বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (সেপ্টেম্বর ২০১৭)

অননুমেয়
ভৌতিক

সংখ্যা

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯

মোঃ আক্তারুজ্জামান

comment ১১  favorite ০  import_contacts ২৯২
(১)
ট্রেন যখন আমাদের ছোট্ট ষ্টেশনটায় থামলো তখন রাত প্রায় একটা বেঁজে গেছে। রেলওয়ের সময়সূচী অনুযায়ী সাড়ে নয়টায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও ট্রেনটা প্রতিদিন দশটা, সাড়ে দশটা নাগাদ আমাদের এই ষ্টেশনটায় পৌঁছে যায়।

প্রায় দু’ মাইল পথ হেঁটে আমাকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেলো। একটু ভয়ই লাগতে লাগলো আমার। জনা বিশেক যাত্রীর মতো ট্রেন থেকে নামলেও ষ্টেশন থেকে বের হয়ে আমার পথের দিকের একজনও পেলাম না। যার যার মতো করে সবাই নানা দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেন সহসাই বাতাসে মিলিয়ে গেলো।

মাঝরাতে আগে যে আরো এরকম অবস্থায় পড়িনি তা নয়। আরো দু’চার বার এরকমই গভীররাতে একা যেতে হয়েছে। ডাকাতের ভয়, ভুতের ভয় বুকে নিয়ে ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছে গেছি।

অনেকবার ভয় পেয়ে, বিড়ম্বনায় পড়ে প্রতীজ্ঞাও করেছি প্রত্যেক সপ্তাহান্তেই আর বাড়ি আসা নয়! মাসে বড়জোর একবার। কিন্তু তা আর হয়নি। নিজের বাড়ি আর মা-বাবা, ভাই-বোনদের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণে প্রত্যেক সপ্তাহেই আমি বাড়ি ফিরে এসেছি।

প্রত্যেকটা শনিবারের বেলা গড়ানোর মধ্য দিয়েই বাড়ি না ফেরার ওই প্রতীজ্ঞা দ্রবীভূত হতে হতে বাতাসে মিলিয়ে যেতো। শনিবারের শেষ ক্লাস করে বের হয়ে হোষ্টেলে ফিরেই নিজের ছোট্ট ব্যাগটা কাঁধে ফেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার মাঝে কী যে আনন্দ হতো।

নির্জন অন্ধকার জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা ধরে অনেকটা পথ হেঁটে আমাকে বাড়ি যেতে হতো। দেখা গেছে কোনরাতে একটা শিয়াল ভুল করে সামনে এসেই খুব ভয় পেয়ে পিছন ফিরে দু’এক বার আমাকে দেখতে দেখতে ছুটে পালিয়ে গেছে। শিয়াল আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে, আমি শিয়াল দেখে ভয় পেয়ে গেছি!

এমনও একাধিকবার হয়েছে নির্ভয়েই হেঁটে যাচ্ছি হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে একটা মস্ত দাড়াশ সাপ পায়ের কাছ দিয়েই ছুটে পালালো। হালকা আলোতে সাপের কালো কুচকুচে শরীর চক্চক্ করে উঠলো। দমবন্ধ করা ভয় পেয়ে আমিও কয়েক পা আগে বা পিছনে গিয়ে লাফিয়ে পড়লাম।

কোনরাতে বাড়ির কাছাকাছিই চলে এসেছি। অনেকটা নির্ভার হয়ে হাঁটছি। কিন্তু কলার থোড়ে বসে থাকা একটা ভাদুড় আমার ভয়ে তার মস্ত ডানা ঝাপটে অদ্ভুত শব্দ করে উড়ে গেলো। আমিও আঁৎকে উঠে ঠায় দাঁড়িয়ে পড়েছি।

মাথার চুল, গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠার মতো নানারকম ঘটনা ঘটতো। ভয়ে ভয়ে ভয় হজম করেই চলাফেরা করতাম।

সম্ভবত তখন সিক্স সেভেনে পড়ি। একদিন কোথা থেকে বাড়ি ফিরতে যেন আমার দেরী হয়ে গেলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বাড়িতে ফিরতেই হালকা বাতাসের সাথে একটু একটু বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে। অন্ধকারে দেখলাম ঘরে তালা ঝুলছে। বাবামা কেউই বাড়িতে নেই।

পাশের বাড়িতে খোঁজ নিলাম। শুনলাম আমার ছোটকাকা মারা গেছেন। উনি জটিলরোগে অনেকদিন বিছানায় পড়েছিলেন। আমাদের বাড়ির সবাই ছোটকাকার বাড়িতে চলে গেছে। ছোটকাকার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে মিনিট দশেকের পথ দূরে, একই গ্রামে।

আমি খবরটা শুনেই ছুটলাম। বৃষ্টি ও বাতাসের তীব্রতা তখন বেশ বেড়ে গেছে। আমাদের গ্রামের একমাত্র পুকুরটার পশ্চিম উত্তর কোণায় একটা জংলার মাঝে ছিল একটা আকাশছোঁয়া জলপাইগাছ। সন্ধ্যায় আর খুব ভোরে ওটার নীচ দিয়ে মস্ত ঘোমটা টেনে একটা সাদা শাড়ী পরা বউ চলাফেরা করার কাহিনী আমাদের গ্রামের সবারই জানা। কিন্তু নিজে চোখে দেখেছে এমন কারো সাক্ষাত কোনদিন পাইনি।

ছোটচাচার বাড়ি ওই জলপাইগাছটার নিচ দিয়েই যেতে হতো। ওইদিন ওই গাছটার নিচে যেতেই সেই লম্বা ঘোমটা টানা বউয়ের কথা মনে পড়লো। আমার মাথার চুল, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো! অন্ধকারটা ওখানে এমন গাঢ় ছিলো যে নিজেকেই নিজে দেখতে পাচ্ছিলাম না। মাথার ভিতর দ্রিম দ্রিম করে কয়েটা আওয়াজ হলো। আমি খুব ভয় পেলে আমার এরকম হয়!

জলপাইগাছটার নীচ থেকে ফাঁকা জায়গায় পৌঁছাতে কয়েক সেকেন্ড লাগে কিন্তু আমার মনে হলো আমি যেন কয়েক যুগ দৌড়ানোর পড়ই একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বেরোতে পেরেছি।
এখানেই শেষ নয়। সেদিন চাচার বাড়ি যেতে আমার আরও ভয় পাওয়ার বাকি ছিলো! পুকুরের পশ্চিম পাড়েই ছিলো দৈত্যাকার একটা গাবগাছ। এইগাছটায় একটা পা রেখে পুকুরের মাঝখানে অন্য পা টা ডুবিয়ে একটা ভুতের আয়েশ করে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটায় আমি মিনিট খানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। তারপর আমি গাবগাছটার দিকেও তাকালাম না, পুকুরের দিকেও তাকালাম না!

মাটির দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতবেগে দৌঁড়ানো মানুষ হয়ে ছুট দিলাম! কিছু না দেখলেও স্পষ্ট অনুভব করলাম দুপ্দাপ্ করে কিছু একটা আমার সাথে সাথেই ছুটছে। ওটা যে কোন মুহুর্তে আমার ঘাড়ে থাবা বসাবে।

পুকুরের শেষপ্রান্তে পৌঁছে মাটির উপর থেকে মাথা তুলে তাকিয়েই আমি ভয়ে ককিয়ে উঠে এ্যাঁ এ্যাঁ করতে লাগলাম। আমি দেখলাম রাস্তার বামপাশে আমার চেয়েও লম্বা মতো লিকপিকে মতো একটা মানুষ! মানুষটা ডানেবামে অদ্ভুত ভঙ্গির একটা তালে নেচে যাচ্ছে!

আমাকে চাচার বাড়ির চুলার পোঁড়ামাটি খেতে হলো। মসজিদের হুজুর দোয়া পড়ে আমার বুকে ফুঁ দিয়ে দিলেন। একগ্লাস পানি পড়ে দিলেন।

মজার ব্যাপার হলো এইরকম ভয় পাওয়ার ব্যাপারগুলি শুধু রাতের বেলাই ঘটতো। ওই যে অদ্ভূতভাবে নেচে যাওয়া একটা মানুষের মতো দেখে ভয়ে আমার মরার যোগাড় হয়েছিলো ওই রহস্যের উদ্ঘাটনও পরের দিন সকালবেলা নিজেই করেছিলাম। ওখানে গিয়ে দেখি একটা ছোট খেজুরচারার কঁচি ডাল তখনও নেচে যাচ্ছে। বৃষ্টির সাথে সকালেও বাতাস বইছিলো। খেজুরগাছের ওই নরম ডালটা বাতাসের তোড়ে বিরামহীনভাবে নেচেই যাচ্ছিলো।

(২)
আমি হাঁটতে হাঁটতেই একবার ঘাড় ঘুরিয়ে রেলষ্টেশনটার দিকে তাকালাম। কেউই নেই, আর কোন সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় আমি লাগিয়ে হন্হন্ করে হাটঁতে শুরু করলাম।
কিছুটা পথ এগিয়ে যেতেই আমি টের পেলাম একটা মানুষ আমার দিকে রীতিমতো ছুটে আসছে। লোকটা পাশে পৌঁছেই হাপাঁতে হাপাঁতে জানতে চাইলো- ভাইয়া, আপনি কি খলিলাবাদের দিকে যাবেন?

আমি সাথে এসে যোগ দেয়া লোকটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। সে আমার চেয়ে বয়সে বেশ ছোট হবে। আমি তার কথার জবাব দিলাম- হ্যাঁ, আমি ঠাকুরদের বাতানবাড়ী পর্যন্ত যাবো।

ছেলেটার গন্তব্য থেকে প্রায় আধামাইল আগেই আমার যাত্রা শেষ হবে। আমাদের গ্রামের পরে আরো একটা গ্রামের ছোট্ট একটা অংশ পেরুলেই ছেলেটার গ্রাম-খলিলাবাদ।
সে হাসতে হাসতে বললো- বেঁচে গেছি। আপনাকে না পেলে হয়তো আজকে আমি ভয়েই মরে যেতাম।

আমিও ছেলেটাকে পেয়ে নিজেকে বেশ হাল্কাবোধ করলাম। অন্ধকার তবু ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞ্যেস করলাম- তুমি কোথা থেকে ফিরছো?

ছেলেটা প্রথম থেকে বেশ উঁচু গলায় কথা বলছিল কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তার গলার আওয়াজ একটু পড়ে গেলো। মন খারাপ করা গলায় সে বললো- বাবা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মাকে বাবার কাছে রেখে এলাম।

ওর কথা শুনে আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেলো। গ্রামের মানুষ খুব জটিলরোগে আক্রান্ত না হলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হয় না। ছেলেটার বাবার অসুখ কী, কেমন অবস্থা ভেবে আমার খারাপ লাগতে লাগলো।

আমরা দুজনে সমানতালে পা ফেলে এগুতে লাগলাম। ছেলেটাকে একটু স্বাভাবিক অবস্থায় আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আমি জানতে চাইলাম- তোমার নাম কী?
-মোঃ জহিরুল ইসলাম।
-আচ্ছা। জহিরুল, তুমি কী লেখাপড়া কর?
-জ্বী! আমি আমিন সরদার উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে পড়ি।
-ভালো। তোমার আরও ভাইবোন আছে?
-হ্যাঁ, আমার আরোও ছোট দু’ ভাই আছে। ওদের জন্যই তো এই রাতে আমাকে ফিরতে হলো। নয়তো আমি মায়ের সাথে হাসপাতালেই থাকতে পারতাম।

আমাদের গ্রামের মানুষগুলোর যে কতোরকমের ঝামেলার মধ্যদিয়ে যেতে হয়! আমি টের পেলাম। জহিরুল আমার মুখের দিকে তাকিয়েছে। তারপর একসাথে দুটো প্রশ্ন করলো- আপনি কোথা থেকে এসেছেন? কী করেন?

-জহিরুল আমিও ওই আমিন সরদার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া করেছি। এখন জগন্নাথ কলেজে বি.এ পড়ি। সেখান থেকেই আজ বাড়ি ফিরলাম।

কালতো রবিবার, ছুটি! তাই বাড়ি এলেন বুঝি?- জহিরুলের গলায় বেশ খুশির আমেজ, টের পেলাম।

ছুটি শব্দটা সব ছাত্রছাত্রীদের কাছেই খুব আনন্দের হয়! সপ্তাহের একটা পুরোদিন সবার শাসনবারণের বাইরে থাকার, একটু বেশি আনন্দ করার কাটানো অন্যরকম স্বাধীনতার স্বাদের নামই ছুটি!

আমাদের পথচলায় বেশ একটা গতি চলে এলো। হাঁটতে হাঁটতে জহিরুল আমার কানের দিকে ওর মুখটা এগিয়ে দিলো। আমি একটু অবাক হলাম। ফিস্ফিস্ করে সে বললো- আন্ধারমানিক গতরাতে একটা ঘটনা ঘটে গেছে! আপনি কিছু শুনেছেন?

আমাদের গ্রাম আর জহিরুলদের গ্রামের মাঝখানে একটু কোণার মতো ঢুকে পড়া গ্রামটার নামই আন্ধারমানিক। কিন্তু ওখানে ঘটে যাওয়া কোনকিছুর খবরই আমার জানা ছিলো না।
জহিরুল আবার আমার কানের দিকে তার মুখ এগিয়ে দিলো। আমার বামহাতটা ধরে খুব ভয়ার্ত গলায় বললো- গতরাতে আন্ধারমানিক একটা খুন হয়েছে!
-খুন! আমি চমকে উঠলাম।
-হ্যাঁ! ঢালী বাড়ির নাহিদাকে গতরাতে ভূতে মেরে ফেলেছে!
আমি আমি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞ্যেস করলাম- নাহিদা কে? ফরিদার বোন?

জহিরুল তার মাথা কাত করে আমার প্রশ্নের হ্যাঁবোধক উত্তর জানালো। আমার চোখের সামনে ফরিদার চেহারাটা ভেসে উঠলো। ফরিদা আমাদের সাথেই ক্লাস নাইন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলো। আমরা হঠাৎ একদিন শুনলাম ওর বিয়ে। এরপর ওকে আর আমরা দেখিনি।

আমাদের সময় লেখাপড়া বন্ধ করে মেয়েদের বিয়ে দেয়াটা কোন ব্যাপারই ছিলো না। প্রাইমারী স্কুল থেকেও অনেক মেয়েই ঝরে যেতো। ফরিদা স্কুল ছেড়ে দিলো ক্লাস নাইনে উঠে!

মাস কয়েক কেটে গেছে। আমরা ওকে ভুলে যেতে শুরু করেছি। একদিন সকালবেলা সারা এলাকা তোলপাড় করে দিলো একটা খবরে। ফরিদা বাপের বাড়ি এসেছিলো বেড়াতে। বাপের বাড়ি এসে সে খুব উচ্ছ¡সিত ছিলো। ভাইবোনদের সাথে অনেকরাত অবধি হৈ-হুলে­াড়, হাসিতামাশা করে ঘুমুতে গিয়েছিলো। সকালে যতীনদের বকুলগাছের গোড়ায় ফরিদার লাশ পাওয়া গেছে। রাতে ওকে ভুতে মেরে ফেলেছে!

যতীনদের অনেক জমাজমি ছিলো। একটা মস্ত বড় চালার ফাঁকা জায়গায় ছিলো ওই বকুলগাছটা। যার নীচে ফরিদাকে পাওয়া গেছে। ওই বকুলগাছটাকে ঘিরেও ভুতপ্রেতের নানারকম গল্প আমাদের এলাকায় প্রচলিত ছিলো।

আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে দলে দলে মানুষ ভুতের হাতে মারা যাওয়া ফরিদাকে দেখতে আন্ধারমানিক যেতে লাগলো। ফরিদা আমাদের সাথে পড়তো তাই আমাদের মনে অন্যরকম একটা কষ্ট ছিলো। খবর শুনেই ছুটে গেলাম।

বকুলগাছটার নীচে গিয়ে দেখি মানুষের খুব ভিড়। ভিড় ঠেলেঠুলে কাছে গিয়ে দেখলাম। ফরিদা বকুলগাছের মোটা শিকঁড়ে যেন ঠেস্ দিয়ে বসে আছে। ওর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম। মাথার চুলগুলো এলোমেলো, কপালে অর্ধচন্দ্রাকার একটা কাটা দাগ। চুলের সাথে রক্ত লেগে জায়গায় জায়গায় জমাট বেঁধে শুঁকিয়ে কালো হয়ে আছে।

নানা লোকের মুখ থেকে নানারকম কথা ঝরতে লাগলো। সবকথা ছাপিয়ে যে কথাটি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলো তা এরকম যে ভুত রাতের কোন একসময় ফরিদাকে তার স্বামীর গলায় ডেকে তুলেছে। তারপর বকুলগাছটার নিচে এনে মাথায় কামড় বসিয়ে মেরে ফেলেছে। তার কপালে ভুতের দাঁতের কয়েকটা দাগ স্পষ্ট!

বকুলতলা থেকে ফরিদাদের বাড়ি গেলাম। সেখানেও লোকে লোকারণ্য। ওর পাড়াপ্রতিবেশীরা হাহাকার করছে। একজন মাঝবয়সী মহিলাকে ঘিরে কান্নার রোলটা খুব তীব্রভাবে চলছিলো। বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে উনি ফরিদার মা।

ফরিদার মা ঘোমটা টেনে বসেছিলেন। মাঝে মধ্যে তাঁর মুখের ঘোমটা সরে যাচ্ছিল। দীঘির পানির মতো স্থির একটা মুখ! দু’ চোখে একফোঁটা পানিও নেই। অনেকেই আফসোস করছিলো যে বেচারী শোকে পাথর হয়ে গেছে!

থানা থেকে পুলিশ আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ এলাকার ময়মুরুব্বীরা দারোগার সাথে কথা বলে ফরিদার লাশ আর থানায় নিতে দিলেন না। ওদের কোন শত্র“ নেই, কারো সাথে বিবাদ নেই। কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও নেই। ভুতের হাতে মারা মরা মেয়েটাকে আর টানা হেঁচড়া, কাটা ছেঁড়া করতে কেউই চাইলেন না।

জহিরুলের মুখ থেকে ফরিদার বোন নাহিদার মৃত্যুর খবরে আমার খুব কষ্ট হলো। এতটাই খারাপ লাগলো যে বাকী পথটুকু হাঁটার সময় আমি আর জহিরুলের সাথে কোন কথাই বললাম না।

আমি আমার গ্রামে পৌঁছে জহিরুলকে একা ছেড়ে দিতে পারলাম না। একটা দায়িত্ববোধ থেকে ওকে ওর বাড়ি পৌঁছে দেয়ার জন্য আমি খলিলাবাদের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ওকে পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরে আসতে আমাকে মাইলখানেক অতিরিক্ত পথ হাঁটতে হবে। এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়ার কোন সুযোগ ছিল না।

যাহোক, জহিরুলকে নিয়ে যখন আন্ধারমানিক গ্রামটার উপর দিয়ে যাচ্ছিলাম আমার মনে হলো রাতেরকোলে পুরো গ্রামটাই যেন মৃতের মতো পড়ে আছে!

এম.এ পাশ করার পর ঢাকারই একটা স্কুলে আমার শিক্ষকতার চাকুরী হয়। নানা কারণে প্রতি সপ্তাহান্তেই আমার বাড়ি যাওয়াটা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

একদিন রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে টেলিভিশনে খবর দেখছিলাম। খবরের শেষের দিকে সংবাদ পাঠিকা আমার জেলার নাম নিয়ে আন্ধারমানিকের একটা রহস্যজনক মৃত্যুর কথা পড়লেন।

অনেকদিন পর আন্ধারমানিক গ্রামটার নাম শুনে আমার মনটা অস্থির হয়ে গেলো। ফরিদা নাহিদার কথা মনে পড়লো। ওদের অকালমৃত্যুর কথা মনে করে বুকটা ভারী হয়ে উঠলো। অস্থিরতার একপর্যায়ে আমি আমাদের থানার ফোন নাম্বার খুঁজে বের করলাম।

আমি রীতিমতো কাঁপা হাতে টেলিফোনে নাম্বার ডায়াল করলাম। ওপ্রান্ত থেকে কেউ রিসিভারটা তুলতেই আমি নিজের পরিচয় জানালাম।

থানা থেকে যিনি টেলিফোনটি রিসিভ করলেন উনি বললেন-জ্বী, বলুন কী জানতে চান।
-আন্ধারমানিকের খুনের ব্যাপার জানতে চাইছিলাম।

-হ্যাঁ। ওই গ্রামে শ্বাশুড়ির হাতে তার ছেলেরবউ খুন হয়েছেন। শ্বাশুড়ি তার ছেলের বউকে খুন করে ভুতের কান্ড বলে চালাতে চেয়েছিলেন।

-কীভাবে খুনটা করলেন, প্লীজ যদি একটু বিস্তারিত জানাতেন?

-এই মহিলা এর আগেও তার নিজেরই দুই মেয়েকে একইভাবে খুন করেছেন। উনি একটা কাঁসার বদনা দিয়ে একই কায়দায় মাথায় আঘাত করে নিজ পরিবারের তিনজনকে মেরে ফেলেছেন।
কিন্তু কেন?- আমি চিৎকার করে উঠলাম।

ওই মহিলা জানিয়েছেন তার দুই মেয়ে এবং তার ছেলের বউ- এই তিনজনই শয়তানের মতো করে হাসতো। তাই উনি তাদেরকে মেরে ফেলেছেন। মহিলাকে ভয়ানক মানসিকরোগী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আরো বিস্তারিত জানা যাবে, ধন্যবাদ।


advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
    বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত এখানে নিবন্ধন করবার আগে থেকেই আপনার লেখার আমি একজন নিয়মিত পাঠক । এবারের গল্পটি খুব ভাল লেগেছে । শুভকামনা আর ভোট রইল । আমার গল্প , কবিতার পাতায় আসবার অনুরোধ রইল ।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • সাইফুল বাতেন টিটো
    সাইফুল বাতেন টিটো লেখাটা অনেক অনেক চমৎকার সন্দেহ নাই। কিন্তু ভৌতিক বলে মনে হয়নি। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • শামীম খান
    শামীম খান অনেক দিন পরে আপনার গল্প পড়লাম । ঝরঝরে লেখা । কাহিনী ভাল লেগেছে । শুভ কামনা আর ভোট রইল ।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
    বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে অনেক অনেক ধন্যবাদ ।
    প্রত্যুত্তর . ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • আহা রুবন
    আহা রুবন আমার কাছে কাগজের প্রতিবেদনের মতো লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • সালমা সিদ্দিকা
    সালমা সিদ্দিকা আমার ভালো লেগেছে, অনেক ব্যাখ্যাতীত বিষয়কে ভৌতিক মনে হয় পরে দেখা যায় তার পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অপরাধ। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
    • মোঃ আক্তারুজ্জামান 'ভুতে মারা'র সব কাহিনীর পিছনেই মানসিক রোগী বা অপরাধীর হাত থাকে। আমি এই বক্তব্য সামনে রেখেই এই লেখাটি সাজাতে চেয়েছি। অনেক অনেক ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য।
      প্রত্যুত্তর . ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম চমৎকার কাহিনী বিন্যাস। পড়ে খুব ভালো লাগলো ভাই...তবে জহিরুলকে তার বাসায় দিয়ে আসা... তারপর হঠাৎ 'এম.এ পাশ করার পর ঢাকারই একটা স্কুলে আমার শিক্ষকতার চাকুরী হয়।'-একটা জায়গায় এসে কিছুটা হোঁচট খেলাম। ভয়ের বেশকিছু দৃশ্য ভীত করে দিয়েছে। শেয়াল এবং বাঁদুরের ব্যাপার...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
    • মোঃ আক্তারুজ্জামান জহিরুলকে তার বাসায় দিয়ে আসা... তারপর একটা দীর্ঘ বিরতি বোঝাতে লেখাটায় তৃতীয় পরিচ্ছেদ (৩) দিয়ে দিলে আপনাকে আর এই হোঁচট খেতে হতো না। এখানে আমার একটা ভুল হয়ে গেছে। মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়ে মূল্যবান মত দেয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।
      প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
    খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি ভাল লেগেছে সুপার ন্যাচারাল না তবে ভয় পাবার মত যথেষ্ট উপাদানে গল্পটি উপাদেয় হয়ে উঠেছে... অনেক ধন্যবাদ আক্তার ভা......
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • ম নি র  মো হা ম্ম দ
    ম নি র মো হা ম্ম দ শুভেচ্ছা সহ ভোট রইল! Kobita prar amontron
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান গল্পটি পড়েছি তবে মন্তব্য করতে দেরি হল,বিন্যাস,আঙ্গিক,চরিত্র পরিপুষ্ট,মুগ্ধতা সহ ভোট রইল।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭