মাঝরাতের নিস্তব্ধতার মত জীবনে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে এক জীবন পথিকের। কিন্তু কেন? তারই জবাব আছে গভীর নিশীথে ছেয়ে থাকা এই গল্পটিতে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০২

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

অন্ধকারে আলো
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০২

ফেরদৌস আলম

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ২১৫
খাট থেকে অনতিদূরে কাঠের লম্বা টুল। তারই উপর টিমটিম করছে চার্জার লাইটটা। নিঃশব্দে। ঘরজুড়ে আলোর মৃদু আভা আর নিস্তব্ধতা ভেসে বেড়াচ্ছে জমাট মেঘের মত। নিচে অসার দেহ এলিয়ে আছে বিছানায়। জোছনা পারুলের। চেতনায় তার নানা ভাবনা চঞ্চলা শিশুর মত ছোটাছুটি করছে। দেখতে দেখতে পথ শেষ হয়ে এল জীবনের। প্রায় আশিটা গ্রীষ্ম-বসন্ত মিলে গেল হাওয়াই মিঠার মত। স্বাদ পেতে না পেতেই শূন্য হয়ে যাওয়া যেন ! ভাবলে বুকটা যতদূর পারা যায় স্ফীত হয়ে উঠে। উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস বাহিরে ছুড়ে দেয়। জীবনটা কি সত্যিই একটা দীর্ঘশ্বাস-এই প্রশ্নটা মনের মধ্যে উল্কার মত উকি দেয় মাঝে-মধ্যেই। আজ তার স্বপ্ন দেখতে ভারি ইচ্ছা করছে। প্রত্যাশিত স্বপ্ন। মানুষ তো স্বপ্নকেই তাড়া করে ফেরে জীবনভর। স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই তার বেঁচে থাকার তাড়না আসে প্রতিদিন। জোছনা পারুলেরও তাই-ই। প্রথম সন্তানের খুশির খবরে স্বামী সায়িদ জামানের মিসকিন খাওয়ানো। সন্তানের পৃথিবীতে আসায় পুরো গ্রামে মজলিশ খাওয়ানো। নারী জীবনে সন্তান আসে সার্থকতার আভরণ হয়ে। যদিও সেবার মরা-বাঁচার মাঝামাঝিই চলে গিয়েছিলাম। প্রবাহিত নদীর মত রক্ত দেখে ভড়কে যাইনি। টানা দুদিনের মৃত্যু যন্ত্রণার মত ব্যাথায় সাহস হারাইনি। শুধু মা হয়েছি বলে। কী এক অনাবিল আনন্দের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম বলে। একটা সন্তানের মা হওয়া মানে একটা স্বর্গ-শোভা মণ্ডিত পৃথিবীর অধিকারী হওয়া। আমার সেই তেরো বছরের ভঙ্গুর শরীরে অথচ উচ্ছ্বসিত মনের জোয়ারে। এভাবেই একে একে আমার গর্ভকাননে ছয়টি সন্তান যেন পদ্মের মত ফুটল। এসব আমার কাছে আজও স্বপ্নের মতনই লাগে। তাই বলছি।
-
গতকাল পর্যন্ত কোন ফোন আসেনি। আমি ভাবিওনি কারো ফোন আসবে। কাজে থাকলে ব্যস্ততা থাকবে। ব্যস্ত থাকলে কেইবা ফোন দিতে পারে। মাঝে মাঝে চিলাকাড়ি থেকে আমার বাপে যখন নায়ের নিতে আসত আমাকে। আমি সংসারের ছোট-বড় সব কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে বলতাম, বাবা, সংসার ছেড়ে এখন যাই ক্যামনে বলো তো? বাবা মুচকি হেসে বলত, আচ্ছা, সামনের ভাদ্র মাসে আবার আসব। তখন কিন্তু মানা করিস্‌ নারে মা। আমিও তো তখন কত ব্যস্ততা দেখিয়েছি আমার বাপকে। উত্তরা থেকে ফোনটা অবশ্য এখন বেশ কয়েক সপ্তাহ পরপরই আসে। গুলশান থেকেও মাসে একবার ফোন আসত। এ মাসেও হয়ত আসবে। ফোনের ও পাশের কণ্ঠগুলো শুনতে শুনতে আমি বিভোর হয়ে যাই বিগত জীবনের বাঁকে বাঁকে। আমার মেঝো ছেলে প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে আঁচল ধরে ধরে সারাক্ষণ পেছনে পেছনে থাকত। মাঝরাতে বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকত। যেন কোন কালেই কোনভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয় তাকে। মায়ের আঁচল থেকে। আজও সেই সন্তান যেন আমার আঁচলেই রয়ে গেছে। ছোট দুই ছেলেও সেই মা-ভক্ত সন্তান। ইনভার্সিটিতে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই বলত, মা, পরশু বাড়ি আসছি। টাকি মাছ ভর্তা, ছোট মাছের চচ্চড়ি আর তিলভর্তাগুলো করে রাখবে। আরেকজনে বলত, মা, আমার জন্য তেল পিঠা আর কুলি পিঠা। সন্তানের আবদারে কখনো কখনো বুক ভারি হয়ে উঠত। চোখে পানি টলমল করত আর ভাবতাম, এ যে আমার পদ্মফুলের বাগান। বৈদেশ থেকে সে দুজন নিয়ম করে মাকে ফোন দেয়। আমার ভারি ভালো লাগে। সন্তানগুলো আমাকে কত মনে রাখে।

-
এখনও বিদ্যুৎ আসল না। খেতে হবে। গ্রামে যে এখন মোটামুটী বিদ্যুৎ পাওয়াই মুশকিল। মাসে মাসে বিল ঠিকই দিতে হয়। কী আর করা। ল্যাম্পের আবছা আলোয় কষ্ট করে বিছানা ছেড়ে উঠে জোছনা পারুল । জানালার ধারে রাখা হাড়ি-পাতিলের দিকে পা বাড়ায়। ভাতের পাতিলের ঢাকনা খুললে উৎকট বাসি গন্ধ আছড়ে পড়ে নাকের উপর। ঐ যা, দুপুরে রান্না করা ছিল। ভ্যাপসা গরমে নরম হয়ে গেছে। তাই-ই মসুর ডাল মেখে কয়েক মুঠ খেয়ে নেয় মৃদু আলোয়। কম্পমান হাতে আধা গ্লাস পানি খেয়ে উঠতে গিয়ে উঠোনের দিকে চোখ পড়ে তার। কী অসম্ভব শীতল আলোতে ভরে গেছে সারা উঠোন। জ্যোৎস্নার আলোয় ভরে গেছে জোছনা পারুলের উঠোন। কী ভালো লাগছে ! এই উঠোন জুড়ে তার সন্তানেরা এক সময় খেলা করত, ছুটত, হাসির সাথে হাসির মিলমিশে এক অপূর্ব স্বর্গ হয়ে উঠত মুহুর্মুহু। চোখ বুজে খানিক তৃপ্তি পায় সে। জানালা বন্ধ করে জোছনা পারুল ল্যাম্প বন্ধ করতে যায়। পাশেই পড়ে আছে পরিশোধকৃত বিদ্যুৎ বিলের গ্রাহকের কপি। যে অফিসার বিল নিচ্ছিল সে কী অদ্ভুত মায়া করে তাকে বলছিল,
- চাচী, এত দূর্বল শরীরে আপনি কেন ব্যাংকে আসছেন বিল দিতে?
- কী করব বাবা, তোমার চাচা বেঁচে নেই তো।
- আপনার ছেলেপুলে কেউ নেই?
- আছে। থাকবে না কেন?
- কয়জন?
- ছয় ছেলে, বাবা।
- কেউ বাড়িতে থাকে না?
- না, বাবা।
- কোথায় থাকে?
- তিনজন থাকে ঢাকায়। দুইজন বৈদেশে। একজন শ্বশুর বাড়িতেই থাকে।
- ঈদে কেউ আসবে না?
- না, বাবা। কেউ আসবে না। সবাই অনেক ব্যস্ত তো। সবাই আমার সাথে ফোনে কথা তো বলে ! নিয়ম করে।
- ও আচ্ছা ! ঠিক আছে চাচী।
জোছনা পারুল ভাবে, এ কী করলাম ! বাহিরের একজনকে কেন এতসব বলতে গেলাম। কেন ? কেন? এ যে আমার সন্তানগুলো ! আমার পদ্মফুলের বাগান তো বেশ আছে। ওরাই তো আমার প্রাণের ধন। আমার সব ! আর কখনো এমন ভুল যেন আমার না হয় খোদা। তওবা, তওবা ! ল্যাম্প নিভিয়ে বিছানায় শুতে যায় সে। হঠাৎ বুকের মধ্যে প্রচণ্ড জোরে এক ধাক্কা খেয়ে যায় তার। অন্ধকার ঘরে আলো জ্বলে উঠে নিমেষেই। কীসের আলো? যেন শীতল জ্যোৎস্নার ধবধবে আলো ! দূরের উঠোনে চোখ পড়ে তার। স্পষ্ট দেখতে পায় জোছনা পারুল। তার বাবা। হাসি মুখে দাঁড়িয়ে। তাকে বলছে, মা, ভাদ্র মাস যে, তোকে নিতে আসলাম ! যাবি না আমার সাথে? এবার কিন্তু মানা করিস্‌ নারে মা! জোছনা পারুলের চোখের কোণায় সুখের ঢল নামে। বুকটা হালকা হয়ে আসে। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, আমি তৈরি বাবা, আমি তৈরি ! এবার আর তোমাকে ফিরে যেতে হবে না। নিশীথে আমার অন্ধকার ঘরে এত আলো আজ। উঠোনে জোৎস্নার আলো। আমি আসছি বাবা। আমি আসছি !

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement