পিতা
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ অক্টোবর ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ১৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

পিতা
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

ম নি র মো হা ম্ম দ

comment ৫  favorite ০  import_contacts ৭০
বিদ্যাগঞ্জ হাই স্কুলে নতুন গণিতের শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। ভাগ্যক্রমে অনেক প্রচেষ্টা আর তদবিরে চাকুরীটা হয়ছে। আমাদের গণিত শিক্ষক চাকুরী পাবার পর এখন অদ্ভুত কিছু নিয়মের মধ্যে প্রতিদিন দিনানিপাত করছেন। ভোর পাঁচটায় উঠেই অংক নিয়ে বসেন। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যস্ত সব ক্লাসের অংক করেন এক নাগারে সকাল ১০ট অবধি। যেন কেউ বলতে না পারে স্যারতো অংক পারে না। তিনি মজার মজার অংক নিয়ে খেলা বের করেছেন বাচ্ছাদের দেখিয়ে চমকে দিবেন। তিনি একটি খাতায় নোট করেছেন যেমন ১১১ x ১১১ করলে ১২৩২১, এর মানে ১২৩ এইভাবে সংখ্যার ক্রমান্বয়ে ফলাফল আসে। আবার যদি ১ থেকে ৯ পর্যন্ত উল্টাভাবে ফিরে আসে এমন একটি মজার গুণন পদ্ধতিও তিনি নোট করেছেন। তা হলো-
১১১,১১১,১১১ x ১১১,১১১,১১১=১২৩৪৫৬৭৮৯৮৭৬৫৪৩২১
সাথে আছে পাই-এর মান ৩.১৪ -কে আয়নাতে উল্টিয়ে লিখলে দেখা যাবে ইংলিশে ঢ়রব লেখা হয়েছে। এরকম আরও অনেক মজার, জটিল অংক নিয়ে তিনি ব্যস্ত থাকেন। আগে স্যারের পরিচয় করিয়ে দেই স্যারের নাম হোসেন আলী। এই বয়সে এসে এই চাকুরীটা তার খুবই জরুরী ছিল। আগে উনি সরকারী চাকুরী করতেন। উনার বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই কিন্তু দেখে বুঝার উপায় নেই। তার স্ত্রী গত হয়েছেন প্রায় আট বছর হবে। এই আট বছরেই তিনি সস্তানদের মাথায় তিনি একটি বিরাট বোঝা ছিলেন। যাক তাদের মাথার বোঝাটা আজ কিছুটা হলেও হালকা হয়েছে। তিনি দুই ছেলে আর দুই কন্যার জনক। ছেলেরা আলাদা আলাদা বাসায় থাকে। বড় মেয়ে মিলুর বিবাহ দেওয়া হয়েছে আর ছোট মেয়ে নীলু ক্লাস টেনের ছাত্রী।
ওরা যখন ছোট্ট ছিল তখন তিনি দুই বোনকে নিয়ে ছড়া বানাতেন।
"নীলু মিলু দুই বোন
একই সাথে থাকে,
উপরওয়ালা যেন
তাদের মহা সুখে রাখে।"

উপরওয়ালা মহা সুখেই রেখেছেন, তিনি তার শহরের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে যাবেন। পেনশনের জমানো টাকা দিয়ে নিজ গ্রামে পাকা বাড়ী করবেন,উপরে থাকবে টিনের চালা। বর্ষাকালে বৃষ্টির শব্দে ঘুমাবেন।কতদিন টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ শুনেন না। তিনি তার পেনশনের টাকা পাঁচ ভাগ করে নিজের জন্য এক ভাগ রেখে বাকি টাকা চার সন্তানের নামে ডিপোজিট করে রেখেছেন। যেন তার মরার পর কেউ আঙ্গুল না তুলতে পারে। এই ব্যাপারে উনার এক বন্ধুর সাথে কথা হয়েছে। বন্ধুর নাম আশরাফ খান উনার ছেলেবেলার বন্ধু। ঢাকায় আগে প্রায়ই আসতেন উনাদের বাসায়। নানাবিধ জমির কাগজপত্র নিয়ে হাইকোর্টে দৌঁড়ঝাপ করতে পারতেন। খান সাহেবের মতে হাই কোর্টের চেয়ার টেবিলও টাকা চায়। টাকা ছাড়া দুনিয়া অচল হাইকোর্টএ গেলে বুঝা যায়। হোসেন স্যার বেজায় খুশি। এই যন্ত্রণাময় ইট-পাথরের শহর থেকে চির মুক্তি।

মেয়ে দুটি সকাল থেকে কান্না করছে। তারা কিছুতেই গ্রামে যাবে না। এই বাড়িতে তাদের মায়ের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মা নেই কিন্তু মায়ের স্মৃতিতো প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে আছে। মায়ের হাতে লাগানো বকুল গাছটায় কলি এসেছে। এই বাড়ির প্রতিটি পরতে পরতে তার মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তারা কিছুতেই এই বাড়ি ছেড়ে যাবেনা। মেয়েদের কান্না দেখে হোসেন স্যারেরও খুব কান্না পাচ্ছে। একটা বয়সের পর মানুষ খুব স্মৃতি কাতরতায় ভুগে। উনারতো এখন স্মৃতি কাতরতায় ভুগার কথা, কিন্তু না তিনি খুবই আনন্দে আছেন। কিন্তু বুকের গহীনে কেমন জানি একটা টান তাকে আকড়ে ধরে রেখেছে, তিনি সেই টানটা টের পাচ্ছেন কিন্তু কাউকে বুঝাতে পারছেন না। এই টানের নাম কি ভালোবাসা না অন্য কিছু?

হোসেন স্যারের বড় ছেলে রিফাত আজ তিন বছর হল বিদেশ থেকে এসেছেন এসেই আলাদা বাসা নিয়ে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে বলে গেছেন, এই আদিকালের বাড়ি তার শশুর বাড়ীর লোকজন পছন্দ করছেন না। তাই তারা তাদের মেয়েকে একটা ফ্ল্যাল্ট কিনে দিচ্ছেন। তাই উনারা চাচ্ছেন মেয়েকে নিয়ে আধুনিক বাসায় থাকতে। হোসেন স্যার বলেছিলেন আচ্ছা বাপধণ তোরা সুখে থাকলেই আমার সুখ। তোরা অনেক ব্যস্ত, নানাবিধ কাজ নিয়ে থাকিস,সময় পেলে মাঝে মধ্যে আসিস আর তোর বোনদের দেখে যাছ এসে, আমি আর কয়দিন? ছোট্টবেলায় আমি যখন অফিস থেক আসতাম তোরা সবাই দৌঁড়ে আমার কাছে আসতি। আজ সবাই দৌঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছিস। সবার আগে চলে গেল তোদের মা, এখন ধীরে ধীরে তোরা আমার সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছিস। তোদের মা বেঁচে থাকলে হয়ত এরকমটা হত না। তোরা যত দূরেই যাছ আমার ছায়া কোনদিন তোদের পিছু ছাড়বে না। এযে ভালোবাসার ছায়া, সব ছয়া এক সময় মিলিয়ে যায় কিন্তু ভালোবাসার ছায়া কোনদিন মিলিয়ে যায়না। বলতে বলতে হোসেন স্যারের চোখ ছলছল করে উঠল।


তোর মায়ের জন্য দোয়া করিস। দোয়াটা জানিস? নীলু মীলু দুই বোন লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কথা শুনছে। আর কী যেন একটা তীব্র কষ্টে বুকটা হাহাকার করছে। মেয়েরা মায়ের সাথে তাদের সব অনুভুতি প্রকাশ করে। হোসেন স্যার ডাকলেন মা নীলু একটা খাতা কলম নিয়ে আয় তো, আমার গাধা পুত্রকে দোয়াটি লিখে দেই, তিনি কাগজে লিখলেন " রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা!” এর অর্থ কি জানিস? এর অর্থ -হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। যা চলে যা সুখে থাক। এভাবে এক এক করে তার দুই পুত্র বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। রিফাত আগে মাঝে মধ্যে আসতো এখন মন চাইলে মসে দুই মাসে একবার আসে। এসেই বলে নীলু কড়া করে একটা চা দেত প্রচন্ড মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। চা খেয়েই নীলু-মীলু দুই বোনের হাতে ৫০০ টাকার দুটো নোট দিয়ে বলবে ভাল করে পড়া-শুনা করবি। দুই বোন টাকাগুলো একটা ডানোর কৌটায় জমিয়ে রাখে।

ছোট ছেলে সীফাত চট্রগ্রামে পোর্টে চাকুরী করে তাই তার বউ ও তার সাথে থাকে। আগে প্রতি দুই ঈদে আসার সময ফোনএ বলত “ বাবা তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবী কিনেছি আর নীলু মীলু জন্য নতুন জামা ” তখন তিনি শীতল গলায় বলতেন,আমর আগের পাঞ্জাবীইতো আছে একটু আয়রন করে নিলেই হবে শুধু শুধু টাকা নষ্ট না করে নিজের জন্য একটি শার্ট কিনিছি বাবা। আহারে এরই নাম পিতা। এখন ছেলেটা একটা ফোনও করে না। সময় দূরত্ব বাড়ায়। এটা হোসেন স্যার হাড়ে হাড়ে টেড় পাচ্ছেন। মিলুকে নিয়ে উনার কোন চিন্তাা নেই ,একমাত্র চিস্তা নীলুকে নিয়ে। মীলুর স্বামী দুবাই থাকে এবার এসেই মীলুকে নিয়ে যাবে। তখন মেয়েটা একা একা কিভাবে থাকবে? যাই হোক মায়ের কবরটাতো মেয়েটি প্রতিদিন একবার হলেও দেখতে পাবে। আর কতদিন অন্যের বাসায় থাকবেন। বাড়ীওয়ালা অবশ্য ফ্ল্যাট কেনার বুদ্ধি দিয়েছিলেন। কিন্তু উনার সাধ যে তাহলে পুরন হবে না। সামনে নীলুর টেস্টের পরেই উনি চলে যাবেন একবারে। মেয়েটার পরীক্ষার জন্য যেতে পারছেন না। এর মধ্যে একবার ফোন এ স্কুল কমিটির সভাপতির সাথে আলাপ হয়েছে, উনারাও সায় দিয়েছেন।

গতকাল মিলুর জামাই এসে মিলুকে নিয়ে চলে গেছে, উনার নাকি ছুটি নেই। এক সপ্তাহের জন্য এসেছেন, আজ বাড়ী যাবেন, তারপর সোজা দুবাই। নীলুর একা একা ভাল লাগছে না। সে তার বান্ধবীর বাড়ীতে থাকবে আজ। মেয়েগুলো কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।

এখন রাত্রি দ্বিপ্রহর আকাশে অষ্টাদশী চাঁদ , মনে হচ্ছে চাঁদটাকে হাত দিয়ে ধরা যাবে, হোসেন স্যার জানালার পাশে বসে চাঁদ দেখছেন। আহারে কী সুন্দর চান্নী।উনার গ্রামের বাড়িতে নারিকেল গাছের পাতার ফাক দিয়ে আগে এমন চাঁদ দেখা যেত। উনার স্ত্রী যেদিন মারা যান সেদিনও আকাশে এত বড় একটা চাঁদ ছিল।

সারা বাড়ি সুনসান নিরবতা, মনে হচ্ছে কেউ কোনদিন এই বাড়ীতে ছিল না। উনার খুব কষ্ট হচ্ছে, না চাইতেই দু’চোখ বেয়ে টপাটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। স্যার হাত দিয়ে অশ্রু মুছলেন।

হঠাৎ উনি খুব ঘামছেন। ঘরটা মনে হয় ঘুরছে, তিনি নীলু,মীলু বলে ডাকছেন। উনার খুব পানির পিপাসা পেয়েছে। মনে হচ্ছে এক গ্লাস পানি নিয়ে উনার স্ত্রী এক্ষুনি উনার সামনে এসে দাঁডাবেন। তিনি পানির জগ খুঁজতে গিয়ে বিছানা থেকে পড়ে গেলেন। বুকের বাম পাশটায় খুব তীব্র ব্যাথা করছে। ফজরের নামজের আগে আগেই উনি মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি কথাই বললেন হে আল্লাহপাক আমার সন্তানদের তোমার কাছে সফে দিলাম। হোসেন স্যারের শেষ ইচ্ছে আর পুরণ হলো না,উনার আর সন্তানদের পাশে নিয়ে গ্রামে টিনের চালার বৃষ্টির শব্দ শুনা হলো না। আহারে এরই নাম নিয়তি। এরই নাম পিতা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement