পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে যারা শুধু নিজের কথা ভাবে না। তারা কাউকে ভয়ও পায়না। কল্লোল সেন এই রকমই এক চরিত্র যে রাজনৈতিক নেতাদের ভয় না করে তাদের দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ আগস্ট ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

কল্লোল সেনের ডাইরি
ভৌতিক

সংখ্যা

মিঠুন মণ্ডল

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৬
২০১০ সালের ১৫ই জানুয়ারী কলকাতা হাইকোর্ট কল্লোল সেনের মৃত্যুকে আত্মহত্যার সিলমোহর দেয়। আমি একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক। আমি সেই দিন সন্ধ্যাবেলায় কল্লোলবাবুর বাড়ী যায়। টালা পার্কের উল্টোদিকে দুটো গলি পেড়িয়ে যখন পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যে ৭ টা। ঘরের ভিতর এক থমথমে পরিবেশ। বাড়ির ড্রয়িং রুমে আমাকে বসতে দেওয়া হয়েছে। ঘরের মধ্যে দুটো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি। একটা রবীন্দ্রনাথের অন্যটা কল্লোলবাবুর। চোখে পাওয়ারের চশমা, কোঁকড়ানো চুল, পড়নে ব্লেজার। আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই ছেলে কি আত্মহত্যা করতে পারে? কতলোক অসুখে ভুগছে, ভালোভাবে খেতে পাচ্ছে না, বেকারত্ব তারপরেও বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এই রকম একটা ছেলে, কিজানি মানুষের মধ্যে কত রকমের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। খেয়াল করিনি মনোতোষ বাবু ঘরে ঢুকেছেন। তিনিই বললেন, ‘এই ছবিটা চাকরী পাওয়ার পরে তোলা। আসলে যা হয় আর কি, চাকরী পাওয়ার পর অনেকেই আসে বিয়ের সমন্ধের জন্য। ও তো বাইরে থাকত তাই জোর করেই তুলিয়ে ছিলাম। মনোতোষ বাবু ব্যাঙ্কে চাকরী করতেন, বছর দুয়েক হল রিটায়ার করেছেন। ‘বুঝলে ভাই সারাজীবন হিসেব নিকেষ করেই কাটিয়েছে, কোনদিন কোন হিসাবের ভুল হয়নি। আজ আমার সব হিসেবনিকেশ গুলিয়ে যাচ্ছে। হাইকোর্টও বলে দিল আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে। আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। কথা গুলো একটানা বলেই চশমা খুলে হাতের উল্টো দিকে চোখটা ঘষলেন। অনেক চেষ্টা করলেন নিজের আবেগ কে ধরে রাখার, শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মনোতোষ বাবুর স্ত্রী উমাদেবি চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। খারাপ লাগে এই রকম ঘটনা কভার করতে গিয়ে। মৃত্যু সব সময় বেদনাদায়ক। বয়স কালে রোগে ভুগে মৃত্যুর জন্য আমরা প্রায় সকলেই মানসিক ভাবে প্রস্তুত। ২৬-২৭ বছরের কোন যুবকের মৃত্যু হলে তাঁর মা-বাবার অবস্থাটা সত্যি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর সকলেই তো রবীন্দ্রনাথ নয়, যে মেয়ের মৃত্যুর পরের দিনই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের জন্য মিটিং এ যোগদান করবেন। আমি মনোতোষ বাবুকে আসস্ত্ব করার জন্য বললাম এতোটা ভেঙে পরবেন না, আপনার যদি মনে হয় কল্লোল বাবু আত্মহত্যা করেন নি তাহলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারেন। ‘কি হবে আবেদন করে ? কোন প্রমানতো নেই দিপুকে (কল্লোল বাবুর ডাক নাম) হত্যা করার। ফালতু হয়রানি। তাছাড়া সুপ্রিম কোর্টে গেলেওতো আমরা আমাদের ছেলেকে ফিরে পাবো না’। কল্লোল বাবুর মা কথাগুলো একটানা বলে গেলেন। এই কথা শোনার পর আর কোন কথা থাকে না। মিনিট ২-৩ চুপচাপ বসে থাকলাম। পরিবেশ গম্ভীর দেখে বললাম, ‘আজ তাহলে উঠি দু-চার দিন পর না হয় একদিন আসব। কল্লোল বাবুর বাবা বললেন, ‘দেখুন আমাদের যা বক্তব্য ইতিমধ্যে দুতিনটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাই নতুন করে আর কিছুই বলার নেই। আমি দিপুর ডাইরীটা আপনাকে দিচ্ছি জেরক্স করে ফেরৎ দেবেন’।
II
আমি সেই দিন রাত্রেই ডাইরীটা পড়ে ফেলি। পরের দিন সম্পাদক মহাশয়কে বলি, ‘ডাইরীটাই যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ছাপি তাহলে মাস দুয়েক আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে না। আমি তাকে ডাইরীর সারমর্ম সংক্ষেপে বললাম। তিনি আমাকে ডাইরী থেকে কপি পেস্ট করতে মানা করলেন। একদিন পশ্চিম মেদিনীপুরের দাস পুরে যেতে বললেন, উমাদেবীর সাথে কথা বলতে বললেন এবং সর্বশেষে যেটা বললেন সেটা শুনে আমার পেশা সম্পর্কে একটু শ্রদ্ধা হারালাম। দেখুন মিঃ ঘোষ, লেখাটা যেন টান টান হয়। প্রথম কিস্তি পড়েই যেন পাঠক পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করেন। হাটে বাজারে, পাড়ার রকে যেন কল্লোল সেন নিয়েই কথা হয়। মোদ্দা কথা পাঠক সংখ্যা বাড়াতে হবে, তাহলেই বিজ্ঞাপন আসবে, আপনারও প্রোমোশন হয়ে যাবে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘টান টান মানে... । একটু বিরক্ত হয়ে সম্পাদক মহাশয় বললেন, ‘ আরে মশাই এই ট্রপিকটাকে একটু রং চড়িয়ে লিখবেন। আমি আচ্ছা বলে উঠে পড়লাম। যখন এই পেশায় আসব বলে ভাবতাম তখন চোখে রঙিন স্বপ্ন। দেশের সব দুর্নীতি গস্ত লোকেদের মুখোশ খুলে দেবো। কোথায় কি? প্রথম এক বছর শুধু জেলার খবর সংগ্রহ করতাম। একবার এক রাজনৈতিক খবর লিখতে গিয়ে বেশ বকুনি খেয়েছিলাম। এক রাজনৈতিক দলের বিগ্রেডে সভা ছিল। সভাতে বেশি লোক হয়নি। আমি খবরের শুরুটা অনেকটা এই রকম করেছিলাম, ‘ঐ রাজনৈতিক দল তাঁর পূর্বের জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, বিগ্রেডে এক বছর আগে যা লোক হয়েছিল তাঁর অর্ধেকও এবার আসেনি’। সম্পাদকের কাছে খসড়াটা নিয়ে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি তো আমাদের ডোবাবেন দেখছি। কি সব লিখেছেন। স্যার যা সত্যি তাই তো লিখবো। সত্যি কথা লিখতে হলে চাকরী ছেড়ে আত্মজীবনী লিখুন। এখানে ম্যানেজমেন্টের স্ট্যান্ড পয়েন্টই শেষ কথা। আমরা শাসক দলের বিরুধে লিখব। এটার হেডলাইন করুন, শাসক দলের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সভায় উপস্থিত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু স্যার গত বছর যেখানে এক লক্ষ লোক হয়ে ছিল, এবার তো তিরিশ হাজার হবে কিনা সন্দেহ। তিরিশ হাজার হোক কি তিন হাজার আমরা সংখ্যা নিয়ে ভাবব না, আমরা শুধু পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী খবর পরিবেশন করব। আপনাকে যা বললাম তাই করুন, এখন বুঝতে পারছেন আপনাকে কেন রাজনৈতিক খবর লিখতে দেওয়া হয় না। দু-বার কল্লোল সেনের বাড়ী গেলাম, একবার দাস পুরে গিয়ে নতুন বি.ডি.ও র সাথে কথা বললাম। প্রথম কিস্তি দেখার পর সম্পাদক মহাশয় বললেন মন্দ লেখেননি, দেখা যাক চায়ের কাপে ঝড় উঠে কিনা।
III
অনেক দিন ধরেই ডাইরি লিখব ভাবছিলাম। ২১ শে ফেব্রুয়ারী ২০০৭, তিন মাস হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাস পুরে বি.ডি.ও হিসাবে যোগদান করেছি। এখানে দুই কামড়ার একটা ঘর নিয়েছি। একেবারে গ্রামের শেষ প্রান্তে। পাশে একটা ছোটো পুকুর। একটু এগিয়েই একটা বাঁশ বনও আছে। সন্ধ্যের পর এদিকে খুব বেশি লোক জন আসেনা। মা একবার মানা করেছিল এখানে ঘর ভাড়া নিতে। বাজারের দিকে দু একটা ঘর দেখে ছিলাম। ঠিক পছন্দ হয়নি। সারাদিন এতো লোকের সাথে কথা বলার পর সন্ধ্যাবেলায় একটু নিরিবিলিতে থাকতেই ভালো লাগে। দুপুরে বাজারের একটা হোটেলে খেয়ে নিই, রাত্রে একজন আসেন রান্না করতে। ২০০৩ সালে সিটি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করি। ইতিহাসে অনার্স থাকায় W.B.C.S –এ প্রিলিমিনারী পাশ করতে সুবিধা হয়েছিল। ইন্ডিয়ান ফ্রিডম মুভমেন্ট যখন পরতাম মন কেমন হয়ে যেত। মেদিনীপুরের কত যুবক স্বাধীনতার জন্য শহীদ হয়েছেন। আজ কালকার নেতাদের কথা ভাবতে অবাক লাগে সবাই কেমন যেন আখের গুছাতে ব্যস্ত। সামান্য এক পুকুর কাটার জন্যও দলাদলি করে, একে অপরের বুকে ছুরি বসাতেও পিছপা হন না। মাঝে মাঝে মনে হয় দেশটা স্বাধীন না হলেই বোধ হয় ভালো হত। তাহলে মনে হয় নিজেদের মধ্যে মারামারিটা বন্ধ হত। যাইহোক স্নাতক হওয়ার পর একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম। বেশ নাম করা কোচিং সেন্টার। ১ বছরের জন্য ১২ হাজার টাকা ফিজ। কোচিং সেন্টারের চেয়ারম্যান বেশ সুবক্তা ছিলেন। ‘প্রতি বছর বেকার যুবক যুবতীর সংখ্যা সংখ্যা বাড়ছে। তাই বলে সরকারী চাকরী পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে তা নয়। চাকরী তিনিই পাবেন যিনি যোগ্য। First prepare then desire. আমরা অনেক সময় যোগ্য না হয়েও অনেক কিছু পাওয়ার আশা করি। আমাদের ইনস্টিউশন আপনাদের দিশা দেখাতে পারে চাকরী নয়’। প্রথম দিন ক্লাস করতে গিয়ে দু-একজনের সাথে আলাপ হল। অনেকেই অনেক দূর থেকে এসেছে। বেলঘরিয়ায় মেস করে থাকে। কেউ প্রিলি পাস করে মেন দিয়েছে তবুও আবার প্রিলি দিচ্ছে। W.B.C.S পরীক্ষার ফর্ম বেরোনো থেকে জয়েনিং করাতে প্রায় তিন বছর লেগে যায়। প্রথম বারেই আমি W.B.C.S পাস করেছিলাম। একই সঙ্গে স্টাফ সিলেকশনেও সিলেক্ট হয়ে ছিলাম। কিন্তু পশিমবঙ্গে থাকব, সপ্তাহ শেষে মায়ের হাতের মাছের ঝোল ভাত খাব বলে W.B.C.S এ জয়েন করি। যদিও গার্গী চায়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের রিভিনিউ অফিসার হিসাবে জয়েন করি। গার্গীর ঘর কুনো বাঙালী হয়ে থাকাটা মোটেও পছন্দ নয়। ও আমাকে সিভিল সার্ভিস দেওয়ার জন্যও অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু আমি জানি আমার লিমিটেশন। আজ অনেক রাত্রি হয়ে গেছে পড়ে গার্গীর কথা লিখব।
IV
আজ অফিসে একটা ঝামেলাই হয়ে গেল। যদিও প্রত্যক্ষ ভাবে আমার সাথে নয়। গ্রামে একটা পুকুর সংস্কারের জন্য টাকা এসেছে। কাজটা কে পাবে এই নিয়ে দুই পক্ষের তুমুল ঝগড়া। দুই পক্ষই একই দলের। কাজ করার জন্য টেন্ডার দিতে হয় ঠিকই কিন্তু কাজটা কে পাবে সেটা জেলাপরিষদের নেতা থেকে পঞ্চায়েত প্রধানই ঠিক করে। সবে কেরিয়ার শুরু করেছি এই রকম কত ঘটনা দেখতে হবে। যাগ গে বাদ দিন। গার্গী আমার পাড়ার মেয়ে । আমার থেকে এক বছরের বড়ো। ওদের পূর্ব পুরুষ ওপার বাংলার। ও একটু বয়েসে বড়ো বলে আমার ওপর খবরদারি বেশি ফলায়। কোন বিষয়ে তর্ক হলে কোন যুক্তি দেখাতে না পারলে ও মুদ্রা দোষের মতো বলত, ‘আমি তো তোর থেকে বড়ো it means I know better than you. এক দিন কথা হচ্ছিল ঋত্বিক ঘটক না সত্যজিৎ কে বেশি ভালো পরিচালক তাই নিয়ে। ওর বক্তব্য ঋত্বিক সত্যজিতের থেকেও বেশি ট্যালেন্টটেড কিন্তু সত্যজিতের মতো ফিল্ম বানানোর সুযোগ পাননি। আমি বললাম দ্যাখ সুযোগ কেউ কাওকে দেয় না সেটা করে নিতে হয়। সত্যজিৎ একের পর এক হিট ছবি বানিয়েছে তাই সে সুযোগ পেয়েছে। ও বলত, কচু হিট ছবি, কয়েকটা বিদেশ থেকে পুরষ্কার পেয়েছে তাতেই বাঙালী ধন্য ধন্য করেছে। ‘মেঘে ঢাকা তারার’ মতো সিনেমা কি সত্যজিৎ বানাতে পেরেছে। পথের পাঁচালী ও তো ঋত্বিক বানাতে পারবে না কোন দিন। আরও অনেক কথা বলার পর গার্গী বলল, ঋত্বিকই সব চেয়ে ভালো পরিচালক ওর ধারে কাছে কেউ নেই। কেন? আমি বলছি তাই। একদিন কথা হচ্ছিল কোলকাতার পূজা মণ্ডপ নিয়ে। যখন ওর পছন্দের মণ্ডপ আমার ভালো লাগে নি বললাম গার্গী এক মিনিট চুপচাপ থাকল তারপর বলল তোর মণ্ডপ সম্পর্কে কোন ধারনা নেই আমি তো ... ওকে মাঝখানে থামিয়ে বললাম, ‘দেখ কোন মণ্ডপ ভালো হয়েছে এটা বোঝার জন্য অনেক বয়েস দরকার নেই, এর জন্য দরকার নান্দনিক দৃষ্টি ভঙ্গি, একজন রিক্সাওয়ালার ৫০ বছর বয়েস হলেই কি সে কুমোর টলির কোন অল্পবয়সী শিল্পীর থেকে বেশি ভালো বুঝবে কোন ঠাকুর ভালো হয়েছে’। কিন্তু গার্গী কোন যুক্তি শুনতেই রাজি নয়। শেষে আমি একটু রেগে গিয়েই বললাম, ‘চুপ কর বাঙাল, কিছু জানিস না’। গার্গী আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। আমি ওকে শান্ত করার জন্য বললাম, অ্যাকচুয়েলি আমি না তোকে ওভাবে বলতে চায়নি। গার্গী গলা মিহি করে বলল, ‘তুমি কিভাবে বলতে চেয়েছিলে’? আমি চুপচাপ ওর মুখের দিকে চেয়ে আছি। এবার গলা ভারি করে ওর নিজস্ব স্টাইলে বলল, ‘ তুই বল ঘটি হয়ে কি উদ্ধার করেছিস। তুই জানিস ঘটিদের কোন কালচার নেই, যেটুকু আছে আমাদের কাছ থেকে শিখেছে। মানে রবীন্দ্রনাথ... আমাকে থামিয়েই, জানতাম তুই বলবি, রবীন্দ্রনাথ, মোহনবাগান আর কয়েকটা নাম নিয়ে আর কতদিন চালাবি? স্বাধীনতার পর বলার মতো কিছু করেছিস তোরা। অমত্য সেন যে নোবেল পেয়েছেন তিনি কিন্তু ওপার বাংলার লোক। আমি সত্যজিতের নাম বলব ভাবলাম, তারপর কি মনে করে আর বলিনি, সত্যজিৎ কে নিয়ে ভাগাভাগি না করায় ভালো। এদিকে গার্গী বলেই চলেছে, ‘শোন আমাদের বাপঠাকুরদা এমনি এমনি তো ঘর বাড়ী , জমি জায়গা ছেড়ে আসেনি। মাথার উপর ছাদ না থাকলে যে কি অসহায় লাগে সেটা যদি জানতিস তাহলে... কোন রকমে কান্না চেপে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তারপর দুদিন কথা নেই, তৃতীয় দিন অনেক বার সরি বলার পর এবং বাঙালদের অনেক গুণগান করে মানে তারা খুব পরিশ্রমী, বুদ্ধিমান সৃজনশীল ইত্যাদি ইত্যাদি শোনার পর গার্গীর উবাচ, ‘এবার লাইনে এসো, গুণীজনদের কদর করতে শেখো, এর পর বাঙালদের নামে কোন রকম বাজে কথা বললে সেই দিনই সম্পর্ক শেষ। আমি মনে বললাম পাগল, ন্যাড়া বেল তলায় একবারই যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যারা দ্বিতীয়বার ভুল করে মনে পড়ে প্রথমবার ভুল করেছিল। আমি সেই দলের। একদিন গার্গীদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার পর বললাম, বাঙালদের রান্না আর আগের মতো নেই। গার্গী আমার দিকে চেয়ে আছে। ঝড় ওঠার আগে যেমন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে, গার্গীর মুখের অবস্থাটা একটু ওই রকম। আমি প্রত্যাশিত ঝড়কে প্রতিহত করার জন্য বললাম, ‘না মানে মাসিমার মাছের ঝোলটা ... । আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ততটা ভালো হয়নি তো? দুদিন ধরে মায়ের জ্বর ছিল নেহাৎ তোকে খেতে বলেছিল তাই আজ উঠে তোর জন্য রান্না করেছে তোর মা হলে হলে তো না বলে দিত’। আমি ঢোগ গিলে বললাম, আমি ভেবেছিলাম তুই রান্না করেছিস’। গার্গী মুখ বেকিয়ে বলল, আমার বয়ে গেছে তোর জন্য রান্না করতে, একটা কথা মনে রাখবি Form is temporary but class is permanent.

V
ডাইরিতে আরও কিছু ব্যাক্তিগত ঘটনার বিবরণ আছে। সবটা আর লিখলাম না। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন গোপাল ছাড়া অফিসের অন্য কলিগদের সাথে ওই হাই-হ্যালো সম্পর্ক । তিনি জয়েন করার পর অন্য অফিসারদের উপরি ইনকাম কমে গেছে। গোপালের সাথেই কিছু মনের কথা ভাগাভাগি করে নিতেন। এই গোপালের সাথে দেখা করব বলেই আমি পশ্চিম মেদিনীপুরের দাস পুরে গেলাম। বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে কল্লোল বাবু মারা গেছেন। নতুন বি.ডি.ও এসেছেন। কাজকর্ম সব আগের মতোই চলছে। দুএকজন কে কল্লোল বাবুর কথা জিজ্ঞেস করলাম। কেউ বলল আমি ঠিক জানিনা, আবার কেউ বলল হ্যাঁ অনেক দিন আগে এখানে ছিল কেন যে তিনি সুইসাইড করেছেন বোঝা গেল না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি সুইসাইডই করেছেন আপনি নিশ্চিত’? লোকটা একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘না মানে সবাই তো তাই বলে’। বি.ডি.ও অফিসে গেলাম। সাংবাদিক শুনে সবাই একটু বক্র দৃষ্টিতে তাকাল। নতুন বি.ডি.ও সাথে আলাপ হল। তিনি বললেন , ‘আমি সবে ৬ মাস হয়েছে জয়েন করেছি, কল্লোল বাবুর পরে একজন এসেছিল তিনি হয়তো কিছুটা জানতে পারেন আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি কল্লোল বাবুর সম্পর্কে সোজাসুজি প্রশ্ন না করে বললাম, ‘আচ্ছা আপনাদের উপর চাপ কতটা থাকে? মানে কাজ কর্ম করতে গিয়ে কোন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন? এই ধরুন ছোটো খাটো কোন কাজের বরাত পাওয়া নিয়ে। ভদ্র লোক বিচক্ষন তিনি আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘আপনি এমন একটা জায়গার নাম বলবেন যেখানে আপনি কাজ করবেন অথচ কোন বাধার সম্মুখীন হবেন না? ছোটো খাটো সমস্যা থাকে। সকলে মিলে বসে মিটিয়ে নিই। দেখুন চাকরী করতে এসেছি নিজেকে সমাজ সংস্কারক ভাবার কি দরকার? আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। বেরোনোর আগে গোপালের কথা জিজ্ঞেস করলাম। উনি বললেন গোপাল আজ ছুটিতে আছে। পাশের গ্রামেই থাকে। আমি এই দিক ওইদিক করে কিছু খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টা করলাম। সেই রকম কিছু খবর পাওয়া গেল না। বেশিরভাগ লোক জনই ভুলে গেছেন। বিকেলের দিকে একবার গোপালের বাড়ী গেলাম। প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষার পর গোপাল বাবুর দেখা পেলাম। কলকাতা থেকে এসেছি শুনে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। তারপর শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন কি জানতে চান’? আমি গোপাল বাবুর চোখের দিকে একবার চাইলাম। মানুষের চোখ দেখলে বোঝা যায়, মানুষটা সাদাসিধে না ধূর্ত। এটা অবশ্য আমার এক সিনিওর কলিগ আমাকে বলেছেন। আমার চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে দেখে গোপাল বাবু একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন আপনি কি কল্লোল বাবুর সম্পর্কে কিছু জানতে এসেছেন। আপনি কি করে জানলেন? বছর খানেক আগে সি আই ডি থেকে দুজন এসেছিলেন। এক তলা দালান বাড়ী, সামনে উঠোন, ধানের একটা ছোটো গোলা করা আছে। উঠোনে আরাম কেদারায় বসে গোপাল বাবুর বাবা মাঝে মাঝে আমার দিকে চেয়ে দেখছেন।চার –পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে দরজার কাছে এসে আমার দিকে একটা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি চা টা শেষ করে গোপাল বাবুকে বললাম যদি বাইরে কোথাও বসে কথাবার্তা বলতাম ভালো হতো। গোপাল বাবু আমাকে একটা পুকুর পাড়ে নিয়ে গেলেন। বাঁধানো ঘাট, পুকুর পাড়ে বেশ কয়েকটা বড় বড় আম গাছ রয়েছে। পুকুরের একপাশে একটা বেদি করা আছে। গোপাল বাবুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এটা শীতলা মায়ের বেদি খুব জাগ্রত, গ্রামে কোন শুভ অনুষ্ঠান হওয়ার আগে সকলেই শীতলা মায়ের পুজো দিয়ে যান।
VI
সেই দিন পুকুর পাড়ে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বসে ছিলাম। কল্লোল বাবুর সম্পর্কে তিনি যা জানতেন প্রায় সবটাই বললেন। সৎ সাহসী একজন মানুষ। মুখে হাসি লেগেই থাকত। গোপাল বাবুর সাথে মন খুলেই কথা বলতেন। দু-তিনবার গোপাল বাবুর বাড়িও এসেছিলেন। গোপাল বাবু বিয়ের কথা বললেই কল্লোল বাবু হাসি মুখে উত্তর দিত, ‘আরে সবে তো ২৭ বছর বয়স আর কিছু দিন নয় একটু একা থাকি’। সেতো বুঝলাম কিন্তু তোমার বান্ধবীর বয়স তো আবার ২৮, সে কি অপেক্ষা করতে রাজী হবে? আরে সেটাই তো সমস্যা। ‘গার্গীর বাড়ী থেকে তাড়া দিচ্ছে, আমি কি যে করি, গোপালদা তুমি কিছু সাজেশন দাও না’? ‘বিয়েটা করে ফেল সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে’। এমনিতে মায়েদের সাথে ছেলেদের বন্ডিং ভালো হয়। কল্লোল বাবু আবার মা কে একটু ভয়ই পেতেন। বরং বাড়ী গেলে বাবার সাথে দাবা খেলতে বসতেন। মনোতোষ বাবু একদিন নাকি কল্লোল বাবুকে বলে ছিলেন, ‘একা থাকিস, ড্রিংস করিস নাকি? যদি খাস একা বসেই খাস বন্ধুদের সাথে খেলে আবার কন্ট্রোল থাকবে না’। পিছন থেকে উমাদেবী একটু ঝাঝিয়েই বলেছিলেন, ‘কি কথার ছিঁড়ি, বাবা না বন্ধু বোঝা যায় না, ছেলে কে কোথায় উপদেশ দেবে তা নয় উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছে’। উমাদেবী চলে গেলে মনোতোষ বাবু বলেছিলেন, ‘মনের ভিতর কোন দ্বন্দ্ব রাখবি না, যেটা ভালো মনে করবি সেটাই করবি’। গোপাল বাবুর আপসোস কল্লোল বাবু একটু ডিপ্লোম্যাটিক হলে মনে হয় এভাবে চলে যেতে হতো না। তাঁর স্টেট ফরওয়ার্ড হওয়ার জন্য অনেকের সাথেই ঝামেলা বেঁধে যেত। একবার এক পঞ্চায়েত মেম্বার একজনের নামে বিধবা ভাতা তুলতে এসেছেন। কল্লোল বাবু সেই মহিলাকে আসতে বললেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘কি দরকার সই তো করেই দিয়েছে, আপনিও সই করে পাস করে দিন, বেকার কেন একজন বয়স্ক মহিলাকে হ্যারাস করা’। কল্লোল বাবু বললেন, ‘সেতো বুঝলাম কিন্তু যে মহিলা ৬ মাস আগে টিপ সই দিয়ে টাকা নিয়েছে সে ৬ মাসের মধ্যে কি করে এতো ভালো সই করতে শিখলেন সেটা দেখব না’। ভদ্রলোক ‘ও তাই তো, তাহলে ভুল ফর্ম নিয়ে এসেছি বলে বেড়িয়ে যায়’। একজনের দুতলা বাড়ী থাকা সত্ত্বেও কি ভাবে বি পি এল কার্ড পায় এই নিয়ে কল্লোল বাবু প্রশ্ন করলে একজন পঞ্চায়েত মেম্বার বললেন, ‘ বাড়িটা তাঁর বাবার নামে আছে স্যার’। তারপর পিছন থেকে আর একজনের টিপ্লনী, ‘আপনি এমন ভাব করছেন যেন টাকাটা আপনার পকেট থেকে দিতে হচ্ছে’। কল্লোল বাবু মাঝে মাঝে গোপাল বাবুর কাছে আক্ষেপ করতেন, ‘এখন রাজনীতি ব্যবসার জায়গা হয়ে গেছে, কত ইনভেস্ট করে কত টাকা প্রফিট করলাম এই নিয়েই হিসেব নিকেস চলছে, সমাজের প্রান্তিক মানুষদের কথা কেউ ভাবে না’। কল্লোল বাবু মারা যাবার তিন দিন আগে একটা ঝামেলা হয়ে ছিল। ইন্দিরা আবাসন প্রকল্পের টাকা দু-এক জন আত্মসাদ করেছিলেন, কল্লোল বাবু এই নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। আগে দু একজন পিছন থেকে আওয়াজ দিত, সেই দিন এক নেতা বললেন, ‘আমাদের পিছনে লেগে টিকতে পারবেন, বেশি হাওয়ায় উড়বেন না, ডানা ছাঁটতে আমাদের বেশি সময় লাগে না’। কল্লোল বাবুর মৃত দেহ পুকুরে ভেসে উঠে ছিল। পোস্টমর্টেম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। কল্লোল বাবুর মা-বাবার জন্য অপেক্ষাও করা হয়নি। তাঁরা আসলে বলা হয় বডি ডিকম্পোজ করতে শুরু করে ছিল, তাই তাড়াতাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে খুনের কোন প্রমান নেই। খুন, আত্মহত্যা না কি নিছক দুর্ঘটনা প্রশ্ন রেখেই শেষ হয়ে গেল একটা জীবন। একটা চারা গাছ বৃক্ষ হওয়ার আগেই এক দমকা হাওয়ায় হারিয়ে গেল। কল্লোল বাবুর মা একটা কথা বলেছিলেন, ‘দিপুকে কত বলেছিলাম লোকের সাথে ঝগড়া ঝামেলা করিস না, রামমোহন, বিদ্যাসাগর এরা সমাজকে দুর্নীতি মুক্ত, কুসংস্কার মুক্ত করতে পারেন নি, তুই তো বাচ্চা ছেলে, তুই মারা গেলে লোকের দুদিনও সময় লাগবে না ভুলে যেতে। দাস পুরের মানুষ সতিই কল্লোল বাবুকে ভুলতে বসেছে।যেমন আমরা ভুলতে বসেছি ট্রাফিক সার্জেন্ট বাপী সেনকে। যাকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর প্রাণ গেল সেই মহিলা পরের দিন এফ আই আর করতেও এলেন না। আমাদের জীবন চলছে আপন ছন্দে। আই পি এল, ফেসবুক টুইটার নিয়ে আমরা দিব্বি আছি। ঝামেলা এড়ানোর জন্য মধ্যবৃত্ত বাঙালী আজ কাল সব কিছুই মেনে নেয়। প্রান্তিক মানুষদের কথা ছেড়েই দিন। তাদের হয়ে সব সময় ভাগ্যই কথা বলে। কল্লোল বাবুর মায়ের মতে, ‘দিপু পাগল তাই লড়াই করতে গিয়ে ছিল, আমার ছেলেটা অকালে চলে গেল’। কল্লোল বাবুর মা কে সান্তনা দেবার ভাষা আমার কাছে নেই। আবরাহাম লিঙ্কনের একটা কথা আজ মনে পড়ছে, ‘In the end, it’s not the years in your life that count. It’s the life in your years’.

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement