লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জুন ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftস্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

ঘুরে ফিরে পিছুটান
স্বাধীনতা

সংখ্যা

অনিন্দ্য অন্তর

comment ১৬  favorite ১  import_contacts ৮৯৬
রাত একটা কয়েক মিনিট।চারদিক রাতের জড়তায় লুকাতে চাইছে।কোনো দিকে কোনো শব্দ নেই।একটা চায়ের দোকান অর্ধেক খোলা তার পাশে ঝাপ লাগানো অবস্থায় একটা মটর গ্যারেজ।চারদিক অন্ধকার শুধু টিমটিম অলোয় জ্বলছে একটা বাতি।লালচে আলোতে মটর গ্যারেজের সামনে রাখা মটরগাড়ির যন্ত্রাংশ গুলো কে অস্ত্রের স্তুপ ভেব ভুল হয়।
কালো আঁধারের বুকে আজ জোছ্নার রং চোখে লাগে না, আঁধারের গভীরতাও মাপা যায় না কালো সময়ের মাপকাঠিতে,গভীর রাতের পরিবেশেও অগভীর এক অস্থিরতা,চাপা একটা উদ্বেগ কিন্ত তা সহজে চোখে ধরা দেয় না।সুনসান নিরবতার রাতেও কোথায় যেন নিরবতা ভেঙ্গে যাচ্ছে,স্বাভাবিকতা যেন অস্বাভাবিক নিয়মের রাস্তায় হাঁটছে,সবাই এটা অনুভব করছে কিন্তু কেউ তা দেখতে পারছে না।
প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের একটা গভীর যোগসূত্র আছে।প্রকৃতি যেন জীবনের অন্য একটা ছবি আর জীবনের নানা অবস্থায়,নানা সময়ে প্রকৃতি নিজেকে জীবনের মত করেই প্রকাশ করতে চায়।কিন্তু কেন এটা হয় তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
চায়ের দোকানের সামনে এসে থামে একটা কালচে-সবুজ জিপ।কাউকে কিছু না বলে জিপ থেকে আট দশজন চলে আসে টিমটিম করে জ্বলা আলোর নিচে।নিঝুম রাতের বুকে খট্ খট্ বুটের আওয়াজ পাওয়া যায়।
তাদের মধ্যে উঁচু লম্বা মত একজন লাথি মারল গ্যারেজের দরজায়। গ্যারেজের মালিক মো.আলী।যিনি কথায় ও কাজে এক।খুব কম কথা বলেন।আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস তার অন্তর পর্যন্ত বিস্তৃত কিন্তু তিনি কোনো অন্যায়কে সহ্য করতে পারেন না।
মো.আলী সব কিছু বুঝেও চুপ করে রইলেন আবার বেশীক্ষন চুপ করেও থাকতে পারলেননা দরজা তাকে খুলতেই হল।আর তার বুঝতে বাকী রইল না এরাই পাকিস্তানী বরবর হানাদার।যা অছে কপালে এগিয়ে গেলেন সামনে,বললেন কাকে চাই ? রাজাকার বদরুদ্দীন বলল চাই তো আনেককেই কিন্তু বর্তমানে আপাতত তোকে-ই।এত লম্বা-উঁচু মানুষের ভীড়ে বদরুদ্দীন নামের একটা প্রাণসত্ত্বার অস্তিস্ত্ব এতক্ষন চোখের আড়ালেই অবস্থান করছিল।হঠাৎ করেই যেন তার উত্থান,এতটাই যেন চোখ জ্বলে যায় অশুভ কোন অলোতে।মো.আলী আসন্ন একটা বিপদের আভাস পেলেন তবুও ভদ্র নম্র ভাবে বললেন বলুন কি করতে হবে ? আবার বদরুদ্দীনই বলল বেশীকিছু না,হুহুরদের গাড়ীর যে সমস্যা হইছে সেটাই খুইজ্জা বাইর কর। মো.আলীর থাকার ঘরটা গ্যারেজের ভিতরেই অর্থাৎ দুই রুমের একটা বাড়ীর বারান্দাসহ বাহিরের ঘরটা গ্যারেজ আর ভিতরেরটা থাকার ঘর।তিনি কিছু না বলে ভিতরের ঘরে গেলেন মিনিট দুই পরে কাজ করার কিছু যন্ত্র ও হাতিয়ার নিয়ে তিনি বেড়িয়ে এলেন।একজন অস্ত্রধারী সেনা তাকে গাড়ীর কাছে নিয়ে গেলো এবং তার দিকে অস্ত্র তাক করে রইল। বদরুদ্দীন তাঁকে কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়ে অপেক্ষমান সেনাদের নিকট গিয়ে মৃদু একটা আলোচনায় সামিল হল। মো.আলী গাড়ীর ইনন্জিন টা খুলে কাজ শুরু করলেন আর মনে মনে আল্লাহ্ কে ডাকতে লাগলেন।হঠাৎ একটা শব্দ কানে আসতেই তার হাত থেকে কাজের হাতিয়ারটা পড়ে গেল।চোখ তুলে তাকালেন মো.আলী।

বদরুদ্দীন পেশায় একজন সরকারী মাদ্রাসার অরবীর শিক্ষক।মুখে চাপ দাড়ি.মনে চাপা বেঈমানী।তবুও সাদা টুপিটা ঠিক আছে,পান্জাবীটাও সাদা। জীবনের শেষ ইচ্ছা পাকিস্তানের কোন এক প্রদেশে ইসলাম জাহানের সবচেয়ে বড় এক বিদ্যাপীঠ আছে,সেখানে শিক্ষকতা করার।তার একটা মেয়ে আছে তাকে পাকিস্তানী হানাদারদের সকল ধরনের খেদমতের জন্য নিয়জিত করা হয়েছে।তাই হানাদাররা তাকে দিন রাত ক্যাম্পে আটকিয়ে নানা ভাবে তাদের হুকুম মানতে বাধ্য করে আর তার মনে হয় নিজের বাবাকে মেরে ফেলে যদি সে অজানা এক পাপের মোচন করতে পারত তবে মরেও সে শান্তি পেত।আসলেই পিতা যে এমনও হতে পার তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বদরুদ্দীন নিজেই।
মো.আলী দেখলেন দরজার বাহিরে বদরুদ্দীন তামাক টানছে আর ভিতরে হানাদারা দরজা আটকিয়ে দিয়েছে।এর কিছুক্ষন পর একটা নারীকন্ঠের করুণ আত্মচিৎকার শোনা গেল সঙ্গে একটা বাচ্চাছেলের কান্নার অওয়াজ। মো.আলীর মাথার উপর থেকে আকাশ আর পায়ের নিচ থেকে মাটি যেন সরে গেল।তিনি শুধু একটা কথাই বললেন-আল্লাহ্ আমার মৃত্যু দাও,নয়তো প্রতিবাদের শক্তি দাও।
এর পর আধাঘন্টা কেটে গেল।দরজাখুলে বেড়িয়ে এলো একএকটি নরপশু।প্রকৃতিও যেন লজ্জায় স্তব্ধ হয়ে গেল।কিন্তু এই লজ্জা মো.আলী মেনে নিতে পারেননি।যদিও তিনি জানতেন হানাদারদের গাড়ীতে কোনোই যান্ত্রিক ত্রুটি নেই তবুও তাঁর কিছুই বলার ছিল না।এরপর বদরুদ্দীন মো.আলীকে বলল - আর গাড়ী সাড়াতে হবে না, বাচ্চাটা কাঁদছে,যা এবার ঘরে যা। মো.আলী আর নিজেকে সামলাতে পারলেনন তিনি বদরুদ্দীন এর গালে স্বশব্দে একটা চড় বসিয়ে দিলেন।রাত তখন গভীর থেকে আরোও গভীর হয়েছে।বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ অন্ধকারকে আরোও ভারী করে তুলেছে এমন সময় মেশিনগানের শব্দে আর একবার স্তব্ধ হল চারপাশটা। মো.আলীর রক্তেভেজা দেহটা পরে রইল গ্যারেজটার সামনে।বাচ্চাটাছেলেটা তখনো কেঁদে চলছে।
সেদিন যে বাচ্চাছেলেটার গগণবিদারক কান্নার ধ্বনিতে কম্পিত হয়েছিল অন্ধকারের কালো চাদর, সে-ই হলাম আজকের আমি।আর আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মায়েদের একজন।
দেশের ভাষার জন্য এমন ত্যগ স্বীকার করেছে আর ক’জনের মা ? আমার মা বীরঙ্গনা । বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ শব্দগুলোর একটির অধিকারিনী আমার মা , এটা ভাবতেই ভালো লাগে,তবুও একটা আজানা পিছুটান মাঝে মাঝেই খুঁজে ফেরে আমাকে কিন্তু আমি তাকে কখনোই ধরা দেই না তবে এমন মায়ের অন্য ছেলেদেরও আমার মত হয় কিনা,তা আমার জানা নেই।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement