মেয়েটা প্রতিশোধের অাগুন নিয়ে অপেক্ষায় অাছে দিনের পর দিন। কাঙ্খিত সেই সময়ের খুব কাছাকাছি সে। যেকোন অপরাধের পূর্ব মুহূর্তে যেমন অপরাধীর মনে ভয় কাজ করে, মেয়েটাও তেমনি ভয়ে ভয়ে অাছে। প্রতিশোধ কিংবা অপরাধটা করতে হলে তাকে এই ভয় জয় করতে হবে। এই ভয় কি জয় করা সম্ভব হবে? গল্পটাতে পাবেন এই উত্তর।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ মে ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ৬টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

কানামাছি
ভৌতিক

সংখ্যা

অাহাদ অাদনান

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩১
বেশ ভয় করছে। অথবা উৎকন্ঠা। কিংবা দুশ্চিন্তা। মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। দুই বছর হল স্কুলে যাচ্ছে। সারাদিন বাসায় ছুটোছুটি করে সন্ধ্যা হলেই ঝিমিয়ে পড়ে। রাতের খাবার নিয়ে এক দেড় ঘন্টার যুদ্ধ শেষ হলেই বিছানায়। দশ মিনিটে ঘুমে কাদা। কিন্তু সমস্যা হয় ছোটটাকে নিয়ে। চারে পড়েছে মাত্র। বুকের দুধ ছেড়ে দিয়েছে এক বছর আগে। বিছানায় গেলে গল্পের পর গল্প সাজাতে হয়। সত্যি গল্প। মিথ্যা গল্প। মিথ্যার মত সুন্দর সত্যি গল্প। সত্যির মত তেতো মিথ্যা গল্প। আজ কেন যেন কোন গল্পই আসছে না মাথায়। ঘুমও নেই ছেলেটার চোখে।
'আম্মু, আব্বু আসবে কখন'?
'তুমি ঘুমালেই এসে পড়বে। সকালে দেখবে তোমাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে'।
মিথ্যা বলতে আমার কন্ঠ জড়িয়ে আসে। জানি আজ ১ডিসেম্বর রাত। ও আসবে না।
'আব্বু না আসলে আমি ঘুম যাব না। আব্বু বলেছে আমার জন্য চকলেট আনবে'।
'তুমি না ঘুমালে চকলেট কাক খেয়ে ফেলবে। একটা এত্ত বড় কাক আছে জানালার ওপাশে। কালো একটা কাক'।
পিচ্চিটা হাসে। ভয় পায়না মোটেও। প্রযুক্তি দিনদিন ভয় জিনিসটা তুলে দিচ্ছে নাকি? মনে হয়না। আমার যে এখন ভয় করছে এর সাথেওতো প্রযুক্তি জড়িয়ে আছে। অন্তর্জাল, ফেসবুক, ইমো এসবা জঞ্জাল না থাকলে কি ভয়টা থাকত?
অনিকের ফোনে আবার নক করি। এখনও বন্ধ। সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ পাচ্ছি। মেসেঞ্জারে কিছু কথা লিখে পাঠিয়েছি। নেটে ঢুকেনি মনে হয়। আরেকটা জরুরি নাম্বারে কল করেই যাচ্ছি। অদ্ভুত, এটাও বন্ধ। অনিকের ফোন বন্ধ নিয়ে তেমন ভয় নেই। কিন্ত দ্বিতীয় লোকটাকে না পেয়ে বুকের কম্পন বাড়ছেই শুধু।
এক অদ্ভুত সংসার আমার। ভার্সিটির শেষ বছরে এসে হঠাৎ করে আমার বাবার মনে হল তার বন্ধুর ছেলে এক রাজপুত্র। আয়কর বিভাগের দাপুটে এই অফিসারের সাথে বিয়ে না হলে তার মেয়ের কোন ভবিষ্যৎ নেই। মেয়ের পছন্দ, ভালোলাগা, ক্যারিয়ার সব তুচ্ছ তার কাছে। তারপর যেদিন দুর্জয় আর আমি ঠিক করলাম পালিয়ে বিয়ে করব আমরা, ঠিক সেদিনই দুর্জয়ের বাবা স্ট্রোক করল। তারপর থেকে আমার এই 'নরকবাস '।
'আম্মু, তোমার কালো কাকটা অনেক বোকা। আব্বুতো কত রাতেই বাসায় আসেনা। আমিও জেগে থাকি। তুমি খালি ভয় দেখাও। কই, আমার চকলেটতো কাক খায়না। আপু অবশ্য খায় মাঝে মাঝে। আপু কি সকাল হলে কাক হয়ে যায়? হি হি '!
আমার হাসি পায় ওর কথা শুনে। আহ, কতদিন প্রাণ খুলে হাসি না আমি! ভালোবাসা ছিলনা কোনদিনই আমাদের সম্পর্কে। ঠিক অভ্যাসের মত আমরা ঘর করছি। সকালে আমি নাস্তা তৈরি করে দিই, ও হাত খরচের টাকা দেয়। মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাই, ও ফোনে জেনে নেয় ফিরেছি কিনা। যেদিন সন্ধ্যায় বাসায় আসে, বিকেলে জেনে নেয় কিছু আনতে হবে কিনা। ভাতঘুম ভাঙার বিরক্তি নিয়ে আমি বলি, আনো তোমার যেটা ইচ্ছা। রাতে ও মাঝে মাঝে বীর্য ত্যাগ করে। সকালে আমি আমার রাগ টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দিয়ে বলি, সুপ্রভাত। ওকে নয়। আয়নায় নিজেকে নিজে বলি এই নিন্দিত নরকে আরও একটা দিন এসে গেল। সুপ্রভাত তোমাকে হে বন্দিনী!

আমাকে খুব অবাক করে দিয়ে দেখি ছেলেটার চোখ ঢুলুঢুলু করছে। আমি কিছু না বলে মাথায় হাত বুলাতে থাকি। ঘুম যত বাড়বে, আমার ধুকপুকানি তত কমবে। ওর আব্বুকেও কোন এক মেয়ে, হয়ত রূপসী, কিন্তু আমার কাছে রাক্ষুসী, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এমন ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে। আমার স্বামীর একটা পরকীয়া আছে, ফেসবুকে অনেক মেয়েই বান্ধবীর সাথে গল্প করে। অনুমান থেকে হয়ত। সহানুভূতির কাঙাল সাজতে চায় সবাই। কিন্ত আমি খুব ভালো করে জানি ওদের কথা। প্রথমে সন্দেহ ছিল, কিন্ত একসময় একটার পর একটা প্রমাণ পেতে থাকি। বিষয়টা এতই প্রকাশ্য যে ও এখন প্রায়ই বাইরে রাত কাটাতে শুরু করেছে। আমি কিছুই বলিনা। কোনদিন বলিনি। ওতো বাবার 'রাজপুত্র '।

ক্লাস এইটে একবার এক স্যার আমার বুকে হাত দিয়েছিল। আমি ব্যথা, লজ্জায় 'উহ্ ' করে কেঁদে ফেলেছিলাম। কিন্তু কাওকে কিছুই বলিনি। নিজের মাকেও না। সেই স্কুলে ছিলাম আমি আরও তিন বছর। ওই স্যারকে দেখলেই আমি আড়াল খুঁজতাম। বাঘ আর রক্তের স্বাদের গল্পটা আমি জানি। যেদিন এসএসসির রেজাল্ট হল সেদিন সবাই মিলে সেলফি তুলছিল। সেদিনও আমি চুপ ছিলাম। একদিন স্কুলে মার্কশীট আসল। আমি বুঝে গেলাম স্কুলের সাথেও লেনদেন শেষ আজ। তখন আমি পড়ি কলেজে। সেদিন গেলাম সেই স্যারের বাসায়। দুপুর বেলা। বউ, বাচ্চা নিয়ে স্যার খাচ্ছেন। কলিং বেল বাজায় তিনিই আসলেন দরজা খুলতে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। আমাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন স্যার।

'ভাবী, ভালো আছেন। আজ থেকে ছয় বছর, দুই মাস, তিন দিন, সতেরো ঘন্টা, আট মিনিট আগে আপনার স্বামী খালি টিচার্স রুমে আমার বুকে হাত দিয়ে টিপে দিয়েছিল। বুক'কে তখনও আমি স্তন বলতে সাহস করিনি। আপনি আমার জায়গায় থাকলে কি করতেন '?
সারা ঘর স্তব্ধ। স্যার মাথা নিচু করে আছেন। আমি জানি এরপর যা করব, স্ত্রী, সন্তানের সামনে তিনি আর কোনদিন মাথা উঁচু করতে পারবেন না।
'আমি বিচার দিতে শিখিনি কোনদিন। আমি বিশ্বাস করি প্রতিশোধে। একদিন পর, এক মাস পর, এক বছর পর, দশ বছর পর। আমি ভুলিনা কিছুই। ভয় পাইনা মোটেও। শোধ আমি নেবই'।
সেদিন আমার পায়ে ছিল সূচালো আগাওয়ালা চামড়ার জুতা। ডান পায়ের তীব্র এক লাথিতে স্যারের অন্ডকোষ থেতলে যাওয়ার কথা। তবে লুঙ্গি খুলে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে, এটা ভাবিনি।
দুইটা বাচ্চাই এখন ঘুমে। অনিকের ফোন এখনও বন্ধ। ফেসবুক থেকে জেনেছি ২ ডিসেম্বর ওর প্রেমিকার জন্মদিন। তার মানে আর কয়েক মিনিট বাকি। এই রাতে ও আর ফিরবে না নিশ্চিত। আমি হাঁটছি সারা ফ্ল্যাটে। রান্না ঘরে কিছু দড়ি, একটা ব্লেড, ধারালো ছুরি, একটা ভয়ংকর বিষাক্ত তরলের কৌটা আমি লুকিয়ে রেখেছি। ভয়টা আবার বাড়ছে। প্রিয় জিনিসগুলো আরেকবার নেড়েচেড়ে আসলাম। ওগুলো আমার অনেক কাজে আসতে পারে। কিন্তু আমার দরকার এরচেয়ে ভয়ংকর কিছু। আরও খারাপ কিছু। তাহলেই না প্রতিশোধ জমবে!

হঠাৎ বেজে উঠল দোরঘণ্টি। চমকে তাকাই দরজার দিকে। ভয়ে পা'ও চলছে না। দরজায় স্পাইহোলও নেই আমাদের। রাত বারোটায় কে আসতে পারে? অনিক ফিরে এসেছে? পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি? নাকি অন্যকেও?
'কে'? কাঁপা কাঁপা গলায় একটাই শব্দ বের হয় আমার। কোন উত্তর নেই।
আবার বলি, 'কে বাইরে'?
এবারও কোন উত্তর না পেয়ে রীতিমত আতঙ্কিত বোধ করি আমি। আমি কি দরজা খুলব? নাকি বন্ধই রাখব? খুলে কী দেখব? অপরিচিত ভয়ংকর কেও? এসে যদি ডাকাতি করে? কিংবা খুন? আমাকে, বাচ্চাদেরকে? যদি ধর্ষণ করে আমাকে? ধর্ষণ অবশ্য পরিচিত আর কাছের লোকগুলোই নাকি বেশি করে।
আবার বেলের বীভৎস শব্দ। সাহস করে দরজাটা খুলেই ফেলি। ভয়টা চলে যায় ঠিক তখনই।
'দুর্জয়? এত শয়তান কেন তুই? কথার উত্তর দিচ্ছিলি না কেন? ফোন বন্ধ কেন তোর? বিকেল থেকে কল করে যাচ্ছি '।
'বিকেলেই ফোনটা ছিনতাই হয়ে গেছে। সিমটা এখনও তোলা হয়নি। তোর এখনকার নাম্বারটাও মুখস্ত নেই। কি আর করি'?
'আমার নাম্বার তোর মনে থাকে না, বদ্'?
'সমস্যা কি? প্রোগ্রামতো জানাই আছে। ১তারিখ দিন যেয়ে ২ তারিখের রাতে তোর জামাইর জিএফের বার্থডে। রাত ওখানেই কাটাবে। বারোটার মধ্যে আমি এসে যাব। এইতো'?
'তারপরও, ভয় করেনা আমার '?
'কিসের ভয়'?
'ছোটটা জেগে ছিল। আবার ধর অনিক যদি এসে পড়ে'?
'আসলে আসুক। এক ঘুষিতে নাক ভেঙে দেব'।
দুষ্টু আর অনৈতিক হাসিতে ঘর জমে উঠে।
'তুই ওই ঘরে যা। আমি বাচ্চাদের ঘর লক করে আসি। প্রোটেকশন এনেছিসতো'?
'কেন, তুই পিল খাস না'?
ভয়ের মেঘ সরে গেছে। সারাটা রাত অসভ্য ভয়ংকর প্রতিশোধের আগুন জ্বলবে শুধু।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement