সুপ্রিয় পাঠক, প্রতিটি কাজে প্ররণা-রূপী উষ্ণতা কাজ করে।সেই উষ্ণতার পরশে উজ্জীবিত হয় মানব,বদলায় জীবন।গল্পে সেই উষ্ণতার বিচিত্র রূপের বর্ণনায় বিষয়ের সাথে গল্পের সাঞ্জস্যর চেষ্টা করা হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ এপ্রিল ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

রূপান্তর
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোঃ মোখলেছুর রহমান

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩২
ঈষদোষ্ণ জলে গোসল করা রুমির পুরনো অভ্যেস । এটা রুমির পৈতৃক সম্পত্তি বললেও অত্যুক্তি হয়না; কারন রুমির বাবা রহমত চৌধুরীও আজীবন ঈষদোষ্ণ পানিতে গোসল করতেন। রুমি তা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে।

রহমত চৌধুরী নিয়মিত যেমন গরম জলে গোসল করতেন তেমনি তার মেজাজটাও সব সময় ঈষদোষ্ণ হয়ে থাকতো। এই উষ্ণতা থাকাটা কোন কোন সময় তার জন্য সুফল বয়ে আনলেও কোন কোন সময় অবমাননাকর পরিস্থিতির উদ্রেক হত। এক্ষেত্রে পারিবারিক ভাবে তিনি একজন সফল মানুষ; সফল পিতা। তিন মেয়েকেই তিনি তার মনের মত করে গড়ে তুলতে পেরেছেন।

এক সময় টিভি সিনেমা দেখতে হলে বাবা মায়ের চোখ এড়িয়ে দূরে কোথাও গিয়ে দেখতে হত। সময়টা বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। চুপ করে টিভি সিনেমা দেখা কোনক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়লে পিতামাতার মনে যে উষ্ণতার কাজ করত তার উত্তাপ সারা জীবন বয়ে বেড়ানোর জন্য যতেষ্ঠ।

রুমির বয়স তখন সাত কি আট; তার স্পষ্ট মনে আছে পাশের মৃধা বাড়িতে প্রথম টিভি এলে গ্রামের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। রুমিও গিয়েছিল। বাড়িতে ফিরে এলে রহমত চৌধুরীর সেকি কান্ড; ভাগ্যিস রুমির নানা সেদিন তাদের বাড়িতে ছিল তাই সেযাত্রা রক্ষে। অবশ্য দুদিন পরে তিনি টিভি আনার ব্যবস্থা করেন যদিও নানার আপত্তি ছিল।

এতটুকু ঘটনা থেকে বোঝা যায় তাদের পরিবার ছিল অনেকটাই রক্ষণশীল, তবে তিন বোনই কলেজের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেছিল।

তিন বোনের রুমি সবার বড় দারুন মেধাবী কিন্তু নম্র ও ভাবুক শ্রেণীর,কিন্তু ছোট বোন রুসি সব থেকে দুষ্টু আর তেমনি কিউট; সারা কলেজ তার রূপের উষ্ণতায় সরগরম থাকতো। ছেলেরা প্রায় সময়ই তার দিকে হা করে থাকতো, গলা দিয়ে মশা ঢুকছে না মাছি ঢুকছে সেদিকে খেয়াল নেই।

মায়ের অবিকল যদি মেয়ে হয় তবে পড়শীরা মেয়েকে দেখে বলাবলি করে যে ‘মা একে বারে উগলে দিয়েছে’। সে অর্থে রুমি একশতে একশ।

তবে এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল মায়ের সাথে তিনবোন একত্র হলে মাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর;বাইরের মানুষ মনে করতো তারা চার বোন। এ নিয়ে কলেজেও হাসাহাসি কম হতনা। এতো গেল মা বন্দনা।

কলেজে তখন তিন বোনের রাজত্ব চলছে; বড় বোন রুমি মাতিয়ে রেখেছে কলা ভবন,মেজো রুহি বিজ্ঞান ভবন আর সব ছোট রুসি অল ক্যাম্পাস; যেখানে আড্ডা সেখানেই রুসি।

তবে সব থেকে মজার ব্যাপারটি হল সেবার কলেজে অভিভাবক সমাবেশে মায়ের পাশে বসে আছে রুমি। ঝড়ো গতিতে কোত্থেকে তমাল এস হাজির, খানিকটা বাতাস গিলে খেয়ে দাড়ায় রুমির কাছে। রুমি কিছু বলার আগেই ‘তোমার যে যমজ বোন ছিল আগে তো কোন দিন বলনি! তমালের কথা শুনে রুমি ভীষণ বিব্রত; তারপর মিহি গলায় বলে উনি আমার মা। তমালতো থ; ভাগ্যিস উনি ভাল শুনতে পাননি।

চুম্বকের বিপরীত মেরু যেমন আকর্ষণ করে ঠিক তেমনি রুমির কাছে আগমন ঘটলেও তার বোকামীর যে বিকর্ষণ তৈরী হয়েছে তাতে সেখান থেকে মন পালাই পালাই করছে। রুমি কি যেন বলতে যাবে ‘একটু ব্যস্ত আছি’ বলেই তমাল সটকে পড়ে কিন্তু বোকামীর উষ্ণতায় তখনো ঘামছে।

আজ কলেজে কি একটা ফাংশন চলছে, সকাল আটটার মধ্যে কলেজে যেতে হবে। কলেজ বাসে রুমিও বেড়িয়েছে। সবার গায়ে বাহারী পোষাক, অনেকের গায়ে পশ্চিমা স্টাইলনেস তাতে দর্শক বিমোহিত অভিভূত। কারও কারও লুলোপ দৃষ্টি আটকি আছে সেখানে।

রুমি পাশে বসা মেয়েটি শাড়ি পড়ে এসেছে, আলাপচারিতায় জানল সে দর্শন বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে,নাম রুপু। কথার ফাঁকে রুমি আশ্চর্য হল তার আঁচলের ফাঁকে একটি দর্শন আটকে আছে। রুমির সেদিকে চোখ পড়তেই ছেলেটি চোখ ফিরিয়ে নেয়। আলাপের এক পর্যায়ে রুমি রুপুকে বলে-‘একটি প্রশ্ন করব মনে কিছু নেভে না তো ভাই?’
রুপু সানন্দে ‘না’ বলে।
হালকা চিমটি কেটে ‘এই পেটটি অন্যকে দেখিয়ে লাভ কি?’ রুমি বলে।

মুহুর্তে রুপু অগ্নিশর্মা! তার মনে হচ্ছে এখনি গালে একটি ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়। চোখ দিয়ে তার আগুন ঠিকরে পড়ছে। রাগের উষ্ণতা হানা দেয় কণ্ঠনালীতে; গরগর করতে থাকে সে। মনে মনে আউড়ায় ‘আমার পেট আমি দেখাব, যাকে খুশি তাকে দেখাব।’ কিন্তু নীরব রোষের আগুনে তার গা জ্বলতে থাকে,বাড়তে থাকে উষ্ণতা।

=২=
‘খেলার সাথীরা কোথা আজ তারা
ভুলিয়াও গেছি নাম।’
মানুষে জীবনটা কতইনা বিচিত্র! কেউ বলে ত্যাগে সুখ কেউ বলে ভোগে সুখ। কেউ সুখে জন্য ঘর ছাড়ে,কেউ সুখের জন্য ঘরে ফেরে; কেউ বা জানেনা সে কোথায় ফেরে। রুমি জীবনও চলছে এক রকম। রুমির মনে পড়ে বাল্য-জীবনের কথা,স্কুল-জীবনে কথা। কত বন্ধ-বান্ধব কে কোথায় তারা! কবি সুফিয়া কামালের এ লাইনটি তার প্রায়ই মনে পড়ে।


ছোট বোন আমেরিকা,মেঝো ইউ.কে-তে আর নিজে পড়ে আছে বি.ডি-তে। তিনজন তিন মহাদেশের বাসিন্দা। তিন মহাদেশের তিন রকম উষ্ণতা দিয়ে তাদের জীবন আবৃত। আমলাত্ব আয়েশ না থাকলেও ভাত কাপড়ের অভাব নেই কারও।

তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতি সপ্তাহে কথা হয় তাদের কিন্তু আগের মত সে উষ্ণতা নেই, চপলতা নেই। কেউ বয়সের ভারে কেউ সংসারের কলকাঠি নেড়ে নেড়ে সেসব হারিয়ে যেতে বসেছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে আর এক মনে রুমি রোমন্থন করে চলেছে অতীত স্মৃতি।

নাই নাই করে কখন পঞ্চাটি বছর খসে গেছে জীবন থেকে; তবুও মনে হয় এইতো সেদিন থেকে পৃথিবীর চেনাজানা । মনটিও মনে হয় সেই অবিকল প্রথম সূর্যোদয়ের মত তাঁজা কিন্তু আরশির সামনে দাঁড়ালে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। মুখশ্রীতে ডুরান্ড লাইন,মাথা কাঁশফুল বীথি আর দন্তের গোড়ায় হাওড়-বাওড়ের সমারোহ কিন্তু মনে অথিতি পাখির নেই আনাগুনা।

ক্লাস থ্রি ফোরে আমরা যখন, দুষ্টুমি করলে মা’র ধমক খেয়ে আমরা বাবার কাছে লুকাতাম। বাবা আমাদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মাকে বলতো- ‘জানতো পুথি সব বয়সের একটা উষ্ণতা আছে, সে উষ্ণতার তেজ বিচিত্র।’

‘তুমিই তো লাই দিয়ে দিয়ে মেয়েদের মাথায় তুলেছ। থাকো তুমি তোমার উষ্ণার প্রকরণ নিয়ে। বাজারের কথা তো ভুলেই গেছ। দু’দিন থেকে ঘরে কিছু নেই সে খবর রাখো ?’ গিন্নির ঝাঝলো উত্তাপে রহরত সাহেবের চৈতন্য ফেরে। হাতে এখনও বেতন আসেনি, আরও দু’দিন বাকি। ঝিমিয়ে আসে রহমত সাহেবের তেজ কারণ টাকার উষ্ণতায় পুরুষেরা তেজ ফিরে পায়।

বাইরের বৃষ্টিতে ভিঁজতে থাকে ধরণী আর স্মৃতির বৃষ্টিতে ঘরে ভেঁজে রুমি। হঠাৎ তমালের কণ্ঠে বৃষ্টি থেমে যায়।
-কি ভাবছো রুমি?
-কই কিছুনা তো, রুমি উত্তর দেয়।

নিঃসন্তান দম্পতি রুমি ও তমাল। বয়সও হয়েছে । বয়সের ভারে দিন দিন ন্যুজ। উঠতে বসতে বাবারে মারে , কমরে ব্যথা হাটুতে ব্যথা।

স্পষ্টতই রুমির মনে পড়ছে সন্যাসিনীর সেই কথা-‘যার নেই ইন্দ্রীয় শক্তি তার নেই ভগবানে ভক্তি।’ কবিরাজি সাহিত্যে এই ইন্দ্রীয় বিশেষ অর্থ প্রদান করলেও পঞ্চ-ইন্দ্রীয় সবার পরিচিত। এই পঞ্চ-ইন্দ্রীয়ের বিশেষ উষ্ণতা বিশেষ সময়ে বিশেষ ধরনের প্রেরণা দেয়,মনে শক্তি যোগায়। উষ্ণতা এক প্রকার শক্তি বিজ্ঞানে এটা তো প্রমাণিত।
বাবা প্রায়ই বলতেন-‘ মা রে, বয়স কালের এবাদতই আসল এবাদত। আজ রুমি তা হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে। ধর্মীয় কাজে মন টানলেও শরীর তা টানেনা। শরীরের উষ্ণতা যত কমে আসছে মনে ধর্মীয় উষ্ণতা ততই বাড়ছে; অথচ এমন এক সময় ছিল মনে ধর্মীয় উষ্ণতার তেমন ঠাঁই ছিলনা, তখন যেন শরীরের উষ্ণতাই সব। মনের যখন কোন নিয়ন্ত্রন থাকে না তখন অনন্যোপায় হয়ে ‘সখি তোমারি চরণে’ কিন্তু সখি জানে এ কেমন ভালবাসা। হায়রে মানব জীবন!

সুমনা এসে বলে-‘মা পানি গরম হয়েছে।’ রুমি তাড়াতাড়ি উঠে গোসল সেরে নামাজ পড়ে নেয়।

সুমনা রুমির পালিত মেয়ে। রুমি-দম্পতির হাতের লাঠি। অনেক চেষ্টা করেও যখন সন্তানের আশা বিফল হল তখন কোন এক দুপুরে সুমনাকে নিয়ে তার মা ভিক্ষে করতে আসে। দৈন্যের যাতাকলে গায়ের চামড়া যতই না থাকুক সন্তান কারো বেশি হয়না, সুমনার মায়েরও হয়নি; রুমির আকুতির কাছে পরাভব মানে। রুমি কথা দেয় সে শুধু সুমনাকে লালন পালন করে মানুষ করবে মাতৃত্বেও দাবি করবেনা। তখন থেকে সুমনা ও সুমনার মা থেকে যায়। সুমনার মা পরিত্যাক্তা তাই সুমনার বাবা অন্যখানে সংসার পেতে সুখেই আছে।

সুমনা এখন অনেক পরিণত। একটি স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করছে।

রুমির শরীরটা দু’দিন থেকে ভাল নেই। শরীরে ঘুষগুষে জ্বর অনুভব হচ্ছে। ঈষদোষ্ণ জলে প্রায়ই নাইতে হয়। দুপুরে ঘুমনো অভ্যেসে পরিনত হয়ে গেছে। যেদিন ঘুম ধরে না সেদিন শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের জাল বুনে।

......পৃথিবীতে যদি কোন পথ-শিশু না থাকতো, কতই না সুন্দর হত এই পৃথিবী! সহসা মনে পড়ে ‘তবে নিঃসন্তানদের কি হতো! তারা কাদের সন্তান পালন করত!’ আবার কখনও ভাবে ‘সংসারে বিধাতা কেউরে ধন দিয়েছে কেউরে জন দিয়েছে। ধন পেয়েও সুখ নেই, জন পেয়েও সুখ নেই; আজব পৃথিবী!

কখনও কখনও মনে আসে ‘এত সম্পত্তি দখলে রেখে কী লাভ! সবই তো ফেলে যেতে হয়। অথচ এই সম্পদের উষ্ণতায় ফুটে কত কচি মুখ; কত তাদের বিচিত্র হাসি। যেন বোশেখের প্রথম বৃষ্টি,ধরণীর নরম উষ্ণতায় জেগে উঠে বৃক্ষরাজি। সবুজের সমারোহ, নতুন সাঁজে উঠে পৃথিবী; কি বিচিত্র তার রূপ! ভাবতে ভাবতে তার দু’চোখের কোণে পানি জমে উঠে। একটা অসহ্য বেদনা বুকে ঠেকে রুমির। শুধু একবার চোখ মেলে দেখে সুমনা তার মুখের উপর অঝরে কাঁদছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement