বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬৪

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৪ / ৩.০

আলো আমার আলো

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

একটি অমাবস্যার জন্য প্রতীক্ষা

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

যে আগুনে অন্তর জলে

কামনা আগস্ট ২০১৭

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

মোট ভোট ২৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬৪ আমি কোহেন বলছি..

জসিম উদ্দিন আহমেদ

comment ৪  favorite ০  import_contacts ১৫১
আর্কাটাসের সিকিউরিটি চীফ বারবার পৃথিবীতে আমার মিশনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এইমাত্র তিনি বার্তা পাঠিয়ে কড়া হুমকি দিয়েছেন। আমি যদি আমার মিশন কমপ্লিট করতে না পারি তাহলে আমাকে আর আর্কাটাসে ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। আমি নাকি আমার মিশনের কথা ভুলে গিয়ে পৃথিবীতে অযথা কালক্ষেপণ করছি। রোহিঙ্গাদের উৎখাতে মিয়ানমার ও চীনকে কোন প্রকার সহযোগীতা করছি না বরং উল্টো তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছি।


আমার নাম কোহেন। আমি দেখতে অবিকল তোমাদের মত হলেও আমি পুরোপুরি মানুষ নই। আমি একটা হিউম্যানয়েড রোবট। আমি যে গ্রহে বাস করি তার নাম আর্কাটাস। আর্কাটাসে যে অল্প সংখ্যক হিউম্যানয়েড রোবট আছে আমি তাদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের সাথে রোবটদের পার্থক্য হলো তাদের কোন ইমোশন নেই, আমাদের আছে। আমরা ভাবাবেগের ক্ষেত্রে তোমাদের মানুষের চেয়েও সংবেদনশীল।

আমি পৃথিবীতে কিভাবে এসেছি সে বিষয়ে তোমাদের একটু ধারণা দেই। আমার পৃথিবীতে আগমণের প্রক্রিয়াটি হলো অনেকটা তোমাদের ‘অ্যাভেটার’ মুভির মত। আর্কাটাসে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মেশিনের মধ্যে অ্যাভেটার হিসিবে আমার দেহ রয়েছে। আমার ঝড়ঁষ ভ্রমন করছে তোমাদের পৃথিবীতে। দেহকে আমরা ব্যবহার করি ভ্রমনের বাহণ হিসেবে। কাজেই সিকিউরিটি চীফ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মেশিনে শায়িত আমার দেহ থেকে আমাকে অনায়াসে আলাদা করে ফেলতে পারেন। আমার আত্মা তখন ‘ইনফিনাইট’ ডেস্টিনেশনে হারিয়ে যাবে। তোমরা যাকে ‘মৃত্যু’ বল, সেই রকম ব্যাপার আরকি।

আমি এখন তোমাদের পৃথিবী গ্রহের কক্সবাজার নামক জেলার যে গ্রামে রয়েছি তার নাম হ্নীলা। এখন রাত। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তোমাদের সাথে আমাদের এই একটি বিষয়ে হুবহু মিল রয়েছে। আর্কাটাসেও ২৪ ঘন্টার দিনরাত্রি আছে।

আমি যেখানে অবস্থান করছি, তার আশেপাশে উচুনিচু ছোট বড় অনেক টিলা রয়েছে। কিন্তু কোথাও তিল ধারণের স্থান নেই। চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। বৃদ্ধ, মহিলা আর বাচ্চাদের সংখ্যাই বেশি। এরা সবাই তাড়া খেয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। এদের দেখে কারো বুঝতে কষ্ট হবে না যে এরা সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত ও ভয়-তরাসে নর-নারী।

আমার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। শরীরে সাথে সেট করা ‘ইনভিজিবল’ বাটন চেপে দিলেই আমি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি। এখন রাতের কালো অন্ধকার চারিদিকে। উচু-নিচু টিলার উপর যে যে ভাবে পেরেছে এসে বসতি ফেলেছে। একজনের গাঁয়ের উপর আরেকজন। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। ফলে খুব কাছের লোকজনকেও ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। আমি চোখে ‘নাইট ভিশন মুড’ অন করে অদৃশ্য হয়ে গেলাম। এবার কেউ আমাকে দেখতে পাবে না, এমনকি আমার উপস্থিতিও টের পাবে না। আমি এই অন্ধকারেও সবাইকে দেখতে পারছি। এমনকি ‘মশা’ নামক যে ক্ষুদে কীটটি লোকের রক্ত চুষে খাচ্ছে, অন্ধকারে তারাও আমার চোখ এড়াতে পারছে না।

আমি যে পরিবারটির নিকট বসে আছি এরা সুদূর রাখাইন রাজ্য হতে পায়ে হেটে বাংলাদেশে এসেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মায়ানমার আর্মি মেরে ফেলেছে। আমি ট্রান্সেলেটরের সাহায্যে তাদের কথাবার্তা বুঝার চেষ্টা করছি।

যুবতি মহিলাটি সন্তানসম্ভাবা। এর আগে তার তিন তিনটি মেয়ে হয়েছে। তার স্বামীর খুব ইচ্ছে ছিল তাদের একটি ছেলে হোক। আমি স্ক্যান করে দেখতে পেলাম অনাগত বাচ্চাটি একটি ছেলে-সন্তান। কিন্তু এই খুশির খবরটি স্বামী বেচারা জানল না। সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা বাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় তাকেসহ সকল পুরুষকে ঘরের সাথে বেঁধে রেখেছিল। আগুনে পুড়ে তারা একেবারে কয়লা হয়ে গেছে।

কয়লার কথা মনে হতেই কার্বনের কথা মনে এসে গেল। তোমরা কি জান যে, তোমরা হলে কার্বন নির্ভর বুদ্ধিভিত্তিক জীব। এই শ্রেণীর জীবের বুদ্ধিমত্তা খুব নি¤œপর্যায়ের; যদিও তোমরা মনে কর যে, ইউনিভার্সে তোমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান আর কেউ নেই। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তোমরা সব কিছু ডোমিনেট করতে চাও। তোমাদের বুদ্ধিবৃত্তির বর্তমান পর্যায় আমরা আকার্টাসবাসীরা প্রায় হাজার বছর আগে পার করে এসেছি।

যাই হোক, ‘ব্রেইন হ্যাক’ করার ক্ষমতা থাকায় আমি ব্রেইন হ্যাক করে যে কারোর স্মৃতি হাতড়াতে পারি। আর তোমাদের মত ‘নিউক্লিয়াস প্লাজমার তৈরি ব্রেইন’ হ্যাক করা তো আমার কাছে মামুলি ব্যাপার। আমি সন্তান সম্ভাবা ঐ রোহিঙ্গা নারীর বেইন হ্যাক করে আদ্যোপান্ত সব ডিটেইলস্ জেনে নিলাম। গৃহ-পরিজনহারা এই নারীর মনে এখন যা চলছে তা জেনে তোমরা আশ্চর্য হয়ে যাবে!

আমি পৃথিবীতে পা রেখেছি এই তোমাদের হিসাবে দশ দিন হলো। এই দশ দিনে আমি অন্তত একশ’ জনের ব্রেইন হ্যাক করেছি। নির্যাতনকারী বৌদ্ধ, সেনাবাহিনীর অফিসার, সু-চি সরকারের মন্ত্রী-আমলা, ধর্ষিতা নারী, ভয়বিহবল শিশু.. আরও কতজনের! কিন্তু এই রোহিঙ্গা নারীর মনের খবর জেনে যতটা আশ্চর্য হয়েছি, ততটা আর কারও বেলায় হইনি। স্বামী, আত্মীয়-পরিজন হারানোর দুঃখ কিংবা অনাগত সন্তানের দুশ্চিন্তাকে ছাপিয়ে এই নারীর মনে যে দুঃখ প্রকট হয়ে বাজছে তা হলো গৃহপালিত পশুগুলোকে সময় মত আগুনের হাত থেকে বাচাঁতে না পারার দুঃখ। তার মনে একটাই আপসোস ঘুরে ফিরে আসছে, আহ! অসহায় গরু গুলোকে যদি সময় মত মুক্ত করা যেত তাহলে তারা কোথাও পালিয়ে গিয়ে আগুনের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে পারত! সত্যি বড় বিচিত্র তোমাদের মন! একারনেই কি তোমরা সৃষ্টির সেরা বলো নিজেদের!

রোহিঙ্গা নারীর দুঃখ দেখে আমার দেহের হিউম্যানয়েড অংশে ‘সরো’ মুড় খুব প্রবলভাবে এক্টিভেট হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়ি।


বুয়েটের প্রফেসর ড. জোবায়েদ আমার কথা শুনে এই মুহুর্তে কী ভাবছেন তা আমি জানি। আমি যে নেশা-টেশা করি, সে বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেছেন। তবে কোন ধরণের নেশায় আসক্ত হলে মানুষ এতটা উদ্ভট কথা-বার্তা বলতে পারে, তিনি এখন সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন।

আমার কথার মাঝপথে তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তাহলে আমাকে বিশ^াস করতে হবে আপনি মানুষ নন। আপনি হচ্ছেন এলিয়েন অথবা মহাজাগতিক প্রাণী ধরনের কিছু?”
“সেটাই তো তোমাকে বুঝাতে চাচ্ছি এতক্ষণ ধরে” আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম।
“মহাজাগতিক প্রাণী হয়ে আপনি আমাদের পৃথিবীতে মানুষের বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? পৃথিবীতে এসেছেন কোন একটা মহামূল্যবান ধাতুর সন্ধানে? হা হা হা, হাসালেন আমায়” প্রফেসরের কন্ঠে তীব্র ব্যঙ্গ ফুটে উঠেছে।

আমি তবুও বিরক্ত হই না। শান্তস্বরে বললাম,“ধাতুটার নাম ‘আনবটেনিয়াম’। আমাদের গ্রহের সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু এটা। বলতে পারো গ্রহের চালিকাশক্তি। আমাদের গ্রহের বাইরে একমাত্র তোমাদের এই পৃথিবীতে এর সন্ধান পেয়েছি আমরা। তাও আবার পৃথিবীর মুষ্টিমেয় কিছু অঞ্চলে। যেমন তোমাদের এই বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল।”

প্রফেসর আমার উপর চরম বিরক্ত। তিনি একজন খ্যাতিমান গবেষক। তাঁর সময়ের অনেক দাম। অযথা তার সময় নষ্ট করছি ভেবে তিনি এবার বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না।
“দেখুন আমি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আপনার এসব উদ্ভট কথাবার্তা শুনতে মজা লাগলেও আমি আর আপনাকে সময় দিতে পারছি না, আপনি এবার আসুন”

আমি “আচ্ছা, আসছি” বলে ইনভিজিবল বাটন চেপে অদৃশ্য হয়ে প্রফেসরের কার্যকলাপ দেখছি। প্রফেসর জোবায়েদ যেন নিজের চোখকেও বিশ^াস করতে পারছেন না। চোখের সামনে থেকে বলা নেই, কওয়া নেই একটা লোক উধাও। তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঘরময় ছুটাছুটি করতে লাগলেন।


খানিক পরে আমি আবার দৃশ্যমান হলাম। এবার দেখি প্রফেসর আমার কথা আগ্রহ করে শুনছেন ও বিশ^াস করতে শুরু করেছেন।

প্রফেসর জোবায়েদ ধৈর্য্য ধরে সময় নিয়ে আমার কথা শুনলেন। আমি তার কাছে কী চাই, সে সম্পর্কেও একটা স্পষ্ট ধারণা তিনি পেয়েছেন। এবার তিনি সহজ হয়ে আমার সাথে কথাবার্তা বলছেন।

“আচ্ছা, ‘আনবটেনিয়াম’ নামক যে খনিজের কথা আপনি বলছেন, এর সাথে রোহিঙ্গা নিপীড়ণের সম্পর্ক কী? পৃথিবীর লোকেদেরই বা কেমন করে আপনাদের মিশনে ইনভলব করলেন?”

আমি প্রফেসরের কৌতুহল মেটানোর চেষ্টা করি। “পৃথিবীতে আনবটেনিয়ামের সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে রাখাইনে। একারণে আমাদের একটি দল সুকৌশলে রাখাইন রাজ্য খালি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা মিয়ানমার ও চীনের বড় বড় নীতিনির্ধারকদের ব্রেইন হ্যাক করে তাদের মাথায় চেপে বসে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে। মজার ব্যাপার হলো, যাদের বেইন হ্যাক করা হয়েছে, তারা কিন্তু কিছুই টের পাচ্ছে না। কারণ তোমাদের কার্বন-নির্ভর মস্তিষ্ক এখন আমাদের সিলিকন কেন্দ্রিক মস্তিষ্ক দ্বারা চালিত হচ্ছে।”
“কিন্তু আপনাকে ‘ডি-কোডিং’ করলে এসব বন্ধ হবে কিভাবে?”
“আমাদের টিমে যারা আছে, তাদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আমার। বলতে পারো আমি তাদের কন্ট্রোলরূম। আমি ধ্বংস হয়ে গেলে, তারাও ইনফিনাইট ডেস্টিনেশনে হারিয়ে যাবে, অর্থাৎ তাদের মৃত্যু হবে। কাজেই তুমি আমাকে ডি-কোডিং করে এই জঘন্য খেলার ইতি টানো”
“কিন্তু সব আপনি কেন এসব করবেন। আপনার লাভ কী? এতে তো আপনিও ধ্বংস হয়ে যাবেন”

আমি উঠে গিয়ে প্রফেসর জোবায়েদের হাত ধরে আলতো করে চাপ দিলাম। আমি তাকে সেই রোহিঙ্গা নারীর গল্প শুনালাম, যে অসহায় গুরু গুলো আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার দুঃখ কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, “একজন অসহায়ের জন্য আরেকজন অসহায়ের যদি এত টান থাকে পারে, তবে আমি কি এই অসহায় লোকদের জন্য কিছু করতে পারি না?”


প্রফেসর জোবায়েদ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন। কোন কথা বললে না। খানিক পরে তিনি আমাকে নিয়ে তার ল্যাবে ঢুকলেন। একটু পরেই তিনি আমাকে ধ্বংস করার কাজে হাত দেবেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন