মাঝরাতে অনেক কিছু ঘটে, অনেক কিছু লোকে দ্যাখে। মাঝরাতে অপকর্ম হয় বলেই ধারণা। চুরি ডাকাতি ষড়যন্ত্র খুন যখম ইত্যাদি রাতের অন্ধকারে হয়। আবার রাতের অন্ধকারে প্রেম, প্রেমের অভিসার, জ্যোৎস্নার মায়াভরা আবেগ, কবিতা গ্রন্থনা, সৃষ্টির আনন্দ এসবও মাঝরাতে হয়। আমার গল্পে এই রকম এক মাঝরাতের ঘটনা একটা অধঃপতনে যাওয়া তরুণের জীবনের গতি কীভাবে পরিবর্তিত করল সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সুতরাং বিষয়ের সাথে গল্পের সামঞ্জস্য আছে বলে আমার মনে হয়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৮৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

মাঝরাতে সংশোধন
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮

মোহন মিত্র

comment ৭  favorite ০  import_contacts ১৩৫
ভয়ানক দুর্যোগের রাত ছিল। দুদিন ধরে প্রবল ঝড় ও বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি চলছিল। সেদিন বিকেল থেকে ঝড়টা থেমেছে। বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও, আকাশে কালো মেঘ। মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের ঝলকানি সাথে তীব্র আওয়াজের সাথে বজ্রপাত। জানালা দরজা কাঠ কাঠ করে বন্ধ। কাঁচের জানালা দিয়ে বিদ্যুতের ঝলকানিতে বাইরের অনেকটা ভেসে উঠছে। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব ভীতু। এখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে সাহস যোগানোর জন্য বাইরে সাহস দেখালেও ভেতরে ভেতরে আমি দুদিন ধরে খুব ভয় নিয়েই কাটাচ্ছি।

রুদ্র অফিসের কাজে চার দিনের জন্য দিল্লী গেছে। আগামী কাল ফেরার কথা। বাবু আর বানু ঘুমিয়েছে। আমিও ট্রাঞ্জিস্টর চালিয়ে গান শোনার চেষ্টা করছিলাম শুয়ে শুয়ে। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় গানের চেয়ে কড়কড় শব্দ বেশী হচ্ছিল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। রেডিও ষ্টেশন বন্ধ হয়ে গেছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকে। অনেক গুলো কুকুর একসাথে তীব্র চিৎকার করতে করতে আমাদের বাড়ির দিকেই এসেছে মনে হচ্ছিল এবং সমানে ঘেউ ঘেউ করে বাইরে লনে দাপাদাপি করছে। মনে হচ্ছিল কোন কিছু দেখেছে সেই রাতে, তাই এমন চিৎকার করছে। এ পাড়ায় অনেক কুকুর আছে বটে কিন্তু এমন তো কখনও করে না। রেডিয়াম লাগানো ঘড়ির কাঁটা দুটো দেখা যাচ্ছিল। তখন রাত একটা বাজে। কুকুরের চিৎকারে মেয়ে বানু জেগে আমাকে জাপটে ধরেছে ভয়ে। ছেলে ঘুমোচ্ছে পাশে। সেও একবার চোখ খুলল। আমি ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আবার ঘুমিয়ে পড়ল। বন্ধ ট্রাঞ্জিষ্টরের হালকা কড়কড় আওয়াজ আসছিল। হাত বাড়িয়ে ওটার সুইচ অফ করে দিলাম। শুয়ে শুয়ে কান খাড়া করে বোঝবারচেষ্টা করলাম কুকুরগুলো ভুকছে কেন।

বাইরে কারও হেঁটে চলার একটা খস খস আওয়াজ পেলাম। দেওয়ালের ধার ঘেঁষে। কেউ যেন ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে হাঁটছে। একবার থামছে, আবার হাঁটছে। আমার বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করছিল। ভয়ে সারা গা ছম ছম করছে। ঝড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে দুদিন ধরে। কখনও লাইট থাকে কখনও থাকে না। তখন লাইট ছিলনা। ঘরে একটা কেরোসিন ল্যাম্প ডিম করে জ্বালান ছিল। আমি বানুকে কোলে নিয়ে খুব সন্তর্পণে চৌকি থেকে নামলাম। বানুর মুখে হাত দিয়ে বোঝালাম যেন ও শব্দ না করে। এত রাতে কে এসেছে? কুকুর গুলোই বা এত ভুকছে কেন? আমি জানালার ধারে নিজেকে আড়াল করে পর্দা ফাঁক করে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, রাস্তার আলোও জ্বলছে না। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু কুকুরগুলো একবার রাস্তায় আর একবার আমাদের বাড়ির গেটের দিকে দৌড়াদৌড়ি করছে। আমাদের বাড়ির দিকেই মুখ করে ঘেউ ঘেউ করছে দেখলাম বিদ্যুতের আলোয়। হঠাৎ দেখলাম একটা ছায়া জানালার ধারে এসে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে। এই বুঝি আমাকে দেখে ফেলেছে। আমি পর্দা ছেড়ে সরে দাঁড়ালাম। ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। জোরে চিৎকার করে বলতে গেলাম “কে ওখানে? চোর, চোর”। কিন্তু আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না। কিংবা হয়তো কুকুরের চিৎকারে ঐ সামান্য আওয়াজ ও শুনতে পায়নি। এবারে দেখলাম একেবারে জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার হাত-পা তখন ঠক ঠক করে কাঁপছিল। এবারে বাইরে বেরিয়ে যাবার জন্য পেছন ফিরতেই অন্ধকারে আমার চোখে পড়ল লোকটার কোমরে গোঁজা অস্ত্রজাতীয় কিছু আর হাতে একটা আঁকশি লাগানো লাঠি। সাহস সঞ্চয় করে আমি প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে উঠলাম, “চোর চোর”। তাই শুনে মেয়ে বানু কেঁদে উঠল। ছেলে বাবুও উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু, দুর্যোগপূর্ণ অত রাতে আমার আওয়াজ শোনবার মত কেউ ছিল না। উল্টে ঐ লোকটি শুনতে পেয়ে গেট থেকে ফিরে এসে জানালার বাইরে দাঁড়ালো, “দিদি, ভয় পাবেন না। আমি চোর নই”।
-“তাহলে কে তুমি? এত রাতে তুমি এখানে কী করছো”? ছেলে মেয়েকে রক্ষার দায়ীত্বে মায়ের ভূমিকা নিতে যত সাহসের প্রয়োজন, তা যেন আমার নধ্যে এসে গেছে।
-“আমি গোবিন্দ সিং। দাদা আমাকে চেনে। তাঁর কাছে এসেছিলাম। একটু কাজ ছিল”।
-“কি কাজ? এত রাতেই বা কেন”? আমার ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর শুনে সেও একটু থতমত খেয়ে যাবার মত হয়েছিল। একটু চুপ করে থেকে বলল,
“ না, মানে...একটা দরকারি কাগজ নেবার ছিল। দাদা কি আছেন বাড়িতে”?

আমি জানতাম না, লোকটা জানত কি না রুদ্রর বাইরে যাবার কথা। তবু বলে ফেললাম, “আছেন, কিন্তু উনি ইভিনিং শিফট ডিউটি করে এসে শুয়েছেন। এখন ঘুমিয়ে গেছেন”।
-“একটু ডেকে দেবেন”?
-“না, এখন ডাকতে পারব না। খুব দরকার থাকলে কাল সকালে এস”।
-“ঠিক আছে, দিদি। কাল সকালে আসব”।

সেই মাঝরাতের অতিথি চলে গেল। মনে হল ওর পা টলছিল। নেশা ভাঙ করে সব ছেলেরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। সে যাচ্ছে যাক। আমার এখানে কেন? সে রাতের মত ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মত স্বস্তি পেলেও কাল সকালের চিন্তায় আবার ভয় হতে লাগল। যদি রুদ্র সকালে এসে না পৌঁছায়......।

সত্যি আমি ছোটবেলা থেকে খুব ভীতু। শিং ওয়ালা গরু মোষ দেখলেও ভয়ে মরতাম। রাত্রিবেলায় নিজের ছায়া দেখলেও আমার ভয় লাগতো। বিয়ের পর আমাকে যখন রুদ্র পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ছোট্ট এই টাউনশিপে নিয়ে এলো আমার খুব ভালো লেগেছিল। বাড়ির ছাদ থেকে দূরে পাহাড় দেখা যেত। সূর্যের আলোয় দিনের বিভিন্ন সময়ে পাড়ের রঙ বদলে যায়। দেখতাম আর অবাক হোতাম। সেগুলো তো পরের কথা। আগে ভয়ের কথাটা বলি। বিয়ের পর যেদিন আমকে নিয়ে প্রথম রুদ্র এলো। সকালে পৌঁছেছিলাম পাহাড়ের কোলে ছোট্ট রেল স্টেশনে। জানতাম না সেদিনই রুদ্রের নাইট শিফট ডিউটি ছিল। তা শুনে আমি বলেছিলাম, “আমি একা এই বাড়ীতে থাকতে পারবো না। একা আমার ভয় করে”।
হাসতে হাসতে রুদ্র বলেছিল, “রাতে শোবার জন্য লোক কোথায় পাব”?
আমি রাগতঃ স্বরে বলেছিলাম, “সব কিছুতে ঠাট্টা কোর না। আমি একা থাকলে সকালে এসে দেখবে আমি মরে পরে আছি। সত্যি আমার খুব ভয় করে”।
-আচ্ছা ঠিক আছে। দেখছি কি করা যায়।

আমাদের পৌছনর পর অনেকেই এসেছিল আমাকে মানে নতুন বৌ দেখতে। পাশের দত্তদার বাড়িতে দুপুরে খাবার নিমন্ত্রণ ছিল। আমরা কোলকাতা থেকে অনেক মিষ্টি নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো দিয়ে সবার মিষ্টিমুখ করানো হয়েছিল। আমার বেশ মনে আছে সাত আট দিন আমাদের রান্না করতে হয়নি। এর বাড়ি তাঁর বাড়ি নিমন্ত্রণ খেয়েই কেটে গেছিল। দত্তদার মেয়ে ঝুমুর বারো তের বছর বয়স, এসেছিল আমাকে দেখতে। কাকীমা কাকীমা করে খুব আপন হয়ে গেল প্রথম দিনই। ঠিক হল রাতে আমার কাছে ঝুমুর থাকবে। বেশ কিছুদিন ঐ থাকত আমার কাছে রুদ্রর নাইট শিফট পড়লে বা বাইরে কোথাও গেলে। অবশ্য রুদ্র বার বার বলে সাহস জুগিয়েছিল “একা থাকতে শেখ। জীবন অনেক বড়। ঝুমুর আর কতদিন এসে শোবে তোমার কাছে”?

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। এখন আমার তো ছেলে বাবু - পাঁচ বছরের এবং মেয়ে বানু তিন বছরের। ওদের নিয়ে আমার ছোট্ট সংসার। রুদ্র প্রায়ই বাইরে যায় অফিসের কাজে। অফিসে কন্ট্রাক্টরদের নিয়ে প্রায় ঝামেলা লেগে থাকে। সৎ লোকেদের উপর ওদের আবার অনেক রাগ থাকে। মাঝে মাঝে শুনি, একে মারছে, ওকে ধরছে। রুদ্র আবার একগুঁয়ে লোক। বাড়ির সামনে দিয়ে নানা রকম মিছিল যায়। বাড়ির দিকে তাকিয়ে হুঁশিয়ারি স্লোগান দেয়। আমার খুব ভয় করে। রুদ্রকে বললে সে হাসে। বলে, “ওসব চলতে থাকে। ভয়ের কিছু নেই”। যদিও আমার ভয় অনেকটা কমেছে। আর কাউকে শুতে হয় না আমার সাথে। রুদ্রর নাইট শিফট হোক বা বাইরে কাজে যাক, আমি একাই থাকি ছেলে মেয়ে নিয়ে। প্রতিবেশীদের সাহায্য পাই প্রয়োজনে। সবাই ভালোবাসে আমাদের।

সব ঠিক চলছিল। সেদিন মঝরাতে ঐ ঘটনা আমার ভয় আবার বাড়িয়ে দিল। সে চলে গেল বটে, কিন্তু আমার মনের মধ্যে এক ভয় ঢুকিয়ে গেল। গোবিন্দ সিং নাম শুনে আমার রক্ত জমে যাওয়ার মত অবস্থা। শুনেছি ও এখানকার নামকরা মস্তান। মস্তানি করে বেড়ায়, দল আছে সব আওয়াড়া ছেলে নিয়ে। মাঝে মাঝে ওয়াগন ব্রেকিং এর খবর বের হয় তাতেও নাকি সে জড়িত। অন্ধকার হলেও বিদ্যুতের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, তাঁর কোমরে ঝুলছিল একদিকে রিভলবার, অন্যদিকে ভোজালি। আর হাতে ছিল লম্বা একটা লাঠি যার আগাটা বাঁকানো আঁকশির মত। কারখানার ফোরম্যান হরবিন্দর সিং এর একমাত্র ছেলে। স্কুল ড্রপ-আউট নাকি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ জানি না। বাবার টাকা ওড়ায়। হরবিন্দর সন্ধ্যা হলেই গাঁজা খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে। ছেলেও তেমনি মদ, গাঁজা খেয়ে ঘোরে। সে রাতে আর আমার ঘুম এলো না। শুধু মনে হতে লাগল যদি ও আবার আসে কাল সকালে। আর তার মধ্যে যদি রুদ্র এসে না পৌঁছায়...।

আমাদের কোম্পানীর দেয়া কোয়ার্টার। দুটো বেড রুম। একটা ড্রয়িং রুম, কিচেন টয়লেট বাথরুম। কিচেনের সামনে একফালি বারান্দা। বারান্দার পর উঠোন। উঠোন প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। উঠোন দিয়ে একটা বাইরে যাবার দরজা আছে। সেখান দিয়ে বের হলে পাশে অনেকটা জায়গা। শাক সব্জি লাগাতাম। বাড়ির সামনে ফুল বাগান করার মত জায়গা। পাহাড় কেটে বাড়ি বানানো তাই সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন। বাড়ির এন্ট্রান্স ড্রয়িং রুমের মধ্যে দিয়ে। ড্রয়িং রুম আর বেড রুমের মাঝে একটা দরজা। যখন আমি একা থাকি সেই দরজাটা আমি বন্ধ করে দিই। জানালায় গ্রিল ছাড়াও তারের জাল দিয়ে কভার করা। তাই নিশ্চিন্ত থাকতাম। সেখান দিয়ে হাত ঢোকান যায়না, সুতরাং চুরি হওয়ার তেমন সম্ভাবনা ছিল না। ড্রয়িং রুমে দুটো জানালার ধার দিয়ে একটা চৌকি পাতা। সেখানে একটা বিছানা পাতা থাকে। রুদ্র মাঝে মাঝে রাতে শোয় ওখানে। গেস্ট এলে সেখানে থাকে।


সাত সকালে ঘুম ভেঙে গেল। উঠেই বেডরুমের দরজা খুলেছি। যা দেখলাম তাতে রাতের চেয়ে বেশী আঁতকে উঠলাম। ড্রয়িং রুমের বিছানাটা গদি সমেত পুরো গোটানো জানালার দিকে। আমি ভেবে উঠতে পারলাম না, বাইরে থেকে বিছানাটা ঐ ভাবে গোটালো কি করে? সে রাতে ড্রয়িং রুমের দুটো জানালাই বন্ধ ছিল বটে, কিন্তু বর্ষাকালে কাঠের ফ্রেম এক্সপান্ড করে বলে ছিটকিনি লাগেনা। সকালে দেখলাম সে দুটো হাট করে খোলা। তার মানে সেই লোকটি খুলেছে। কিন্তু কেন? কী উদ্দেশ্য ছিল গোবিন্দ সিং এর। যদি কাল রুদ্র থাকত ওখানে শুয়ে তাহলে কি হত? ভাবতেই আমার রক্ত হিম হওয়ার মত অবস্থা। আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না। আমি বিছানায় হাত দিলাম না। রুদ্র এলে ওকে দেখাব। আর ও যদি না এসে পৌছায়, তাহলে কাউকে তো বলতেই হবে। এই লোক যদি বার বার আসে?

সকালে রুদ্র এসে গেছিল। বিছানা গোটানো দেখে রুদ্রই জিজ্ঞেস করলো, “বিছানা গুটিয়ে রেখেছ কেন”?
আসতে না আসতে ওকে চাপে রাখাটা ঠিক হবেনা। আমি চা বানিয়ে রেখছিলাম। বললাম, “হাত মুখটা ধুয়ে নাও। আমি চা নিয়ে আসছি”।

বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে বাবু আর বানুও উঠে এসেছে। বাবার কাছে আদর না খেলে ওদের যে কত কষ্ট! বাবা বাইরে গেলে কত জিনিষ নিয়ে আসে। চকলেট, মিষ্টি, জামা-প্যান্ট, খেলনা ইত্যাদি। রুদ্র ওদের কাছে টেনে নিল। আদর করল। তারপরে ব্যাগ খুলে দুজনের হাতে দুটো ক্যডবেরি চকলেট দিয়ে বলল, “এখন এগুলো নাও। পরে দেখছি আর কিছু আছে কিনা”?
ওরা চকলেট নিয়ে মনের আনন্দে বেডরুমে চলে গেল।
-“আগে ব্রাশ কর। পরে চকলেট খুলবে কিন্তু”। আমি ওদের বললাম রান্না ঘর থেকে।

চা বিস্কুট নিয়ে আমরা বসেছি। আমি আদ্যপ্রান্ত ঘটনা বললাম আর দেখালাম গোটানো বিছানা। রুদ্র অবাক হয়ে ভাবছে কী উদ্দেশ্য ছিল। রুদ্রর সাথে ঐ ছেলেটার কোন ভাবে কোন সংযোগ নেই। কোনদিন কথাবার্তাও হয়নি। বয়সের তারতম্য তো আছেই। রুদ্র চা শেষ করে বলল, “ওসব নিয়ে তুমি কোন চিন্তা করবে না। আমি যা বলছি শুধু সেটা মনে রেখ। আমাকে যা বললে সেটাই তোমার শেষ বলা। ঘুনাক্ষরেও কাউকে বলবে না গতকাল মাঝরাতে কী ঘটেছিল”।
আমি অবাক হোলাম, “কী বলছ, তুমি? এতবড় একটা সাংঘাতিক ঘটনা তুমি কাউকে বলবে না”?
-“না, বলব না। হয়তো ভূল করে ঢুকেছিল। ওরা নেশা করে। নেশার ঘোরে কোথায় যেতে কোথায় গেছে, ও নিজেই জানে না। একটা চান্স নেয়া উচিৎ। তাছাড়া আমি তো আছি”।
-“আমার বাপু ভীষণ ভয় করছে। তুমি প্রায়ই এখানে সেখানে চলে যাও। আমি দুটো ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে একলা থাকি। আবার কবে এসে যাবে, কী করবে...না,না, তুমি এটা নিয়ে কারো সাথে আলোচনা কর”।
রুদ্র আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “রানী, আমি কি তোমাকে বিপদে ফেলে কোথাও যেতে পারি? তুমি ভয় পেয়ো না। দেখ, সব ঠিল হয়ে যাবে। শুধু যা বললাম সেটা মনে রেখ”।

আমি জানি রুদ্র খুব সংযত স্বভাবের। যা কিছু করে অনেক ভাবনা চিন্তা করে করে। তাই ওর কথামত সে রাতের কথা আমি কাউকে বলিনি। যদিও ভয় মনের মধ্যে ছিলই। তাই বার বার জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে সারাদিন নজর রাখতাম। সন্ধ্যার পর আরও বেশী। বাইরের আলোটা জ্বালিয়ে রাখতাম। ঘর অন্ধকার করেও লক্ষ্য করেছি। হ্যাঁ, দেখেছি ঐ ছেলেটাকে ঐ রাস্তা দিয়ে যেতে আসতে। প্রায় প্রতিদিন। যেতে আসতে ও তাকাত আমাদের বাড়িটার দিকে। ছেলে মেয়ে দুটো সারাক্ষণ খেলত বাইরে বাগানে। আমার বুকটা ঢিপ ঢিপ করত ভয়ে। এই বুঝি কিছু অঘটন ঘটাবে।

এক মাস পেরিয়ে গেছে। আর সে রকম কোন ঘটনা ঘটে নি। রুদ্র বলছিল গোবিন্দ সিংএর সাথে মাঝে মাঝেই দেখা হয় বাজারে, রাস্তায়। ও রুদ্রকে লক্ষ্য করেছে কি না রুদ্র জানে না। রুদ্র যেমন আগে দেখত ওদের তেমনি দেখেছে। আগে যেমন কথা হত না, এখনও হয় না। সব নর্মাল হয়ে গেছে।

রুদ্র ইভিনিং শিফট ডিউটি গেছে। আমি বিকেল পাঁচটা নাগাদ ছেলে মেয়ে নিয়ে পার্কে যাচ্ছিলাম। সারাদিন ঘরে বন্ধ থেকে ওরা হাঁপিয়ে ওঠে। হঠাৎ একটা বাইক পেছন থেকে এসে এক্কেবারে আমাদের কাছে দাঁড়ালো। মুখ ফিরিয়ে দেখি গোবিন্দ সিং। ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেছে। কি বলব বুঝে উঠতে পারছিনা। বানুতো এমনিতেই আমার গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সে এবারে আরও জোরে চেপে ধরল।

বাইক আরোহী বলে উঠলো, “সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলেন, তাই না দিদি”?
আমি কী উত্তর দেব ভাবছি। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, “স্যরি, দিদি, সেদিন আমার মাথার ঠিক ছিল না। ভূল করে ওখানে ঢুকে পড়েছিলাম”।
-“আবার ভূল হবে না, তাঁর কী নিশ্চয়তা”? আমি জানতে চেয়েছিলাম।
দু হাত কানে লাগিয়ে, দাঁতে জিব কেটে সে বলল, “এই কান ধরছি। বিশ্বাস করুন”। আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “বেশ, দিদি বলেছ। ভাইএর মর্যাদা রেখে চলবে”।
-“আলবৎ দিদি। দাদা কখন বাড়িতে থাকবে, আমি আসব একদিন”।

আমি ভাবলাম এ আর এক নতুন ফ্যাসাদ দেখছি। এবার বাড়ী আসার পথ খুঁজছে। কিন্তু, না বলি কি ভাবে। বললাম, “দাদার অফ ডে আগামী রোববার”
-“ঠিক আছে আমি রোববার বিকালে আসব। আমার কিছু কথা আছে”।

ও বাইক নিয়ে চলে গেল। আমরা পার্কে গেলাম। বেশীক্ষণ বসতে পারিনি। মাথার মধ্যে শুধু ঐ ছেলেটার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।

রাতে রুদ্র এলে সব কথা খুলে বললাম। রুদ্র বলল, “এ তো ভালো কথা। ঐ গুন্ডা যদি তোমার ভাই হয়ে যায়, তোমাকে আর কিছু ভাবতে হবে না। কেউ আসবে না ধারে কাছে”।
-“যাঃ তোমার সবেতেই ঠাট্টা। আমার এসব ঝামেলা একদম পছন্দ হয়না। একে সারাদিন দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি, তাঁর উপর এসব উটকো ঝামেলা”।

রবিবার এসে গেল। রুদ্র বাজার থেকে মাংস নিয়ে এল। দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে ঘুমোলাম সবাই। বিকাল হয়ে গেল তখনও তাঁর পাত্তা নেই। আমার মনে কিন্তু শান্তি নেই। কী করবে ও এসে। কী কথা আছে ওর রুদ্রর সাথে। আমরা চা নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসেছি। বাবু আর বানু খেলছে সামনের বাগানে। একটা বাইক এসে দাঁড়ালো বাইরে গেটের সামনে। গোবিন্দ সিং।

দু হাত জোর করে বলল, “প্রণাম দাদা, প্রণাম দিদি”।
রুদ্র এমন ভাব করলো যেন ও কিছু জানেই না। অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে, তুমি? কী মনে করে? ভেতরে এস, বস”।

গোবিন্দ সিং আমার দিকে একবার তাকাল। হয়তো বোঝবার চেষ্টা করছিল আমি রুদ্রকে কতটা বলেছি। আমি কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে ওর জন্য চা বিস্কুট আনতে ভেতরে গেলাম। রুদ্রর সাথে ও কথা শুরু করেছে।
-“আমি তো অনেক দিন থেকে আপনাকে চিনি, দাদা। আমাদের আলাপ হয়নি”।
-“হ্যাঁ, আমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তাছাড়া কোন সংযোগ হয়নি তোমার সাথে আলাপ হওয়ার। তোমার বাবাকে আমি চিনি। আমার সাথে অফিসের কাজে কথা হয়। উনার ডিপারটমেন্ট আলাদা, কিন্তু আমাদের মধ্যে কথা হয়। তা, তুমি কী কর”?
-“কিছু না। একটা কাজ খুঁজছি। পেলে ভালো হয়”।
-“কী ধরণের কাজ করতে পারবে”?
-“আমি একটা গ্যারেজে কিছুদিন কাজ করেছি। যে কোন কাজ করতে পারি”।

আমি চা নিয়ে এলাম। ট্রে থেকে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে বলল, “দিদি খুব ভালো”
-“কেন? কী হিসাবে? তুমি দিদিকে চেনো”? রুদ্র জানতে চাইল।
-“না, আমার মনে হল। দিদি, অনেকের থেকে আলাদা। দাদা, আপনি শুনেছি অনেককে কাজ দিয়েছেন। আমার জন্য একটা দেখবেন?...তাহলে খুব উপকার হবে”।
রুদ্র বলল, “চেষ্টা করব। ধৈর্য ধরতে হবে”
-“সে আমি ধৈর্য ধরব। আমার খুব উপকার হয়”।

সে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদি, আজ উঠছি। যে কোন দরকারে আমাকে ডাকবেন। আমি হাজির হব। আপনাদের কোন ভয় নেই আমি থাকতে। এক ডাকে সবাই চেনে গোবিন্দ সিং”।

সন্ধ্যা হয় হয়। ও বাইক নিয়ে চলে গেল। আমার মন থেকে ভয়ের পাহাড় নেমে গেল অদ্ভুত বিশ্বাসে। রুদ্র বলেছিল, “দেখলে? তুমি যদি সেই মাঝরাতের ঘটনা কাউকে বলতে, সেটা পাঁচ কান হতে সময় লাগত না। তাতে সেও জানতে পারত যে সবাই জেনে গেছে। তাঁর সম্মানে আঘাত লাগত। সে আরও রেগে যেত। আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করত। এখন কী হল? ঠিক তাঁর উল্টো। সে তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়ে রইল”।
-“তুমি ঠিক বলেছ”।

কিছুদিন বাদে রুদ্র গোবিন্দকে এক কন্ট্রাক্টরের সাথে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। ও মাঝে মাঝে আসত আমাদের বাড়ী। বাবু ও বানুর জন্য লজেন্স, চকলেট নিয়ে আসত। ওরা ওকে মামা বলে ডাকত। গোবিন্দ সিং সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ এখন। লোক মুখে শোনা যায় ও নেশা ভাঙ সব ছেড়ে দিয়েছে। আমরা সেখানে আরও পাঁচ ছ বছর ছিলাম। তারপর রুদ্রর ট্রান্সফার হয়ে গেল। আমরা জিনিষ পত্র ট্রাকে তুলে দিয়েছি। আমাদের ট্রেন রাত্রে। গোবিন্দ আমাদের দুপুরে খাবার নিমন্ত্রণ করেছিল। সেদিন আমাকে ও বলেছিল, “দিদি, আপনি আমাকে মানুষ হবার পথ দেখিয়েছেন”।
-“কি করে”?
-“সেদিন মাঝরাতের ঘটনা যে ভাবে আপনি চেপে রেখেছিলেন, সেটাই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে। আপনি এই ঘটনার কথা গোপন না করলে আমাদের, বিশেষ করে আমার বাবার সম্মান ক্ষুন্ন হত। আমিও বাবার কাছে মুখ দেখাতে পারতাম না। আমার সব অপকর্ম তিনি সহ্য করেছেন কিন্তু এই ঘটনা তিনি সইতে পারতেন না। আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। আমি আজ ভিন্ন পথে চলতে শিখলাম। আমার আমূল সংশোধন হয়ে গেল, দিদি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ”।

আজ কত বছর পেরিয়ে গেছে। ভাবি মাঝরাতে কত কিছু ঘটে সৃষ্টি থেকে ধ্বংস। আমি একটা সংশোধনের সাক্ষ্মী হয়ে রইলাম।

সমাপ্ত

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement