লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জুলাই ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১০টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভালবাসা (ফেব্রুয়ারী ২০১১)

আশ্রয়
ভালবাসা

সংখ্যা

সেলিনা আশরাফ

comment ২৩  favorite ৬  import_contacts ১,৫৩৪
সানাইয়ের সুরে মুখরিত এ বাড়ির পরিবেশ। বান্ধবীদের কল কোলাহল হাসি, তামাশার মাঝে দ্রুত কাটছে ব্যস্ত সময়। আজ কনার গায়ে হলুদ, সকাল থেকেই মেহমানদের আনাগোনা। সারাবাড়ি উৎসব মুখর। সবার মাঝে কনাকে অপূর্ব লাগছে। গত তিন দিন ধরে গায়ে হলুদ মাখাতে হয়েছে। আর প্রতিবার গোসলের সময় বেশ আনন্দ হয়, যে যাকে পায় তাকেই রং কাদা মাখিয়ে একাকার করে দেয়। ভাবীদের আনন্দ আর ধরে না, একমাত্র ননদের বিয়ে মজাই তো হবে। কনাকে ওযু করিয়ে দু’রাকাত নফল নামায পড়ানো হল, তারপর মা পরে ভাই ভাবীরা একে একে কপালে হলুদ মাখিয়ে মিষ্টিমুখ করে চলে যায়। এখন বান্ধবীদের পালা কনার হাতে মেহেদী লাগাতে হবে। মিষ্টি হাসি আর কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে একে অন্যের গায়ে হেলে পড়ে। হৃদিতার অপূর্ব গলা গান ধরে সবার অনুরোধে “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস, সাধক ওগো প্রেমিক ওগো পাগল ওগো ধরায় আস।”
হঠাৎ সাহেদের আগমন, তন্ময় হয়ে গান শুনছিল সাহেদ। গান থেমে যাওয়াতে বাস্তবে ফিরে আসে। দরদ দিয়ে গাওয়া সুরের মূর্ছনা সাহেদকে পাগল করে !! কে এই মেয়ে আর কিভাবেই আলাপ করা যাবে তার সাথে। ভেবে অস্থির লাজুক নম্র ও বিনয়ী স্বভাবের সাহেদ। কখনো সে গভীর ভাবে মেয়েদের ব্যাপারে ভাবেনি। আজ হৃদিতার মায়াবী কণ্ঠ তার মনটাকে সজোরে নাড়া দিলো। ছাত্র জীবনের পুরো সময় শুধু পড়াশোনা নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। প্রেমিক বন্ধুদের বে-হিসাবী অবস্থা দেখে তার ধারণা প্রেম ভালবাসা মানেই এক অশান্ত জীবন। তাই বন্ধুদের আড্ডা থেকে পালিয়ে বেড়াত কখনো কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে চাইতো না সাহেদ। এ নিয়ে বন্ধুরা খেপাত, অহংকারী রাশভারী কাঠখোট্টা ও আবার প্রেমের বুঝেটা কি? ও তো মেয়ে দেখলে পালিয়ে বেড়ায়, এমন অবস্থা হয় যে, পালানোর সময় পথও খুঁজে পায়না। ওর কপালে প্রেম তো দুরের কথা, কখনো বৌ জুটবে কিনা সন্দেহ,
ভাবছে সাহেদ, আজ ভরা মজলিসে কি ভাবে এই মেয়েটার সাথে কথা বলবে। বন্ধুগুলো সাথে থাকায় কিছু বলা যাচ্ছেনা, আজ হলোটা কি সাহেদের? যে মেয়েটির গান শোনার পর থেকেই বুকের ভিতরে শুধুই চিনচিন করছে। দুর থেকে চোখে চোখে রাখছে মেয়েটিকে। এক মিনিটের জন্যও হারাতে চাচ্ছে না। রাতের খাবার দেওয়া হলো। বন্ধুদের সাথে সাহেদও খেতে বসলো। খাবার পরিবেশন করছে সেই মেয়েটি যাকে সাহেদ এখন জীবনের অংশ হিসাবে ধরে নিয়েছে। তাকে না পেলে অপূর্ণ রয়ে যাবে সাহেদের জীবন। এরই মধ্যে সাহেদ কল্পনায় এই মেয়েটিকেই বউ হিসেবে জীবন সঙ্গী করার শপথ নিয়েছে। অন্যথায় জীবনে আর কোন নারীর মুখ দর্শন করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছে। খাওয়া শেষে সাহেদ তার খালাতো বোন কণার শরণাপন্ন হলো এবং জানতে চাইলো যে মেয়েটি সুমিষ্টি কণ্ঠে গান গেয়েছিল তার নামসহ বায়োডাটা জেনে নিল? কণা তো অবাক! ভাবল যে লাজুক সাহেদ আমার সাথে কথা বলতেই সংকোচ করতো, সে আজ গানের টানে এক গায়িকার খোঁজ করছে, ব্যাপার কি? তারপর সাহেদের কথার হাব-ভাবেই বুঝতে পারলো এতদিনের সাহেদের মনের জানালা খুলে গেছে। কণা জানালো গায়িকা দুরের কেউ নয়, আমার বান্ধবী হৃদিতা। তবে র্দুভাগ্য যে তার মা নেই এবং বাবা অসুস্থ। কষ্টে ভরা জীবন তার, বাবাকে সঙ্গে থাকে। ছাত্রী হিসেবে বেশ ভালো হলেও অভাবের সংসার, তাই টিউশনি ও ফুলের চাষ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয় তাকেই। তাকে ডেকে দিচ্ছি, নিজেই কথা বলে নাও। কথা শেষ হতে না হতেই কণা হৃদিতাকে ডাক দিল, এই হৃদিতা এদিকে আয়, তোর সাথে কথা আছে। সে কবিতা আবৃত্তি করছে আর তার দিকে আসছে।
“সইয়ের আর সহে না তর
কখন আসবে প্রাণের বর,
কখন ফুরাবে অপেক্ষার পালা
সহে না আর মনের জ্বালা।”
কাছে আসতেই কণা হৃদিতাকে সাহেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সাহেদ হৃদিতাকে স্বাগতম জানিয়ে বলল, গানের কণ্ঠ শুনে ভেবেছি গায়িকা, এখন কবিতা আবৃত্তি করা দেখে মনে হচ্ছে কবিত্বের ছোঁয়াও আছে বটে।
প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেলাম কোথায়। কণা তাদেরকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে অন্য ঘরে গেল।
আপনার সাথে একটু নিরালায় কথা বলব, আসুন ছাদে যাই। ভরা পূর্ণিমা জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে গোটা পৃথিবী। এমন ভাল গালা ক্ষণে সাহেদ বলল, আমি রবীন্দ্র সংগীত পছন্দ করি। আপনার পছন্দ কি ? এটা আমারও পছন্দ, উত্তর দিতে না দিতেই হৃদিতার স্বভাব সুলভ গাইতে শুরু করল “চাঁদে হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে উছলে পড়ে আলো, ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ শুধা ঢাল------”। গান থেমে গেলে সাহেদ অবলীলায় বলে ফেলল, সাক্ষী এই জ্যোৎস্না রাত, সাক্ষী রাতের চাঁদ, আমি কখনো মিথ্যে বলিনা আজও বলছি না, আপনার গান আমাকে বিমোহিত করেছে। গান শুনে মনে হয়েছে আপনার গানের কথাগুলো যেন আমাকে নিয়েই। আমার জীবনের প্রতিটি পারতে পারতে যে সুপ্ত স্বপ্নগুলো এতদিন ধরে লালন করে এসেছি। তা আজ আপনার গানে প্রকাশ পেল। তাই আমার ধারণা আপনিও আমার মতোই। তাই আপনাকেই আজ থেকে মনে প্রাণে ভালবাসলাম এবং সারাজীবন ভালবেসে যাব।
শিহরে উঠে হৃদিতা, নিস্তব্ধ হয়ে থাকে কয়েক মিনিট। নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ জবাব দেয় মাপ করবেন, আমার সম্বদ্ধে কিছুই জানেন না এতো সহজেই আমাকে ভালবাসার কথা বলে ফেললেন। আমাকে ভালবাসা মানে সমাজে কাছে হেও প্রতিপন্ন হওয়া। আমি দীনহীন এ সমাজের অপাংক্তেয়। আমার ভালবাসা মানে আকাশের চাঁদকে কাছে পাওয়া। যা সম্ভব নয় তা ভেবে লাভ কি ? ভালবাসা এবং বিয়ে দু'টোই আমার জীবনে স্বপ্নর মত। তাই বলছি বাদ দিন তো ঐ সব ভালবাসা-টালোবাসার কথা। আপনার জীবনের মজার কথা বলুন। কি করছেন সে বিষয় বলুন।
আমি সদ্য ডাক্তারি পাশ করেছি। এখনো চাকুরী হয় নি। তবে চাকুরী পেলে আপনাকে বউ বানাবোই।
তখন দেখা যাবে, জবাব দিল হৃদিতা।
এরপর কত কথা হলো, কত গান গাওয়া হলো চুপি চুপি। সময় খুব দ্রুত বদলায়।
সাহেদের চাকুরী হল একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। দিন ক্ষণ দেখে সাহেদ তার মা ও ভাবীদের পাঠাল হৃদিতার বাসায়। আলাপ আলোচনা করে বিয়ে দিন ঠিক হলো আশ্বিনের ২০ তারিখ।
বড় ভাইয়া রাজি ছিল না তবু মায়ের কথা মত বিয়ে আয়োজন করা হল। ঘটা করে যদিও আয়োজন করা হয় নি, তবুও সাহেদ ও হৃদিতা দু’জনেই খুশি। আল্লাহর রহমতে তাদের মিলন হয়েছে। বাসর রাত সব নারীদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত রাত। বধূ বেশে অপেক্ষায় বসে আছে হৃদিতা। একটু একটু করে সময় পার হচ্ছে। রাত ৯ টার দিকে সাহেদ এলো। হৃদিতা সাহেদকে সালাম করতেই সাহেদ তাকে বুকে নিয়ে বলল তোমাকে তেমন কিছুই দিতে পারি নি। ভাইয়েরা রাজি নয়। তবুও বলছি যা হবার হবে শুধু কথা দাও তুমি আমাকে শত কষ্টের মাঝেও একাকী এই বাড়ী ছেড়ে যাবে না। আমার অশান্ত সংসারে তুমি শান্তির ফুল ফুটাবে। এই দোয়া করি। অনেক কথার ফুল ঝুড়ি, সময় খুব দ্রুত চলে যায়। প্রত্যুষে আলো ফুটে ভাবীরা এসে হৃদিতাকে ডেকে নিয়ে যায়। আস্তে আস্তে সংসারের হাল ধরে হৃদিতা। সাহেদ ও তার মা এক সাথে অন্য ভাইয়েরা যার যার সংসার নিয়ে আলাদা থাকে বাবা মারা যাবার পর।
সাহেদ হ্নদিতার বিয়ের এক বছর পূর্ণ হলো হ্নদিতা মা হবার জন্য বেশ উতলা ঘর আলো করে সন্তান আসবে সারা উঠোন জুড়ে খেলবে, সাহেদ বলে এত অধ্যর্য হচ্ছো কেন, দেরী করে সন্তান এলে আমি কিছুটা সময় তোমার আদর পাব। দেখ পিচ্চি এলেই আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে। হ্নদিতা বলে এখন তুমি আমার বর। পরে হবে সন্তানের বাবা তখন দায়িত্ব আরো বেড়ে যাবে। ঠিক আছে এসো এখনি তোমাকে মা বানিয়ে দিচ্ছি। যা অসভ্য কোথাকার। সুখের দিন দ্রুত কাটে।

সাহেদ বিদেশে চলে যায়, হ্নদিতা তখন পাঁচ মাস চলছে হ্নদিতার প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও সংসারী মেয়ে শাশুড়িকে সাথে নিয়ে বেশ সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। কিছু দিন হলো বাবা মারা গেছেন,হ্নদিতা একা সাহেদ ও দেশে নেই। হ্নদিতা ভেঙ্গে পড়ে অসুস্থ রক্ত শূন্যতা শরীরে পানি জমেছে সময় দ্রুত যাচ্ছে হ্নদিতার ভয় তেমনি বেড়েই চলছে। প্রসব বেদনা উঠে হ্নদিতার শাশুড়ি পাশের বাড়ি থেকে এক জন দাই ঢেকে আনে। সারা রাতের কষ্টের পর এক ছেলে শিশু জন্ম দিয়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে হ্নদিতা । শাশুড়ি ছোট শিশুকে বুকে নিয়ে অনেক কষ্টে বড় করে। সাহেদকে ফোন করে ঢাকায় আনা হয়। সাহেদ শিশুটিকে আপন করে নিতে পারে নি। সে ডাকাত আমার সুখ স্বপ্ন সব কেরে নিল। তার আগমনে সাহেদের বুকে শূন্যতার সৃষ্টি হলো। না তার মুখ আমি দেখবো না। এক বুক কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একটি বারের জন্যও শিশুটির মুখ দেখে নি। কান্নার শব্দ শুনতে পেলে মাকে বলে মেরে ফেলো ওকে, আমি এর মুখ দেখতে চাই না। আস্ত একটা রাক্ষস, মাকে খেয়েছে। এই বড় এই সংসার সবই হৃদিতার হাতে স্পর্শ লেগে আছে। হারানো স্মৃতি বুকে ঢেউ তুলে সাহেদের।
হৃদিতার ছবির পাশে দাঁড়ায়। তুমি কেন ছবি হয়ে গেলে ? ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। তোমাকে পেলাম না, তোমাকে সুখী করার জন্যই বিদেশে গিয়ে ছিলাম। হারানোর জন্য নয়। সাহেদ আবার বিদেশে চলে যায়। বৃদ্ধা মাতা একা একা শিশুটিকে আগলে রাখে। শিশুটির নাম রাখে দুখু। দুখুর কপালে সুখ সইবে কেন ? পাঁচ বছর বয়সে দাদী হার্ট এ্যাটাকে মারা যায়। দুখুর জীবন দুখের কালো ছায়া কখনো ঘুচে না। সাহেদ বিদেশে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। দুখুর আর কেউ রইলো না আদর স্নেহের ডালি হাতে। দুখুকে সবাই দোষারোপ করে এবং বলে জন্মের পর পরই মাকে খেয়েছিস, দাদীকেও। এখন বাবাকেও খেয়েছিস। আর কতজনকে খাবি। অবহেলা আর অনাদরে বড় হতে থাকে দুখু। রমজানের ঈদ এলো। চাচাত ভাই-বোনেরা নতুন পোষাকে সজ্জিত হয়ে ঈদ গাহে যাচ্ছে। দুখুরও ইচ্ছা হলো নতুন পোষাকে সজ্জিত হয়ে ঈদ গাহে যাবার। কিন্তু কে কিনে দিবে। কখনো একটা নতুন পোশাক পরার সৌভাগ্য হয় নি দুখুর। সবার ফেলে দেওয়া পুরানো পোশাক পড়েই জীবন চলে দুখুর। কষ্টে সীমা নেই, বাড়ীর সবার এঁটো খারাব খেয়ে বাচতে হচ্ছে। শীতে কাঁথার অভাবে ছালা বিছিয়ে ঘুমাতে হয় দুখুকে। চড় থাপ্পড় মামুলী ব্যাপার। বাজার থেকে শুরু করে হাড়ি পাতিল মাজা, কাপড় ধোয়া, রান্না করা, ঘর, মোছা সব কাজের পুটু। একটু এদিক সেদিক হলেই মার আর অকথ্য ভাষার গালি গালাজ শুনতে শুনতে ভালো লাগে না। মারের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কাঁদে আর মাকে ডাকে, “মা, তুমি কোথায় মা। একবার চোখ খুলে দেখ, তোমার ছেলের প্রতি পৃথিবীর কোন মানুষে দয়া মায়া নেই। তোমার কাছে আমাকেও নিয়ে যাও মা। আমি আর সহ্য করতে পারি না। সবার মা সন্তানকে বুকে নিয়ে আদর করে। কোলে নিয়ে শান্তিতে ঘুম পারায়। আমিও তোমার কোলে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে চাই মা। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও না, মা”। পেটের ক্ষুধা মিঠাতে কাজ করতে হয়। দশ বছর বয়সে পদার্পণ করল দুখু। একটু সজাগ ও সোচ্চার হলো সে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, না আর এই বাড়ীতে নয়। কাজ করেই তো খেতে হবে তবে অন্য কোথাও খাব। দু’চোখ যেদিকে যায় সে দিকেই চলে যাবে। কমলাপুর রেল স্টেশনে এসে একটি ট্রেনে চড়ে অজানা উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পকেটে তার একশত টাকা। বাজারে দর কষাকষি করে বাঁচিয়েছিল এই টাকা। যে ট্রেনে উঠেছিল তা সেটি ছিল মহানগর প্রভাতি। চট্টগ্রাম স্টেশনে বিকেলে ট্রেন থেমে গেলে নেমে পড়ে দুখু। এখন কোথায় যাবে সে বুঝে উঠতে পারে না। ভয় পেয়ে যায় সে। কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, কি খাবে ? কিছুই স্থির করতে পারে না দুখু। ফলে স্টেশনে বসে আপন মনে কাঁদতে থাকে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক মাঝারী বয়সের ভদ্র লোক। ছেলেটিকে দেখে তার বেশ মায়া হলো। কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চাইলে দুখু তার সব কথা খুলে বলে। সব শুনে ভদ্র লোকের মন নরম হয়ে যায়।

একে তার একমাত্র সন্তান বউ বাচ্চা নিয়ে আমেরিকায় থাকে। বাসায় শুধু চাকর বাকর ছাড়া মাত্র দু’জন। সব কিছু ভেবে চিন্তে দুখুকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। দুখু সেখানে আদর যতে মানুষ করতে থাকে। প্রথম দিনেই দুখুকে ভালো ভাবে গোসল করে সঙ্গে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে। দুখুর সামনে চিকন চাউলের ভাত এবং মাছ-গোশতসহ নানান ধরণের মুখরোচক খাবারের ছড়া ছড়ি। দুখু ভাত মুখে নিয়েও খাইতে পারছে না। দু'চোখে কান্নার বাধ ভাঙ্গা জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। জ্ঞান হবার পর থেকে তাকে খেতে হয়েছে বাসি ও এঁটে খাবার।এই খেয়ে কেটেছে দিন। কোনদিন ভাল খাবার ভাগ্যে জুটে নি। জীবনে এই প্রথম পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসে সাহেবদের মত ভাল ভাল খাবার খাচ্ছে দুখু। ভদ্র লোক তার স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে দুখুকে নাতীর পরিচয় বড় করতে চাইল। বাজার থেকে বই কিনে এনে পড়াশুনা করানো চেষ্টা করল। দুখু অল্প দিনেই সব রপ্ত করে ফেলল। পড়া শুনার প্রতি আগ্রহ দেখে দুখুকে বাসায় ভালো করে পড়ানোর পর ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হলো। স্কুলে তার দুখু নাম পরিবর্ত করে রাখা হলো সীমান্ত। যে পরিশ্রম সে একদিন এক মুঠো ভাতের জন্য করে ছিল। এখন সেই পরিশ্রম সে তার পড়াশুনার জন্য ব্যয় করে। ফলে তার রেজাল্ট অত্যন্ত ভালো হতে লাগল। পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেল সে। বরাবরই সে ক্লাসে প্রথম হতে থাকল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ঈশিতা নামে বনেদী ঘরের এক মেয়ে। সে কিছুতেই হার মানত না। রাত দিন শুধু পড়া শুনা করে দিন কাটাতো। অষ্টম শ্রেণীতেও ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেল সে। সীমান্তর পড়াশুনায় মুগ্ধ তার দাদা-দাদী। অবশেষে এস.এস.সি. এবং এইচ.এস.সি. উভয় পরীক্ষাতেই জি.পি.এ. ৫ পেয়ে পাশ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো সে। দাদা-দাদীর ভালবাসায় দুখু থেকে সীমান্ত হওয়ার কথা প্রায় ভুলেই গেছে সে। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরলেই শুরু হয় দাদা-দাদী ও নাতির রম্য রসের আসর। এভাবেই বেশ চলছে দিন। একদিন সীমান্ত তার দাদুকে বলল, “ক্লাসের একটি মেয়ে তাকে ইদানীং বেশ জ্বালাতন করছে। দাদু রসিকতার ছলে বলল সমস্যা কি বাসা নিয়ে আসিস। তোর দাদীর অনুমতি নিয়ে শেষ বয়সের বিবি বানিয়ে নিব।
কথা শেষ হতে না হতেই দাদী হুংকার দিয়ে উঠল, “বৃদ্ধ বয়সে ভীমরতি ধরেছে। হাতুড়ী দিয়ে দাদা নাতি দু’জনেরই মাথা ফাটাব। চোরের সাক্ষী মাতাল। হাসি খুশিতে দিন কাটে। সীমান্ত ভালবাসার কি তা বুঝতে পারে কিসের জন্য বাবা তাকে অবহেলা করতো তা ও বুঝতে পারে। মাঝে মাঝে ছোট বেলার স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে উঠে। এখন ইচ্ছে করে চাচা চাচিদের ডেকে এনে বলে মানুষ অসহায় থাকেনা পর ও কখনো কখনে আপন হয় আবার আপনজন পর হয়ে যায়। অসহায় ছিল বলেই দাদার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত ছিল। ইচ্ছে করে চাচাদের কাছ থেকে হৃত সম্পত্তি উদ্ধার করে গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতে। বিগত দিনের স্মৃতি মনের পর্দায় ভীর জমে। সীমান্ত চৌধুরী নিজেই একটা ক্লিনিক খুলে বিনা পয়সা চিকিৎসা দেয় গরীব দুঃখীদের। সীসান্ত চৌধুরী অধ্যবসায় আর দাদার সহযোগিতায় এত দুর এগিয়ে আসতে পেরেছে। ঈশিতা ভালবাসার কাছে পরাজিত হল সীমান্ত। দাদা আর দাদি শুভ দিন দেখে সীমান্তর বিয়ে দিয়ে দিল।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement