"অভিজ্ঞতার ঝুড়ি নিয়ে ৭ বছর বয়সী জামিলা বিচরণ করছে সেই একই চারণভূমি তে, যেখানে তোমার আমার ৭ বছর বয়সী বোন পুতুল খেলায় মত্ত!" পৃথিবীর আকাশ ও মাটির মধ্যকার এই দূরত্ব, এই অতি সাধারণ পার্থিব রীতিনীতি, যা একটি মানুষের জীবনকে অন্য একটি মানুষের জীবন থেকে একদম বিচ্ছিন্ন করে, সে ব্যপারটাই প্রকাশ পেয়েছে এই গল্পে। পার্থিব বৈচিত্রের পাশাপাশি মুখ্য হয়ে উঠেছে একটি শিশুর জীবন সংগ্রাম।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ জুন ২০১৮
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - পার্থিব (আগস্ট ২০১৮)

সংসারী
পার্থিব

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৬

মালিহা নামলাহ

comment ৫  favorite ১  import_contacts ৯৬
এশা তাকে বলে,
– ভিক্ষা করো না, পড়াশোনা কর।
সে অবাক হয়ে এশার দিকে তাকায়,
– পড়াশোনা করলে কি ভাত পাওয়া যায়?
এশা বলে,
– হ্যা, তুমি আমাদের কাছে পড়তে এসো। আমরা প্রতিদিন দুপুরে ভাত খাওয়াই।
– কতোক্ষণ পড়াইবেন?
– দুই ঘন্টা।
সে মনে মনে হিসাব করে, তারপর বলে,
– দুই ঘন্টা ম্যালা সময়, পুষবো না। ট্যাকা কম হইলে মায়ে রাগ করব।
– আমরা তোমাকে প্রতি মাসে টাকাও দেব। তোমার মা কে বলো, কেমন?
– কতো ট্যাকা দিবেন?
দর কষাকষি তে এশা তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তবু ধৈর্য্য ধরে বলল,
– পাঁচশর কম দেব না।
সে আবার মনে মনে হিসাব করলো।
– আইচ্ছা, আমু নে।
এমনভাবে বলল যেন অল্পে রাজি হয়ে এশাকে করুণা করেছে। এশা ওকে নিয়ে দোকানে গেল। এডভান্স কিছু না দিলে আবার মনে থাকবে না স্কুলে আসার কথা। জিজ্ঞেস করল,
– দুপুরে খাওয়া হয়েছে?
– না, হয় নাই।
বেশি টাকা ছিলো না এশার কাছে, অলটাইম বাটার বন কিনে দিলো একটা। সেটা নিয়ে সে চলে গেল। একটা হাসিও উপহার দিলো না। এশার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ওদের মতো বাচ্চাদেরকে নিয়েই তো সে কাজ করে।
ওর বয়স ৬/৭ বছর। এই বয়সী বাচ্চাগুলো সাধারণত কোমলমতী আর মিষ্টি হয়। হ্যা, তবে পথশিশুরা ১৫/১৬ বছর বয়সে রুক্ষ আর নিষ্ঠুর হয়ে যায়, তাও এশার দেখা। তবে ৬/৭ বছর বয়সেই এতোটা রুক্ষ সাধারণত কেও হয় না। এই ভিন্নধর্মী শিশুটিকে এশার ঠিক পছন্দ হলো না।
পরেরদিন ক্লাস করাচ্ছে এশা। সেই বাচ্চাটিও এসেছে। দেখা গেলো এশার কিছু ছাত্র-ছাত্রী চেনে বাচ্চাটিকে, কিন্তু মনে হলো ওরা ওকে খুব একটা পছন্দ করে না। কারণটাও এশা বুঝতে পারলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। আধা ঘন্টা পার হতে না হতেই সে একটি ছেলের সাথে তুমুল মারামারি বাধিয়ে দিলো। অনেক কষ্টে এশা থামাল ওদের। ওকে নিয়ে সে একপাশে চলে এল। বলল,
– তোমার নাম যেন কি?
– জামিলা।
– জামিলা, তুমি ওকে মারলে কেন?
– অয় আমার মায়েরে গালি দিছে।
– ও একটা পচা কাজ করেছে, কিন্তু তুমি তো ওকে মেরে আরো পচা কাজ করলে, তাই না?
– আমার মায়েরে যে গালি দিব, তারে আমি আস্তা রাখুম না।
এশা অনেকক্ষণ ধরে তাকে বুঝালো, কিন্তু কোনোই লাভ হলো না। মনে হলো তার কথাগুলো একটি কঠিন পাথরে লেগে ফিরে আসছে, ভেদ করতে পারছে না কিছুতেই।

ক্লাস শেষ করে এশা সবাইকে খেতে দিলো। সে দেখলো, জামিলা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্লেটের দিকে, খাচ্ছে না। ওর কাছে যেয়ে বলল,
– কি হয়েছে? খাচ্ছ না কেন?
জামিলা কোন কথা বলল না।
– ক্ষুধা নেই?
এবারও সে নিশ্চুপ। একটুপর বলল,
– আমি একটু আইতাছি।
এই বলে সে বাইরে চলে গেল। একটু পর একটা পলিথিন এনে প্লেটের খাবার গুলো পলিথিনে ভরে ফেলল। ততোক্ষণে বাকি বাচ্চারা পেট ভরে খেয়ে উঠেছে। এশা জামিলার কাণ্ডকারখানা দেখে একটু অবাক না হয়ে পাড়লো না। কারণ জিজ্ঞেস করায় কোন উত্তর পেল না। পরেরদিনও জামিলা একই কাজ করলো, ভাত পলিথিনে ভরে নিলো। এই দুইদিনে এশা তাকে একটিবারও হাসতে দেখেনি। সবসময় কেমন যেন অন্যমনস্ক। যে কথায় অন্য বাচ্চারা হেসে কুটিকুটি হয়, সে কথায়ও সে মুখ ভোতা করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

তৃতীয় দিন ক্লাস শেষ হওয়ার পরের ঘটনা। সব বাচ্চাদের সাথে জামিলাও চলে যাচ্ছিলো, এশা পেছন থেকে ডাকলো,
– জামিলা, একটু এদিকে আস।
সে আসলো। এশা পাশের জায়গাটা দেখিয়ে বলল,
– এখানে বস।
এশার পাশে নির্ভয়ে বসলো সে। এশা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– তোমার বাসা কোথায়?
– বেরিবান্দ।
– বাসায় কে কে আছে?
– আমার মায় আর ছোট দুই ভাই।
– মা কি করে?
– কিছু না।
– কিছুই করে না?
– না।
– কেন?
– মায়ের অসুখ।
– কি অসুখ?
– জানি না, বিছানার তন উঠতে পারে না।
– কতোদিন ধরে অসুখ?
– ম্যালা দিন। ২-৩ বচ্ছর হইব।
– তোমার বাবা কোথায়?
– মায়ের অসুখ হওয়ার পর বাপে কই জানি চইল্যা গেছে।
– তোমাদের চলে কিভাবে?
– আমি ট্যাকা আনি, আমার ট্যাকায়ই চলে।
– এই ভাত কি তোমার মা আর ভাইদের জন্য নিয়ে যাও?

জামিলা হ্যা সূচক মাথা নাড়লো। তার মুখ অসম্ভব গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। এশা তাকে এক হাত দিয়ে বুকে টেনে নিলো। সে অঝোরে কাঁদলো। এতো কষ্ট ঐ ছোট্ট বুকটার ভেতরে কিভাবে জমে ছিলো কে জানে! একটু পর সচেতনভাবে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়, বলে,
– আমি যাই, ভাই দুইডা না খাইয়া আছে।
এশা কিছু বলল না। জামিলা হাঁটা শুরু করলো। এশা শুধু তাকিয়ে দেখলো, সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটি শিশু!
যে সময়টা শিশুরা খেলাধুলা করে কাটায়, সে সময়টা জামিলা পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করে! যে বয়সে শিশুরা পরিবারের আদর পাওয়ার চিন্তায় উদগ্রীব থাকে, সে বয়সে জামিলা পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকে। দায়িত্বের ভার সামলাতে সে তার আবেগ- অনুভূতিটুকুও পায়ে পিষে ফেলেছে, গলা টিপে মেরে ফেলেছে নিজের শৈশবকে! অভিজ্ঞতার ঝুড়ি নিয়ে ৭ বছর বয়সী জামিলা বিচরণ করছে সেই একই চারণভূমি তে, যেখানে তোমার আমার ৭ বছর বয়সী বোন পুতুল খেলায় মত্ত!
এরপর থেকে জামিলা আর স্কুলে আসে নি। কেন আসে নি তা জানে না এশা। বাচ্চাদের কাছ থেকে তেমন কোন তথ্য পায়নি সে ওর ব্যপারে। তারপর কাজের ব্যস্ততায় ভুলেও গিয়েছিলো ওর কথা। মাঝেমাঝে মনে পড়ে, বুকটা হু হু করে ওর জন্য। এই ব-দ্বীপেই কতো শত জামিলারা আসে যায়, কয়জনের কথা আমরা জানি? ওর জন্য কিছু করতে পারেনি ভেবে এশার কষ্ট হয়, কিন্তু কিছুই তো করার নেই। সুতা কাটা ঘুড়ির মতোই ছন্নছাড়া ওরা, ওদের কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? তাই ভুলে যাওয়াটাকেই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে তার। আসলে সত্যিকথা বলতে, জামিলাদেরকে কেও মনে রাখে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement