লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ২৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা - তুমি কোথায় (মে ২০১৬)

বিজ্ঞাপন বন্ধ করুন

ভন্ড বাবু
মা - তুমি কোথায়

সংখ্যা

জসিম উদ্দিন জয়

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৯৩
কথায় আছে “ পাগলের সুখ মনে মনে”। গুটিপোকা যেমন আস্তে ধীরে হয়ে উঠে রঙ্গিন প্রজাপতি । রঙ্গিন ডানা মেলে আকাশে বাতাসে উড়েঁ বেড়ায়। বীজ থেকে কত সুন্দর মস্ত বড় গাছ হয়। সেই গাছে বাহারি প্রজাতির পাখি আসে। অথচ সেই ছোট্ট শিশু থেকে এত বড় হয়েছে সজিব। কিন্তু তার মানে একটা দুঃখ সে মানুষ হয় নাই হয়েছে একটা পাগল। দিন দূপুরে কবিতা লেখা আর স্বাধীন আচরণ কথায় কথায় নীতিবাক্য প্রচারের জন্যই সে পাগল উপাধি পেয়েছে। ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী রুপাকে সে বিজ্ঞানের কুলম্বের সূত্র বুঝাচ্ছিলেন যে,‘‘ কুলম্বের প্রথম সূত্র- একই ধরণে চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত ধর্মী চার্জ পরস্পরকে আকর্ষন করে। কুলম্বের দ্বিতীয় সূত্র - দুইটি বিন্দু চার্জের মধ্যে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল চার্জ দুইটির পরিমাণের গুণফলের সমানুপাতিক এবং এদের মধ্যে দুরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।” বুঝরে এই সূত্র দুইটি এক্ষনিই মুখস্ত করো । রুপা তার স্যারের বকবক করে পড়াশুনাটা মোটেও পছন্দ না তাই সে সজিবকে বলেই দিয়েছে ‘‘স্যার আপনার হাবাগোবা ভাব আর গরুর মতো নিরীহ দু‘টি চোখ দেখলে খুব মায়া হয়। রাগে দুঃখে সজিব বিজ্ঞানের বইটি বন্ধ করে বাসায় রওনা হয় । সজিবের আম্মু সজিবকে কিনতে দিয়েছিলো আটা সকালের নাস্তা বানানোর জন্য কিন্তু একটু পরে তার হাতে তাকিয়ে দেখে এক পাতিল মাঠা কিনে বাড়ীর দিকে যাচ্ছে। এদিকে গত সন্ধ্যে রাতেও এই রকম ভূল করেছিলো বাসায় মেহমান এসেছে রান্নাবান্না চলছিলো হঠাৎ তেল ফুড়িয়ে যাওয়ায় সজিবকে তেল আনতে বলেছিলো শেষমেষ সে তেল না এনে এনেছিলো বেল । এই ধরনের ভূল সজিব প্রায় করে থাকেন।
কথায় আছে ‘পাগলের সুখ মনে মনে’ প্রচন্ড একটা ক্ষেভের মধ্যেও গুনগুন করে গান গেয়ে পথ চলছিলো সজিব। তিন রাস্তার মোড় ঘুরতেই ধপ করে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে। গায়ে ছে্যঁড়া কাপড় জড়ানো। চুলগুলো ময়লায় জমাট বেঁধে আছে। মেয়েটির বয়স ৮/৯ বছর হবে। দু‘কাঁধে ঝুলানো একটা বড় স্কুল ব্যাগ। দুই হাতে দুটি বাজারের ব্যাগ। ব্যাগ দুটির ্ওজন প্রায় এক মন হবে। বাজারের ব্যাগটির ভেতর থেকে টাটকা গরুর গোস্ত আর মুরগীর মাংস ইলিশ মাছ মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো। ব্যথায় ‘‘ উহ্ আহ্ চিৎকার করে উঠলো। তড়িৎগতিতে ছুটে গিয়ে তাকে টেনে তুললাম। বললাম- ‘ কী খুকি ব্যথা পেয়েছ ? দেখে শুনে পথ চলতে হয়। তুমি কোন স্কুলে পড় ?
কথাটা বলতে দেরি, কিন্তু তার গালে চপেটাঘাতে দেরি হলো না। কোত্থেকে কালো সিল্কের বোরকাপাড়া এক মহিলা এসে “ঠাস ঠাস্ চড় বসিয়ে দিলো খুকির দুই গালে। তার পেছনে জীব থেকে নামলো আরেক টাই পরা ভদ্রলোক। নেমেই অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে বলতে লাগলো ‘‘ছোট লোকের আবার পড়াশুনা ”। ....ঝি . . . বাচ্চা এগুলো পড়লো কী করে। দোখো কী করেছে ? পাশে দাড়িঁয়ে দাঁত বের করে খিল খিল করে হাসছিল স্কুল ব্যাগটির মালিক সম্ভবত ভদ্রলোকটির মেয়ে।
ভদ্রলোকটি উত্তেজিত হয়ে আবার বললো ‘‘কুকুরের বাচ্চা’’ । তাড়াতাড়ি এগুলো বাসায় নিয়ে আয়। বলেই বোরকাপড়া মহিলাটি ও কথিত ভদ্রলোক ও তার মেয়েকে নিয়ে গাড়িতে উঠে শো.. শো করে চলে গেলে। কিন্তুু ততক্ষনে হাড়, জিরজিরে মেয়েটির দু‘চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে মাটিতে। দূর্ব্যল রোগা মেয়েটি খুব যতœ করে মাটিতে পড়ে যাওয়া ‘মাংসের টুকরোগুলো কুঁড়িয়ে ব্যাগে ভরছে। কুড়ানো শেষ হতেই পরবর্তি পরিনতির আশংকায় তড়িঘড়ি করে বিশালওজনের ব্যাগ দুটি কাঁেধ নিয়ে চলতে শুরু করলো কিশোরীটি। তার কষ্ট দেখে মনের টানে হাত বাড়িয়ে দিলাম। বিশাল ওজনের বাজারের ব্যাগ দু‘টি হাতে তুলে নিলাম। ¯েœহভরা কন্ঠে পেছন থেকে ডেকে বলালাম খুকি শোন। তোমার নাম কী ?
মেয়েটি ঃ জি¦ আদুরী। বাবা আমাকে খুব আদর করতো । তাই নাম দিয়েছিলো আদুরী । অবশ্য বাবা মারা যাবার পরে ঐ নাম ধরে আমাকে কেহ ডাকে নাই। শহরের ওনারা আমাকে ডাকে ‘‘কাজের ছেমরি’’ ।
মেয়েটির সাজিয়ে গুজিয়ে কথা বলা দেখে বলালাম ‘‘তুমি পড়াশোনা জানো বুঝি।’’
ঝঁটপট উত্তর দিলো - জানবে না কেন ? ৪র্থ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি। স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে খুব আদর করে বলতো ‘‘ তুমি আমাদের বিদ্যলয়ের গর্ব। তারপর বাবা মারা যাবার ছয় মাস পর আমার মায়ের বিয়ে হয়ে যায় অন্য কোথাও । অন্য সংসারে চলে যায়। আমার নানুর কাছ থেকে শহরের উনারা আমাকে নিয়ে আসে। নানুকে বলেছিলো পড়াশুনা করাবে। এই বলে শহরে নিয়ে আসে আমাকে। তারপর শুরু হলো আমার এই রকম জীবন। আমি এখন যাই ‘‘ দেরী হলো সাহেবে আমার পিঠে লোহা পুড়ে আগুনের ছ্যাকা বসিয়ে দিবে” কথাটি বলেই দ্রুত চলে যাচ্ছিল আদুরী।
আদুরীর পিঠে কালো কালো পোড়া দাগ ছ্যেড়া জামাটার অংশ বিশেষ দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো। এই করুণ দৃশ্য দেখে বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললাম খুকি আমি তোমাদের পাশের বাড়ীর তৃতীয় তলায় থাকি। বলতে দেরি হলো না - কথার প্রত্যুত্তরে আদুরী বললো ‘‘ আমি আপনাকে চিনি। আপনি ছাদের উপর বসে প্রায় কবিতা আবৃত্তি করেন উচ্চ স্বরে। বড় সাহেব আর ম্যাডাম আপনাকে পাগল-ছাগল কবি বলে গাল দেয়। আদুরীর কথা শুনে আমার মনটা বিন্দুমাত্র খারাপ হলো না। ছদ্ববেশী ভদ্রলোকরা কবি সাহিত্যিকদের পাগল-ছাগল বলেই থাকে। এটা নতুন কিছু না। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে ছাগল কে নিয়ে তিরস্কার করাটা । ছাগল নিরীহ সহজ সরল প্রাণী। আমাদের উপকার করে। শুনেছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশের উন্নয়নে এবং মানুষকে আত্মনির্ভারশীল হওয়ার জন্য ছাগল কাজে লাগিয়েছে। যা হোক ভদ্রলোক ছাগলের মর্ম বুঝে না তাই ছাগল বলে মানুষকে তিরস্কার করে।
এদিকে আদুরী খুব তরিঘরি করে ভারী ব্যাগ দুটি নিয়ে আদিম যুগের মজুরের মতো কাঁধ বাকা করে দ্রুত হেট চলে গেলো। সেই যে গেলো তারপর থেকে সেই ছোট্ট মেয়ে আদুরীর সাথে আমার দেখা হয় নাই। তবে মাঝে মাঝে পাশের বাড়ি থেকে ছোট্ট একটি মেয়ের চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। ভেসে আসে বা..বা-- গো.. মা গো... বলে। গায়েঁর মেয়ে আদুরীর চিৎকার চার দেয়ালে বন্দি নির্যাতনের শব্দ আস্তে আস্তে শেনা গেলেও আমার ভেতরে এই শব্দের কম্পন ধরে যায়। হৃদয়ের রক্তক্ষরন ঘটে, আমার বিবেক নামে রক্তের ফ্রেমে । প্রতিবাদ জানানো ভাষা থাকলেও উপায় নেই। ঐ ভদ্রলোকেরা প্রভাবশালী। বাড়ীর সামনে ধাঁপে ধাঁপে পাঁচটি গেট আর দাড়োয়ান পরিপূর্ন।
তারপর নদীর ¯্রাোতের মতো এগিয়ে গেলো অনেকটা সময়। বহুদিন পড়ে আমার এক বন্ধু অহিদুজ্জামান এর সাথে দেখা। একটা হলুদ ট্যাক্সি ক্যাব থেকে নেমে বললো, “শেখ আলাউদ্দিন আলাল ’’ আপনার কাছে যাচ্ছিলাম। আগামীকাল ‘বিশ^ শিশু দিবস’ উপলক্ষে শিশু উন্নয়ন পুরুস্কার ঘোষনা করা হয়েছে। কাল সেই পুরুস্কার দেয়া হবে। গাড়ী থেকে একটা ইনভাইটেশন কার্ড বের করে বড় বড় আক্ষরে লিখলো আমার নাম পাদবি। তারপর গাড়ীতে শো . . . শো. . . করে চলে গেল। গাড়ীর গতিবেগে একরাশ দুলোবালি উড়ে এল আমার নাকে-মুখে। ধুলোগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ভাবছি অহিদুজ্জামান শিশুদের উন্নয়নে কাজ করছে। মনে মনে খুব আনন্দ পেলাম। চারদিকে তাকালেই দেখা যায়- শিশু শ্রম, শিশু পাচার, শিশু নির্যাতন, শিশু হত্যার মতো জঘন্য দৃশ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে শিশুরা বেড়ে উঠছে একটি অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থা দেখে।
অহিদুজ্জামানের কার্ডটি খুব স্বযতেœ রেখে দিলাম। অপেক্ষা আগামীকালের অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য। সেখানে অনেক অনেক শিশু-কিশোর উপস্থিত থাকবে। অসহায় শিশুদের জন্য বিশেষ কিছু করা হবে। ভাবতে খুবই আনন্দ লাগছিলো। অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। অনুষ্ঠান শুরুর ১০ মিনিট আগে পৌছে গেলাম সেখানে। যথারীতি দর্শকদের উপস্থিতিও বাড়ছে। কিন্তু কোন গরীব শিশু কিশোরীদের কাউকেই উপস্থিত দেখা যাচ্ছে না সেখানে। তারা সবাই ফিটফাট বাবু । আমাকে প্রায় বেমানান লাগছিলো । তুবুও দর্শকদের সারিতে একটি কোণে চুপচাপ বসে রইলাম। অনুষ্ঠানের অতিথির একজনকে দেখেছি। তাকে বকাঝাকা করতে ইচ্ছে করছে কেন ? অনেকক্ষন ধরে মনে করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তার থেকে দুটি কথা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই কণ্ঠস্বর চিনে ফেললাম আমার মনে পড়ে গেলো এই তো সেই ব্যক্তি যার আনেক আনেক কালো টাকাআছে। আমাদের পাশের বাড়ীটা তো উনার । আদুরী নামের মেয়েটিকে পড়াশুনা করাবে বলে ঢাকায় নিয়ে আসে। তারপর তাদের বাসায় কাজের মেয়ে বানিয়েও শান্তু থাকেনি, চালিয়েছে আমানবিক নির্যাতন। নিজ চোখে সেদিন যা দেখলাম তা হুবহু আমর চোখের সামনে ভাসতে লাগলো । এই ভন্ড বিশেষ অতিথিকে দেখে মনের ভেতরে যা আনন্দ ছিলো তা মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল। ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে নিলাম স্টেজ থেকে। কাউকে কিছু না বলে ভারক্রান্ত মনে অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করলাম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী । তিনি এখনও আসে নাই। মাস তিন হবে তিনি প্রথমবারের মাতে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। শিশু উন্নয়ন পুরস্কার বিরতণ করবেন তিনি। তবে বিভিন্ন কজের জন্য যারা পুরুস্কার পেতে যাচ্ছেন্ তাদেরকে আমি চিনি। মা-বাবা‘র আদর-¯েœহ থেকে বঞ্চিত আদুরীর মাতো আরো কত শিশুই না জানি ভন্ডদের হাতে নির্যতিত হচ্ছে। আমাদের সামাজটা কী অঙ্কুরেই বিনিষ্ট হবে, নাকি সঠিক পরিচর্যা পেয়ে বেড়ে উঠবে আমাদের শিশুরা ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন