দুজন নারী পুরুষের গভীর ভালবাসায় একটি সন্তানের জন্ম । যে কোন নারী পুরুষের জীবনের এই অধ্যায় পূর্ণতা এনে দেয় । কিন্তু সন্তান জন্ম দিলেই কেউ পিতা মাতা হতে পারে না । পিতার পিতৃত্ব কিংবা মাতার মাতৃত্ব সন্তান কে আস্থা ,বিশ্বাস আর ভালোবাসার জন্ম দেয় । আমার গল্পের নাম ও "পিতৃত্ব "। যা গল্পের বিষয়ের সাথে খুব সুন্দর ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ । গল্পে একজন দায়িত্বহীন পিতা সন্তানের প্রতি অবহেলার চিরন্তন পিতার পিতৃত্ব কে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে । পিতা নতুন বিয়ে করে নিজের জীবন রচনা করে । প্রথম পক্ষের কন্যা পিতার পিতৃত্বের টানে বার বার বাবাকে দেখতে আসে । আর নিয়তির কারনে সব সময়ই অবহেলিত হয় । এমন করেই গল্পটা এগিয়ে যায় ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ১১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপিতৃত্ব (জুন ২০১৮)

পিতৃত্ব
পিতৃত্ব

সংখ্যা

নুরুন নাহার লিলিয়ান

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩১৮
গত পরশু রাতে আমার শাশুড়িকে নিয়ে আমাদের আবাসিক এলাকায় হাঁটতে বের হয়েছিলাম ।এক সপ্তাহ ধরে বিরতিহীন বৃষ্টি আর বজ্রপাত আমাদেরকে ঘর বন্দি করে রেখেছিল ।গ্রীষ্মের তীব্র তাবদাহ আর স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ মনটাকে কেমন গুমোট করে রেখেছিল । প্রায় ঘণ্টা খানিক হাটার পর একটু ক্লান্ত অনুভব করলে দুজনে ক্যাম্পাসের গাছের নিচের চেয়ারে বসি ।সন্ধ্যার পর অনেক মহিলারাই দল বেঁধে হাঁটতে বের হয় । অনেকে আবার ছোট ছেলে মেয়ে সহ পরিবারের অনেক কে নিয়ে বের হয় ।আধো আলো পরিবেশে রাতের ঢাকা নিয়ে আমরা দুজন যাপিত জীবনের গল্পে ডুবে ছিলাম । আর আমাদের চোখের সামনে সবুজ গাছ গাছালির ছায়া ভেদ করে স্বদম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা রাজধানীর হাজার ও অপরিকল্পিত চূড়াশীর্ষ দালান কোঠা দেখছিলাম ।এই বেরসিক গরমের রুক্ষতায় একটু একটু হীম হাওয়া মনকে প্রানবন্ত করে তুলছিল ।
এমন সময়ে এক মধ্য বয়সী মহিলা আর তাঁর সাথে পনের ষোল বছর বয়সী কন্যা । কাছে এসে আমাদের সাথে কথা বলতে চাইল ।আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম । মেয়েটির গায়ে রাজধানীর বিখ্যাত কোন কলেজের ড্রেস । মহিলা সাজ সজ্জায় কিছুটা গোছান থাকলে ও কথা বার্তা কেমন এলোমেলো লাগল । কলেজ ড্রেস পড়া মেয়েটির বেশ মায়াকাড়া চেহারা , সুন্দর আর লাজুক অভিব্যক্তির । আলো আধারি পরিবেশে ও মেয়েটির চেহারার দ্যুতি আমাদের চোখকে স্পর্শ করে যাচ্ছে । আমার শাশুড়ি মেয়েটির দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে ।
আমি মহিলাকে আমার ডান পাশে বসতে বললাম । মেয়েটিকে ও বসার জায়গা করে দিলাম । মেয়েটি মাথা নিচু করে আমার পাশে চেয়ারে বসল ।মেয়েটির মা আমাকে জিজ্ঞেস করল ," ভাবি আপনি কি এখানেই থাকেন ?"
আমি সহজ ভাবে উত্তর দিলাম ," জি ।ওই তো সামনের দুটো বিল্ডিং পরের বিল্ডিংয়ে ।"
মহিলা সঙ্গে সঙ্গে বলল ,"আমার হাজবেন্ড ও এখানে চাকরি করে ।ওই বিল্ডিংয়ে থাকে । আমি এখানে নিয়মিতই আসি ।"
আমি মহিলার অসংগত কথায় ঘাড় ঘুরালাম । কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম । আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম ,"আপনি আবাসিক এলাকায় থাকেন না ?"
মহিলা আমতা আমতা করে বলল ," না ।আমি থাকি না । আমার হাজবেন্ড ফ্যামিলি নিয়ে ওই বিল্ডিংয়ে থাকে । অভদ্র একটা লোক । দেখেন না এই মেয়েটাকে সেই দুপুর থেকে ডাক্তার দেখাবে বলে বসিয়ে রেখেছে ।এখন মোবাইল ফোন ও ধরছে না । "

আমি ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় নয়টা বাজে ।তারপর সচেতন ভাবেই জিজ্ঞেস করলাম ," কেন মোবাইল ধরছে না । এটা কেমন কথা । আর কতক্ষণ বসে থাকবেন । অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে । "
মহিলা এবার সকল লাজ লজ্জা আর আত্ম মর্যাদাকে এক পাশে রেখে বলতে লাগল ,"আসলে এই মেয়েটার তিন বছর বয়সে সে এক মহিলার সাথে পরকিয়ায় আসক্ত হয়ে আমার সংসার ছেড়ে আসে । তাকে নিয়েই এই সরকারী বাসায় নতুন সংসার করছে । সে সংসারে দুটো সন্তান ও হয়েছে । বাচ্চা দুটোই ট্যাঁরা । আর আমার এই রাজকন্যার মতো মেয়েটা বাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত । বাবাকে একটু দেখার জন্য ভিক্ষুকের মতো ঘুরে । "
মহিলা কথা গুলো বলেই হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল । আমি আর আমার শাশুড়ি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম ।মহিলা কান্নার মাঝে আবার চিৎকার করে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল ," জানেন ওরে আমার বাবা চার লক্ষ টাকা দিয়ে এখানে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে । এখন আমার সাথে সেই চাকরির ক্ষমতা দেখায়। চাকরি থেকে পাওয়া সরকারি বাসায় অন্য মহিলা নিয়ে থাকে । আমার ,আমার মেয়ের থাকার ভাগ্য হয়না । " তারপর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে । মায়ের বুকে মুখ লুকানো মেয়ের চোখ দিয়েও নিস্তব্ধ কান্নার জল গড়িয়ে পড়ে । তাদের বাঁধহীন কান্নায় অন্ধকারে যেন আমরা দুজনও চোখের পানিতে বুক ভিজালাম ।

মহিলার এমন অভিমান অভিযোগে ভরা কান্না আমাকে ভীষণ ভাবে ব্যথিত করেছিল । অনেকটা কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পরেছিলাম ।
আমরা আসলে কি বলব ঠিক বুঝতে পারলাম না ।আমাদেরকে ঘিরে থাকা রাতের আঁধার যেন আরও গভীর হয়ে উঠল ।আমার পাশে বসা মেয়েটি মোবাইল ঘেঁটে পিতা নামক লোকটার ছবি দেখাল । যে ফ্ল্যাটে থাকে তাঁর দরজার ছবি দেখাল ।ছবিতে দরজায় স্পষ্ট অক্ষরে লোকটার নাম আর পদবী লেখা। আমি বিশ্বাস ঘাতক লোকটা এবং ফ্ল্যাট কোনটাই চিনতে পারলাম না । শুধু মনে মনে অনুভব করলাম ওই দরজাটার কতো ক্ষমতা ! যে দরজা ভেদ করে পিতা তাঁর সন্তানকে দেখতে বাইরে আসতে পারে না । কিংবা সন্তান দরজার ভেতরে থাকা পিতার কাছে যেতে পারে না ।পিতা পরকিয়ায় পাওয়া স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য নিজের প্রথম স্ত্রী সন্তানকে অস্বীকার করে । কখনও পিতা কিংবা সন্তান ও কতো অসহায় !

মোবাইলের ছবিতে দরজায় থাকা ফ্ল্যাট নাম্বারটা আর পদবী দেখে বুঝলাম আমাদের বিল্ডিং থেকে খুব বেশি দুরে নয় । এই বিচিত্র ঢাকা শহরের কোলজড ডোর সোসাইটিতে আজকাল নিজের প্রতিবেশীদের খবরই জানা যায় না । সেখানে হঠাৎ এমন ঘটনা শোনা অবাস্তব কিছু নয় । এই শহরে হাজারও নিষিদ্ধ গল্পের ভিড়ে কয়টা গল্প আমরা এমন শুনতে পাই !

একজন নারী পুরুষ যেমন ভালবেসে সুখের নীড় গড়ে । তাদের দুজনের গভীর ভালোবাসায় একটি সন্তান পৃথিবীতে আসে । যে কোন কারনেই স্বামী স্ত্রী আলাদা হতেই পারে । একটি নিষ্পাপ সন্তান জন্মের পর থেকেই মা বাবা দুজনের ভালোবাসা প্রত্যাশা করে । পিতার পিতৃত্ব আর মায়ের মাতৃত্ব সন্তানের জীবনে শ্বাশত গভীরতম অনুভূতির অমুল্য সম্পদ । বেঁচে থাকার সকল আস্থা এবং ভরসা । কিন্তু দুর্ভাগ্য যদি কারও জন্মগত সঙ্গী হয় তার কাছে চিরন্তন ভালোবাসার শেষ আশ্রয় মা বাবা ও ভিন্ন অর্থ বহন করে ।

আমার শাশুড়ি তাকে বলল ," কেস করেননি ? সন্তানের ভরণ পোষণ তো দিতেই হবে । "
মহিলা বলল ," আমার বাবা জীবিত থাকতে নারী ও শিশু নির্যাতনের কেস করেছিল ।কয়েক বছর আগে বাবা মারা গিয়েছে । আর টাকার জোরে কেসটা শেষে তার পক্ষে নিয়েছে । কিন্তু সন্তানের কি দোষ !আমি অভাব দৈন্যতার কাছে ভীষণ অসহায় । মেয়েটার পরীক্ষার ফি দিতে হবে । এই ঢাকায় বেঁচে থাকতে টাকার অনেক প্রয়োজন । "
আমি জিজ্ঞেস করলাম ,"আচ্ছা আপনি নিজে কিছু করতে পারেন না ? এমন অকৃতজ্ঞ স্বামীর পেছনে না ঘুরে নিজের পরিচয়ে সন্তান মানুষ করুন । "
মহিলা খুব শান্ত কণ্ঠে ," আমি টুকটাক করে সংসার চালাই । মেয়ের পড়াশুনার খরচটা একটু বেশি । তাই কুলাতে পারিনা । তাছাড়া মেয়েটা বাবাকে মিস করে । "
আমার শাশুড়ি বলল ," সন্তান তো বাবাকে কি ভুলতে পারে ?"

মহিলা আবার ও বলতে লাগল,"এতো দিন এই দ্বিতীয় বিয়েটা লুকানো ছিল । মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতো ,নানা জায়গায় মেয়েকে নিয়ে ঘুরতো ,মেয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল । ইদানিং মেয়েকে ও এড়িয়ে থাকতে চায় ।আমাদের অসহায়ত্বটুকু কেউ বুঝবে না ।কেমন করে আমার নিজের হাতের সাজানো সংসার চুরমার হয়ে গেল ! সবচেয়ে বিশ্বাস আর আস্থার মানুষটি চোখের সামনে পর হয়ে গেল । "
তাদের সাথে কথা বলতে বলতে আমরা মেয়েটির বাবা যে বিল্ডিংয়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকে সেখানে এলাম । মেয়েটি হাত দিয়ে দেখাল ,"ওই ফ্ল্যাটে আমার বাবা থাকে । আমাকে নিচে অপেক্ষা করতে বলে এখন মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে ।"
আমি ঘড়িতে আবার তাকাই । তখন রাত প্রায় নয়টা । আমি বললাম ," আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন । এতো রাতে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরতে কষ্ট হবে । রাস্তা ঘাটে যেকোন বিপদ হতে পারে । "
মহিলা বলল , " মেয়ের পরিক্ষার ফি'র জন্য মাথা আমার খারাপ হয়ে গেছে । দেখি কি করা যায় । আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ । "
মহিলা চলে যাওয়ার পর সিকিউরিটি জিজ্ঞেস করল ," ম্যাডাম উনারা কি আপনাদের কিছু হয়? সেই দুপুর থেকে ওই ফ্ল্যাটের নিচে বসে ছিল ।নিরাপত্তার বিষয় । মহিলা মোবাইলে কারও সাথে ঝগড়া করছিল । বার বার নিচে আসার জন্য বলছিল ।"
সিকিউরিটির কোন কথাই মাথায় ঢুকল না ।আমি শূধু জনম দুঃখী এক মায়ের চলে যাওয়া দেখছিলাম ।একজন মা সন্তানকে একটু ভাল রাখার জন্য পৃথিবীর সব অন্যায় অপমান সহ্য করতে পারে ।আমার বুকের ভেতরটা কেমন দুমরে মুচড়ে যাচ্ছিল ।
এক মায়ের আর্তনাদ আর অভিশাপ কেমন যেন আমার চোখে দেখা পৃথিবীটাকে অনেক বেশি নিঃসঙ্গ করে দিল । মা নামক শ্বাশত শব্দটি আমাকে আবিষ্ট করে রাখল ।

আর চোখে দেখা কোন পিতার পিতৃত্ব ক্রমশ ধোঁয়াশায় ঠেলে দিল ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement