মেজবাহ চৌধুরির সামাজিক অবস্থান আর প্রতিপত্তি তাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে সেখান থেকে নিঃসন্দেহে সে গণমানুষের গলায় গলায় মিলতে পারবে না। তার বেতনভুক শফিক আত্মম্ভরিতার মাপকাঠিতে তাকে ছাড়িয়ে যাক এটা তার দাম্ভিকতায় প্রচণ্ড আঘাত। শফিক যতই ভাল হোক, যতই স্নেহধন্য হোক তার সফলতা মালিকের সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাক এটা কখনোই মেজবাহ চৌধুরির কাছে গ্রহনযোগ্য নয়। এই মনস্তাত্ত্বিকতাকেই অল্প কথায় গল্পে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩৯টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - দাম্ভিক (জুলাই ২০১৮)

স্ট্যাটাস
দাম্ভিক

সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ৭  favorite ০  import_contacts ২৩৩
এটা কী?

- সামান্য মিষ্টি, স্যার?

- মিষ্টি কেন?

- স্যার, আপনাদের দোয়ার আমার ছেলে গোল্ডেন এ হইছে।



মেজবাহ চৌধুরির বুঝতে বাকি রইল না ব্যাপারটা কী। তিনি অস্বস্থি, রাগ এবং লজ্জার মিশেলে এক অবিস্ফোরিত বোমার আকার ধারণ করলেন। কিন্তু বিস্ফোরিত হতে পারলেন না। একবার পরিচারিকা কাজলীকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলেন। পরক্ষণে ড্রাইভার শফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, প্যাকেটটা তোমার ছেলেমেয়েদের জন্য নিয়ে যাও।

- কী যে বলেন স্যার, এই সামান্য ...... আমি খুব খুশি হমু স্যার ...... আমার খুব আনন্দ হইছে স্যার –

- এজন্যই বলি, তোমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে আনন্দ করে খাও।



চৌধুরির ভেতরে আগুনের কুণ্ডলি; বাইরে বেরিয়ে আসতে পারছে না। মিষ্টি খাওয়ানোর কথা কার, আর খাওয়াচ্ছে কে! অগাধ বিত্তের মালিক – আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মেজবাহ চৌধুরির ছেলে শত চেষ্টাতেও যখন কোন ভাল ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হতে পারল না, আধাডজন গৃহশিক্ষক তার পেছনে লাগিয়ে ভেবেছিলেন ছেলেটা যদি দেশি পদ্ধতির এসএসসি পরীক্ষায় সুনামের সাথে পাশ করতে পারে তবে কোনরকম মুখ রক্ষা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও হল না। ফল – জিপিএ ৩.৯। ভাবা যায়? ড্রাইভারের কাছে অপমান! তার শরীর কাঁপছে। কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। এই অসহনীয় পরিস্থিতি সামাল দিতে হঠাৎ কী যেন মাথায় এল। কাজলীকে ডেকে নিচুস্বরে বললেন, ম্যাডামের কাছ থেকে দু’হাজার টাকা নিয়ে আয়তো।



কাজলী টাকা নিয়ে এলে মেজবাহ চৌধুরি ড্রাইভারের দিকে ঘুরে বললেন, শফিক, টাকাটা তোমার ছেলেকে দিয়ো। আমি খুশি হয়ে দিলাম।



ড্রাইভার চলে গেলে চৌধুরি চিৎকার করে কাজলীকে ডাক দিয়ে বললেন, এটা ভেতরে নিয়ে যা। প্রাইম সুইটসের মিষ্টির প্যাকেট। ড্রাইভার জানে তার স্যার কোন মিষ্টি পছন্দ করেন। কিন্তু এখন মিষ্টি চৌধুরির কাছে বিষবৎ। তিনি বুঝতে পারছেন না রাগটা আসলে কার উপর। ড্রাইভার নাকি তার নিজের গর্দভ ছেলের উপর? নাকি ছেলেকে লাই দিয়ে দিয়ে যে ওর মাথাটা খেয়েছে তার উপর? ঢের যুক্তি থাকলেও শেষ অনুমানকে তিনি অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সাহস দেখাতে পারবেন না। তার অন্তঃস্থ ও বহিঃস্থ অনেক কারণ আছে।



বিষয়টি নিয়ে স্ত্রীর সাথে তিনি কথা বলতে যাননি, যাবেনও না। ছেলে তার রুমে বসে আই-ফোন টেপাটিপি করছে – মুখে দুর্ভাবনার কোন ছাপ নেই। চৌধুরি বুকের ভেতর আগ্নেয়গিরি ধারণ করে ছেলের রুম কয়েকবার অতিক্রম করলেও লাভা উদ্গীরণ করতে পারেননি। ভেবেও পাচ্ছেন না এ মুহুর্তে তার কী করা উচিৎ। ছেলেকে নাহয় কোন দেশে পাঠিয়ে দিতে পারবেন উচ্চশিক্ষার নাম করে। কিন্তু তার নিজের নাম রক্ষা হবে কেমন করে? বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখে তার মুখটা চুপসে যাবে না! এ ধাক্কাও হয়ত সামলানো যাবে এটা ওটা বলে। কিন্তু ড্রাইভার শফিকের সামনে ডাকসাইটে কর্তা হিসেবে বুক ফুলিয়ে তিনি দাঁড়াবেন কেমনে? নুন আনতে পান্তা ফুরোয় – সেই ড্রাইভারের ছেলে কিনা গোল্ডেন জিপিএ নিয়ে নটরডেম কিংবা ঢাকা কলেজ দাবড়ে বেড়াবে। তারপর আরোও দু’বছর না যেতেই শফিক আরেকটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে হাজির হবে। এর বেশি ভাবতে পারেন না চৌধুরি; তার মাথা ঝিমঝিম করে।




শফিককে ঘরের সবাই ভালবাসে; মেজবাহ চৌধুরি নিজেও। তার মত বিনয়ী, ভদ্র ও সৎ ড্রাইভার জগতে খুব কমই আছে। বেতন বাড়ানোর কথা সে নিজে কখনও বলেনি। হয় চৌধুরি নিজে কখনও পাঁচশ’ টাকা বাড়িয়েছেন, নয়ত বেগম সাহেব একচোটে একহাজার বাড়িয়ে দিয়েছেন। এছাড়া এটা ওটা ঈদের জামা এসবতো আছেই। খাওয়াপরা নিয়ে তার কোন উদ্বেগ নেই; শুধু ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে কদাচিৎ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করত। সেই শফিক ...... চৌধুরির ভেতরে এখন আগ্নেয়গিরির পরিবর্তে বৈশাখীর তাণ্ডব চলছে। উত্তরণের পথ খুঁজতে অস্থির হয়ে তিনি পায়চারি করছেন ঘরময়। যে কোন মূল্যেই হোক উর্ধমুখী মাথাকে উর্ধেই ধরে রাখতে হবে।



ভোরবেলা বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে একটি হেঁচকিওঠা কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। শব্দটা দোতলা পর্যন্ত পৌঁছানোর মতই জোরালো। কিন্তু তা মেজবাহ চৌধুরির ইন্দ্রিয় ছুঁতে পেরেছে বলে মনে হয় না। কারণ তার কানের ছেঁদা স্ট্যাটাস নামক শক্ত পাথরের এক গোলক দিয়ে বন্ধ করে দেয়া আছে।



দারোয়ান খামটি তার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, শফিক ভাই, কাইন্দা লাভ নাই; ধর, স্যারে তোমারে আসতে মানা করছে। আর কখনও আসবা না।



শফিক ভারসাম্যহারা হয়ে দুই হাত ছুঁড়ে বলতে যাচ্ছিল, ক্যান, কী দোষ করছি আমি। কিন্তু বাক্যটি পূর্ণশক্তি নিয়ে বেরোবার আগেই দারোয়ান আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁটে একবার এবং পরক্ষণে শফিকের ঠোঁটে ত্রস্ত হয়ে চেপে ধরে বলল, চোপ থাক, লাভ নাই। যাও, তুমি যাও। স্যার বলছে খামের ভিতর তিন মাসের বেতন আছে।



শফিক মাথা তুলে দোতলার দিকে একবার তাকাল। না, ওখানে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তারপর শার্টের আস্তিন দিয়ে দুচোখ মুছলো। সাদা খামটা খোলার তাগিদ নেই তাই ওটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে সে অনতিদূরে ফুটপাতের ওপরে শেফালী গাছটার নিচে বসল। সেখানে বসে সে বৃথাই এই আকস্মিক ঘটনার কারণ খুঁজে চলেছে আর মাঝেমাঝে একফোঁটা দু’ফোঁটা অশ্রু তার চোখ থেকে টপ করে মাটিতে পড়ছে। হঠাৎ সে লক্ষ করে দেখল তার আশেপাশে এবং গায়ের উপর কিছুক্ষণ পরপর একটি দুটি শিউলীও গাছ থেকে টুপ করে ঝরে পড়ছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement