লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ মার্চ ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২৫

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকষ্ট (জুন ২০১১)

নষ্ট প্রেম
কষ্ট

সংখ্যা

মোট ভোট ২৫

এমএআর শায়েল

comment ১১  favorite ১  import_contacts ৪,৬১৩
বাড়ির দক্ষিণ পাশে বিশাল পুকুর। ঘন্টাখানেক আগে গোসল করতে গেছে নিপা। কিন্তু ফিরে আসার নাম নেই। অন্যান্য দিন গোসল করতে গিয়ে পুকুরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সাতার কেটে ঝড় তুলে। কিন্তু আজই ব্যতিক্রম। ননদের দেরী দেখে
ভাবী মৌ তাকে ডাকছে। নিপা। এই নিপা। কি করে তোর গোসল হলো! নিপার কাছ থেকে সাড়া না পাওয়ায় ভাবী মৌ ঘাটলায় যায়। গিয়ে দেখে- নিপা ঘাটলায় বসে আছে। কি রে তুই এখানে বসে আছিস যে। আর আমি ডেকে ডেকে হয়রান। তুই গোসল করিস নি। নিপা কোন কথা বলেনি।
নিপা নিশ্চুপ।
ভাবী- কি রে কথা বলছিসনা যে।
নিপা তাকিয়ে আছে জলের দিকে।
কয়েকবার ডাকার পর নিপা বলে কি হয়েছে ভাবী তুমি এখানে!
ভাবী মৌ বললো,- তোর আজ কি হয়েছে। গোসল করতে এসে এখানে উদাস হয়ে বসে আছিস কেন? গোসল সেরে তাড়াতাড়ি করে রোমে আয়, আমি খাবার দিচ্ছি।
নিপা,- ভাবী তুমি যাও আমি আসছি।
ভাবী চলে যাওয়ার পরও নিপা কিছুক্ষণ ঘাটলায় বসে রইল। মাথায় তার দুশ্চিন্তা। কাল থেকে চাচাতো ভাইয়ের বন্ধু নীল কে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।
নীল কে ভালোবাসে নিপা। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কিছুদিন ধরে তাদের এখানে ছিলো। গতকাল কাউকে কিছু না বলে সে কোথাও যেন চলে গেছে।
নিপার চাচাতো ভাই সুমন, নীলকে খুঁজতে বেড়িয়েছিলো গতকাল। তারও কোন খবর নেই। তাই নীলেরও কোন খবর পাচ্ছেনা সে। নীল এখন কোথায় আছে কেমন আছে নিপা জানেনা।
নীলের চিন্তায় গত রাত ঘুমোতে পারেনি নিপা। আগের দিন রাতে ভেবে রেখেছিলো সে নীলকে তার মনে কথা খুলে বলবে। এর আগে অনেকবার বলেছে নীল সুস্থ ছিলোনা বলে সে সব সময় তাকে এড়িয়ে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে নিপা লক্ষ্য করছে নীল কিছুটা সুস্থ হয়েছে। চাচাতো ভাই সুমনসহ সবার সাথে ভালোভাবে কথা বলছে। কিন্তু নীলের ভালোবাসা নিপাকে ফাঁকি দিয়েছে।
কাউকে কিছু না বলে নীল উধাও হয়ে যাবে নিপা কল্পনাও করতে পারেনি। তাই তার মন খারাপ। উদাস হয়ে কতক্ষণ জলের দিকে তাকিয়ে ঘাটলায় বসেছিল।
গোসল সেরে নিপা ভিতর বাড়িতে তার ভেজা কাপড়গুলো রোদে শুকানোর জন্য মেলে দিচ্ছিল। এমন সময় হকার এসে স্থানীয় একটা পত্রিকা দিয়ে গেলো তার হাতে। নিপা কাপড় মেলা শেষ করে পত্রিকাটা হাতে নিয়ে তার রোমে চলে গেলো। আয়নার সামনে বসে
চুল আছড়ানো শেষ করে সে পত্রিকার শিরোনামগুলোর উপর চোখ রাখলো এবং যথারীতি চমকে উঠলো।
" হবিগঞ্জে বরযাত্রীবাহি গাড়ির সাথে সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষ \\ এক প্রেমিক যুবকের অকাল মৃত্যু"
শিরোনামের পাশে দেড় কলাম ব্যাপী নিহত প্রেমিক যুবকের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। যুবকটির মুখ ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। ক্যাপশন দেয়া হয়েছে নিহত প্রেমিক যুবক। তাই বিস্তারিত জানার জন্য সংবাদটি পড়তে হলো নিপাকে। সংবাদ পড়ছে আর চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে ওই নিহত যুবকের ক্ষতবিক্ষত ছবির উপর।
সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংবাদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলার জন্য যা যা করনীয় মনে করেছেন তাই করেছেন। চার কলাম ব্যাপী সংবাদের মধ্যের ২ কলামে নিহত যুবকের পকেট থেকে উদ্ধার করা একটি চিঠি ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে পত্রিকার কাটতি না হয়।
যিনি লিখেছেন তিনি সংবাদটি শুরু করেছেন ভূমিকা দিয়ে।
প্রেম নাকি স্বর্গ থেকে আসে। আবার স্বর্গে চলে যায়। যারা প্রেমের মর্যাদা দিতে জানেন না তারা সত্যিকারর্থে প্রেমের মর্ম কি তা আসলে জানেন না। প্রেম কোন খেলনার জিনিস কিংবা মেয়েদের শাড়ি কাপড় নয় যে, ইচ্ছা করলেই তা ভেঙ্গে ফেলা কিংবা খুলে ফেলা যায়। প্রেম হলো এক ধরনের অনুভূতি। একজনের জন্য প্রতি আরেকজনের যে অনুভূতি তার নামই প্রেম। যাইহোক নিপা ২কলামে ছাপানো চিঠিটা পড়তে লাগলো।
প্রিয় নিপা, 'ভালোবাসা নিও । আমার এই চিঠিটা যখন তোমার হাতে গিয়ে পৌছঁবে তখন আমি থাকবো অনেক দুরে। জানি আমার কথাগুলো শুনার পর তুমি ভীষণ কষ্ট পাবে। কিন্তু কি করবো বলো, আমি যে অসহায়, নিঃস্ব, রিক্ত। তুমাকে দেয়ার মতো আমার কাছে আজ কিছুই নেই। আমি হয়তো লুবনাকেই বুঝাতে পারেনি, তাকে কতটা ভালোবাসি। তোমাকে বুঝাবো কি করে।
জানো, লুবনাকে ভুলে গিয়ে তোমার ডাকে সাড়া দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছি আমি । কিন্তু যতবারই চেয়েছি তোমার ডাকে সাড়া দেব, ততবারই আমার ভালোবাসা আমার প্রতি বিদ্রোহ করে উঠেছে। কারণ আমি ভালো করেই জানি, প্রেম ভালোবাসা আমার ভাগ্যে নেই। শুনেছি আগামীকাল লুবনার বিয়ে। তাই চিঠিটা তোমাকে দেব বলে লিখেছি।
জানিনা, তোমরা দুজনের কারো সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হবে কিন। যদি না হয়, তাহলে লক্ষ্মীটি আমায় ভুল বুঝনা। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। কারণ আমি চাইনা, আমাকে ভালোবেসে তুমি কষ্ট পাও। আমি জানি ভালোবাসা চেয়ে প্রতিদানে ভালোবাসা না পাওয়ার কি যে কষ্ট?-ইতি-নীল
এবার সংবাদটি পড়তে লাগলো নিপা। স্কুলে পড়ার সময়, লুবনা নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়ে নিহত যুবক নীল। মেয়েটিকে খুব বেশি ভালোবাসতো নীল। মেয়েটিও তাকে খারাপ বাসতোনা। কিন্তু তাদের এই সম্পর্ককে মেনে নেয়নি, মেয়েটির পরিবার। মেয়েটির পরিবারের কারণে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় নীল। পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ।
বন্ধুর এরকম অবস্থা দেখে মায়া হয়, নিহত যুবকের আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুমনের। তাই নিহত যুবকের বাবা মাকে বলে তাকে সুস্থ করে তুলার জন্য নিয়ে যায় তাদের বাড়িতে। সেখানে তার প্রেমে পড়ে নিপা নামের একটি মেয়ে। এদিকে আজ নিহত যুবক নীলের প্রেমিকা লুবনার বিয়ের দিন ছিলো। তাই কাউকে কিছু না বলে বন্ধুর বাড়ি থেকে সে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেয় । বাড়িতে গিয়ে জানতে পারে লুবনার বিয়ের কথা। তাই দেরী না করে একটি সিএনজি ভাড়া করে রওয়ানা দেয় লুবনা নামের ওই মেয়েটির বাড়িতে।
অন্যদিকে বিয়ে শেষে বরযাত্রী বহর কনে নিয়ে তাদের বাড়ি ফিরছিলো। পথিমধ্যে বরযাত্রীবাহি একটি গাড়ির সাথে আরোহিত যুবক নীলের সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় নীল ।
উত্তেজিত জনতা বিয়ের গাড়িটি আটক করে। লোকজনের জটলা দেখে বর-কনেসহ বরযাত্রীরা কি হয়েছে দেখতে গাড়ি থেকে নেমে আসে। লোকজনের ভিড় ঠেলে কনে যখন নিহত যুবকটি দেখে তখনই সে জ্ঞান হারায়। প্রথমে সবাই ভেবেছিল ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া মৃতদেহের ছবি দেখে ভয়ে কনে অজ্ঞান হয়েছে। কয়েকজনে পাজাকোলে করে গাড়িতে নিয়ে পানি ছিটিয়ে যখন তার জ্ঞান ফেরানো হল, তখন কনে নীল বলে চিৎকার করে উঠল। নীল তুমি মরতে পারনা নীল। আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যেতে পারনা নীল। বলে সে হাসতে লাগল। সে হাসি থামানো গেলনা। পরে জানা গেল কনের প্রেমিক ছিল ওই নিহত যুবক। কনে পাগল হয়ে গেছে মনে করে বরের অভিভাবকরা কনে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলনা। ফিরিয়ে দিয়ে গেল তার পিত্রালয়ে। অনেকেই তাকে অপয়া, অলক্ষ্মী বলে গালাগাল দিল।
পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে নিয়ে গেল এবং নিহত যুবকের পকেট থেকে ওই চিঠিটা উদ্ধার করল। তখনই জানা গেল, যে গাড়ির সাথে সিএনজির সংঘর্ষ হয়েছে সে গাড়িতে করে নিহত যুবকের প্রেমিকা লুবনা তার শ্বশুর বাড়িতে যাচ্ছিল। সংবাদটি পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল নিপা। চোখ থেকে আরো কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে নিহত যুবকের ছবির উপর।
যেখানে বসে সে সংবাদটি পড়ছিলো সেখানেই বসে রইলো। চোখের সামনে যেন তার সমস্ত পৃথিবীটা ঘুরতে থাকলো। আকাশ যেন তার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়লো।
ভাবী মৌ এসে খাবারের জন্য তাকে ডাকল। কোন সাড়া শব্দ নেই। জ্ঞান হারিয়েছে মনে করে সবাইকে ডেকে আনা হলো। অনেক চেষ্টার পরেও যখন কোন সাড়া পাওয়া গেল না তখন ডাক্তার ডাকা হলো।
ডাক্তার বললেন,- অনেক দেরী হয়ে গেছে। সে হার্টফেল করেছে। মুহূর্তের মধ্যেই কান্নার আওয়াজ শুনা গেলো। স্তব্ধ হয়ে গেলো মস্ত বড় বাড়ির সব কিছু।

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement