রূপবতীর জবানীতে সেনভিলার চার প্রজন্মের কাহিনি এগিয়ে যায় । রুপবতী এক ঘোরের মধ্যে শ্রোতাকে যেন সামনে রেখে অভিশপ্ত সেনভিলার কথা বলে চলে । ভূতের ভয় নস্যাত করে রুপবতী পাঠকের মনে আস্থা জমিয়ে ধীরে ধীরে সেনভিলার রহস্যকাহিনি উন্মোচিত করে । থমথমে এক নিশুতি রাতে সেনভিলার উপরের ছোট্টো ঘরটিতে এক হাড়হিম করা ঘটনার কথাও গল্পচ্ছলে বলে যায় রূপবতী । পাঁচ পাঁচটি অপমৃত্যুর বর্ণনাও শোনা যায় কথকের মুখে । শেষ পর্যায়ে এসে শ্রোতা জানতে পারে , যে এতক্ষণ ধরে সেনভিলার ঘটনা বুনে যাচ্ছিল সে আসলে অপঘাতে মরে যাওয়া রূপবতী যার বয়স এখন একশো দশ বছর । ভূতের মুখেই ভূতের কাহিনি । তাই 'চামচিকের থাপ্পড়' একটি নিখাদ ভৌতিক গল্প ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৬২
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

চামচিকের থাপ্পড়
ভৌতিক

সংখ্যা

ARJUN SARMA

comment ২  favorite ০  import_contacts ৩৬
এটা কোন ভুতের গল্প নয় । আমি ভূতটুতে বিশ্বাস করি না । ছোটোবেলায় যা’ও একটু ছিল তাও ‘ভূত আমার পুত,পেত্নি আমার ঝি , রাম লক্ষ্মণ সঙ্গে আছে করবে আমার কী ?’ মন্ত্র আউড়ে দূর করে দিতাম । অবশ্য দুহাত ছেড়ে এভন সাইকেলে চড়ে ঠিক দুপুরে টো টো করার সময় সবাই বলতো এই মেয়েকে ভূতে পেয়েছে । ভুতেরাই ভূতকে ভয় পায় । গাঁ গঞ্জেই এখন ভূত উধাও , আর এই শহরে তো কথাই নেই । হাজারো আলোর রোশনাইয়ে ভূতেরা পালিয়েছে । শেষের কথাগুলো অবশ্য আমার নয় , ঐ যে কী যেন নাম ,ও হ্যাঁ মনে পড়েছে ,নিমাই প্রমোটারের । গল্পের মতো আমাকে আবার ভূত ভেবে বসবেন না যেন । আমি গোবেচারি । এই সেন ভিলার রক্ষাকত্রী । আমার পাহারাদার আছে দ্বারোয়ান সুবল সিং । তবে দুনিয়ার কোন কিছুতেই আমার ভয় হয় না । আমাকে কেউ পাত্তা দেয় না , আমিও দিই না ।

পাত্তা না দেওয়াটা রক্তের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত । কেউ কিছু বললেই তার উল্টোটা বলে দিতাম । নিজের মত খাড়া করবার জন্য তর্ক জুড়ে দিতে আমার জুড়ি ছিল না । আমার মা’ও , তার মা’ও,তার মা’ও এমনই ছিলেন । এসব আমি শুনেছি আমার মা কমলাবতীর কাছে । মা শুনেছেন তার মা’র কাছে , এভাবেই চলে এসেছে । আমার মা’র দিদিমা মানে আমার বড়মা থেকে শুরু করে সবাই এই সেন ভিলাতেই থেকেছেন । বলা ভাল আমাদের মায়ের বংশের মেয়ে-সিরিজের খাসতালুক এই ভিলা । বড়মা’র বাবা মেয়েকে ঘরজামাই ছাড়া বিয়ে দেবেন না পণ করেছিলেন । তিনি ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিক্রমকিশোর সেন । সেনভিলার বিক্রমকিশোরের নাম শুনলে কুকুর আর বিড়ালও জড়াজড়ি করে থাকত ভয়ে ,এমন কথা চালু ছিল । তারপর থেকে ঘরজামাইটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে সেনভিলার । দুষ্টুলোকেরা অবশ্য বলতো ‘জামাইগড়’ । সেনভিলা এই অঞ্চলের মধ্যে নামকরা ও একমাত্র ডিজাইন করা দোতলা বাড়ি । নিন্দুকেরা অবশ্য বলে অভিশপ্ত বাড়ি । সেসব কোন কাজের কথা নয়।

বড়মার নাম বিপুলাসুন্দরী । চোখ টানা টানা,রঙ ধবধবে । যৌবনের কণা উপচে পড়ছে সারা অঙ্গে । পুরুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায় । বিপুলাসুন্দরী বড্ড বেশী দেমাকী । ঘরজামাই শর্তে বিয়ে হল মা-বাপ হারা প্রতুলের সঙ্গে । বড্ড ভাল বর ছিল প্রতুল । কিন্তু দেমাকী বিপুলার মন পেত না । তবুও প্রতুল সহ্য করত । বিপুলার কথায় তাকে উঠতে বসতে হত । না হয় বিপুলা এমন সব কান্ড করে বসত যে পুরো সেনভিলা আতঙ্কিত হয়ে যেত । একদিনের কথা বলি । বিয়ের বছর ঘুরেছে । বিপুলা বলল,আমাকে নিয়ে আজ সারাদিন ঘুরবে, লায়লা রেষ্টুরেন্টে খাওয়াবে ,পরে ইভিনিং শো তে চাঁদনী হলে সিনেমা দেখাবে । ঐ সময় লায়লা রেষ্টুরেন্ট আর চাঁদনী সিনেমার খুব বনেদীয়ানা ছিল এই অঞ্চলে । এখন তো চিহ্নমাত্র নাই । বায়না শুনে প্রতুলের মাথায় বজ্রপাত । কারণ সেদিন তার সদর কোর্টে সেনপ্রপার্টির কি একটা জরুরি হলফনামা জমা দেওয়ার কথা । সবচেয়ে বড় কথা বিপুলার পেটে তিনমাসের বাচ্চা । প্রতুল কিছুতেই যাবে না । অনেক কাকুতি মিনতি করেছে । বিপুলাসুন্দরীর এক কথা আজ যেতেই হবে । শেষে প্রতুল ঘরজামাই জীবনে এই প্রথম একটু সুর চড়া করতেই বিপুলার মোক্ষম দাওয়াই , যাবে না তো ,তাহলে আমি আজই গলায় দড়ি দেব দেখো । আমাকে এখনো চেনো নি । শাশুড়িমায়ের হস্তক্ষেপে শেষ রফা করল প্রতুল । পেটে বাচ্চা নিয়ে সন্ধ্যের সময় বের হতে নেই আর ঘোরাঘুরিতে বাচ্চার ক্ষতি হবে এইসব বুঝিয়ে শুধু রেষ্টুরেন্টে যাওয়ার চুক্তি হল আর সারাদিন প্রতুলকে বিপুলার কাছে কাছে থাকতে হল । কিন্তু তিনবছরের সুরবালাকে রেখে একদিন কথা কাটাকাটির জেরে ঠিকই বিপুলাসুন্দরী ঝুলে গেল দোতলার এই ঘরটিতে । এখনো রাতে বিপুলাসুন্দরী কাঁদে এই ঘরে ।

আমার দিদিমা সুরবালা দুর্গাপ্রতিমার মত দেখতে । বিপুলার দেমাকি গুণ মেয়ের মধ্যেও ষোল আনা সঞ্চারিত । সুরবালার এক মামা আর পিসি তখন সেন ভিলার পাকাপাকি বাসিন্দা । সবার আদর আর লাই পেয়ে মা মরা সুরবালার মাথায় উঠতে বিলম্ব হয় নি । স্কুল পড়ুয়া সুরবালা সহপাঠী বিরাজভূষনকে প্রেম নিবেদন করল শুধু নয় বিরাজকে কব্জা কুরতে বেশিদিন লাগে নি । প্রেম গাঢ় হলে ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে গেল । সেন ভিলায় ধুন্ধুমার কান্ড । সেনভিলার প্রেষ্টিজ নিয়ে কথা হল । সকলে প্রমাদ গুনল । সুরবালা গৃহবন্ধী হল । জোর করে সুরবালার বিয়ে দেওয়া হল ঘরজামাই নিশান চৌধুরীর সঙ্গে । নিশান চৌধুরী মানে আমার দাদু এবাড়ির অন্য পুরুষদের তুলনায় বেশি পার্সোনালিটির পুরুষ ছিলেন । নিশানের আমলেই সেন ভিলার সম্পদ সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছে । কিন্তু সুরবালা একদম পছন্দ করত না । সে লুকিয়ে দেখা করত প্রেমিকের সঙ্গে । এই নিয়ে নিশানের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ লেগে থাকত । বিয়ের বছর না ঘুতেই আমার মা কমলাবতীর জন্ম হল । মেয়ের মুখ দেখে নিশানের মনে খুঁতখুঁত । তার সঙ্গে কোন মিল নেই । নিশান সুরবালাকে সন্দেহ করতে লাগল । অকুতোভয় সুরবালা পাত্তা না দিয়ে দিন দিন নিশানকে আরো বেশি অবহেলা করতে লাগল । সেনভিলার পুরুষরা ইয়ারদোস্তদের নিয়ে বিদেশী পানীয়ের আসর বসাতো একতলার ঐ কোণের সাজানো কক্ষটিতে । বাইরের জগতে এটাও সেনভিলার প্রেষ্টিজের মুকুটের এক উজ্জ্বল পালক হিসেবে প্রচারিত ছিল । নিশানের ক্ষেত্রে পানের লেখচিত্র একেবারে চূড়ায় উঠেছিল । সূর্যালোকে নিশান চৌধুরীর মত ভদ্র,মার্জিত ,কর্মপ্রিয় লোক দ্বিতীয়টি মেলা ভার । দিনের আলো নিভে গেলেই নিশানের মাথায় পানীয়ের পোকা কিলবিল করত । সেদিন হল অন্যরকম । আমার মায়ের মানে কমলাবতীর মামা আর মাসী সেনভিলার অতিথি । তারা ধরল, জামাইবাবু আর দিদির বিবাহবার্ষিকী পালন করবে । প্যাঁচে পড়ে নিশানচৌধুরী রাজি হল । খানাপিনা হল । অনেকদিন পর সেই মাঝ রাতে নিশান সুরবালার শয়নকক্ষে । সারা সেন ভিলা নিঃঝুম । অনেকদিন পর নিশানের মন প্রফুল্ল । সুরবালা যেন এর অপেক্ষাতেই ছিল । নিশান দরজা ভেজিয়ে কাছে যেতেই ওঁত পেতে থাকা ব্যাঘ্রীর মতো গর্জে উঠল সুরবালা । বিশ্রীভাষায় গালাগাল করে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল নিশানকে । অপমানিত নিশান ছোট্ট ঘরে পানীয়ের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিল একা একা । টলতে টলতে দোতলার ঘরের চাবি নিয়ে উপরে এল । ছাদের এককোণের এই ঘরটি বিপুলার মৃত্যুর পর কেউ খোলে না । ছাদের উপর চাঁদ তখন ডুবু ডুবু । আলোছায়ার খেলা চলছে মেঘের আগমনে । নিশাচর পাখি নিশানের যেন ঠিক মাথা ছুঁয়ে চলে গেল । সেনভিলার পাঁচিল ঘেঁষে উঠা বিশাল তেঁতুল গাছে কী একটা ডেকে উঠল ‘নিম নিম’ বলে । হঠাৎ শন শন করে একস্রোত শীতল বাতাস ধেয়ে এল । মদমত্ত নিশানের গায়ের লোমও খাড়া হয়ে গেল । একটা কুকুর কেঁদে উঠল । নিশান চাবি লাগালো তালায় । হাতে যেন বিদ্যুতের ছেঁকা লাগল । ছিটকে গেল হাত । চারিদিকে তাকিয়ে আবার চেষ্টা করে চাবি ঢুকিয়েছে নিশান । পলকের মধ্যে দুটো কঠিন হাত সাঁড়াশীর মত তার গলায় চেপে বসল । আর ঘরের ভিতর দাপাদাপির শব্দ শোনা যেতে লাগল । এক মহিলার কান্না শোনা গেল । হাড়সম্বল হাত দুটোকে গায়ের সব জোর দিয়ে সরিয়ে নিশান কোনমতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল নীচে । পরদিন থেকে নিশানের আর কোন খোঁজ সেনভিলার কেউ পায় নি । শুধু দ্বারোয়ান উধম সিং উপরের ঘরের তালায় আটকানো চাবিটা খুলে এনে রেখেছিল । আমার মায়ের মামা মাসীরা বহাল তবিয়তে সেনভিলায় আশ্রয় নিল । সুরবালা দিন দিন মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হল । এক প্রত্যুষে সেনভিলার পাঁচিল ঘেঁষে সুরবালার নিথর দেহ আবিষ্কার করে সেনভিলার আশ্রিতরা লোকজানাজানির সুযোগ না দিয়েই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দিতে সক্ষম হল । উধম সিং শুধু সুরবালার বোনকে বলেছিল যে তার অনুমান , কেউ সুরবালাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে । দ্বারোয়ানের মুখের কথা তাকেই গিলতে হয়েছিল ।


কমলাবতী অপরূপা । সেনভিলার মহিলা সিরিজের মধ্যে উগ্র সুন্দরী এবং চতুরতম হল কমলাবতী,আমার গর্ভধারিনী । কমলাবতী ‘সেনভিলা’ হোর্ডিং লাগানো গাড়ি থেকে যখন নামতো অজস্র চোখ তখন তাকে গিলে খেত । সেনভিলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রন কব্জা করেছিল কলেজ-না-পাশ করা কমলাবতী । সেনভিলার ইতিহাসে এক অঘটন ঘটিয়ে দিয়েছিল কমলাবতী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে । ঘরজামাই বর সোজা সরল উপেন্দ্রনাথ মানে আমার বাপ পুত্রের জন্ম হয়েছে বলে সেনভিলা সারারাত আলোর মালায় ভরিয়ে দিয়েছিল । ছেলের নাম রাখা হল কিশোরনাথ । সবাই আদর করে ডাকে কিশু । ছেলের জন্মের বছর ঘুরে যেতেই কমলাবতী সেনভিলার রেকর্ড ভেঙ্গে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিল । এবার মেয়ে । আগুন সুন্দরী এক ফুলপরী এল সেন ভিলায় । নাম রূপবতী । সেনভিলার ঘরজামাই প্রথা রক্ষা করার লক্ষ্যে কমলাবতী নিজের দাম আরো বাড়াতে পারল । আমার রূপের কথা ছড়িয়ে যেতে বিলম্ব হল না । কমলাবতী প্রথম মহিলা যে সেনভিলায় পুরুষের সঙ্গে গালগল্প করত । আমার বাবার বন্ধু শোভনের সঙ্গে কমলাবতীর ছিল অবাধ মেলামেশা । বাবার অনুপস্থিতিতেও শোভনের আগমন ছিল অবাধ । উধম সিং এর ভাইয়ের ছেলে সুবল সিং তখন সেনভিলার দ্বারোয়ান । কালো রঙের সুঠাম সুবলের আকর্ষনীয় চেহারা । তার অনুমতি ব্যতিরেকে মাছিও গলতে পারে না সেনভিলায় ,এক শোভন ছাড়া ।

বাবার সহজ সরল গুণ অর্জন করেছিল আমার কিশুদাদা । সে ছিল ভিতুর ডিম । কারো সাতে পাঁচে সে নাই । যে যা বলত তাই করত বিবেচনা না করে । আমি ছিলাম ঠিক বিপরীত । এভন সাইকেলে চড়ে টো টো করে বেড়িয়ে বেড়াতাম । আমার এক জন্মদিনে সেনভিলাকে বাবা আলোর মালার ভরিয়ে দিয়েছিল । আমার ফুলপরী রূপ দেখে অনেকে সেদিন ভিরমি খেয়ে পড়েছিল । আমার রূপের আগুনে পুড়বে বলে যখন পতঙ্গরূপী যুবকের দল পিছু নেওয়া শুরু করল ,আমার মা কমলাবতী তখন রাশ টানতে থাকল । আমাকে একা স্কুলে পাঠায় না । দ্বারোয়ান সুবল সিং আমাকে পৌঁছে দেয় ,নিয়েও আসে । ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দেয় না । ডানপিটে আমিও মাকে পাত্তা না দিতে শুরু করলাম । সেনভিলায় আমিই প্রথম কলেজে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করলাম । কমলাবতী আমাকে কিছুতেই কলেজে পড়তে দেবে না । আমিও জেদ ধরলাম । শেষ অবধি কলেজে গেলাম । এক সরল সুবোধ ছেলের প্রেমে পড়ে গেলাম । ভিতু ছেলেটিকে চালাক করে তুললাম । এখবর কমলাবতীর কানে যেতেই অগ্নিমূর্তি ধরে আমাকে সাবধান করে দিল । আমিও মুখের উপর বলে দিলাম ঐ ছেলেকেই আমি বিয়ে করব । কমলাবতী ক্ষেপে গেল । যা তা বলল । আমিও রুখে গিয়ে বললাম , তুমি মনে করো সেনভিলায় তুমিই শুধু চালাক । আমি জানি শোভন অধিকারী কেন আসে ,কী করে । এই কথা কমলাবতীর পক্ষে হজম করা মুসকিল হল । মুহুর্তে চুপ হয়ে পৃষ্ঠটান দিল । জেদী কমলাবতী তার সব ক্ষমতা প্রয়োগ করল । আমার পড়া বন্ধ হল । গৃহবন্ধী হয়ে রইলাম । সেনভিলার রক্ত আমার শিরায় শিরায় । কিছুতেই ঐ স্ট্যাটাসহীন গেঁয়োর সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেনে নেবে না সেনভিলার সর্বময় কর্ত্তী । এক ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে সুবলের ঘরে ঢুকেই তাকে জড়িয়ে ধরলাম । আচমকা এমন আচরণে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল সে । বললাম আমাকে বিয়ে করবি । সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল । বললাম এটাই শেষ কথা ,মনে রাখিস । সেইরাতে আবার সুবলের ঘরে গেলাম । এরপর থেকে প্রতি রাতে সুবলের ঘরে কাটাতাম । ফল যা হবার তাই হল । পেটে বাচ্চা এল । বুদ্ধিমতি কমলাবতীর বুঝতে দেরী হল না । হুকুম জারী করল ,খালাস করতে হবে , না হয় কেটে নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে । বলা বাহুল্য ,সুবল আমার দাসানুদাস বনে গেল । পরিকল্পনামত এগোলাম । সে ছিল ঝড়জলের রাত । সুবলকে বললাম উপরের ঘরের চাবি নিতে । দুজনে উপরে উঠলাম । সুবল চাবি লাগাতেই ভিতরে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম । কবাট খুলতেই চামচিকের বোটকা গন্ধ । উথাল পাথাল হাওয়া ঘরের ভিতর কোথা থেকে এল কে জানে । দুজনে জড়াজড়ি করে কিছুক্ষন রইলাম । তারপর সুবলের হাতের বোতল থেকে ঝাঁজালো তরল দুজনে একসঙ্গে পান করে কমলাবতীকে শিক্ষা দিতে শুয়ে গেলাম মেঝেতে ।

কমলাবতী এরপর বেশীদিন বাঁচে নি । তার ঘরেই এক ভোররাতে বিচিত্র শব্দ শুনে সবাই হাজির । ততক্ষণে কমলাবতীর শরীর নিথর হয়ে গেছে । তার গালে আর গলায় কালসিটের মতো অনেক ছাপ দেখা গেছে ।

আমার বাপও বেশিদিন টিকে নি । সোজা সরল কিশুদাকে কমলাবতীর মামারা ভয় দেখিয়ে সেন ভিলা বিক্রী করে দিল । এক ব্যবসায়ী কিনল । থাকতে এল সপরিবারে । জোয়ান এক দ্বারোয়ান ছিল । প্রথম রাতে সে ছাদে উঠে শুকনো নেশা চড়িয়েছে । নেশার ঘোরে ছোট্ট ঘরের তালা ধরে টান দিয়ে বলল, এই কে আছো , খোলো । একবার ,দুবার । তিনবারের সময় ভিতরে কান্নার শব্দ পেল এবং চামচিকের ঝাঁকের উপস্থিতি টের পেল । একটা চামচিকে এমন জোরে তার গালে থাপ্পড় মারল যে তার নেশা ছুটে গেল । সে ভয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে গেল । পরদিন সব খুলে বললে মালিকও ভয়ে বাড়িটি ছেড়ে দিল ।

তারপর থেকে বিক্রীর চেষ্টা করলেও কেউ এবাড়ি কিনতে চায় না ভয়ে । ইদানিং কোন এক নিমাই প্রমোটর নাকি কিনেছে বাড়িটা । সে বেশ সাহসী বলে পরিচিত । বলে ,অপদেবতা টেবতা সব ফালতু । শুনছি আজ রাতে দলবল নিয়ে এসে এখানে ফুর্তি করে প্রমাণ করবে যে এবাড়িতে খারাপ কিছু নেই । শুনেই সেনবংশীয় জেদ চাগাড় দিয়ে উঠল । আমাদের এতদিনের মৌরসীপাট্টা এত সহজে হাতছাড়া করব ! তাছাড়া সুবল বলেছে আজ নাকি আমার একশো দশতম জন্মদিন । ঘটা করে পালন করতে হবে না ? নিচের তলায় সুরবালা ও কমলাবতী এবং উপরের ঘরটিতে বিপুলাসুন্দরী ও রূপবতী -বেশ দাপিয়েই আছি আমরা । আর সুবল তো আছেই আমার আর সেনভিলার দ্বারোয়ান হয়ে । না , যাই পাঁচজনে মিলে শলা করি । ঐ প্রমোটর ব্যাটাকে এমন এক ঝাড় দেব যে বাপের নাম ভুলে যাবে । ভুতের নামও ভুলে যাবে । শেষে পঞ্চস্বরে গান ধরব । একশো দশতম জন্মদিন বলে কথা ! হিঁ হিঁ হিঁ ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement