লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কোমল (এপ্রিল ২০১৮)

বুক পকেটে পাওয়া চিঠি
কোমল

সংখ্যা

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩৮

মোস্তফা হাসান

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৮৬১
“প্রিয়তম,
তোমাকে দেখিনি ষেষট্টি দিন আধা বেলা আর কয়েক মিনিট। ঘড়ির কাটার মত টিক্ টিক্ হিসাব করে কাঁটে আমার প্রতিটা মুহূর্ত। হৃদয়টুকু ভয় পাওয়া ছোট্ট পাখির ছানার মত ছট্ ফট্ করে সারাক্ষণ।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়; দুপুর গড়িয়ে বিকেল; বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়; তবু অসহায়-আকাঙ্খিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকি সদর দরজার দিকে। এই তুমি এলে বলে! রাতভর ঘুমহীন দুচোখে সতর্ক প্রহরা। প্রতীক্ষা করি পিছন দরজার খিড়কী খোলার আলতো সতর্ক শব্দ শোনার জন্য। যুদ্ধের সময় এখন। অনেক সাবধানে চলতে হয় তোমাকে। যখন তখন হুড়মুড় করে বাড়িতে তুমি ঢুকতে পারনা। যে কেউ খবর পৌছে দিতে পারে মিলিটারী ক্যাম্পে। বিড়ালছানাটা টুপ্ করে চৌকাঠ পেরোয়। ঝুপ্ করে একটু শব্দ হয়। আমি উদগ্রীব হয়ে পড়ি। এই তুমি এলে বলে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়। বুকের দুপাশে টন্ টন্ করে থাকা স্তনের মাঝে যেখানে তুমি মুখ লুকিয়ে ঘষতে আর বলতে এ আমার বেহেশতের করিডোর! সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। দুর্বোধ্য অলঙ্ঘনীয় একটা মুহূর্তের মধ্যে আটকা পড়ে আমি দমবন্ধ হয়ে উঠি। ভোরের আলো ফুটে সকাল হয় যেন এক দীর্ঘ যুগ-সম রাত পেরিয়ে।
তোমার বিদায়বেলার সময়টায় কে যেন বর্শি দিয়ে টেনে হিছড়ে আমার শরীর থেকে হৃদপিন্ডটাকে বের করে আনছিল। তুমি একবারও ফিরে তাকাওনি। অশ্রু আমার দেখেছে এই মাটি, ঐ নীলাকাশ আর আমার পোষা টিয়া পাখিটা।
একবেলা আমাকে না দেখলে তুমি থাকতে পারতে না। এখন কতদিন কতরাত একা কাটাও। কিভাবে জানি না! তুমি হয়ত বলবে মায়ের অসহায় ক্লিষ্ট মুখখানি সব পিছুটানে ভুলিয়ে দেয়। তার সমস্ত গায়ে-গতরে যে আগুন জ্বলছে। সে আগুন না নিভিয়ে তুমি বাড়ি ফিরো কি করে?
তোমার খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি মুখটি একটু ছুতে পাগল হয়ে যায় আমি। আমার পল্লবিত ফুলের পাপড়ি মঞ্জুরিতে ঐ খোঁচা খোঁচা দাড়ির সুড়সুড়ি দিয়ে কামনার আগুন উত্তপ্ত করতে আর তুমি ছুটে আস না! আচ্ছা, এখনও কি তুমি তোমার খোঁচা খোঁচা দাড়ি আয়নার সামনে দাড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে শেভ কর? নাকি মুখভর্তি দাড়ি মহানন্দে বুক অবধি নেমে গেছে। তাহলে নিশ্চয় তোমাকে আলিফ লায়লার দরবেশ বাবার মত দেখাচ্ছে। আশে পাশে যদি ছবি তোলার ঘর পাও, একটা ছবি তুলে পাঠিয়ে দিও না, দরবেশ সাহেব! হয়ত ভাববে আমি পাগল হয়ে গেছি, যুদ্ধের সময় এসব চিন্তা মাথায় আসে কি করে। কি করব বল তোমাকে নিয়ে এসব ভেবে ভেবেই যে আমি বেঁচে আছি।
তুমি না তোল, আমি তোমার জন্য একটা ছবি তুলেছি। পাশের বাসার আন্টির দেবরের সাথে এক বিদেশী এসেছে। আমেরিকা থেকে। তার ক্যামেরা দিয়ে। সাদা ফর্সা ঐ বিদেশি নাকি সাংবাদিক। তোমরা যে পবিত্র যুদ্ধ করছ, তার খবরসহ ছবি সংগ্রহ করবে। তুমি যুদ্ধে গেছ, তোমাকে পাঠাব বলে সে আমার ছবি তুলে দিতে সম্মত হয়েছে। ছবি তোলার জন্য অনেক সময় ধরে সেজেছি। কত যত্ন করে তুলেছি তুমি দেখবে! নীল শাড়ি তোমার পছন্দের নীল টিপ হাতে পরেছি নীল চুড়ি তোমার দেওয়া ভালবাসার প্রথম উপহার। নীলের মাঝে এক চিলতে হলুদ কানের দুল। চুলগুলো সামনে পিছনে এলোমেলো ছড়ানো। উহ! কি সুন্দর লাগছে আমাকে দেখবে না তুমি!
নারীর মন আমার। আবেগে সিক্ত তোমার স্মৃতির স্রোতধারা অবিরত বহে মনের কুল-কিনারাবিহীন পাথারে। কোন বাধা মানে না। কত না স্মৃতি!
বিয়ের প্রথম রাতের তোমার সুখ-স্বর্গরচিত কামময় স্পর্শগুলোর স্মৃতি। কি ধ্রুপদী কৌশলে তুমি বস্ত্রহরণ করলে। মঙ্গল অভিযানের অনিশ্চিত কৌতূহলী নভোচারীর মত আমার তৃঞ্চার্ত দেহাকাশে ভ্রমন শেষে তুমি প্রবল বেগে প্রবেশ করলে, তোমার ওৎসুক্য চাহনীতে কামাতুর আমার অন্দর মহলে। জ্ঞান হারাবার উপক্রমে আমি অভয় পেলাম তোমার বুকের কালো ঘন লোমের স্পর্শে। গোঙানো শব্দময় শরীর-কথন শেষে এলিয়ে পড়লে তুমি আমার বুকে। সুখে-সার্থকে ভরে গেল আমার নারী জীবন।
তোমার একটু ছোয়াতে অধীর চঞ্চল হয়ে উঠা আমার শরীর-মন এখন অবসন্ন-নিশ্চল। স্মৃতির পাথারে ডুবন্ত আমি অনুভব করতে পারি না বর্তমানকে। কতদিন এমন হয়েছে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে সন্ধ্যা নেমেছে; আমি বারান্দায় ঠায় বসে আছি ইজি চেয়ার পেতে। নির্মিলীত দৃষ্টিতে; ছল্ ছল্ চোখে।

কখনো কখনো পড়ন্ত বিকেলে জানালার শিকেয় মাথা রেখে দুর আকাশে তাকিয়ে থাকি। মুক্ত-উচ্ছল পাখিরা ঝাক বেঁধে উড়ে যায়। ওরা যখন হারিয়ে যায় দূর ঈশানকোণে, খুব নিঃসঙ্গ অসহায় বোধ করি। নীল আকাশের বিশাল শুন্যতা আমার ভিতরের শূন্যতাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। হু হু করে ওঠে ভেঙে যাওয়া পাখির বাসার মত আমার মন। ইচ্ছে হয়, ইস্ দুটি ডানা থাকলে ঐ পাখির ঝাকের সাথে উড়ে যেতাম তোমার কাছে! গল্প করতাম তোমার হাতে হাত রেখে। অনেক গল্প যে জমা হয়ে আছে।
কদিন আগে ডিম থেকে অনেকগুলো হাঁসের ছানা ফুটেছে। টুকটুকে হলদে ওদের গাঁ। নরম তুলতুলে। আমার পোষা টিয়া পাখিটা মরে গেছে কি একটা শোকে! যদু চাচার টুকটুকে উচ্ছল মেয়েটা গায়ের রং কালো হওয়ায় তাকে কেউ বিয়ে করবে না বলে সবাই শাপ-শাপান্ত করত ওর বিয়ে হয়ে গেছে। যুদ্ধও কি কারো জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে! বাড়ির উঠানের চালতা গাছে চালতা ধরেছে শ’য়ে শ’য়ে। তোমার জন্য মিষ্টি করে এক বৈয়াম চালতার আচার বানিয়ে রেখেছি। আর কত কথা জমিয়ে রেখেছি এমনি করে। চাঁদ ডুবে যাবে; প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়বে তবু বুঝি আমার গল্প ফুরোবে না।
ইচ্ছে করে তোমাকে শাড়ির আচল দিয়ে বেঁধে রাখি আমার বুকের মধ্যে। দেশের বিপদে তুমি বাড়ি ছেড়েছো। কি করে আমি আটকে রাখি। কোন ছলে তোমাকে কাছে ডাকি! দেশ যে বড়। মায়ের মুক্তি তার হাসিমুখ যে সবকিছুর আগে। মনকে শক্ত করি। তুমি জীবনের পরোয়া করনি। আর আমি একটু বিরহ সইব না? বিশ্বাস কর, আমি চাই, তুমি জয়ী হও। আগুন নিভিয়ে মায়ের বুক ঠান্ডা কর। কিন্তু অবলা নারীর মন আমার। নদীর মত ফল্গুধারা বয় হৃদয়ে। বাঁধ মানে না। ক্ষনিকেই অস্থির হয়ে পড়ি। হৃদয়ের অবোধ্য অনুভূতির কোঠরে বন্দি আমি। সেখানে আমার মুক্তি কই!
ইদানীং রাজাকারদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। ওরা সন্দেহ করছে তুমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছো। তোমাকে বিদেশে বড় চাচার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাবা ওদের বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছে। তবুও খুব ভয় হয়, কখন কি যে হয়ে যায়। বাড়ির ধানের গোলার নিচে বাবা বাঙ্কারের মত গোপন একটা জায়গা করে রেখেছে বিপদের দিনে বাড়ির মেয়েদেরকে যেন বাঁচানো যায়। তোমার প্রতীক্ষায় থাকলাম। আল্লাহ তোমাকে যেন সকল বিপদ থেকে বাচিয়ে রাখেন।
ইতি,
তোমার প্রিয়তমা স্ত্রী।”
চিঠিটা পড়া শেষ হলে তৃষার মুখের দিকে তাকায় জয়। জয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরে জন্মগ্রহণ করেছিল। মা তাই তার নাম রেখেছিল জয়। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’র শ্লোগানের জয় হয়েছে সে জন্য। আর তার জন্মের কিছুদিন পরে বাবার বন্ধুরা মায়ের কাছে এই চিঠিটা ও চিঠির সাথে পাঠানো মায়ের ছবিটা পৌছে দিয়ে যায়। বাবার বুক পকেটে ছবিসহ চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল। তৃষা ছবিটি হাতে নিয়ে দরদ ভরে দেখে। অ™ভুত মায়া পড়ে যায় ছবির মানুষটার প্রতি।
‘বাবাকে একটিবার দেখার আকুতি নিয়ে মা বেঁচেছিল সারাটি জীবন। বাবা ফিরে আসেনি’, আবেগঘন কন্ঠে বলতে থাকে জয়। ‘একটা অপারেশনে সম্মুখ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে বাবার সমস্ত দেহ ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের ঐ বাস্তবতায় বাবার লাশ বাড়িতে পাঠানো সম্ভব হয়নি। আশেপাশেই একটা জঙ্গলে তাকে দাফন করে তার সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধারা । পরে সেই স্থানটিও আর সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেনি কেউ। মা বাবার কবরটা একটু ছুয়ে তার অতৃপ্ত হৃদয়কে শান্ত করতে চেয়েছিল, পারেনি। বাবা হয়ত একদিন ফিরে আসবে এই এক চিলতে আশা নিয়ে মা আমরণ বেঁচেছিল।’ বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে স্মৃতিচারণ করে জয়।
তৃষা মনোযোগ দিয়ে শোনে। তৃষা মায়ের ছবিটার উপর ভালবাসাসিক্ত শ্রদ্ধায় হাত বুলায়। ছবিতে একদম নীলপরীর মত লাগছে মাকে। সেও নীলপরীর মত করে সেজেছে আজকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর থেকে বের হয়ে দুজনে। আজ তারা বিয়ে করবে। শহীদ বাবা-মায়ের আশীর্বাদ বার্তা দিয়ে দুটো হলদে পাখি উড়ে যায় সামনে দিয়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement