গল্পটির বিষয়বস্তু আমার দাদুর থেকে শোনা । "কাঠখোট্টা" বলতে আমরা সাধারণত বুঝি -- রস-কষ হীন কোন মানুষ । যার মধ্যে কোন দয়া মায়া নেই । কিন্তু এই সমস্ত মানুষদের ভিতরটা সবসময় কাঠখোট্টা বা কঠিন হয় না । তাঁদের অন্তরের ব্যবহার গুনে অন্য মানুষকে নাড়া দেয় । পরে তাঁর পরিচয় গুনে মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করে , ভালবাসে । এইরকম একজন মানুষের কথা চিন্তা করে আমার এই গল্পটি লেখা ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬১

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কাঠখোট্টা (মে ২০১৮)

কাঠখোট্টা
কাঠখোট্টা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬১

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত

comment ১৯  favorite ০  import_contacts ৬২৫
বহু বছর পর প্রায় হটাৎ করে এই রকম একটা সুন্দর , শান্ত , পাহাড় ঘেরা জায়গায় " ঝাঁটা গোঁফ দারোগার " সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে , ভাবতেই পারি নি । যারা ঘুরতে ভালবাসেন কিংবা প্রকৃতি প্রেমিকরাই এই সুন্দর জায়গাটার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আকর্ষণে ভিড় করেন । পাহাড় ঘেরা এই নিরিবিলি জায়গাটায় যেকোন স্থানে দাঁড়ালেই আপন মনে বলতে ইচ্ছে করে কবিতা । অন্তর থেকে বেরিয়ে আসে সুন্দর কোন গানের লাইন । ভেবে অবাক হচ্ছি -- এইরকম আকর্ষণীয় এক মনোরম সুন্দর জায়গায় " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " কি করে এলেন ?

পশ্চিম সিকিমের পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট একটা গ্রাম । একটু নিচের দিকে নামলে বাজার । সকাল থেকে দেখা যায় স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রা । কাঞ্চনজঙ্গার কোলে বেড়ে ওঠা পাহাড়ী মানুষগুলোর মনটাও পাহাড়ের মতোই বিশাল । যারা নিরিবিলিতে থাকতে পছন্দ করেন তাঁরা এখানে এসে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যান । নিচে বাজারের কাছে থাকবার জন্য বেশ কয়েকটি নামি , অনামি হোটেল রয়েছে । এক আত্মীয়ের থেকে এই জায়গাটির সন্ধান পেয়ে হটাৎ করেই কয়েকজন ছোটবেলার বন্ধু মিলে এখানে বেড়াতে চলে এলাম , উদ্দেশ্য -- শহরের একঘেয়ে কঠিন জীবন থেকে কয়েকদিনের জন্য প্রানভরে নিঃস্বাস নেয়া , গাড়ী ভাড়া করে , পায়ে হেঁটে এখানকার বিভিন্ন স্থান দর্শন করা ।

স্থানীয় লোকেদের থেকে জানতে পারলাম - এখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের কোলে সুন্দর একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে । প্রতিদিন সন্ধেবেলায় সেখানে দেখবার মত সন্ধ্যা আরতি হয় । আমরা ঠিক করলাম আজই সেখানে সবাই মিলে আরতি দেখতে যাব । হোটেল থেকে বেরোবার সময় আমাদেরকে বলে দেওয়া হোল , যেখানেই যান রাত ৯ টার মধ্যে অবশ্য করে হোটেলে ফিরে আসবেন । আশাকরি , হোটেলের প্রধান গেটে বড় বড় করে লেখা এই মর্মে " নোটিশ " টিও আপনারা দেখেছেন । আমাদের হোটেলের ম্যানেজার কিছু দরকারি কাজে কলকাতায় গিয়েছেন । আজই সন্ধেবেলা ওনার ফেরার কথা । উনি ভীষন কড়া স্বভাবের মানুষ । যেটা মনে করবেন , সেটাই উনি করবেন অবশ্যই সেটা ভালোর জন্য । ওনার হাসিমুখ এই হোটেলে কদাচিৎ কেউ কোনদিন হয়ত দেখেছে । এককথায় , রস-কস হীন এক কাঠখোট্টা মানুষ । আমরা এই কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে মন্দিরের আরতি দেখতে বেড়িয়ে পরলাম । হোটেলে ফিরলাম তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা । দেখলাম হোটেলের মেন গেট বন্ধ । অনেক ধাক্কাধাক্কির পর হোটেলের একজন গেটটা অল্প ফাক করে বললো -- ম্যানেজার বাবু হোটেলে এসে গেছেন আর বলে দিয়েছেন রাত নটার পর আর গেট খোলা যাবে না । তাছাড়া আপনাদের এই বিষয়ে বেরোবার আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল । বিদেশ-বিভুঁই জায়গা , এখানে ঝগড়া বা চেচামেচি করে লাভ নেই । বাহিরে অল্প অল্প বৃষ্টি সঙ্গে ঠান্ডা । অগত্যা অনুনয় করে বললাম -- আজ আমাদের ফিরতে দেরি হয়ে গেছে , সামনের দিনে বেরোলে আপনাদের হোটেলের নিয়ম মতই হোটেলে ফিরে আসব । লোকটি আমাদের অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে গিয়ে একটু পরে ফিরে এসে বললো -- আপনাদের দেরিতে ফেরার জন্য ম্যানেজার বাবু ১৫ মিনিট বাহিরে অপেক্ষা করতে বলেছেন , তারপরে গেট খোলা হবে । মনে মনে আমরা ভাবলাম এ কি ধরনের লোক ! ! , এই বৃষ্টি আর ঠান্ডার মধ্যে আমাদের ১৫ মিনিট বাহিরে অপেক্ষা করতে বললো !! এই রকম দয়া-মায়া হীন , কঠোর , লোকের পাল্লায় আগে কোনোদিন পরিনি । .... ১৫ মিনিট বাহিরে থাকবার পর হোটেলের লোকটি মেন দরজা খুলে আমাদেরকে বললো -- আপনাদের নিজেদের ঘরে যাবার আগে একবার ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে দেখা করে যাবেন ।

ঘরটা ছোট আর বেশ অগোছাল । ঘরে ঢুকে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটা বড় বড় দাঁত বের করা বাঘের স্ট্যাচুতে । হটাৎ করে দেখলে মনে হয় বাঘটা যেন জীবন্ত আর আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে । ম্যানেজার বাবু ঘরে উল্টো মুখ করে কিছু একটা করছিলেন । আমাদের পায়ের আওয়াজ শুনে ঘুরে আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলতেই একেবারে ভূত দেখার মত অবাক বিস্ময়ে চমকে উঠলাম । আরে , এযে " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " ! ঠিক আগের মতোই দাঁত বের করে কথা বলার ঢং , যেন সবসময় রেগে আছেন । আগের থেকে বয়সটা অনেক বেরেছে । কিন্তু গোঁফটা ঠিক আগের মতোই সলার ঝাঁটার কাঠির মত খাড়া খাড়া । আগে ছিল কুচকুচে কালো আর এখন ধবধবে সাদা ।

পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম । স্বাধীনতা আন্দোলন তখন তুঙ্গে । ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতেই হবে । সব জায়গার মত আমাদের এই গ্রামেও তার যথেষ্ট প্রভাব । গ্রামটি যেহেতু শহর থেকে অনেক দূরে তাই কিছুটা নিরাপদ জায়গা । সেইসময় অনেক নামকরা বিপ্লবী পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতে এই গ্রামে এসে আশ্রয় নিতেন । ব্রিটিশ সরকার যথারীতি এই খবর জানবার পর এই গ্রামের থানায় এমন একজন দারোগাকে পাঠালো , সে নাকি এই সমস্ত বিপ্লবীদের শায়েস্তা করতে একেবারে সিদ্ধহস্ত । কানাঘুষো শোনা কথা , লোকটার প্রাণে নাকি কোন দয়া-মায়া নেই , কেউ কোনদিন তাঁকে হাসতে দেখে নি । বিয়ে করেন নি । সংসার বলতে থানার কাজ আর ব্রিটিশ সরকারকে তোষামোদ করে আন্দোলনরত বিপ্লবীদের উপর নাকি অত্যাচার করা । এককথায় কঠোর এক কাঠখোট্টা মানুষ । নাম ভবানী ঘোষাল । বয়স ৩৪ / ৩৫ , কিন্তু হটাৎ করে দেখলে বয়সটা একটু বেশি মনে হয় । গায়ের রংটা ময়লা । মাথাভর্তি কদমছাট চুল । তাঁকে দেখলে প্রথমেই চোখে পরে তাঁর গোঁফটা । মোটা করে রাখা একেবারে ঝাঁটার কাঠির মত । ক্রমে লোকে তাঁর আসল নামটাই ভুলে গেল আর তাঁর নামই হয়ে গেল সবার কাছে " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " । ক্রমে এই কাঠখোট্টা লোকটা একটা সময় গ্রামের সবার কাছে অগোচরে পরিচিত হয়ে পরলেন একটা ভয়ের ত্রাস হিসেবে ।


একদিন ভারতবর্ষ স্বাধীন হোল । একটা সময় এই ভবানী ঘোষাল ওরফে " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " আমাদের গ্রামের থানা থেকে বদলি হয়ে অন্য কোন থানায় চলে গেলেন । ছোট হলেও এইটুকু বুঝলাম গ্রামের লোকেরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলো । ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পর চারিদিকে আনন্দের উৎসব ।

আজ সন্ধ্যায় আমাদের গ্রামে এই নিয়ে বিরাট এক বিজয় উৎসব । অনেক নামকরা বিপ্লবী আজকের এই বিজয় উৎসবে উপস্থিত হয়েছেন যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন । এই সমস্ত বিপ্লবীদের বক্তৃতায় তাঁদের স্মৃতির ঝুলি থেকে একটি নামই বারে বারে উচ্চারিত হচ্ছিলো -- তিনি হলেন " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " । আমাদের সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন ভয়ংকর লোক হিসেবে । কিন্তু এই সমস্ত মহান বিপ্লবীদের থেকে সেই দারোগার সম্পর্কে জেনে আমরা সত্যি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । জানতে পারলাম , বাহিরে যতটা কাঠখোট্টা , কঠোর - ভিতরে ততটাই নরম আর নিজেও একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ । বিপ্লবীদের থানায় ধরে নিয়ে এসে পরোক্ষভাবে অন্য লোক মারফত তাঁদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা , অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা করানো । আর একটা খবর আমাদের প্রথম সারির বিপ্লবী বরেনদার মুখ থেকে শুনে আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম । এই " ঝাঁটা গোঁফ দারোগা " বরেনদাকে গ্রেফতার করে থানার লকাপে ঢুকিয়ে দিলেন । রাত যখন গভীর তখন লকাপ থেকে বরেনদাকে বের করে নিয়ে এসে চাপা স্বরে বললেন -- আমাকে সবাই কঠোর দারোগা বলে চেনে । আমি কিন্তু আপনাদের আন্দোলনকে শ্রদ্ধা করি আর মনে প্রানে সমর্থন করি । আপনারা যে কাজে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন , আপনারা একদিন নিশ্চয় জয়ী হবেন। আমরা নিশ্চয় একদিন স্বাধীন হব । " জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী " -- জননী , জন্মভূমি হচ্ছে আমাদের মা , আমাদের দেশ। ব্রিটিশরা আমাদের মাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে । আমরা সবাই মিলে আমাদের মাতৃভূমিকে ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত করবোই । বরেনদা লক্ষ্য করলেন এই কাঠখোট্টা লোকটার চোখে জল । হঠাৎই লোকটা বরেনদার হাতটা ধরে থানার পাশের বড় মাঠটা দেখিয়ে বললেন -- এখন গভীর রাত , সবাই ঘুমাচ্ছে । যান , এই মাঠটা দিয়ে সাবধানে পালিয়ে যান । বরেনদা ভক্তিভরে থানার দারোগাকে প্রণাম করে অন্ধকার মাঠের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন । বরেনদার থেকে সেদিনের ঘটনার কথা শুনে লোকটার প্রতি আমাদের যে ধারনা জন্মেছিল সেটা মুছে গিয়ে এক পরম শ্রদ্ধা জেগে উঠলো ।

এতদিন পরে এই পাহাড় ঘেরা সুন্দর জায়গার হোটেলটায় " ঝাঁটা গোঁফ দারোগার " কড়াকড়ি নিয়ম দেখে প্রথমে বেশ বিরক্তই হলাম । পরে বুঝলাম এই রকম হোটেল চালাতে গেলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রাখতে হয় । যেদিন আমরা হোটেল ছাড়ব , সেদিন ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারার পর আমাদের গ্রামের কথা , সেই সময় আমাদের গ্রামে দারোগা হয়ে ওনার আসা , বিপ্লবীদের কথা বিশেষ করে বরেনদার কথা -- সব কিছুই ওনাকে বললাম । উনি সব শুনে পুরনো স্মৃতিগুলিকে মনের কোঠায় ফিরিয়ে এনে একটুখানি চিন্তা করে হাসলেন ... তারপর শূন্যে দৃষ্টি মেলে আপন মনে বললেন -- যেদিন আমাদের দেশ স্বাধীন হলো , সেদিন সবার মতো আমিও সারারাত আনন্দ করে রাস্তায় কাটিয়েছিলাম । একটা সময় চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এই হোটেলে কাজ করতে চলে এলাম । ......ভালকথা , আপনাদের ফেরার গাড়ীর ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি । ঠিক সময় গাড়ী হোটেলে পৌঁছে যাবে ।

হোটেলে মালপত্র নিয়ে আমরা তৈরি বেরোবার জন্য । দারোয়ান এসে বললো -- আপনাদের গাড়ী এসে গেছে । হটাৎ করেই ম্যানেজার এলেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আর সবার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন -- নিন , গাড়ীতে উঠুন , পাহাড়ী রাস্তা পৌঁছাতে সময় লাগবে , তাই গাড়ীকে আগেই আসতে বলেছিলাম । সাবধানে যাবেন , পারলে আবার আসবেন । বরেনদার থেকে এই লোকটি সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছিলাম , তখন ছোট ছিলাম তাই অতটা বুঝতে পারিনি । আজ ভবানী ঘোষাল ওরফে " ঝাঁটা গোঁফ দারোগাকে " নতুন করে চিনলাম , জানলাম আর উনি আমার মনের মধ্যে হয়ে রইলেন এক পরম শ্রদ্ধার ব্যাক্তি । ওনাকে একটা প্রণাম করে গাড়ীতে উঠলাম । গাড়ী চলতে শুরু করলো । যতক্ষণ দেখা গেল -- উনি হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানালেন ..... ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement