বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৫৬

বিচারক স্কোরঃ ৪.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪৬ / ৩.০

মুক্তিযোদ্ধা (ডিসেম্বর ২০১২)

মোট ভোট ৭৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৫৬ যুদ্ধ এবং যোদ্ধা অথবা মৃত্যুপথ যাত্রীর চোখ

মোঃ আক্তারুজ্জামান
comment ৪৯  favorite ৭  import_contacts ১,৬৪৯
তেল, নূনের মত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তো আর সংসার চলে না। চন্দনের ঘরে মাস চারেক বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ে আছে। সারা রাত হ্যারিকেন জ্বালাতে হয়। কেরোসিন ছাড়া তাদের আর কোন ভাবেই চলছে না। বাধ্য হয়ে চন্দন দুপুর বেলা মানিক গোঁসাইর ডুবিয়ে রাখা নৌকাটা সেঁচে ফেলে।

যুদ্ধ বিমানগুলি সারাদিন বিকট শব্দে মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। গভীর রাতে দূর থেকে ভেসে আসা টানা গুলির শব্দ নীরবতা ভেঙ্গে খান্ খান্ করে দেয়। নানা জায়গা থেকে নানা রকম খবর আসে- সবই ভয়ানক দুঃসংবাদ। ওদের গ্রামটিতে যুদ্ধ শুরুর তিন চার মাসেও কোন অঘটন ঘটেনি।

এলাকাটা খুব জংলা তার উপর রাস্তা না থাকাতেই হয়ত ওরা বেঁচে গেছে। তবু সব বাড়ী ঘরই জনমানব শুন্য। সবাই জংগলে দল বেঁধে থাকে- একদিন মহিষের আগাড় তো আর একদিন পরানেরটেক। এই সব জংগলে এখন বাঘ ভাল্লুক না থাকলেও এক সময় ছিল। তবে এখনও শিঁয়াল, বাঘডাসা, বনবিঁড়াল, খরগোশ ইত্যাদি সব জানোয়ারের ভিড়ে ভয় পাওয়ার মত যে প্রানীটা আছে তা হল সাপ। নানা প্রজাতির সাপে জংগল ভর্তি। বন-ডালিমের বাহারি রঙের ফুলের দিকে কেউ মুগ্ধ হয়ে তাঁকিয়েছে তো পর মুহুর্তেই আঁতকে উঠে দু’লাফে পিছনে চলে গেছে কারণ গাছটার ডাল পালা পেঁচিয়ে আছে হাত তিনেক লম্বা সবুজ বর্ণের একটা লাউ ডগা সাপ। জংগলের পাশ দিয়ে চলার সময় কোন গাছের পাতাটি নড়ে উঠল তো খেয়াল করলে দেখা যাবে পাঁচ সাত হাত একটা দাড়াস সাপ ডাল জড়িয়ে আছে। শুকনো পাতার খস্ খস্ আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘুরাতেই হয়ত চোখে পড়বে- মস্ত অজগরটি রাজকীয় চালে ঘন জংগলে হারিয়ে যাচ্ছে। কোন ক্ষেতের নালা দিয়ে পানি নামছে তো ট্যাংরা পুঁটিরা ছর ছর করে উঠা নামা করছে। মস্ত কাল ঢোঁড়া দেখা যাবে নালার পাশেই বসে বড়সড় একখানা পুঁটি গিলছে। আরও একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে দলা পাঁকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে ঠান্ডা স্বভাবের শঙ্খরাজ সাপ। সারা গায়ে হলুদ কালো ডোরা কাটা দাগ। এদের লেজের চিকন দিকটা থাকে না বললেই চলে ফলে ভোঁতা মত লেজটা দেখে ওটাকে অনেকে দুমুখো সাপ বলে ডাকে। এরা যত না লম্বা হয় তার চেয়ে বেশি হয় মোটা। শঙ্খরাজ সাপের একটা স্বভাবের কথা না বললেই চলে না- এরা মাছ, ব্যাঙ, ফড়িং এর সাথে সাথে ঢোঁড়া বা মেটে সাপের মত ছোট ছোট স্বজাতীয়দেরকেও খেয়ে ফেলে! বজ্জাত জাত সাপেরও অভাব নেই! ঘন জংগল থেকে শুরু করে গৃহস্থের হাঁসমুরগীর খুপড়ি পর্যন্ত এদের বেপরোয়া যাতায়াত।

যাইহোক, সবার বাড়ীঘরই ফাঁকা ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও যে যার মত করে মাটির নীচে, জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছে। পুরুষ মানুষেরা দিনে কয়েকবার বাড়ীতে এসে চক্কর দিয়ে যায়। বাড়ীর বয়স্ক মহিলারাও এক আধবার আসে। তটস্থ হরিণীর মত দ্রুত ছুটোছুটি করে দু’চারটা ডাল ভাত একটু ভর্তার আয়োজন সেরে আবার পরিবারের উদ্দেশ্যে জঙ্গলের দিকে চলে যায়।

কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, হরে রাম- করতে করতে বিশালদেহী মানিক গোসাই বৈঠা হাতে নৌকার পাঁছায় গিয়ে বসলেন। তাঁরও হাটে না গেলে আর চলছেই না। চন্দন দেখল আরও তিন চার জন নৌকায় চড়ে বসেছে। সবার সাথেই একটা করে বাঁশের টুকরি, ছোট বড় দু’তিনটা করে তেলের বোতল। শনিবারের হাট আজ না গেলে আবার চারদিন পর্যন্ত কোথাও কিছু মিলবে না।

নাজিম খোনকার সবার পরে এসেছে। নৌকার পাইল ঠিক করে বসতে বসতে চন্দন একটা হাত বৈঠা তুলে নিল। দাঁড় বৈঠার সাথে হাত বৈঠা চালালে নৌকার গতি বাড়ে। খোনকার গলুইটা ধরে ঠেলেঠুলে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নৌকাটা পানিতে ভাসাতে ভাসাতে চাপা গলায় বলল- আল্লাহ ভরসা!

পানিতে বিলি কাটতে কাটতে নৌকাটা এগুতে থাকে। পানিতে বৈঠা পড়ার ছপাৎ ছপাৎ আর গলুইর নীচে কুল কুল করে পানি ভেঙ্গে পড়ার শব্দ ছাড়া অন্য কিছু শোনা যায় না। মাঝে মাঝে দু’একটা শালুক পাতা বৈঠার আঘাতে টুপ্ করে শব্দ তুলেই ডুব দেয়। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই নৌকাটা হাটের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। গোসাই প্রথম বারের মত মুখ খোলেন- দ্যাখ্, যে যাই করস্ খুব তাড়াতাড়ি নৌকায় ফিরবি কিন্তু। কোন্ সময় কী অয় কওন যায় না!

হাট থেকে কিছুটা দুরে নৌকাটা একটা হিজল গাছের শিঁকড়ের সাথে বেঁধে ফেলেই সবাই দ্রুত পায়ে হাটে ঢুকে পড়ে। লোক জন একেবারে কম না। সবার চেহারায়ই আতঙ্ক, ছুটোছুটি করে সবাই কেনা কাটা করছে।

এক চালা ছোট ছোট ঘর। দোকানীরা বেঁচাকেনার পর যার যার মাল পত্র বাড়ী নিয়ে যায়। আবার অনেকে দু’একটা বড় ঘরেও নিজেদের মালামাল রাখে। হাটে বেশ কয়েকটা বড় দোকান আছে ওগুলো টিনের ঘর। চন্দন সব সময় সাউ’দের দোকান থেকে কেনা কাটা করে। সে মাথা নীচু করে দোকানটায় ঢুকেই হাতের তেলের বোতল তিনটা এগিয়ে দেয়- বিপিনদা ধর।

বিপিন হাত বাড়িয়ে বোতল তিনটা ধরে। চন্দন বোতল তিনটা ভরে রাখতে তাগদা দিয়ে অন্য দিকে পা চালায়। কিছুদুর গিয়েই আবার ফিরে আসে- দাদা, ছোট এক বোতল মধু আর এক ছটাক তাল মিশ্রীও দিও, মাইয়াডার খুব ঠান্ডা লাগছে।

পদ্ম পাতায় বেঁধে রাখা লবনের এক সের একটা পোটলা নিতেই চোখে পড়ে কিছুটা দূরে মটকায় সুন্দর ঝোলা গুঁড় নিয়ে বসে আছে একটা লোক। চন্দনের বাবার কথা মনে পড়ল। পেটের ব্যথায় সে অনেকদিন ধরে কিছু খেতে পারছে না। একটু গুঁড় হলে দুধ দিয়ে যদি দুটো ভাত খেতে পারে। চন্দন লবনের দামটা দিয়ে কোন রকম দরদাম না করেই গুঁড়ওয়ালাকে তাগাদা দিল- আধাসের গুঁড় দ্যান।

বাঁশের টুকরিটায় লবন আর গুড়ের পোটলাটা নিয়ে চন্দন চট করে একবার তরকারির হাটের দিক থেকে কিছু পিয়াজ, মরিচও নিয়ে নেয়। সাউ’দের দোকানে গিয়ে সরিষার তেল আর নারকেল তেলের বোতলটা টুকরির মাঝে লবন আর গুঁড়ের পোটলার ফাঁকে বসিয়ে গোঁড়ার দিকে কিছু পিয়াজ দিয়ে দেয় যাতে করে বোতল কাত হয়ে তেল না পড়ে। তারপর নৌকার দিকে যাওয়ার জন্যে পা তুলতেই প্রচন্ড একটা ঠা শব্দে সে থমকে দাঁড়ায়।

টানা ঠাঁ ঠাঁ গুলির আওয়াজ আর লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচির মধ্য দিয়ে চন্দন দৌঁড়াতে থাকে। নৌকার কাছে গিয়ে যখন সে দাঁড়ায় তার দুই হাতই খালি। লোকজনের হুঁড়োহুড়িতে মাথার টুকরি কোথায় ছিটকে পড়েছে, হাতের তেলের বোতল কখন খসে পড়েছে তার কিছুই খেয়াল নেই।

চন্দন দেখল গোঁসাই আগেই নৌকার পাছায় বৈঠা হাতে বসে আছে। তার মুখে চোখে ভয়ানক আতঙ্ক। ভয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে চিৎকার করে উঠল- অরা সব কই?
গোঁসাইর কথা শেষ হতে না হতেই বাকীরা প্রায় এক সাথেই যেন নৌকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবারই হাত খালি। চন্দন নৌকাটাকে পানিতে সজোরে ঠেলে দিয়ে গলুইয়ে বসেই দাঁড়ে হাত লাগায়।

নৌকাটা গোত্তা খেয়ে বিপরীত মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েই ছুটতে শুরু করে। তীব্র টানে দাঁড়ের বাঁশ কড় কড় করে ডাকতে থাকে। পানিতে ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করে কিছু পড়তে দেখে দিশেহারা চন্দন দাঁড় টানতে টানতে বলে উঠে- গোঁসাই কাকা, এমুন করে কী?

নৌকার পাঁছায় বসে বৈঠা ঠেলে ঠেলে হাল ঠিক রাখতে গিয়ে মানিক গোঁসাই চিৎকার করে উঠলেন- শূয়োররে একটা কতা ক’বি না! জানে বাঁচতে চাইলে খিচ্চা দাড় টান দেরে বাপ- ঈশ্বর, ঈশ্বরগো রক্ষা কর!

বাকীরাও তখন হাত বৈঠায় শরীরের সব শক্তি নিংড়ে দিচ্ছে। একটা কিছু ভোঁ করে চন্দনের কানের কাছ দিয়ে গিয়েই পাশে ছ্যাৎ করে পানিতে ডুবে গেল। চন্দন দু’পা লোহার মত শক্ত করে সামনের পাল গুঁড়ায় আটকে ফেলে সাঁড়াশির মত শক্ত হাতে দাঁড় টানতে লাগল। পায়ে ভর দিয়ে হাতের কবজিতে শরীরের শক্তি চালান দিতে তার পাছা গলুই থেকে উঠে যাচ্ছে। পানি থেকে বৈঠা তোলার সময় আবার দম টেনে নিয়ে গুলুইয়ের উপর একটুখানি বসে পড়ছে।

পাক সেনারা হাটে ঢোকেনি। ওরা হাটের পাশ দিয়ে যাওয়া নদীর উপর রেল ব্রীজে দাঁড়িয়ে বাজারের দিকে এলোপাথারি গুলি করছে। হাট থেকে রেল ব্রীজের দুরত্ব পাঁচ’শ গজের মত হবে। দিকবিদিক ছুটে যাওয়া নৌকাগুলি থেকে আর্তচিৎকার ভেসে আসছে। সবাই প্রাণপণে ছুটার চেষ্টা করছে। হঠাৎই ঝপাৎ শব্দে গোঁসাইর হাত থেকে বৈঠাখানা খসে পড়ল। গোঁসাই নৌকার পাছা থেকে দাঁড়িয়ে উঠেই বলল- কি অইলরে!

তারপরই তাঁর শরীরটা ধনুকের মত বাঁকা হয়ে নৌকার খোলের মধ্যে পড়ে গেল। নৌকাটা প্রচন্ড বেগে নিয়ন্ত্রণবিহীন হয়ে লাটিমের মত ঘুরতে লাগল। চন্দন দেখল গোঁসাইর ঘাড়ের দিক থেকে ফিন্কি দিয়ে একটা রক্তের ধারা নৌকায় ছড়িয়ে পড়ছে। হতভম্ব হয়ে যাওয়া কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই গোসাইর শরীরটা খিঁচুনি দিয়ে নৌকার খোল থেকে যেন উঠে দাঁড়াল। চন্দন দেখল তাঁর বিস্ফারিত দুচোখে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সীমাহীন কষ্ট, ভয়- বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি।

ঘুর্ণায়মান নৌকায় টাল সামলে নিয়ে কেউ তাঁকে হাত বাড়িয়ে ধরার আগেই টলে উঠে গোসাইর দেহখানি ঝুপ্ করে নদীর পানিতে তলিয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যেই স্রোতের তোড়ে রক্তের লালটুকুও হারিয়ে গেল। গলুই থেকে চন্দন হাত বাড়িয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল- গোঁসাই কাকা!

অতলে তলিয়ে যাওয়া মানিক গোঁসাই চন্দনের ডাকে কোন সাড়া দিল না। সন্ধ্যার আগে যখন তারা গ্রামে পৌঁছল খবরটা আশে পাশের দুচারটা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে বেশী সময় লাগল না। গোঁসাইর বউ ছেলে মেয়ে তো দূরের কথা অন্যরা কেউই বিশ্বাস করতে চাইল না যে গোঁসাই হাট থেকে ফিরে আসেনি, আর আসবে না।
নৌকার খোল ভর্তি পানি পুরোটাই গোসাইর রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে- শুধু এই জলজ্যান্ত প্রমাণটুকু সবাইকে একেবারে নির্বাক করে দিল। শোক বিধ্বস্ত মানুষগুলির সবার চোখ নৌকার তলানিতে আটকে গেছে; গোঁসাইর দেহটা যেন ওখানেই আছে। নৌকাটি ঘিরে বিলের ধারে সবাই নির্বাক, স্তব্দ হয়ে বসে থাকে। রাত গভীর হয় চন্দন মানিক গোঁসাইর কিশোর ছেলের হাত ধরে টেনে নিয়ে দু’জন পানিতে নেমে পড়ে। নৌকাটি গোঁসাইরই আমন ক্ষেতের ডুবিয়ে দিতে গিয়ে তাঁর কিশোর ছেলেটা ডুকড়ে উঠে। ওর কাছে নৌকাটা ডুবানো যেন পিতার মুখাগ্নি করার মতই বেদনাদায়ক একটা কাজ দাঁড়ায়। চন্দনেরও খুব কষ্ট হয়, কষ্টের সাথে ক্ষোভ দলা পাঁকিয়ে উঠে তার দম বন্ধ করে দিতে চায়।

রাতের আধাঁর শোকের আধাঁরের কাছে খুবই নগন্য। কোরোসিন ছাড়াই চন্দনদের রাত কাটে। একটা শিশু বাচ্চা নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে রাত পার করার চেয়ে একজন মানিক গোঁসাইকে হারানো তাদের কাছে আরও অনেকগুণ বেশি কষ্টময় মনে হয়।

মানিক গোঁসাই মারা পড়ার তিনদিন পর খুব ভোরে গ্রামে রাজাকারদের সাথে পাক বাহিনী আসে। গ্রামে হিন্দু লোক বেশি। লুটপাট করার ইচ্ছায়ই তারা জঙ্গলাকীর্ণ গ্রামটাতে হামলা চালায়। নাজিম খোনকার গোয়াল থেকে গরু বের করতে গিয়ে তাদের হাতে ধরা পড়ে।

তার গলায় বেনয়েট ঠেকিয়ে এক পাক সিপাহী হুংকার দিয়ে উঠে- তু মুক্তি হ্যায়?

না সাব আমি মুক্তিবাহিনী না!- নাজিম আঁতকে উঠে।

- তু হিন্দু হ্যাঁয়?
- সাব আমি মুসলমান আমার নাম নাজিম উদ্দিন খন্দকার!

এক রাজাকারের দিকে তাঁকিয়ে সিপাহীটা আবারও চিৎকার করে উঠে- ইয়ে ব্যাহেন চোদ, ইধার আ! ইসকা কাপড়া উতার দে যারা হাম ভি দেখে ইয়ে শালা ক্যায়সা মুসলমান হ্যায়!

রাজাকারটা চরম বেহায়া বেশরমের মত হাসতে হাসতে গিয়ে নাজিম খোনকারের লুঙ্গিটা খুলে ফেলে। নাজিম পাথর বনে যায়। তার চোখ দু’টি এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়।

সিপাহিটা বেনয়েটের আগা দিয়ে নাজিম খোনকারের শিন্নটা নেড়ে দিয়ে বিদ্রুপের স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে- ইতনা ছোটা লোনড্ লেকে তুম লোক শালা পাকিস্তান কি সাথ জং লড়তে হো!

সবাই হো হো করে হেসে উঠে। সিপাহিটা নাজিমের গালে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠে- শুয়োর কা বাচ্চা, পান্চ কলেমা পড়কে শোনা!

রক্তের ধারা নাজিমের ঠোটের কোণা বেঁয়ে ঝরতে থাকে নাজিম খোনকার এবার চোখ মেলে তাকায়। সিপাহীটা পশুর মত গর্জে উঠে- শুরু করতে হ্যায়, কিয়া ইয়ে তেরে পেট মে দাবা দু!

খোনকারের চোখ লাল হয়ে উঠে, সে সোজা সিপাহিটার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলে- আগে লুঙ্গিটা দেন আর ওযু না কইরা আমি কলেমা পড়তাম না।

কুত্তে কি বাচ্চা আখ উঠাকে জবান চালাতে হ্যায়- খেঁকিয়ে উঠে সিপাহীটা। বেনয়েটের খোঁচায় নাজিম খোনকারের রক্তাক্ত দেহটা বাড়ির উঠানে লুটিয়ে পড়ে। কিছু¶ণ পরই পুরা বাড়িটা দাঁউ দাঁউ করে জ্বলে উঠে। ওরা সারা গ্রাম লুটপাট শেষে সবগুলি বাড়িই পুড়িয়ে দেয়।

চন্দনরা দূরে জঙ্গলে থেকে দেখে আগুনের লেলিহান শিখা, কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী আকাশে উঠে যাচ্ছে। সীমাহীন কষ্ট আর ভয়ে তাদের যেন একটু বিলাপ করারও সুযোগ থাকে না।

পাক সেনারা চলে যাওয়ার পর সবাই যার যার ভিটায় ফিরে আসে। কিছু¶ণ পর রাতও নেমে আসে। রাতটা অন্যদিনের চেয়ে আরো অনেক অনেকগুণ বেশি আঁধার নিয়ে আসে। প্রহরগুলি যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যায়।

তারপরও রাত ফুরায়। রাত ফুরালেও চন্দনের কষ্ট ফুরায় না। মানিক গোসাইর চোখ জোড়া, পোঁড়া বাড়ির ভিটা তার হৃদয়ে সারা¶ণ রক্ত¶রণ ঘটায়। কষ্ট মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালায়। প্রচন্ড আক্রোশে সে হাত পা ছুঁড়তে থাকে।

খেয়ে না খেয়ে সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পড়ে থাকে। ট্রেনিং না থাকায় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে পারে না। তবে বিভিন্ন অপারেশনে, কাজে সে নানাভাবে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। দলের কমান্ডার খুব খুশি হয়। সে বলে- চন্দন খাতায় নাম তোল। ট্রেনিং নাও।

-নাম তুইলা কি অইব? আমার ত নাম অওনের দরকার নাই। আমি খালি প্রতিশোধ নিতে চাই! চন্দনের চোখ জ্বলে উঠে।

কমান্ডার হাসে- চন্দন, সব কিছুরই কিছু নিয়ম কানুন থাকে। তাছাড়া একদিন যুদ্ধ শেষে তোমার তো একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণও থাকা চাই।

-প্রমাণ দিয়া কি করমু? আমি তো জানি আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। চন্দন আবারও কমান্ডারের কথার জবাব দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর যুদ্ধ ফেরত জার্মানীরা যুদ্ধ করে নাই এমন সব লোকদের প্রতিনিয়ত ’আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করে বেঁচে আছি তোমরা কেন বেঁচে আছ’ বলে একরকম তিরস্কারই করত। হয়ত আমাদের দেশেও এমন কিছু হতে পারে। অবশ্য সেটা না হলেই ভালো। এই যে প্রতিদিন কত কত মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ দিয়ে যাচ্ছে এই কঠিন ত্যাগের জন্য, কাজের জন্য যথার্থ সম্মানটুকু পেলেই যথেষ্ট- কমান্ডারের কথার মাথা মুন্ডু চন্দন কিছু বুঝে উঠতে পারে না।

দলের একজনকে ডেকে নিয়ে কমান্ডার বলে দেয় চন্দনকে যেন প্রতিদিন একটু একটু করে অস্ত্র চালনা শিখিয়ে দেয়। চন্দন কমান্ডারকে একটা স্যালুট দিতে চেষ্টা করে। তারপর কমান্ডারের সামনে থেকে পা দু’পা পিছিয়ে আসে।

কমান্ডার চন্দনকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বললেন- দেশের জন্য সবার সশস্ত্র সংগ্রাম না করলেও চলে। এটা আমার কথা নয়। যুদ্ধে না যাওয়া সাধারণ জার্মান নাগরিকরা বলত “উই আর সারভাইভাল ফর আওয়ার কান্ট্রি!” আমার মনে হয় ওরা সত্যি বলত দেশের জন্যেও কিছু মানুষের বেঁচে থাকা খুব জরুরি!

চন্দন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেও ওর মনের আশা পুরা হয় না। ওর খুব ইচ্ছা অন্তত একজন পাকিস্তানি মিলিটারী নিজ হাতে খুন করে তার মৃত্যু যন্ত্রনা দেখার মধ্য দিয়ে মানিক গোঁসাই, নাজিম খোনকারের মৃত্যুর বদলা নেয়া।
যুদ্ধের তীব্রতার সাথে সাথে বাংলাদেশে বর্ষাও বাড়তে থাকে। ভাদ্রের শেষের দিকে চন্দনদের দলটার কাছে সন্ধ্যার আগে একটা খবর আসে দল ছুট একজন পাকি¯—ানি সেনা গ্রামবাসী আটক করেছে। কমান্ডার খবর শোনা চন্দনকে নির্দেশ দেয়- তোমার মনের আশা পূরণের জন্যই হয়ত উপরওয়ালা ওকে গ্রামবাসীর হাতে আটক করেছে। যাও, তোমার ইচ্ছা পুরণ করে এস। আজকের পর হয়ত আর কোনদিনই তোমার জন্য এমন সুযোগ আসবে না।

চন্দন কমান্ডারকে একটা স্যালুট ঠুকেই রাইফেল কাঁধে বেরিয়ে পড়ল। একটা মসজিদের পাশে একটা জংলা কবর স্থান ওরই এক কোণায় দশ পনের জন নারী পুরুষ কিছু একটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সে কাছে যেতেই সবাই জায়গা ছেড়ে দিল।

চন্দন দেখল বিশ বাইশ বছরের একটা যুবক। ওর সারা গায়ে রক্ত লেগে রয়েছে বোঝা গেল সারাদিনই যে যেভাবে পেরেছে ওকে নির্যাতন করেছে। চন্দনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে সবাইকে দ্র“ত জায়গাটা ছেড়ে দূরে চলে যেতে বলল। যারা কাছে দাঁড়িয়ে একজন পািস্তানি শত্র“র মৃত্যুটা উপভোগ করতে চেয়েছিল চন্দনের কড়া ধমকে তারাও সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হল।

চন্দন পিঠ মোড়া করে শক্তভাবে বেঁধে রাখা পাকিস্তানিটাকে ঘাড় ধরে টেনে সোজা করে বসানোর চেষ্টা করতেই লোকটা মৃত্যু ভয়ে কাত হয়ে চন্দনের পায়ের উপর পড়ে গেল, বেশ বোঝা গেল ওর হাতদুটো ছাড়া থাকলে ও চন্দনের পা দুটো আকঁড়ে ধরত। সে কঁকিয়ে উঠে কোন মতে উচ্চারণ করল- আল্লাহ কি ওয়াস্তে মুজ পে রহম কর!

চন্দনের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল। পাকিস্তানিটা ব্যাকূল হয়ে আকুতি জানাতে লাগল- ম্যায়নে কোই বাঙালীকে খুন নেহি কিয়া, কিসি পে কোই জুলুম নেহি কিয়া। স্রিফ তিন দিন পেহেলেই মুজে লাহোর সে ইহা ভেজায়া গায়া!

চন্দন ঝটকা মেরে দু’পা পিছিয়ে গিয়েই কাঁধ থেকে রাইফেলটা টেনে নিল। পাকসেনার ঠিক বুক বরাবর নিশানা তাক করে ট্রিগারে চাপ দেয়ার সময়ই লোকটা আবার আর্তনাদ করে উঠল- ঘর পর মেরা বিমার বুড্ডা বাপ পড়া হুয়া হ্যায়! ও ভি মর যায়েগা- তুমহারা ভি ঘর পর বাপ হোগা!

চন্দনের আঙুলটা বিবশ হয়ে ট্রিগারে যেন আটকে গেল। মনের পর্দায় ওর নিজের অসুস্থ বাবার মুখচ্ছবিটা জেগে উঠল। সে আরও দু’এক বার চেষ্টা করেও লোকটার উপর গুলি চালাতে পারল না। অনেক¶ণ লোকটার পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। সে হেরে গেল। মানিক গোঁসাই আর নাজিম খোনকারের হত্যার প্রতিশোধ নিজ হাতে নেয়া হয়ে উঠে না। কিন্তু শত্র“কে বাঁচিয়ে রাখার কোন উপায় নেই।

চার পাশে অন্ধকার ঘন হয়ে আসে। চন্দন আশে পাশেরই একজনকে ডেকে একটা নৌকা জোগাড় করতে বলে। কিছু¶ণের ভিতরই সব আয়োজন করে পাকিস্তানিটাকে নৌকায় তোলা হয়। দু’তিনজন খুব উৎসাহ নিয়ে নৌকায় উঠে। ওদের একজনের কাছে একটা বড় টর্চ লাইটও দেখা যায়।

অন্ধকারের গা বেয়ে বেয়ে নৌকাটা বিলের মাঝ বরাবর চলে যায়। পানির গভীরতা আট দশ হাত হবে অনুমান করে। চন্দন নৌকাটি হাতের ইশারায় থামায়। খুব শক্ত করে পাকিস্তানটার হাত পা বেঁধে চোখ দুটোও একটা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। অনেক চেষ্টা করেও চন্দন নিজে পারে না খুব কষ্টে একজনকে ইশারা করেই সে চোখ বন্ধ করে।

ঝুপ্ করে পানিতে কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়। শব্দটা চন্দনের কানে মানিক গোঁসাইর পড়ে যাওয়ার শব্দের মতই লাগে। সে আরও কিছুটা সময় চোখ বন্ধ করেই থাকে। যখন চোখ খোলে দেখে টর্চ নিয়ে আসা লোকটা পানিতে আলো ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। অবিশ্বাস্য ভাবে তখনই পাকি¯—ানিটা ভূস করে একবার ভেসে উঠে। কিভাবে জানি ওর চোখের উপর থেকে গামছাটা সরে গেছে। ভেসে উঠেই হাত পা বাঁধা লোকটা আবার ডুবে যেতে থাকে। চন্দন দেখল, স্পষ্ট দেখল- তার বিস্ফারিত দুচোখে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সীমাহীন কষ্ট, ভয়- বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি। তার কাছে পাকিস্তানিটার চোখ দুটি অবিকল মানিক গোসাইর চোখের মত মনে হয়; দু জনের চোখের কোথাও সে বিন্দু মাত্র ব্যবধান খুঁজে পায় না।

মুক্তিযোদ্ধার চোখে পানি বড় বেমানান। ফিরে যেতে যেতে সে এক দলা থুতু অন্ধকারের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে- ছি: যুদ্ধ এত খারাপ!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন