লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৭ মে ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৩টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভালবাসা (ফেব্রুয়ারী ২০১১)

শেষ বৃষ্টির দিনে
ভালবাসা

সংখ্যা

এজি মাহমুদ

comment ৩০  favorite ৯  import_contacts ২,৪৭৬
১.
‘এ্যাই, এই পাঞ্জাবী পরতে তোকে কে বলেছে?’ প্রজ্ঞা একরাশ বিরক্তি নিয়ে মুহিবের দিকে তাকায়। মুহিব সিগারেটের এক পশলা ধোঁয়া ছেড়ে বলে, ‘কেউ বলেনি, এমনিতেই পরেছি।’
‘এটা একটা পাঞ্জাবী হল! কিরকম খ্যাত মার্কা কালার। কেমন যেন মেয়ে মেয়ে লাগে!!’
‘মেয়ে মেয়ে লাগলেই তো আর আমি মেয়ে হয়ে যাচ্ছি না’
‘মেয়ে হয়ে যাবি মানে? কি সব আজেবাজে কথা।’
‘আজেবাজে হবে কেন? তুই জানিস, পৃথিবীর অনেক দেশের আইন পুরুষকে নারী হবার অধিকার দিয়েছে।’
‘ওখানে যাবার জন্য বুঝি তোর ভিসা-পাসপোর্ট সব রেডি হয়ে গেছে?’
‘আমি ওসব রেডি করতে যাবো কেন?’
‘না মানে, তোকে সেই অধিকার আদায়ের বেশ আগ্রহী বলে মনে হচ্ছিল বলে জিজ্ঞাসা করলাম আরকি!
‘ধ্যাত! তুই এমন কেন?’
‘কেমন?’
‘যাচ্ছেতাই একটা। আমি গেলাম।’
‘অ্যাই, কোথায় যাচ্ছিস আমাকে ফেলে?’
‘জানি না।’
‘ক্লাস করবি না?’
‘নাহ।’
ব্যাগটা কাঁধে ফেলে ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে যায় মুহিব। খানিকদূর যেতেই সেলফোনে রিং বেজে উঠে। ফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখা যায় স্ক্রিনে ভাসছে, ‘প্রজ্ঞা কলিং।’ ফোনটা কেটে দিয়ে আরও জোরে জোরে হাটতে শুরু করে ও।
মুহিবের ডায়রি থেকে
ভার্সিটিতে ভর্তি হাবার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ভুলেও কোন মেয়ের সাথে অ্যাফেয়ারে জড়াবো না। কিন্তু ক্লাসে একজনকে দেখে কি হয়ে গেল। দেখেই ভাল লেগে গেল। কিন্তু হুট করে কাউকে কি কিছু বলা যায়। তাছাড়া দেখলাম, তার পেছনে ক্যান্ডিটেন্ডও অনেক। এতজনকে ঠেলে আমার তাকে জয় করতে হবে ভেবেই আমার ভালোবাসার প্রবল দখিনা বাতাসের প্রবাহ কমতে শুরু করলো। কারন আমি মূলত প্রথম শ্রেণীর একজন অলস মানুষ।
ভালোলাগার সেই মেয়েটাকে নিরবে দেখে যাই। তাকে এভাবে লুকিয়ে দেখার মাঝে আমার যত না সতর্কতা, ক্লাসের কাউকে সেটা বুঝতে না দেবার ব্যাপারে সতর্কতা যেন আমার তারচেয়েও বেশি। ভুলেও আমি তার পাশ দিয়ে যাই না। এর মধ্যে শুনলাম, বেশ কয়েকজন তার সাথে ভাব জমাতে গিয়ে ক্লিন বোল্ড অথবা কট্বিহাইন্ড হয়ে গেছে। আমি আরও সতর্ক হয়ে যাই। এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময়।
একদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার সময় ভার্সিটির বাসে পেয়ে গেলাম তাকে। আমার কয়েকটা সিট সামনে বসেছিল মেয়েটা। আমি তক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, আজ পিছু নেবো তার। কিন্তু আমাকে বেশ অবাক করে দিয়ে আমার স্টপজেই নেমে পরলো সে। পিছু পিছু আমিও। খেয়াল করলাম দুপুরের কাঠফাটা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছে মেয়েটা। আমাকেও একটা রিকশা নিতে হবে এমন একটা ভঙ্গি করে তার কাছাকাছি এসে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি মিরপুর থাকেন?’
মেয়েটা তার কপালের একপাশে পরে থাকা এলোচুল খানিকটা সড়িয়ে নিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ সাড়ে এগারো।’ ভালোভাবে ফিরেও দেখল না সে আমাকে। কিন্তু তাতে আমি মোটেও দমে যাবার পাত্র নই। খানিকটা গাইড লাইন দিয়ে বললাম, ‘তাহলে তো অনেকটা দূর। রিকশা যেতে চাইবে না। বাসে গেলে ভালো করবেন।’
‘না, মিরপুর এক নাম্বারে আমার কিছু কাজ আছে। সেটা শেষ করে তারপর বাসায় যাবো।’ বলে মুখ ফিরিয়ে নিলো মেয়েটা। অনেক হয়েছে আর নয়। প্রথমদিনই নিজেকে বিরক্তির পর্যায়ে নিতে যেতে চাই না। তাই সরে এসে একটা রিকশায় চেপে বসলাম। সঞ্চিত সাহসের অনেকটা ব্যায় করে তার সাথে আমার সেই প্রথম কথা।
২.
সেদিন লাইব্রেরি ওরিয়েন্টেশান। ভার্সিটিতে নতুন ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের লাইব্রেরি ডিসিপ্লিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে।
ভার্সিটিতে এসে আর সবকিছুর সাথে লাইব্রেরিটাকেও নতুন লাগছে। যদিও লাইব্রেরিটা মোটেও নতুন নয়। এখানকার র্যা ক ভর্তি মোটাসোটা পুরানো বইগুলো সে কথাই যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়। তবে এই মূহুর্তে মুহিবের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলো যে ওর মতই নতুন-এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সবাই ওর ব্যাচের একই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছাত্রী। কেউ শুধু এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার কেউবা বই উল্টেপাল্টে দেখছে। সবার সাথে এখনও ওভাবে পরিচয়টা হয়ে উঠেনি মুহিবের। এমনিতে বই পড়তে একদম ভালো লাগে না ওর। পরীক্ষার আগে পাস করার জন্যই মাঝে মাঝে বই নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। লাইব্রেরিতে বসে থেকে নিঃশব্দ টেবিল চেয়ারের সাথে মিশে যাওয়াতো ওর কাছে রীতিমত দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়। তাই বইভর্তি বড় বড় স্টিলের ডোরলেস আলমারিগুলোর একপাশ থেকে অন্যপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মুহিব। হঠাৎ করেই চোখ পরে যায় সেদিনের সেই মেয়েটা গভীর মনোযোগের সাথে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। সেদিনের মতো আজও ফিরে তাকালো না মেয়েটি। তাকাবে বলেও মনে হচ্ছে না। তবুও উপযাচকের মতো পা ফেলে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল মুহিব, ‘কি পড়ছেন?’
‘পড়ছি না দেখছি, হেলাল হাফিজের কবিতা।’ বই থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিল মেয়েটা।
‘কবিতা কি শুধু দেখার জন্য?’
‘না দেখলে কি করে পড়বো?’
‘কিন্তু আপনি তো শুধুই দেখছেন।’
‘হয়তো একটা সময় পড়বো তাই, আপনি লেখেন কবিতা?’
‘আমি লিখলে আপনি পড়বেন?’
‘ভালো কিছু সবাই পছন্দ করে।’
‘আর আপনি?’
‘‘আমি খুব সাধারণ, অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতার মতো। সবার থেকে আলাদা কেউ না।’’
এ সময় পেছন থেকে কিছু ছেলেমেয়েদের কথাবার্তা শোনা গেল। অন্য সবাই এদিকে চলে আসছে। একটা বই হাতে নিয়ে ওখান থেকে সরে গেল মুহিব। সরে যাবার সময় আবার এক পলক মেয়েটার দিকে তাকালো ও। কিন্তু নাহ্! এখন পর্যন্ত বই থেকে চোখ সরায়নি সে। এতটা কঠিন হওয়া কোন সাধারণ মেয়েকে মানায়?
মুহিবের ডায়রি থেকে
লাইব্রেরি থেকে বের হতেই আমার আরেক ক্লাসমেট তিশার সাথে দেখা। তিশা আমাকে দেখেই বললো, ‘আচ্ছা, তুমি নাকি দৈনিক পত্রিকাতে লেখালেখি করো?’
ক’দিন হল ক্লাস করছি। তেমন করে কারও সাথেই পরিচয় হয়নি। তবুও কেমন করে যেন তিশার সাথে পরিচয়টা আগেই হয়েছিল আমার। কিন্তু তিশা সেখানে একা নয়। ক্লাসের আরো অনেক মেয়েরা দাঁড়িয়ে।
তিশার এমন ওপেন কোয়েশ্চনে খানিকটা লজ্জা পেয়ে বসলো আমাকে। লেখালেখি করি এই কথাটা সাধারণত আমি কাউকে জানাতে চাই না। সবাই কেমন অন্যভাবে তাকায়। তারপরেও বললাম, ‘হ্যাঁ এই তো শখের বসে করি মাঝেমাঝে। ওরকম কিছু নয়।’
হঠাৎ দেখি এবার সেই মেয়েটাও ফিরে তাকিয়েছে আমার দিকে। টের পেলাম, নতুন করে সে এবার দেখছে আমাকে। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বললাম, ‘তিশা, চল আইসক্রিম খাই।’ তিশা মুহূর্তেই অন্য মেয়েদেরকেও আইসক্রিম খাবার ব্যাপারে রাজি করে ফেললো। আমি অবশ্য ভেবেছিলাম, সেই মেয়েটা হয়তো আইসক্রিম খেতে রাজি হবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে রাজি হয়ে গেল। হৃদয়ে প্রশান্তির দখিনা হাওয়া বয়ে গেলেও আমি এবার ভিন্ন পথের পথিক সেজে তিশার সাথে গল্প শুরু করলাম। বেশিক্ষণ অবশ্য সেটা চালিয়ে যেতে পারলাম না। ঘুরে এসে সেই মেয়েটাও দাঁড়ালো আমাদের পাশে। কখন যে সে তিশার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছিল আমি টেরও পাইনি। একের পর এক প্রশ্ন করে গেল সে আমাকে। কি লিখি? কোথায় লিখি? লেখালেখির শুরুটা কবে? আমিও বেশ লেখকভঙ্গী নিয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেলাম। অনেক কথা হলো সেদিন। কি মনে করে যেন তার সেল নাম্বারটাও আমাকে দিয়ে দিল। সেদিনের পর কি কারণে যেন ভার্সিটি বেশ কয়েকদিন বন্ধ ছিল। এই ক’দিন আর তার সাথে আমার দেখা কিংবা কথা হয়নি।
দুই কি তিনদিন পর
সেদিন সকালে সাড়ে ছয়টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল। যদিও এত সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গার কথা নয়। ঘুম ভাঙ্গার কারণ সম্ভবত বৃষ্টি। কি এক অদ্ভুত কারণে যেন বৃষ্টি শুরু হলেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আর চোখ মেলে জানালার বাইরের রিমঝিম বৃষ্টি দেখে আনমনা হয়ে যাই আমি।
মাঝে মাঝে সেগুলো লিখে রাখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু হাতের কাছ কাগজ-কলম পাওয়া যায় না তখন। অগত্যা সেলফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ অপশানে গিয়ে লিখতে শুরু করলাম সেই এলোমেলো কথাগুলো। লিখতে লিখতেই বোধহয় ঘুমিয়ে পরেছিলাম। এসএমএস-এর ইনকামিং টোনে আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম ঘুম চোখে সেই এসএমএস পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম আমি। একটু আগে যা লিখেছিলাম তার জবাব দিয়েছে যেন কেউ। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব! আমি কাউকে এসএমসএস না করলে রিপ্লাই আসবে কিভাবে! দ্রুত সেন্ড আইটেমস চেক করলাম। এবার আরো চমকে গেলাম। সেলফোনে লিখে রাখা সেই এলোমেলো কথাগুলো সেলফোনের কি-প্যাডে চাপ লেগে চলে গেছে সেই মেয়েটা, সেই তাহরিনা ফারহানা প্রজ্ঞার নাম্বারে!
কিভাবে কিভাবে এরপর যেন আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। সকালে একসাথে ভার্সিটিতে যাওয়া, ক্লাস করা, আড্ডা দেয়া, বাসায় ফেরা। সবাই আমাদের বিষয়টিকে অন্যভাবে নিতে লাগলো। কিন্তু আমরা বিষয়টাকে নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামালাম না। এর মধ্যেই ভার্সিটিতে সামার ভ্যাকেশনের ছুটি হয়ে গেল। কিন্তু প্রজ্ঞার সাথে আমার দেখা হওয়া বন্ধ হল না।
আমি তখন একটা দৈনিক পত্রিকা অফিসে টুকটাক লেখালেখির কাজ করতাম। প্রজ্ঞারও এদিকে বেশ একটা ঝোঁক ছিল। একটা সময় ও আমার সাথেই দৈনিক আপন আলোতে লেখালেখির সাথে জড়িয়ে পরলো। মাঝে মাঝে অফিস থেকে একসাথে বাড়ি ফেরা। রিকশায় এলোমেলো ঘুরতে যাওয়া। সে এক অন্য রকম অনুভুতি। আমার আচরণে এক সময় ধরা পরে যেতে শুরু করলো আমি তাকে পছন্দ করি এবং সম্ভবত ভালোওবাসি।
বিষয়টি হয়তো আমি ইচ্ছে করেই আড়ালে রাখতে চাইনি কিংবা চেষ্টা করেও পারিনি। তার সামান্য ইশারায় সমস্ত কাজ ফেলে আমি ছুটে যেতাম। প্রজ্ঞার কারনে আমার অনেক কিছুই বদলে যেতে থাকে। প্রজ্ঞার অনুরোধের সুরে দেয়া আদেশে বদলে ফেলি আমার সেলফোনের অপারেটর। তখন একটাই এফএনএফ করার সুযোগ ছিল। আর সেটাও প্রজ্ঞার সাথেই।
সামার ভ্যাকেশনে এমন কোন দিন ছিল না যেদিন তার সাথে আমার কথা হয়নি। দিনে এসএমএস আর রাতে কথা বলা। আমি কোথায় যাচ্ছি আর কখন কি করছি সব যেন তাকে জানতেই হবে। কোন কিছু না জানিয়ে করলে সে দেখাতো অভিমান আর করতো অনুযোগ।
আমার ড্রেসআপ নিয়েও প্রজ্ঞা ভীষণ রকম খেয়ালি ছিল। কোন কিছু তার পছন্দ না হলেই সেটা আর পরতে পারবো না-এরকম নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যেত।
আমিও তার সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতাম। আঙুলে কোন রিং অথবা হাতে কি রকম ব্রেসলেট পরলে আমাকে ভালো লাগবে-এ নিয়েও তার গবেষণা কম ছিল না। আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটাকে দেখলেই তার রাগ হতো। বলতো, এরকম ব্যাগ মানুষ ব্যবহার করে? আমার পায়ের স্যান্ডেল জোড়াকেও বাথরুমের স্লিপার ছাড়া অন্যকিছু তার কাছে মনে হয়নি কোনদিন।
একটা সেকেন্ডহ্যান্ড সেলফোন কেনার ঘটনাটা নিয়েও সে রাগ করেছিল ভীষণ। প্রথমত আমাকে সে সেটা কিছুতেই কিনতে দেবে না। কারণ সেটা ভিজিএ ক্যামেরা। তখন অবশ্য সেলফোনে মেগাপিক্সেল ক্যামেরা নিয়ে অতটা মাতামাতি শুরু হয়নি। কিন্তু অতগুলো টাকা খরচ করে আমি যখন একটা ভিজিএ ক্যামেরাধারী সেলফোন কিনে ফেললাম তখন সে ক্ষিপ্ত হয়েছিল ভীষণ। ফোনটাকে পারলে ঢিল মেরে পানিতে ফেলে দেয়ার মত অবস্থা। আমি তার অনুমতি ছাড়া কেন এই ফোনটা কিনলাম এই অভিযোগে সে আমার সাথে দুইদিন কথা বলেনি।
মাঝে মাঝে কোন এক নিঝুম সন্ধ্যায় প্রজ্ঞার ফোন পেয়ে আমি ছুটে যেতাম ওর বাসায়। সন্ধ্যাটা গাঢ় হতেই মগে করে চা অথবা কফি হাতে ওদের বাসার ছাদে বসে থাকা। তারপর অনেক কথা, গল্প আর স্বপ্নের আঁকিবুকি দু’জনার।
৩.
লাইব্রেরিতে বসে সেদিন কিসের যেন নোট তৈরি করছিল মুহিব। এমন সময় প্রজ্ঞা এসে মুহিবের ঘাড়ে চুলের কাঁটা দিয়ে একটা খোঁচা দিয়ে বলল, ‘এই যে স্যার, এখানে বসে কি করা হচ্ছে শুনি?’
‘তেমন কিছু না। আপনার বিয়ের কাবিননামায় সাক্ষর করছি।’
প্রজ্ঞা মুহিবের লিখতে থাকা কলমে আঙুল দিয়ে টোকা মেরে খাতায় বিশাল দাগ ফেলে দিয়ে বললো, ‘খবরদার! সাক্ষি ছাড়া কিন্তু অন্য কোথাও তোর সাক্ষর করা চলবে না।’
মুহিব মহাবিরক্ত হয়ে বললো, ‘এসব কি?’
প্রজ্ঞা মুহিবকে ভেংচি কেটে বললো, ‘এসব কি?’
মুহিব দাগ পরে যাওয়া প্যাডের পাতাটা উল্টে নিতেই প্রজ্ঞা এবার ওর গলায় চুলের কাঁটা ধরে বললো, ‘সত্যি করে বল, তুই কি আমাকে ভালোবাসিস? সত্যি না বললে কিন্তু দু’ভাগ করে দেবো।’
একটা সময়ে এই প্রশ্ন অনেক ভাবিয়েছে ওকে। মনের অলি-গলিতে কোথাও কিছু খুঁেজ পায়নি। কিন্তু আজ জবাব দিতে গিয়ে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেই বললো, ‘হ্যাঁ, ভালোবাসি।’
প্রজ্ঞা মুহিবের ভালোবাসার গাঢ়ত্বটাকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে বললো, ‘হুম আমি জানতাম সেটা। সত্যিটা বলার জন্য বেঁচে গেলি আজকে।’
মুহিব প্যাডের ঝকঝকে নতুন পাতায় লেখা শুরু করতে গিয়ে বললো, ‘কিন্তু এমনভাবে কিন্তু বাঁচতে চাইনি আমি।’
প্রজ্ঞা মুহিবের কথায় কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়, ‘দ্যাখ, একজন মানুষের হয়তো আরেকজনকে ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা ভালোবাসা হয় না।’
‘হু আমি জানি’, বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাইলো না মুহিব। লিখতে শুরু করলো আবার।
প্রজ্ঞা এবার একটানে মুহিবের হাতের কলম টেনে নিয়ে বললো, ‘কাজ পরে করিস। চল চা খেয়ে আসি।’
সবকিছুকে এতটা সহজ স্বাভাবিকভাবে নেয়া আসলে ক’জন মেয়ের পক্ষে সম্ভব। এই মেয়েকে ভালো না লাগার কোন কারন তো এখন পর্যন্ত আমি খুঁেজ পাইনি। মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রজ্ঞার দিকে তাকিয়ে আবার পরক্ষণই চোখটা ফিরিয়ে নেয় মুহিব।
৪.
রিকশাটা পান্থপথ ছাড়িয়ে ধানমন্ডির দিকে এগুচ্ছে। মুহিব লাইটার বের সিগারেট ধরায়। সিগারেট জালাতেই বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকায় প্রজ্ঞা, ‘হয় তুই সিগারেট ফেলবি নইলে আমাকে ফেলে দিবি।’
প্রজ্ঞার কথা শুনে নিরবে হাসে মুহিব। ওর হাসি দেখে আরও রেগে যায় প্রজ্ঞা, ‘ফাজিলের মত দাঁত বের করে হাসবি না। এ্যাই মামা, রিকশা থামাও। আমি অন্য রিকশায় যাবো।’
মুহিব লম্বা টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলে, ‘আচ্ছা আমার এফএনএফ তো তোর সাথে তোর এফএনএফটা কার সাথে? আমার সাথে না এটা আমি জানি।’
প্রজ্ঞা অবাক হয়ে বলে, ‘আজ হঠাৎ এ প্রশ্ন?’
‘নাহ এমনি। খুব জানতে ইচ্ছা হলো তাই।’
‘মানে কি?’
‘মানে নেই। কার সাথে এফএনএফ সেটা জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘তোর কাছে কি বলতে আমি বাধ্য?’
‘আমি তোমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক নই আর তুমিও একান্ত বাধ্যগত নও। অন রিকোয়েস্ট? জাস্ট কিউরিসিটি।’
‘সিহানের সাথে।’
‘হুম।’
‘আসলে দ্যাখ, বন্ধুত্বের বিষয়টা বহুমাত্রিক। দু’জন পরস্পরের সাথে এফএনএফ করলে তো আমরা দ্বিমুখী চুক্তিতে বন্দী হয়ে গেলাম। কিন্তু যদি আমার যার সাথে এফএনএফ তার যদি আরেকজনের সাথে থাকে তাহলে যখন তখন সেলফোনে কনফারেন্স করে ঘরে বসেও আড্ডা দেয়া যায়। যে কারণে এটা সুবিধাজনক। আর যদি অন্যকিছু ভেবে থাকিস তাহলে ভুল করবি।’
প্রজ্ঞা এভাবে আরও অনেক কথাই মুহিবকে বলতে থাকে। কিন্তু সেই কথাগুলো ওর কাছে স্রেফ অর্থহীন মনে হয়। কার গুরুত্ব কার কাছে কতটুকু সেটা তো আজ জানা হয়ে গেল। কিন্তু মুহিবের কিছুই করার নেই। মুহিব তো বলতে পারে না, ‘কে সিহান ? তোর এফএনএফ থাকবে আমার সাথে।’ সেই অধিকার কেউ তাকে দেয়নি। নির্জন বিকেলে নিঃসঙ্গ কোকিলের মুহূর্মুহূ ডাকের মর্মবেদনা সেই প্রথমবারের মত উপলব্ধি করে মুহিব।

৫.
মুহিব সাধারণত ভার্সিটির ক্লাস মিস করে না। কিন্তু সেদিন লেখালেখি সংক্রান্ত কি একটা কাজ থাকায় ক্লাসে যাওয়া হয়নি। সারাদিন শেষে বাসায় ফিরে বিছানায় একেবারে গা এলিয়ে দিয়েছিল। এসময় সেলফোনের বিরক্তিকর ভাইব্রেশন। ফোনটা হাতে নিতে নিতেই লাইন কেটে যায়। মিসডকল! বিরক্ত হয়ে চেক করতে গিয়ে দেখে প্রজ্ঞার নাম্বার। ফোনটা হাতে রেখে পাশ ফিরে আবার চোখ বুজলো ও। এসময় আবার মিসডকল। মুহিব ফোনটা সাইলেন্ট করতে গিয়ে খেয়াল করলো এবার ভাইব্রেট আর থামছে না।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোন এক সুনামি যেন ফোনের মধ্য দিয়ে উড়ে চলে এল, ‘এ্যাই তুই ফোন করিস না ক্যান?’
‘আজব। আমার ফোনে ব্যালেন্স নাই। কি দিয়ে ফোন করবো?’
‘ব্যালেন্স নাই কেন?’
‘খুবই রহস্যময় প্রশ্ন। তবে এর কোন উত্তর আমার জানা নেই।’
কোন কথা না বলেই ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে দেয় প্রজ্ঞা। একটু পর মেসেজের ইনকামিং টোন শুনে চোখ খুলে ফোনটা কাছে টেনে নেয় মুহিব। চেক করতে গিয়ে দেখে, ব্যালেন্স ট্রান্সফার মেসেজ। ফিফটি টাকা রিচার্জ!
৬.
সেদিন বিকালে তেমন কোন কাজ না থাকায় এলাকার এক রেস্টুরেন্টে বসে স্কুলের বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল মুহিব। অনেকদিন এভাবে একসাথে দেখা হয়নি ওদের। তাই অনেকদিনের জমানো গল্পও যেন আর শেষ হতে চায় না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রির শুরুতে যখন এক এক করে বন্ধুরা বিদায় নিতে শুরু করলো তখন ঘড়িতে সময় প্রায় সোয়া নয়টা। মুহিবের হাতে তেমন কোন কাজ নেই। তাই বাসায় ফেরারও তেমন তাড়া নেই। তবুও ফোনের দোকান থেকে সেলফোনে রিচার্জ করে বাসার পথ ধরল ও।
আজ সকালে প্রজ্ঞা বেশ কয়েকবার মিসডকল দিলেও ব্যলেন্স ছিল না বলে ফোন দেয়া হয়নি। ব্যালেন্স মেসেজ আসতেই মুহিব ফোন দিল ওকে। কয়েকবার রিং বাজার পর লাইনটা কেটে গেল। এরপর ট্রাই করে দেখা গেল নাম্বার বন্ধ। খানিকপর আবার ফোন দিতে দেখা গেল রিং বেজেই যাচ্ছে। কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না।
সন্ধ্যায় মুহিব বাসায় পৌছানোর আধ ঘন্টা পর প্রজ্ঞার মিসডকল আসে। মুহিব ফোন দিতেই প্রজ্ঞা বললো, ‘এইতো আমি রিকশায় আম্মুর সাথে একটু মার্কেটে গিয়েছিলাম।’
‘ও আচ্ছা তুই আন্টির সাথে। ঠিক আছে তুই বাসায় যা। আই উইল কল ইউ লেটার।’
‘না বল, সমস্যা নাই।’
‘এমনি কিছু না। সকালে মিস দিলি, ফোন করতে পারি নাই।’
‘এমনিই মিস দিয়েছিলাম। আচ্ছা কালকে ভার্সিটিতে আসবি তো?’
‘হুম।’
‘আচ্ছা রাখ, কাল দেখা হবে।’
পরের দিন সকালবেলা। হক ভাইয়ের চায়ের দোকানের সামনে মুন্নীচত্বরে বসে আছে মুহিবের বেশ কয়েকজন ক্লাসমেট। তাদের সবার মাঝখানে বসে আছে প্রজ্ঞা। খুব উৎসাহিত ভঙ্গিতে কথা বলছে সে।
মুহিব একবার ভাবলো যাবে না ওখানে। প্রজ্ঞা যা বলছে বলুক। কিন্তু শেষপর্যন্ত পুরোমাত্রায় বিষয়টিকে এড়িয়েও যেতে পারলো না ও। হক ভাইয়ের দোকানে চা খেতে যাচ্ছে এমন একটা ভঙ্গিতে প্রজ্ঞার জমানো আসরের পাশ দিয়ে হেটে যাবার সময় কানের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে দিলো মুহিব। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যতটুকো কানে এল তাতে মনে হল, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বেশ আলোচিত একটা বাংলা ছবির দক্ষ সমালোচকের ভুমিকা পালন করছে প্রজ্ঞা। মুহিব গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে অন্যমনষ্ক ভঙ্গিতে ওর কথাগুলো শোনার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
একটু পরেই প্রজ্ঞা ওর চায়ের বিল দিতে দোকানের সামনে আসতেই প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে গেল মুহিব, ‘তুই কি মুভিটা দেখছিস নাকি, এত জ্ঞান আসছে কোথেকে?
প্রজ্ঞা মুখে খানিকটা তাচ্ছিল্যের ভাব এসে বললো, ‘সবাই কি তোর মতো ঘরে বসে মুভি দেখার অপেক্ষায় থাকে নাকি? নতুন মুভি দেরি করে দেখলে আর জমে না। গতকালকেই তো সিফাত আর আমি মুভিটা সিনেপ্লেক্সে বসে দেখলাম।’
প্রজ্ঞার কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে যায় মুহিব, ‘গতকালকে দেখলি মানে? তুই না কাল আন্টির সাথে মার্কেটে শপিং করতে গেলি...’
‘না! মানে প্রথমে আম্মুর সাথে মার্কেটেই গিয়েছিলাম। পরে আবার সিফাত ফোন দিয়েছিল। হাতে সময় ছিল তাই ছবিটা দেখতি গিয়েছিলাম!’ একটু ইতস্তত করে জবাব দেয় প্রজ্ঞা।
ওর এসব কথা শুনে ভাবনার বেঁড়াজালে হঠাৎ আটকা পরে যায় মুহিব। এই সামান্য বিষয়টা প্রজ্ঞা ওর কাছে এভাবে লুকানোর চেষ্টা করবে কেন!
ওকে গতকাল অযাচিত মিথ্যে বলার কারণটা ভেবে পেল না মুহিব।
৭.
কয়েকদিন পর। কি কারনে যেন মুহিবকে বাসায় ডেকেছে প্রজ্ঞা। মুহিব কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলছে না কিছুই।
বিরক্ত হয়ে একসময় মুহিব বললো, ‘আচ্ছা থাক তাহলে। আমি চলে যাই। কালকে ভার্সিটিতে আসবি?’
‘হুম যাবো। আচ্ছা শোন আমার মোবাইলে মিসকল দেবারও ব্যালেন্স নাই। তুই দশটা টাকা রিচার্জ করে যাস।’
‘আচ্ছা করে দিব।’
‘এই দাঁড়া, টাকা নিয়ে যা।’
‘নাহ টাকা লাগবে না। তুই তো আমার কাছে এমনিতেই টাকা পাবি। তোর রিচার্জের অ্যামাউন্টটা দেয়া হয়নি।’
‘ওটা ফেরত দেয়া লাগবে না। তোকে দশ টাকা দিচ্ছি, তুই ওটাই রিচার্জ করবি।’
‘কেন, আমার মত তুচ্ছকে ঋণী রেখে কি লাভ মহামান্যা? আমি তোকে সেই দিনের টাকাটা রিচার্জ করে দিচ্ছি।’
‘তোর টাকা আমি সাথে সাথে ব্যালেন্স ট্রান্সফার করবো। আমি কারও পঞ্চাশ টাকা রিচার্জ নেই না। করলে পাঁচশো টাকা রিচার্জ করে দিতে হবে, পারবি?’
‘ব্যাপারটা এত সিরিয়াসলি নেবার কি আছে? আমার কছে এখন অত টাকা নেই। থাকলে করে দিতাম।’

‘তাহলে তুই দশ টাকা রিচার্জ কর।’
‘না।’
‘আচ্ছা যা। তোর কিছুই করতে হবে না।’
প্রজ্ঞার ওপর প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল মুহিব। পকেটে আজকে পাঁচশো টাকা থাকলে, শিট্ !
‘ল্যিকুইড মানি ইজ দ্যা মোস্ট পাওয়ারফুল ফ্যক্টর ইন দিস ওয়ার্ল্ড’ কথাটা যে বলেছে, তার নাম্বার জানা থাকলে আজকে তাকেই মুহিব পঞ্চাশ টাকা রিচার্জ করে দিত।
৮.
সেদিন মুন্নী চত্বরে বসে সিগারেট টানছিল মুহিব। এসময় প্রজ্ঞা এসে
মুহিবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘এ্যাই আজকে ক্লাস হবে না?’
মুহিব কোন জবাব দেয় না।
‘কিরে কথা বলিস না কেন?’
‘কি?’
‘ক্লাস হবে না?’
‘জানি না।’
‘এত ভাব নেবার কি আছে? তোর ভাবের দাম যে দুই পয়সা, জানিস?’
‘ভালো।’
‘আচ্ছা শোন, এই শার্ট কি তোর ইউনিফর্ম হয়ে গেছে? এই শার্টটা কেন এত পরিস?’
‘আচ্ছা আর পরবো না।’
‘কেন পরবি না? এই শার্টটা পরলে না তোকে জটিল লাগে, সত্যি।’
‘এত জটিলতার দরকার নেই। কি বলবি বল।’
‘মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানিস, তুই না থাকলে আমি কিভাবে ভার্সিটিতে আসতাম। কার সাথে গল্প করতাম? এখানে ভর্তি হবার পর ভেবেছিলাম সামনেরবার রি-অ্যাড দিয়ে ঢাবিতে চলে যাবো। কিন্তু ওখানে গেলেতো আর তোর মত বন্ধু পাবো না, তোকে পাবো না। এইসব ভেবে আমি পরীক্ষাও দেইনি। তোর কথা আমি আমার অন্যান্য বন্ধুদেরকে এত বলি যে, ওর বিরক্ত হয়ে যায়। ওরা বলে, তুই এত মুহিব মুহিব করিস কেন? কি পেয়েছিস ওর মধ্যে?
প্রজ্ঞার মুখে এসব শুনতে শুনতে মুহিব কেবলই হারিয়ে যায় অজানা কোন এক অচিনপুরের স্বপ্নে যেখানে শুধুই বসবাস এক রাজপুত্র আর রাজকন্যার। রাজপুত্রের হাসি হাসি মুখটি দেখা গেলেও রাজকন্যার মুখটি কিছুতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আচ্ছা কেন এমনটা হচ্ছে কেউ কি ওকে বলতে পারবে?
৯.
ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্রান্সপোর্টের দিকে যাচ্ছিল মুহিব। এমনিতে বাসে সিট না রাখলেও আজকে সিট রাখা দরকার। কারণ আজকে একেবারে শাহবাগ গিয়ে নামতে হবে। সিট রাখতে গিয়ে একটা বাসে উঠে ও দেখলো প্রজ্ঞা একা একা মুখ গম্ভীর করে বসে আছে।
মুহিব হেসে বললো, ‘কি ব্যাপার ডার্লিং, তুমি এখানে কেন?’
প্রজ্ঞা মুখ গম্ভীর করে বললো, ‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ!’
মুহিব সিট রাখার কাগজটা জায়গামত রেখে বললো, ‘হোয়াটস রং?’
‘আমার প্রতি তোর কিছু কিছু আচরণ ঠিক বন্ধুর মতো হচ্ছে না। তোর আচরণগুলো হচ্ছে প্রেমিকের মতো। আই থিংক ইট স্যুওড বি চেঞ্জ।’
‘যেমন?’
‘এই যে তুই আমাকে ডার্লিং বললি। এটা কখনো বলবি না।’
‘অ্যাবসার্ড! আমি তোকে কখনোই অন্য কিছু মিন করে অ্যাড্রেসটা করিনি। তুই হয়তো জানিস না বা খেয়াল করিসনি আমি লিরা, তিশাকেও একই অ্যাড্রেস মাঝেমাঝে করেছি। বাট দে আর নেভার রিয়্যাক্ট ইন দিস সিলি টপিক।’
‘এছাড়াও অনেক ব্যাপার রয়েছে।’
‘কি সেটা?’
‘দ্যাখ, তুই আমার অনেক ভালো বন্ধু। আমাদের নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। আমি সেই বিষয়গুলো নিয়ে মোটেও ভাবি না। কিন্তু তুই সেই বিষয়গুলো নিয়ে সবার সামনে এমন ভাব করিস যে, আমি তোর সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ।’
‘আমি ভাব করি না বা ধরি না। তুই সত্যিই তাই। কিন্তু তার মানে এই না যে, তোকে আমার পেতে হবে। আমাকে তোর বিয়ে করতে হবে, ভালোবাসতে হবে। আমি এসবের কোন কিছুই তোর কাছে কখনো দাবি করিনি আর করবোও না।’
‘ঠিক আছে এত কিছুর দরকার নেই। তুই তোর মত থাক, আর আমাকে আমার মতো থাকতে দে। এর মানে এই না যে তোকে আমি আমার জীবন থেকে সরে যেতে বলছি। এখন থেকে তুই আমার কোন পার্সোনাল বিষয় নিয়ে কথা বলবি না, আর আমিও বলবো না।’
‘শর্ত দিয়ে কখনো দু’জন মানুষ কখনো পাশাপাশি থাকতে পারে না। আমি আর কোন কিছু নিয়েই তোর সাথে কথা বলতে চাই না।’
সিটের কাগজটা উঠিয়ে নিয়ে ওই বাস থেকে নেমে আসে মুহিব। প্রথমদিন যখন মুহিব প্রজ্ঞাদের বাসায় গিয়েছিল সেদিন ওদের বাসা থেকে বের হয়ে খানিকদূর গিয়ে ফিরে তাকাতেই ও দেখেছিল, প্রজ্ঞা বারান্দায় দাঁিড়য়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু আজ ঘুরে তাকালে কি দেখা যাবে? একবার পেছনে তাকিয়ে খুব জানতে ইচ্ছা করে মুহিবের। কিন্তু ওর প্রবল ক্রোধ আর অস্তিত্ববোধেরা সেই ইচ্ছা থেকে একটানে ওকে দূরে সরিয়ে নেয়।
১০.
কামরান আর মুহিব বসে আছে দৈনিক আপন আলোর রাস্তার ওপারের চায়ের দোকানে। বেশ মেঘলা আবহাওয়া। কামরান চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, ‘কিরে তোর বান্ধবীর কি খবর?’
‘অবস্থা ঢেউটিন! বান্ধবী কাল আমার উপর খেপে গেছে।’
‘ক্যান কি করছিলি?’
‘আরে কইস না। কাল বিকালে সবাই মিলে ট্রান্সপোর্টে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় আমার এক ফ্রেন্ড কোথেকে যেন এক বোতল হুইস্কি নিয়া আসছে।
সবার সামনে ও আমাকে বললো, খাবি নাকি একঢোঁক। আমি খেতেই দেখি সে ব্যাপক চেঁচামেচি শুরু করে দিছে।
‘তারপর?’
‘আমি এরপর একটু মাতলামির অভিনয় করতেই সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। পারলে ধরে মার দেয় আমাকে এমন অবস্থা।’
‘পরে...’
‘পরে আর কি, বান্ধবী আমাকে ফেলেই ক্যাম্পাস থেকে চলে গেল। এরপর থেকে সে আমার আর ফোন ধরে না।’
‘এই অবস্থা!!’
‘হুম। আমি ঠিক করছি এখন একটা ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচ খেলবো।’
‘মানে কি?’
‘মানে তুই এখন প্রজ্ঞাকে ফোন করে বলবি, মুহিবতো কালকে বাসায় ফেরে নাই। তুমি কিছু জানো কি-না। ওর ফোনও তো বন্ধ বাসায় খুব টেনশন করছে সবাই।’
‘সিরিয়াসলি?’
‘সিরিয়াসলি, আমি এখনই আমার সেল অফ করছি।’
সেদিন রাতে ফোন অন করতেই পরিস্থিতি যে কত ভয়াবহ হয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারলো মুহিব। অনবরত কল আসছে ফোনে। ক্লাসের প্রায় সবাই এক সাথে ওকে ফোন করছে। এর মধ্যে প্রজ্ঞার কল সবার চাইতে বেশি। মুহিব একটু পর আবার ফোন অফ করে দিল।
সেদিন ভোরে কি কারণে যেন ঘুম ভেঙ্গে গেল ওর। কি মনে করে ফোনটা অন করতেই প্রজ্ঞার কল চলে আসলো। কলটা ধরবে না ধরবে না করেও ধরলো ও। কোন কথা নেই। প্রথম সাড়ে চার মিনিট শুধু কান্নার আওয়াজ শুনলো মুহিব।
‘কিরে কাঁদছিস কেন?’
‘তুই কোথায়?’
‘আছি দূরে কোথাও’
‘তুই বাসায় যা।’
‘না।’
‘আল্লাহর দোহাই লাগে তুই বাসায় যা।’
‘না।’
‘আমি এই মাত্র তোর জন্য বিশ রাকাত নফল নামাজ শেষ করলাম। আমি এখনও জায়নামাজে বসে আছি, শুধু তোর জন্য মুহিব।’
‘তাহলে বল, তুই আমাকে ভালোবাসিস কি-না?’
‘তুই বাসায় যা।’
‘তুই বল আমাকে ভালোবাসিস কি-না?’
আবারো কান্নার একটানা শব্দ শুনতে পেল মুহিব। এই কান্না শুনে কেন যেন মনে হল, ও হেরে গেছে। এই মেয়ে তাকে ভালোবাসে না আর কখনো ভালোবাসতেও পারবে না।
সাত বছর পর
১১.
বহুদিন পর হুট করে এক দুপুরে ফার্মগেটে আবিদের সাথে দেখা। দেখেই ‘এতদিন কই ছিলি দোস্ত’ বলেই মুহিবকে জড়িয়ে ধরে আবিদ।
‘এই তো আছি তোদের আশেপাশেই।’
‘তোর নাম্বারটা বন্ধ ক্যান রে, কতবার ট্রাই করলাম।’
‘আরে বলিস না, ওই নাম্বারটা সেটসহ বাস থেকে সাইজ হয়ে যাবার পর থেকে অফিসের কর্পোরেট নাম্বারটাই ইউজ করছি। তোদের কারও নাম্বারেরই ব্যাকআপ ছিল না তাই কাউকে জানাতেও পারিনি।’
‘তুই এখনো আগের জবটাই করছিস?’
‘হুম। তুই?’
‘আমি বাবার ব্যবসা দেখতে দেখতে দেখেই যাচ্ছি।’
‘ভালোই, চালিয়ে যা। লাঞ্চ করেছিস?’
‘নাহ চল, কোথাও গিয়ে বসে পড়ি।’
খেতে খেতেই প্রজ্ঞার প্রসঙ্গটা তোলে আবিদ, ‘কি রে প্রজ্ঞার কোন খবর রাখিস?’
‘নাহ, কি করে রাখবো? সে কখনো কি আমায় সে অধিকার দিয়েছে?’
‘হুম, তারমানে তুই কিছু জানিস না।’
‘কি জানবো?’
‘প্রজ্ঞা যে অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল সেটা জানিস?’
‘মানে?’
‘এক রিলেটিভের বাসা থেকে ও একাই ফিরছিল সেদিন।’

আমিনবাজারের কাছাকাছি আসতেই ওর ক্যাবটাকে সামনে থেকে একটা ট্রাক সরাসরি ধাক্কা মেরে বসে। ক্যাবের ড্রাইভার বাঁচেনি। প্রজ্ঞা মরতে মরতে বেঁচে গেছে। তবে ওর বাম পা’টা আর কখোনোই ভালো হবে না।
‘ক’মাস আগের ঘটনা এটা?’
‘মাস ছ’য়েকতো হবেই।’
‘প্রজ্ঞা এখন কোথায় থাকে জানিস?’
‘ওর বাবার বাড়িতে, মিরপুরেই।’
‘কেন ওর হাজব্যান্ড?’
‘ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। অ্যাকসিডেন্টের কিছুদিন পরেই নাকি অভদ্রলোকটি আরেকটা বিয়েও করেছে শুনলাম।’
আবিদের কাছ থেকে এতদিন পর এসব কথা শুনে যেন পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে যায় মুহিব। খাবার শেষ না করেই উঠে পড়ে ও।
১২.
অনেকদিন পর মুখোমুখি দুজনে। প্রজ্ঞার রুমে ঢুকে মুহিব দেখে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রজ্ঞা। মুহিবকে দেখে এতটুকু চমকালো না ও। যেন জানতো মুহিব আসবে। হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, ‘অনেকদিন পর তাই না?’
‘হ্যাঁ তাই। কিন্তু অনেকদিন আগে তুমি ভালো ছিলে, এখন নেই।’
‘কিন্তু তুমি দেখনি আরো অনেক কিছুই, ভাবনি অনেকের কথাই।’
‘হয়তো সে কারনেই আজ আমি পরাজিত।’
‘কিন্তু আমি তো আজও জয়ী হতে পারিনি।’
‘শোধ নেবে তোমার অবহেলার?’
‘যদি নিতে চাই তবে কি তুমি বাধা দেবে?’
প্রজ্ঞা কোন কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকায়। মুখ ঘুরিয়ে নিলেও মুহিব বুঝতে পারে প্রজ্ঞা তার চোখের কষ্টধারাকে আড়াল করছে। এসময় আকাশ গর্জে ঝমঝমে বৃষ্টি নামলো। মুহিব প্রজ্ঞার এক হাতে হাত রেখে জানালার বাহিরে চোখ রাখে। এক অসম্ভব অপরূপ বৃষ্টি ঝরছে। কিন্তু বৃষ্টিটা আরো জোরে নামছে না কেন?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement