লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ ডিসেম্বর ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কোমল (এপ্রিল ২০১৮)

দ্বৈতসত্ত্বা
কোমল

সংখ্যা

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৬

সালসাবিলা নকি

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৫২৯
দু’হাতে দুটো মুরগী নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চারপাশে তাকাচ্ছে রাজিব। কাকে দেয়া যায় মুরগী দুটো! মাথার ওপর দুপুরের কড়া রোদ। অধিক দুশ্চিন্তা নাকি তীব্র গরমে চোখে সব ঝাপসা দেখছে, সে ঠিক বুঝতে পারছে না।
.
হাসপাতালে সেই সকাল আটটা থেকে প্রসব বেদনা সহ্য করছে তার স্ত্রী সামিরা। ডাক্তার বলেছে বাচ্চাটা ভালো আছে। আসরের সময় পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবেন। এরমধ্যে নরমাল ডেলিভারি না হলে অপারেশনে যেতে হবে।
.
রাজিব আর সামিরা কেউই চাই না সিজারিয়ান বেবি হোক। একটু কষ্ট সহ্য করে নরমাল ডেলিভারি হলে বাচ্চা আর মা দুজনের জন্যই ভালো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটু কষ্ট না, সামিরার অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছে। মেঝভাবি ডেলিভারি রুমে গিয়ে দেখে এসেছেন। ব্যথায় সামিরার মুখ নীল হয়ে ছিল। শুনে আর সহ্য করতে পারেনি রাজিব। সাথে সাথে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দুটো মুরগী কিনে নেয়। কোন গরীব মানুষকে দান করলে সে আর তার পরিবার ভালো করে খেতে পারবে। তাদের খুশিতে আল্লাহ খুশি হয়ে যদি সামিরার কষ্টটা কমিয়ে দেন। এই আশায় বুক বেঁধে সে রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে চলেছে, একজন উপযুক্ত মানুষকে, যাকে মুরগী দুটো দেয়া যায়।
.
বাম কাত হয়ে শুয়ে আছে সামিরা। মুখে বিড়বিড় করে জিকির করছে। আর একটু পরপর বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে বের করে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটা নার্স সব রোগিনীকে শিখিয়ে দিয়েছে যাতে ব্যথাটা কম অনুভূত হয়। তারপরও সব মেয়েগুলো ‘ও আল্লারে, ও আম্মুরে’ বলে চেঁচাচ্ছে।
.
সামিরা জানে এভাবে চিৎকার করলেও ব্যথা কম লাগে। স্কুল লাইফে পিরিয়ডের ব্যথা সইতে না পেরে এভাবেই চিৎকার করতো সে। ব্যথাটা একটু কম মনে হতো। তবে হাসপাতালে এভাবে চিৎকার করার কোন যৌক্তিকতা সে খুঁজে পাচ্ছে না। সব অপরিচিত মুখ। এদের সামনে চেঁচানোর কোন মানে হয় না। এদিকে যারা চিৎকার করছে তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে যাচ্ছে কর্তব্যরত নার্সরা। সামিরা অবাক হয়। অন্যতম নামকরা ব্যয়বহুল প্রাইভেট হাসপাতাল এটা। এখানের নার্সগুলো এমন বাজে ব্যবহার কীভাবে করে!
.
ঐযে একটা পঙ্গু লোক দেখা যাচ্ছে। ফুটপাতে বসে আছে। রাজিব সরাসরি গিয়ে বলল, ‘এই মুরগী দুটো বাসায় নিয়ে যান। বউ বাচ্চা মিলে রান্না করে খাবেন।’ লোকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। রাজিব দ্রুত ফেরার পথ ধরে। লোকটার অভিব্যক্তি দেখার সময় নেই। সামিরার কী অবস্থা কে জানে!
.
প্রসব যন্ত্রণাটা প্রথমে কম থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ে। বাড়তে বাড়তে এক সময় সহ্যের বাইরে চলে যায়। তারপর আবার কমতে থাকে। এই ব্যথার সাথে আর কোন ব্যথারই তুলনা চলে না। সামিরার বেডের পাশেই একটা জানলা আছে। ওটা মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা। যখন ব্যথা সুতীব্র হয় সামিরা পর্দাটা খামচে ধরে। এত জোরে ধরে মনে হয় পর্দাটাই ছিড়ে খুলে আসবে। একসময় আবার মেঝভাবি আসলেন ওকে দেখতে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?’
‘হ্যা ভাবি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’
‘কিন্তু ওরা যে বলছে তোমার পেইন নেই।’
‘না ভাবি। অনেক পেইন হচ্ছে। আমি অন্যদের মতো চিৎকার করছি না বলে ওরা বুঝতে পারছে না। চিৎকার করলেও তো নার্সরা বাজে ব্যবহার করে।’
মেজভাবি চুপ করে রইলেন। সামিরা আবার জিজ্ঞেস করলো,
‘ভাবি ডাক্তার কী বলছে?’
ভাবি ছোট করে জবাব দিলেন, ‘সিজার করতে হবে মনে হয়।’
সামিরা ভয় পায়। এতো সময় ধরে নরমাল ডেলিভারির ব্যথা সহ্য করে আবার সিজার! উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে, ‘সিজারের কথা কেন আসছে? আমার তো সবই ঠিক ছিল।’
‘পানি কম এজন্য হয়তো। তুমি অত টেনশন করো না। সিজার আজকাল সবারই তো হচ্ছে।’
আরও কিছুক্ষণ স্বান্তনা দিয়ে ভাবি বেরিয়ে যান। সামিরা আবার একা হয়ে পড়ে। পানি কম ব্যাপারটা সে জানতো। পানি বলতে অ্যামনিউটিক ফ্লুইড। এতদিন পর্যাপ্ত পরিমাণেই ছিল। এক মাসের মধ্যেই হঠাৎ কমে গেছে। সামিরা বারবার আল্লাহকে বলে যাচ্ছে, ‘বাচ্চাটাকে সুস্থভাবে দুনিয়াতে পাঠাও আল্লাহ! আমাকে ধৈর্য্য দাও।’
.
রাজিব থমথমে মুখে ডেলিভারি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার, নার্স সবাই বলছে বাচ্চা ভালো আছে, সামিরা একটু দূর্বল হয়ে পড়েছে। রাজিবের খুব ইচ্ছে করছে ভেতরে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়াতে। ওদের সন্তান পৃথিবীতে আসছে। অথচ সব কষ্ট সামিরাকে একা সহ্য করতে হচ্ছে। রাজিব ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিল যেন ওকে ভেতরে ঢুকতে দেয়। এ সময় ওর সামিরার পাশে থাকা দরকার। মেয়েটা অনেক ভীতু, মনটাও নরম। ওকে সাহস দিয়ে যেতে হবে। অন্য কারও চেয়ে রাজিবই ভালো পারবে কাজটা। তাছাড়া ও সামিরার স্বামী। সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু নার্স ‘ভেতরে ঢোকার নিয়ম নেই’ বলে ওকে ঢুকতে দিচ্ছে না। খুব অসহায় লাগছে ওর।

.
ভেতর থেকে ডাক্তার সাহেনা বের হয়ে রাজিবকে ডাকলেন। কোমল কণ্ঠে বললেন, আর অপেক্ষা করা উচিত হবে না। চাপের কারনে বাচ্চার মাথা লম্বাটে হয়ে গেছে। এখন দ্রুত বের করে ফেলাই উচিত হবে। তুমি বললে আমরা এখনই অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে পারি।’
রাজিব বুঝতে পারে না কী বলবে। ওরা দুজনেই চেয়েছিল নরমাল ডেলিভারি হোক। এখন সব এলোমেলো হয়ে গেছে। একদিকে বাচ্চার নিরাপদে ভূমিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি, অন্যদিকে সিজার হলে সামিরার আজীবন নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নিজের অজান্তেই ওর চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘ওকেই জিজ্ঞেস করুন। আপনি আর ও দুজনে মিলে যেটা করা উচিত বলে মনে হয় সেটাই করুন প্লিজ।’
ডাক্তার চলে যেতেই রাজিবর চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরতে লাগল। হাসপাতালে উপস্থিত রাজিবের বোন, ভাবি, শাশুড়ি সবাই দেখছে, যেকোন পরিস্থিতিতে শক্ত থাকা মানুষটি আজ কেমন ভেঙে পড়েছে। রাজিবের দৃঢ়তা আর গাম্ভীর্য্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমল মনটা আজ সবার সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল।
.
সামিরাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যদিও ও বারবার বলেছে, ‘আমি আরও সহ্য করতে পারব। আরেকটু অপেক্ষা করি।’ ডাক্তার সাহেনাও অপেক্ষা করতেন। কিন্তু বাচ্চার মাথাটা চোঙাকৃতি হয়ে গেছে। আরও দেরি করলে সমস্যা বাড়তে পারে। তাই তিনি অপারেশনের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন।
সামিরাকে বেডে শোয়ানো হলো। মাগরিবের আযান দিচ্ছে। ডাক্তার সাহেনা নামায পড়তে গেছেন। এসেই সিজার করবেন। ঐ সময় সামিরা নিজেকে নিজেই সাহস দিচ্ছে, ‘তুমি পারবে সামিরা। সারাদিন পেইন সহ্য করে এখন আবার সিজার! না না সেটা হবে না। নরমালেই হবে তোমার। তোমাকে সর্বোশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।’
.
রুমে দুজন নার্স ছিল। একজন অন্যজনকে বলছে, ‘কী নরম মেয়েটা! ওর নরমাল হবে কীভাবে! আগেই সিজার করে ফেললে ভালো হতো।’ সামিরা তখন শক্তি সঞ্চয় করছে। সিজারের কথা ভাবতেই পারছে না। ডাক্তার সাহেনা নামায পড়ে রুমে ঢুকলেন। তারপর বললেন, ‘আমরা আরেকটু চেষ্টা করি। দেখি তো মা আল্লাহর নাম নিয়ে প্রেসার দাও।’ তার কথায় সামিরা যেন নতুন শক্তি পেল। শরীরের সব শক্তি একত্র করে পেটের ওপর দিয়ে বাচ্চাটাকে নিচে ঠেলে দিল। সাথে সাথেই ভোজবাজির মতো সামিরার শরীরের সব ব্যথা কোথায় যেন চলে গেছে। কানে আসছে মিষ্টি একটা কান্নার আওয়াজ। মাথা উঁচু করে দেখল ধবধবে সাদা মেয়ে শিশুটা ডাক্তার সাহেনার দু’হাতের মধ্যে হাত পা ছুড়ে কাঁদছে।
.
ডেলিভারি রুম থেকে বের হতেই রাজিবকে দেখতে পেল সামিরা। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বিশাল ঝড়টা ওর ওপর দিয়েই গেছে। শারীরিক কষ্ট সামিরা পেয়েছে, কিন্তু রাজিবের মানসিক কষ্টটা কোনভাবেই সামিরার শারীরিক কষ্টের তুলনায় কম না। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। যেন বিশাল যুদ্ধ দুজনে মিলে জয় করে ফেলেছে।
.
ওদের বাবুটার নাম রেখেছে ইনায়াহ। এটার অর্থ ‘সৃষ্টিকর্তার পক্ষ্য হতে বিশেষ উপহার।’ ওদের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছে। শুধু রাজিব ওর কোমলতাকে আবারও কঠোরতার মুখোশ পড়িয়ে দিয়েছে। আর সামিরা! শুধু ঐ মুহূর্তটাতেই কোত্থেকে যে এতো শক্তি শরীরে এসেছিল সে আজো বুঝতে পারে না। তবে শুধু ঐ সময়ই। এর আগে, এরপরে সে যে নরম, কোমল মেয়েটি ছিল, এখনও আছে। এখন তো আবার মা হয়েছে। কোমলতা যেন ওর আচার আচরণে উথলে পড়ে। দুজন প্রায়ই দুজনের সে দিনটির কথা স্মরণ করে। আর ভাবে, সব মানুষেরই কি এরকম দ্বৈতসত্ত্বা থাকে!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement