বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ মে ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫৭ বহ্নিশিখা

এলিজা রহমান
comment ৫  favorite ০  import_contacts ২২৪
টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার বহেরতৈল গ্রামে ভোর হচ্ছে । একটি নতুন সূর্য , একটি নতুন দিন শুরু হলো ফাতেমা খাতুনের ।
সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয় , সময় উত্তর দিয়েছে , দেশ স্বাধীন হয়েছে । ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়াটা নিশ্চিন্ত ছিলো , শুধু স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়াটা ছিলো সময়ের ব্যাপার ।
তিনি একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা । টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করেছেন । মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করছেন । অল্প বয়সের কারণে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে পারেন নি , কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা , তথ্য ও চিঠিপত্র আনা নেওয়া করা এইসব কাজ গুলি তিনি করতেন । এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পাহারা দেওয়া , তাদের অস্ত্র গুলো পাহারা দেওয়া এবং সেগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ছিলো তাঁর উপরে যাতে সময়মত সেইসব অস্ত্র গুলো ব্যবহার করা যায় । তিনি ছিলেন সাহসী আর উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী । ছেলেদের মত চুল রাখতেন তিনি আর নাকে কানে গয়না না থাকায় তাঁকে চট করে মেয়ে বলে মনে হতো না ।
একবার তিনি নিজের বুদ্ধির জোরে কয়েকজন রাজাকারকে বোকা বানিয়েছিলেন ।
ঘটনাটা ছিলো এরকম , তিনি কয়েকজন রাজাকারকে রাইফেলকে চারভাঁজ করে কাপড়ের নিচে লুকিয়ে নিয়ে মরিচার (টাঙ্গাইল জেলার একটি গ্রাম ) দিক থেকে আসতে দেখেন । তিনি যাচ্ছিলেন মরিচার দিকে । এসময় তারা তাঁকে দেখে জানতে চায় তিনি ছেলে নাকি মেয়ে । উত্তরে ফাতেমা নিজেকে ছেলে বললেন । তারা বলে যে তাঁকে দেখে তো মেয়ের মতন মনে হয় । কিন্তু তিনি নিজেকে ছেলে বলে দাবী করেন । তারপর তারা জিজ্ঞাসা করে সে কোথায় যাচ্ছে । উত্তরে তিনি জানান যে বোনের বাড়িতে যাচ্ছেন। এরপর তারা জানতে চায় বহেরতৈল গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি আছে কিনা , ফাতেমা খাতুন তাদের বলেন যে , না , কোন ঘাঁটি নেই । রাজাকাররা ফাতেমা খাতুনের কথায় বিশ্বাস করে , তাঁর দেখানো পথ ধরে সোজা গিয়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে পড়ে এবং ধরা পড়ে অসহায়ভাবে মার খাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিলো না ।
' মা , চা খাও ' মেয়ে নাজলির কথায় বাস্তবে ফিরেন তিনি । মেয়েটা চা আর মুড়ি রেখে জিজ্ঞেস করল ', কি ভাবতাছ সকাল থেকইকা ? শরীর বেশি খারাপ ? ডাক্তার দেখাইবা আজকে ? বিজয় দিবসের ছুটির পরে ছাড়া তো ডাক্তার দেহান যাবে না ।'
' না মা কিছু না ' , মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফাতেমা খাতুনের মনে হয় , তাঁর এতো ভালো মেয়ের স্বামীর সুখ হলো না । তাঁর মেয়ে নাজলি আকতার ফর্সা না , কিন্তু মিষ্টি দেখতে , বিয়ে হয়েছিল , সে যৌতুকের কারণে স্বামীর সংসার করে নি । নার্সিংয়ের ট্রেনিং নিয়ে সে একটা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করছে । মাঝে মাঝে ফাতেমা খাতুনের মনে হয় নাজুই তাদের দুজনকে বাঁচিয়ে রেখেছে । রান্না করা , বাজার করা , ডাক্তার দেখানো সবকিছুই নাজলিকে করতে হয় । নাজলির বাবা কফিলউদ্দীন মানসিক ভারসাম্যহীন । মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকাররা নাজলির বাবার চোখের সামনে দাদা, দাদি , দুই চাচাকে কোপায় মেরে ফেলে , রাজাকাররা এরপর তাঁর শ্বশুর বাড়ি , জমি জমা সবকিছু ই দখল করে নেয় । সেই থেকেই কফিলউদ্দীন অসুস্থ , এখনও তাই ।
ফাতেমা খাতুনও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন । তাঁর সারা শরীর ও মাথায় ঘা হয়েছে । টাকার অভাবে ভালোভাবে চিকিত্‍সা করতে পারছেন না । তাঁর ছেলেমেয়েরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে বিনা বেতনে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে নাই । তিনিও মুক্তিযোদ্ধা বলে ফ্রী চিকিত্‍সা সেবা পান না । তাঁর ছোট মেয়ে নাসরিনকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন , তাকে ও বেশি লেখাপড়া করাতে পারেননি । নাসরিনের শ্বশুর বাড়ি গৃহস্হ পরিবার বলে তাকে সারাদিন কাজ করতে হয় । দুটো দিন সে মায়ের কাছে এসে থাকতে পারে না । একে তো নাসরিনকে অনেক কাজ করতে হয় তার শ্বশুর বাড়িতে তার উপর ফাতেমা খাতুনের বাড়িতে মাত্র দুটো ঘর , একটা ঘরে নাজলি মায়ের সঙ্গে থাকে আরেকটা ঘরে থাকে নাজলির বাবা , তাই নাসরিনের স্বামী কামরুল ইসলাম ছেলেমেয়ে দের নিয়ে ফাতেমা খাতুনের বাড়িতে এসে আর থাকতে চায় না ।
ছেলে মাহবুব উদ্দীনকে ছোট বয়সেই একটা মোটর গ্যারেজে দিয়েছিলেন , তাকেও বেশি লেখাপড়া শেখাতে পারেননি । সেখানেই সে কাজ শিখেছে , বিয়ে করে আলাদা সংসার করেছে , মা বাবার খোঁজ খবর করে না ।

'মা , কি হইলো , আলু শিম ভাজা , পুঁটি মাছ ভাজছি পেয়াজ কাঁচামরিচ দিয়া ' , ভাত খাইয়া লও ।' নাজলি বলল ।

' মা রে তুই আর কত করবি আমাগ জন্যি ? তোর তো সংসার ও হইলো না , আমিও তো কাম কাজ করতে পারি না আজকাল আর শরীরে কুলায় না । সবকিছু তুই করস । 'বলতে বলতে ফাতেমা খাতুনের চোখে পানি চলে আসে ।

' মা , কি কও এইসব ? তুমি খাইয়া লও । আজকে আমার ডিউটি নাই । তাই তোমার লগে খাইতে বসলাম । ডিসেম্বর মাস আসলে ই তুমি মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাব । আমরা ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় পাইছি পাকিস্তানের কাছে থেকে । তুমি যুদ্ধ করে দ্যাশ স্বাধীন করছো , অনেকেই মারা গেছে , স্বাধীন দেশ দেখতে পারে নাই তারা , তুমি তো একটা দেশ স্বাধীন দেশে বাঁইচা আছো । পৌরসভার ঝাড়ুদারের কাজটা এহন ছাইড়া দেও ।' নাজলি বলে ।

' মা রে কি করতাম , তোর নানা গরীব ছিলো বইলা
আমারে লেহাপড়া করাইতে পারে নাই । আমি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সখীপুর পৌরসভায় ঝাড়ুদারের চাকরি পাইছি আজকে ১৩-১৪ বছর , ২০১২ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাইতাছি দুই হাজার টাকা আর দুই হাজার পাই ঝাড়ুদারের বেতন । তোর চাকরি পাওয়ার আগে এই টাকায় সংসার চালাইছি । আমি তো তাও সরকারি ভাতা পাই অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধা তো এখন ও সরকারিভাতা পায় নাই ।' ফাতেমা খাতুন আক্ষেপের সুরে বললেন ।
'

মা , তুমি ঝাড়ু দিয়্যা দেশ থেইকা পাকিস্তানী গো তাড়াইছ , রাজাকাররা তো অহনও পাকিস্তানে চলে যায় নাই , তাগো ঝাড়ু মাইরে তাড়াও না কেন ?' নাজলি হাসতে হাসতে ফাতেমা খাতুনকে বলল ।

ফাতেমা খাতুন তার কথাটা শুনে হেসে ফেলেন । তারপরে বললেন , ' ঠিকই কইছিস মা , তয় এহন সেই কামডা করবি তুই , নাসরিন, মাহবুব , তোদের মতো আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা । বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে জড়ায় ছিলো জানিস নাজলি , কেউ ছিলো স্বাধীনতার পক্ষে আর কেউ বা ছিলো বিপক্ষে । স্বাধীনতার বিপক্ষে যারা ছিলো তাদের আমি নিজের চক্ষের সামনে দেখছি টাকার জোরে ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যেতে । সময়ে সঙ্গে সঙ্গে তারা তো এখন আরো ক্ষমতা পাইছে দিন দিন । আমাদের দেশটারে তোরা তোদের চিন্তা ভাবনা আর লেখাপড়া দিয়া অনেক দূর আগায় নিয়ে যাবি এইটা আমার বিশ্বাস ।' ফাতেমা খাতুন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের কথা জানালেন নাজলি আকতারকে ॥

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন