা পরস্পরকে মিতা ডাকতো। ধরা যাক সেই লোকের নাম রহমান। রহমানের আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে সিলেট যাওয়ার কথা ছিলো, একজন সহপাঠীর মৃত্যুতে সে যাত্রাটা সে বাতিল করেছে। কিভাবে মৃত্যু হলো সেটা নিয়ে মতভেদ থাকলেও মৃতের পরিবার চাচ্ছে তারাতারি দাফন করতে। চাচারা বলছে হার্ট এটাক কিন্তু এতো অল্প বয়সে হার্ট এটাক? রহমান সাহেবের কাছে একটু খটকা লাগে। রহমান সাহেব খুবই মর্মাহত হলেন “একজন ভালো মানুষ পৃ্থিবী থেকে বিদায় নিলেন। ভালো মানুষেরা পৃথিবী থেকে খুব তারাতারিই চলে যায়।” রহমান সাহেব ভালো মানুষ তাই তার কাছে সব মানুষই ভালো। এখানে এসে রহমান সাহেবের সাথে আরেকজন মানুষের পরিচয় হলো। তিনি সেই মেয়ের ভাই যার বিয়ের কথা হচ্ছিলো মৃতের সাথে। তিনি আশরাফ। আশরাফও মর্মাহত। তিনিও মৃতের সহপাঠী, একসাথে ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। সেই পরিচয়েই তার বোনের সাথে বিয়ের কথা হচ্ছিলো। কিন্তু কপাল মন্দ!
জানযায় এসে গল্পের খাতিরে সামান্য পরিচয়েই আশরাফের বাড়িতে এলেন রহমান সাহেব, স্ববান্ধব। আশরাফের বাবা খুবই হিসাবি লোক এলাকার লোকজন না বুঝে কৃপণ বলেন। তিনি মনে মনে হিসাব কষে ফেলেছেন তার ছোট মেয়ের সাথে রহমান সাহেবের বিয়ের হিসাব। খাওয়া-দাওয়া, গল্প-গুজবের ফাঁকে ছেলের বাড়ির খুঁটিনাটিও জানা হয়ে গেল আশরাফের বাবার। সেদিন বন্ধুর মৃত্যুর জন্য ব্যাপারটা তেমন আমলে নেননি রহমান সাহেব। বাড়িতে ফিরে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, চাকরিতেও ঢুকেছেন। সেদিন যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে বন্ধুর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন সেই কাজটা ছিল একটা চাকরির ইন্টারভিউ, সেই চাকরিটা তার হয়নি। সেটা নিয়ে তার কোন আফসোস নেই, এই চাকরিটাও ভালো। আর সবচেয়ে সুবিধা হয়েছে যেটা সেটা হচ্ছে তার পোস্টিং হয়েছে তার বাড়ির কাছেই, ময়মনসিং এর পাশের একটা জেলায়। সে চেয়েছিল তার সাথে চাকরিস্থলেই থাকুক তার বাবা-মা। কিন্তু তার বাবা-মা ময়মনসিং-এই থাকবে। তার বাবা-মা তাকে বলছে বিয়ে করতে।
আর যে চাকরিটা হয়নি সেটা ছিল সিলেটে, বাড়ি থেকে দূরে হয়ে যেত। রহমান সাহেব কোনদিন জানবেন না যে সেদিন যদি মৃত বন্ধুর জানাযায় না গিয়ে ইন্টারভিউ-এর জন্য রওনা হতেন তাহলে তিনিও কখনো বাড়ি ফিরতেন না। সেদিন একটা রোড এক্সিডেন্ট হয়েছিল সে’খবর তিনিও শুনেছেন কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। কারণ সেটা তার জীবনে ঘটেনি। যা তার জীবনে ঘটেনি তা নিয়ে তিনি কেন চিন্তা করবেন? যে সময়ে দূর্ঘটনা ঘটেছিল তিনি সে সময়ে যেতেন না। কিন্তু তিনি জানেননা, তিনি সেদিন রওনা হলে সেই সময়ে, সেই গাড়িতেই রওনা দিতেন এবং নিহতদের তালিকায় তার নামও থাকতো।যাই হোক, ঘুরেফিরে সেই মেয়ের সাথেই বিয়ে হয়ে গেল রহমান সাহেবের।
হাস্নাহেনা গত কয়েক মাস যাবৎ দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন, তার আরো অনেক ভয়াবহ স্বপ্ন দেখার কথা ছিল কিন্তু রহমান সাহেবের সাথে বিয়ের সাথে সাথে তার সকল দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটলো।

২০১৩
কনকের জ্ঞান ফিরতে সময় লেগেছে তিনদিন। জ্ঞান ফিরলেও ডাক্তার বলছে মানসিকভাবে সে কিছুটা অসুস্থ। কনকের বাবা রহমান সাহেব, মা হাস্নাহেনা তার সাথে আঠার মতো লেগে আছেন। জ্ঞান ফেরার পর থেকে কনক শুধু তার স্বামী আর সন্তানকে খুঁজছে, ভয় আর আতঙ্কের সাথে। তারা কোথায়, তারা কি বদলে গেছে? সে কি এখন তাদের ছাড়া এই সময়ে বাঁচতে পারবে? হাস্নাহেনা ভয় পেয়ে গেছে তার মেয়ের আবোল তাবোল কথা শুনে। কনকের বরকে কনকের মা-ই আজ অফিসে পাঠিয়েছে, প্রাইভেট চাকরি তার উপর দুই দিন অফিস যায়নি। এখন কনকের অবস্থা খারাপ দেখে তাকে চলে আসার জন্যও ফোন করেছে হাস্নাহেনা। আর কনকের বাচ্চাটাকেও নিয়ে আসা হয়েছে। সে বাসায়ই ছিল কনকের শ্বাশুড়ির কাছে। না কিছুই বদলায়নি। কী বদলাবে? সে কেন ভয় পাচ্ছিল, হুট করে এখন মনে করতে পারছে না। তার হুটহাট করে মনে হয় কি জানি বদলে গেছে, মনে করার চেষ্টা করতে করতেই তার মনে হয় কেন সে এসব ভাবছে, কেন তার এসব মনে হয়? সব ঠিক আছে, সবাই ঠিক আছে, ঠিক থাকবে না কেন? কনকই শুধু ঠিক নাই তবে ডাক্তার বলেছে সময় একটু বেশি লাগলেও ঠিক হয়ে যাবে। কনক অফিস যেতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করলে ডাক্তার না করেননি তবে কিছুদিন পরিশ্রম কম করলেই ভালো।
কনক তার বাসায় এসেছে আজ, সে ক্যালেন্ডার দেখলোঃ তারিখ ২৬।১১।১৩, সময় সন্ধ্যা ৬টা। অফিস যায়নি কতদিন হলো? তিনদিন, মাত্র! কাল থেকে সে যাবে ভাবছে। সে ঢাকার একটি প্রাইভেট পলিটেকনিকেলে পড়ায়। একসময় সে এখানে পার্টটাইম পড়াতো দুই বছর যাবৎ সে এখানে ফুলটাইম। তার মাঝে মাঝে মনে হয় সে এখানে বেশিদিন পড়াতে পারবে না। এজন্য সে বিসিএস দেয়ার কথা ভাবছিলো যদিও ডাক্তার আপাতত পড়তে না করে দিয়েছে। কিন্তু সে এখানে ফুলটাইম হওয়ার আগে ভেবেছিল এখানে ফুলটাইম হয়ে গেলে তার সরকারি চাকরির জন্যও কোন আক্ষেপ থাকবে না। তাহলে কেন সে এখন বিসিএসের কথা ভাবছিল, কেন চাকরিটা হারানোর ভয় করে সে? সে মনে করতে পারে না। কনকের বাবার উত্তরটা কনকের পছন্দ হয়েছে, “তুমি যাদেরকে কিংবা যাকিছু খুব বেশি ভালোবাস তাদেরকে হারানোর ভয় সবসময় তোমার মাঝে কাজ করে, এটা কোন মানসিক সমস্যা না, তুমি সবাইকে বেশি ভালোবাস।” এই ফিলিংসটা নাকি তারও হতো, এখনও হয় তবে কম কিন্তু তিনি এই ব্যাপারগুলি কারো সাথেতো নয়ই এমনকি মা’র সাথেও শেয়ার করেননি।
আমার বাবা! সারাজীবন সম্মান করেছেন সম্পর্ককে তিনি কারো সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাননি। কনকের নানা মেয়েদেরকে কোন সম্পদ দিয়ে যাননি কারণ তার বিশ্বাস ছিল আলাদা, আমার বাবা আমাদেরকে ঠকাননি তবে তিনি নানার বিশ্বাসকেও অসম্মান করেননি। আমিও সেই চেষ্টাই করে যাবো সারাজীবন। কনক ভাবছে যদিও ডাক্তার বেশি ভাবতে না করেছে।
সামনে লম্বা একটা ছুটি আছে এবার সে পুরো ছুটিই বাড়িতে কাটিয়ে আসবে, তার বাড়িটা তার অনেক প্রিয়। তাদের বাড়ির ডিজাইনে কোন ভুল নেই পচ্শিম দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ঠিক জায়গায় বাড়ান্দা, ঠিক জায়গায় দরজা-জানালা। কনকের মা, কনকের বাবার মতো বা কনকের মতো ইঞ্জিনিয়ার না তবে তার ইচ্ছে অনুযায়িই বাড়িটা সেজেছে। যাবে, সময় পেলেই ঘুরে আসবে সে।
হঠাৎ একটা ফোন এলো, মোবাইলে নাম সেভ করা - রিনি আপা। কনকের মেঝ মামার মেয়ে। “রিসিভ করবো? কেন করবো না?”
-হ্যালো?
-কিরে ভালো হইছিস?
-হ্যাঁ!
-গলা এইরকম ক্যান? বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর। জামালের বিয়ের ডেট পরছে, যাবি? তুই গেলে আমিও যাবো। মাধবীকেও বলিসতো, যদি যায় জানাস। মাধবীলতা। কনকের বোন, ঢাকায়ই আছে শ্বশুরবাড়িতে। তারপর আশালতা-স্বর্ণলতা কনকলতার সাথেই থাকে। অরণ্যলতা থাকে বাবা-মা’র সাথে। আর জামাল আমদের কাজিন-ব্রাদার।
-যাওয়া যায়, দেখি। কনকের কন্ঠে উচ্ছলতা দেখে কনক নিজেই অবাক হলো, তার নিজেকে সুস্থ সুস্থ মনে হচ্ছে, তার ভালো লাগছে - শরীরটাও, মনটাও। কনকের জীবনে কোন ভুল নেই, কোন ক্ষতি নেই, তার কোন শত্রু নেই, কেউ তার ক্ষতি চায়না, তার জীবন থেকে কোন বন্ধুই হারিয়ে যায়নি। কনক ভাবতে ভাবতে মাধবীকে ফোন করতে ভুলে যায়, কনকের ভাবতেই ভালো লাগে। যারা ভালোবাসাহীন, স্বজনহীন জীবন কাটায় তারা কিভাবে বাঁচে? তারা সত্যিই দূর্ভাগা, কনক নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ভাবে, সে যা চেয়েছে সব পেয়েছে তবে এই পাওয়ার পেছনে পরিশ্রম আছে, কঠোর পরিশ্রম যেটা করেছে তার বাবা, তার মা এবং সে। কনক ও তার বোনদের শুধু শরীরটার জন্ম দিয়েছে তার মা আর বাকি যা কিছু আছে তার সবটুকুই তার বাবার এটাই কনক বিশ্বাস করে।
পরিশিষ্ট :
কনক কিছুদিন আগে কাউকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছিল, একজন জ্যোতিষের কাছে গিয়েছিল সে প্রতিবেশী মেয়েটার বুদ্ধিতে। সবাই যে তাকে মেন্টাল ভাবছে এইজন্য, জ্যোতিষ সাহেবের দেয়া আংটিগুলি পড়লেই সমস্যার সমাধান। অনেক টাকা খরচ করে এনেছিল সে। উনি বলেছিলেন, তিনদিন আঙ্গুলে পরতে। যদি কোন সমস্যা হয় ফেরৎ দেয়া যাবে। সে ঠিক করেছে আংটিগুলি সে রাখবে না স্যুট করলো কি করলো না সেটা বড় কথা না বড় কথা হচ্ছে এই কাজটা শিরক। কনক আল্লাহকে ভয় পায় সে শিরক করবে না। এটা এমন কোন বড় সমস্যা না। আর তার ধারনা তার কোন সমস্যাই নেই। কেউ তাকে মেন্টাল ভাবে না, সবাই তাকে ভালোইবাসে। না বাসলেও কনকের কিছু যায় আসে না - সেতো বাসে।
উৎস্বর্গ : কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement