লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ জুন ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুলাই ২০১৪)

ভয় ও ভালোবাসা
বাবা দিবস

সংখ্যা

এফ রহমান

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩৭৪
আষাঢ়ের আকাশ আজ মুখ ভার করে আছে। সকাল থেকেই থেকে থেকে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। বারান্দার রাউন্ড টেবিলের সামনে শান্ত চুপটি মেরে বসে আছে। তার মুখ খানাও আষাড়ের মেঘের মত বেজায় কালো হয়ে আছে। টেবিলের উপর বোর্ডে আটকানো এডমিট কার্ড আর বিজ্ঞানের প্রশ্ন। ক্লাস সেভেনের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা দিয়ে কিছু আগে বাড়ীতে ফিরেছে সে। ঘড়ির কাটা টিকটিক করে যতই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, শান্তর বুকের ভেতর ধুকপুক সেই সাথে বেড়ে চলেছে। একটু পরে আব্বু দুপুরে খেতে বাসায় ফিরবে। আব্বুকে সে জমের মত ভয় পায়। প্রতিদিন পরীক্ষা দিয়ে আসার পর আব্বু প্রশ্নপত্র নিয়ে পড়ে, দাগ নম্বর অনুযায়ী কৈফিয়ত নেয়। শান্তর বড় দুর্বলতা হলো সে ঠিকঠাক ভাবে মিথ্যা বলতে পারে না। ধরা পড়ে গিয়ে কপালে চড় থাপ্পড় জোটে।

শান্তরা চালনায় ভাড়া বাড়িতে থাকে। একখানা মোটে ঘর। বড় খাটে আব্বু আম্মু ছোট ভাইকে নিয়ে থাকে। আলনার আড়ালে রাখা ছোট চৌকি খাটে ঘুমায় শান্ত। বারান্দায় টেবিলের পাশে একটা খাট। খাটের দুইখানা তক্তা ভাঙা। খাটের উপর বসে ছোট ভাইটা খেঁজুরের বিচি দিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে কি একটা খেলা খেলছে। পশ্চিমের লাগোয়া বারান্দায় রান্নাঘর। শান্তর মা খুব সম্ভবত চুলায় শাক তেলে দিচ্ছে। বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে ফিচফিচে আওয়াজ উঠলো। আজ কাঁঠাল বিচি দিয়ে শাক রান্না করার কথা। কাঁঠাল বিঁচি দিয়ে শাক ভাজি খেতে শান্তর খুব ভালো লাগে।

রফিক সাহেব অফিস থেকে ফেরার পথে আঁচাভূয়া বাজার থেকে এক কেজি আম হাতে করে নিয়ে এসেছেন। এই দূর্মূল্যের বাজারে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। হুহু করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকার যদিওবা বেতন স্কেল বাড়ায় তো দেখা যায় অন্যান্য জিনিসের বর্ধিত মূল্য বেড়ে মূল খরচ বেড়েছে চারগুন। সরকারী অফিসের ক্লার্কের চাকুরী করে সৎভাবে জীবন চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। মেজাজ তো আর এমনিতে চড়ে থাকেনা।

বারান্দায় বসা বড় ছেলের মুখ দেখেই তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। মেজাজটা খিঁচড়ে গেলো। বড় ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু একটু কম চালু। পরীক্ষায় বরাবরই সেকেন্ড থার্ড হয়। আরেকটু মনোযোগ দিলেই ফার্স্ট হতে পারে। কিন্তু সেদিকে খেঁয়াল নেই। টিভি দেখতে, খেলা করতে তো তার কোন আলস্য দেখা যায় না। যত কষ্ট কেবল বই পড়তে। আরে রফিক সাহেব যে পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে সেই পরিবেশে এরা জন্মালে তো আজ বকলম মুর্খ হয়ে থাকতো। তাকে পড় বলার কেউ ছিলো না। স্কুলে না গিয়ে বাপকে কাজে সাহায্য করলেই বরঞ্চ খুশী হত। সেই পরিবেশ থেকে রফিক সাহেব উঠে এসে আইএ পর্যন্ত লেখা পড়া করেছেন। সরকারী অফিসে ক্লার্কের চাকরী জুটিয়ে নিয়েছেন। সে অনেককাল আগের কথা। স্কুলে যেতে হত তিন মাইল দূরে। যাওয়ার পথে খাল পড়ত। খাল পেরোনোর জন্য সাথে গামছা নিতে হত। গামছা পড়ে বই, প্যান্ট উচু করে ধরে খাল পেরোতে হত। আর এটাকে দিন রাত ঠেলেও কিছুই হয় না।

রান্না হতে দেরী আছে। ছেলেকে নিয়ে পড়লেন তিনি। ‘একের কোনটা লিখেছিস?’
‘অথবা’।
‘কেমন লিখেছিস?’
‘ভালো’।
‘সবসময় তো ভালো ছাড়া আর কিছু শুনিনে। পাঁচের ভেতর কত পাবি?’

শান্ত বলতে পারে না। চুপ করে থাকে। সে কিভাবে জানবে স্যার কত দেবে তাকে!

‘সাত নম্বর দাগাসনি ক্যান?’
শান্ত কাঁপাকাঁপা গলায় বলে, ‘সাত লিখিনি’।
‘কেন লিখিসনি?’
‘উত্তর মনে পড়ছিলো না’।
‘কেন মনে পড়লো না। কালকে রাতেই তো এইটার উত্তর পড়লি। বেয়াদব একটা’।

পরীক্ষার উত্তর না লেখার সাথে আদবের কি সম্পর্ক শান্ত সেটা ভাবার অবকাশ পেলো না। রফিক সাহেবের রাগ মাথা থেকে হাতের ডগায় চলে এলো। তিনি শান্তর কান বরাবর থাপ্পড় মেরে বসলেন। থাপ্পড় খেয়ে শান্ত এক দৌঁড়ে গেটের বাইরে চলে গেলো। শান্তর মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘খাওয়া দাওয়া করে তারপর বসলে পারতে। দেখ ছেলেটা কোথায় গেলো! কোথায় গিয়ে ভয়ে বসে থাকবে। সকালে সেই আলু ভর্তা দিয়ে একমুঠো ভাত খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেছে’।

ছেলের ব্যবহারে রফিক সাহেব কিছুটা আশ্চর্য্য হয়েছেন। অন্যদিনে মারলে ছেলে গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে মাকে ডাকে, ‘আম্মু বাঁচাও, আম্মু বাঁচাও’। আজ সোজা বাড়ির বাইরে ছুটে গেলো। রাস্তায় বেরিয়ে দেখে শান্ত কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি হাত উঁচিয়ে ডাকলেন। শান্ত ভাবলো, তাকে মেরে আব্বুর শান্তি হয়নি। আরো মারবে। সে দৌড় শুরু করলো। সোজা দক্ষিণের দিকে। দক্ষিণ দিকেই তাদের গ্রামের বাড়ি। সুন্দরবনের কাছে। ভাগবাহ গ্রাম। লঞ্চে করে যেতে হয়। স্যান্ডেল পরে আসতে পারেনি। পায়ের নিচে পিচের রাস্তার সুড়কি ফুটছে। ছেলের মতিগতি রফিক সাহেব বুঝতে পারলেন না। বুধবারে চালনায় সাপ্তাহিক হাট বসে। রাস্তায় নানান জায়গায় লোক। ছেলে কার পাল্লায় পড়ে তার ঠিক আছে। তিনি ছেলের পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন।


শান্তর দুচোখ ফেঁটে কান্না আসছে। এই পৃথিবী এত নিষ্ঠুর কেন! সবাই তাকে বকাঝকা করে। বোকা বলে। সেকি আসলেই বোকা! সে তো সব বোঝে। আব্বু তাকে এত মারে কেন? সবার আব্বুরা কত ভালো। কত আদর করে। মাঝে মাঝে আম্মুকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে যে আব্বু কি ছোট বেলায় কখনো তাকে কোলে নিয়েছে। ইচ্ছে করে দূরে কোথাও চলে যেতে। সিনেমার ছেলেরা ছোট বেলায় যেভাবে চলে যায় ঠিক ঐভাবে। কিন্তু কোথায় যাবে? একদিন ঠিক লঞ্চঘাটে গিয়ে সে লঞ্চে করে খুলনা টাউনে চলে যাবে। তখন আব্বু আম্মু বুঝবে তাকে মারার জ্বালা!

তারা অনেকটা দূর চলে এসেছে। মাইল খানেকেরও বেশী। এই সময়ে ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। রফিক সাহেব রাস্তার পাশের একটা ঘরের ছাইচের নিচে দাঁড়ালেন। গাধা ছেলেটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। আরে তোর এখনো তিন খানা পরীক্ষা বাকী আছে না! বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরজারী বাঁধিয়ে বসবে দেখছি। তিনি ছেলেকে আবার ডাকলেন। ছেলে আসে না। রেগেমেগে পায়ের কাছে থাকা মাটির ঢেলা তুলে ছুড়ে মারলেন। শান্তর গায়ে লাগলো না। পাশে গিয়ে পড়লো। শান্ত আবার ছুটতে শুরু করলো। আগের থেকে বেশী বেগে। মূহূর্তে চোখের আড়াল হয়ে গেলো। রফিক সাহেবও ছোটা শুরু করলেন। বাপবেটা মিলে ছুটতে ছুটতে মাইল তিনেক পথ পেরিয়ে এলেন। গোড়কাঠি, বারুইখালী, পোদ্দারগঞ্জ সব পেছনে পড়ে গেছে। ক্ষুধায় শরীর দূর্বল লাগছে। বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। একটা লোক গরু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বেয়াড়া গরুটাকে কিছু বাগে আনতে পারছেন না। খালি গা। পরনের লুঙ্গি দুই ভাঁজ করে কোমরে গোঁজা। রফিক সাহেবকে হন্তদন্ত ছুটতে দেখে তাকে থামালেন।
‘কি ব্যাপার, এভাবে কই যাচ্ছেন? কাদের এক খোকাকে দেখলাম দৌড়ুতে দৌড়ুতে গেলো’।
রফিক সাহেব ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো, ‘কোন দিকে গেলো, দেখতে পাচ্ছি নে কেন? কোন দিকে যেতে দেখলেন’?
‘আচ্ছা ব্যাপারখানা কি খুলে বলেন তো’।

রফিক সাহবে লোকটিকে ব্যাপারখানা খুলে বললেন। লোকটা সব শুনে বললেন, আচ্ছা দাড়ান। আমি ধরে আনছি।

শান্ত একটা দোকানের পাশে ঘাপটি মেরে বসে আছে। অচেনা একটা লোক তার পাশ ঘেঁসে হেঁটে গেলো। হঠাৎ লোকটা খপ করে তার হাত এঁটে ধরলো। সে হাত মুচড়ে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। লোকটা ছাড়ে না, মিটিমিটি হাসছে। শান্তর মনে হলো এই লোকটা নির্ঘাত ছেলে ধরা। আম্মুর কাছে সে শুনেছে হাঁটের দিন ছেলেধরারা ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পরে। ছেলে ধরে ঝোলায় পুরে লাপাত্তা হয়ে যায়। এই লোকটার ঝোলা কই? আশে পাশে কোথাও রেখে এসেছে। শান্তর ইচ্ছে করছে এক ছুটে আব্বুর কাছে চলে যেতে। সে গলা উঁচিয়ে আব্বুকে দেখার চেষ্টা করে। সে আব্বুকে দেখতে পায় না। লোকটা শক্ত হাতে তাকে টানতে থাকে। আব্বু কিছু দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটা শান্তকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঐ লোকটা তোমার কি হয়?’ শান্ত জবাব দিলো, ‘আব্বু হয়’।

শান্তকে রফিক সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে লোকটা হাসিমুখে বললো, দেইখেন আবার বাসায় নিয়ে মাইরেন না। রফিক সাহেব লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পথ ধরলো। তিনি শক্ত হাতে শান্তর হাত ধরে আছেন। মনে হচ্ছে কোন জিনিস তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন খুঁজে পেয়ে শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন। শান্ত হাত ছাঁড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে না। একটু আগে যে হাতখানা ধরেছিলো সেই হাতের তুলনায় এই হাত হাজারগুন নির্ভাবনার।

বাসায় ফিরে দেখে আম্মু ছোট ভাইটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শান্তকে দেখে তিনি কাঁদতে কাঁদতে দুই চড় বসিয়ে দিলেন পিঠে। কিছু কিছু ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশই যে ঘটে হাতে। ঘরে দুই খাঁটের মাঝখানে এক চিলতে জায়গা। সেখানে বসে চারজন মিলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলো।

আব্বু অফিসে চলে গেছে। আম্মু ছোট ভাইটাকে নিয়ে ঘরে শুয়ে আছে। শান্ত রাউন্ড টেবিলটায় বসে ক্লাস সেভেনের সামাজিক বিজ্ঞান বইখানা খুলে পরের পরীক্ষার পড়া করছে। আষাঢ়ের আকাশ তখনো টিপিরটিপির করে বৃষ্টি ঝরিয়ে চলেছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement