লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঅস্থিরতা (জানুয়ারী ২০১৬)

ভুলটা আমারই ছিল
অস্থিরতা

সংখ্যা

মোট ভোট

শ্রী সঞ্জয়---

comment ৬  favorite ০  import_contacts ১,১৬৩
মা, আমি চললাম । দরজা’টা বন্ধ করে নিও.. ।

আরে আরে খাবারটাও ভালো খাসনি য়ে ! আরো তিরিশ’টা মিনিট হাতে আছে । খেয়ে যা বাবা শোনা । খেয়ে যা- !

না মা ।সময় হয়ে গেছে । আমি চললাম-- !

কি যে করি, তোকে নিয়ে আর পারা যায় না । এত বলি তবুও কোনো মতেই তোর এতটুকুও- বদলায়নি আজও । সারাটা জীবন সেই গাধাই রইলি । আরে-, আরে- টিফিনের বাক্সটাও নিয়ে যাসনি যে । এতটা ভুলোমন হলে- কি আর তুই চলতে পারবি ! গাধা কোথাকার ।

আমি- মা কে ছোট্ট একটা প্রণাম করে আর টিফিনের বাক্সটা হাতে নিয়ে- দৌড় দিলাম সোজা ‘গরুড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ । আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীতে । নতুন নতুন ক্লাস আর নতুন নতুন বন্ধু । তার মধ্যে কিছু পুরানোও ছিল । তাই দ্রুত যাওয়া । যদি- ক্লাস শুরু হওযার আগেই কিছুক্ষন আলাপ আলোচনা হয়ে যায় বন্ধু গুলোর সাথে , কিংবা কিছুক্ষন খেলাধুলা হয়ে যায় । কারন আমাদের এগারো”টায় স্কুল শুরু হয় । আমি জানতাম সময় হাতে অনেক , তবুও- ছুট দিতাম নতুন একটা বিশ্বের কাছে ।

কিছুক্ষন বাদেই সব সহপাঠী’রা ধীরে ধীরে চলে এল । এমনকি প্রার্থনার ঘণ্টাও বেজে যায় । প্রতিটি শ্রেণী মিলে আট’টি লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম । তারপর প্রার্থনা শুরু-

জাতীয় সংঙ্গীত
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ
বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছল জলধিতরঙ্গ
তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিষ মাগে,
গাহে তব জয়গাথা ।
জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে ।।”


প্রার্থনা শেষ হল । তারপর দিদিমণির নিয়ম অনুযায়ী সবার হাতের নখ দেখা শুরু । আগে একবার দ্বিতীয় শ্রেণীতে মার খেয়ে ছিলাম । তাই এই ভুলটা আর করি না । পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আসি । নখ দেখার পর দিদিমণির আদেশ অনুযায়ী জল-টল খেয়ে বসার বেঞ্চে উপস্থিত হলাম । তারপর ক্লাস শুরু । প্রথম ক্লাসটা অঙ্কের । সবাই নিজে নিজের হোমওর্য়াকের খাতা জমা দিল মাস্টার মশাইয়ের টেবিলে । আমি কিন্তু দিলাম না কারন অঙ্কের খাতাটা যে আমি বাড়িতেই ভুলে এসেছিলাম । স্যার ডাকলেন আমায় । আমি গুটি গুটি পায়ে মাথা নিচু করে গেলাম স্যারের কাছে ।

নাট্টু-!- ‘তোমার অঙ্কের খাতা কোথায় ? জমা দাওনি কেন ? হোমওর্য়াক কি- তুমি করো নি ! নাকি করতে পারোনি । কি করেছিলে কাল রাতে বাড়িতে’ ।

না স্যার , আমি হোমওর্য়াক করেছিলাম কাল রাতে । কিন্তু- আজকে তাড়াতাড়ি আসাতেই আমি ভুলে গিয়েছি খাতাটা আনতে ।

কেন ? পাশেই তো তোমার বাড়ি । স্কুলে আসতে মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা ।এর থেকেও কম সময় লাগবে, আমার মনে হয় । এর মধ্যে ভুলে যাও কেমন ? শুনি ! এত ভুলোমন হলে চলবে !

না স্যার , আসলে খাবার খেতে খেতেই দেরি হয়ে গেছে আমার । মা খাবার বানাতে খুব দেরি করেছিল । এবার থেকে স্যার নিয়ে আসবো- সবকিছুই ঠিকঠাক করে ।

ঠিক আছে বসবে যাও । পরের বার ভুল হলে কিন্তু ছাড়ছি না ।

যাই হোক্ সত্য-মিথ্যা বলে-টলে আজকেই তো পেরিয়ে গেলাম । এবার রাতের টিউশন । বেশি দূরেই নয় । বাড়িতে । দাদার কাছেই । তবে, এখানে তো আর মিথ্যা-টিথ্যা বললে চলবে না, তাই- মনস্থির করলাম গুগলু , রামা , কিংবা গোকুলের সাথে একটুখানি খেলেই রাতের মানে টিউশনের পড়াটা করেই ফেলবো । খেলতেও গেলাম । কিন্তু, খেলার ছলে ভুলেই গেলাম নিজের কাজটি সম্পন্ন করতে । বেশ-, তবে সময়তো আর কারোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না । তাই-, সন্ধ্যেও নামলো । ধীরে ধীরে- হ্যারিকেনের আলোও আলোকিত হল গোটা দুয়ারটা । চেয়ারে দাদা । আমি তখন চুপিসারে বাংলার বইটা খুলে বসেই আছি এবং দ্রুত বেগে দুলেই যাচ্ছি । এক ঘণ্টা কেমন করে যে অতিক্রান্ত হয়ে গেল তা বুঝতেও পারলাম না । এর আগে পড়া না দিয়েও চুপিসারে অনেকবার পোগার-পার হয়ে গেছি । মনে মনে ভাবছি তখন, ‘আর তো দেড় ঘণ্টা । যেমন করেই হোক্ তা পেরিয়েই যাবে । তারপর তো আধা ঘণ্টা গল্পের ক্লাস’ । ভাবতে ভাবতে- কখন যে ঘুমে মগ্ন হলাম তা জানতে পারলাম না ।


ঠিক সেই সময়- খুব জোরে একটা বেতের আঘাত , আমার পিঠের উপর পড়লো ।

‘কি-রে, ঘুমানো ! দেখাচ্ছি মজা’ । তাড়াতাড়ি পড়া নিয়ে উঠে আয় । দেখি কি কি পড়া করেছিস্ সন্ধ্যে থেকে ।

উঠে-তো গেলাম । সাথে বাংলার বইটা আর ভূগোলের বইটাও নিয়ে গেলাম ।

কি রে ততক্ষন থেকে মাত্র এই দুইটি পড়া । বেশ-, ঠিক আছে ।
বল্ , এক বছর = কতদিন ?

প্রশ্নটি শুনার পর খুব খুশি হলাম । কারন, আগে থেকেই উত্তরটি আমার জানা ছিল । তাই-, ফট্ করে বলে দিলাম, ‘তিনশো পঁয়ষট্টি্ দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট ছেচল্লিশ সেকেণ্ড’ ।

বাঃ ! ‘ভেরি গুড্’ । এবার আর একটা প্রশ্ন- আমাদের জাতীয় সংঙ্গীত- “জনগণমন অধিনায়ক জয হে-” কার লেখা ?

প্রশ্নটি যে শুধু আমাকেই করেছিল তা নয় , সব্বাই-কে করেছিল । আমি এটাও জানতাম । তাই একটি লম্বা হাত তুলে দিলাম । সবাই বলার পর যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো তখন আমি খুব খুশি মনে বলে দিলাম । তখন দাদাও খুব খুশি হল এবং আমাদের মধ্যে যারা ভুল বলেছিল তাদেরকেও বলে দিতে বলল আমায় । আমিও বলে দিলাম । এটি- “কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা” ।

গুড্ ! ভেরি গুড্ । ব্রিলিয়েণ্ট্ । যা- বসবি যা । আর অঙ্ক যে ক’টা দেওয়া আছে তাড়াতাড়ি করে আন ।

আসার সময় খুশি খুশি মনে বসলাম নিজের আসনে এবং খুব তাড়াতাড়ি অঙ্কও করে নিয়ে এলাম । কিন্তু-, আমার তাড়াতাড়িতেই যে ভুলটা হয় তা অবশ্যই হয়েও গেল । কোনোটাই ঠিক করিনি । সব ক’টাই ভুল । শুধু মাত্র উত্তর পটিয়ে দিয়েছি । বেশ-, তারপর আর কি-, মার খেলাম দাদার হাতে । আরো বকুনিও শুনলাম খুব । ভুলটা আমারই ছিল । কারন -, গল্প শোনার তাড়া যে ছিল আমার । দাদা আরোও বলল;-

‘শুনি-, কবে ঠিকঠাক করবি ! এমন করলে দেখবি চতুর্থ শ্রেণীর মুখও দেখতে পারবি না । পরীক্ষায় দেখবি- গোল্লার পর গোল্লা-ই পাবি । মনে রাখিস্ যেন- । আর তো ক’টি দিন বাদেই পরীক্ষা । জানিস্- ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ । চেষ্টাতো- করতেই হয় সব কিছুতেই ।আর-, চেষ্টার সাথে সাথেও ধৈর্যটাও হল বড় ব্যপার । এটাও যেনে রাখো সব্বাই- ‘ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়’ । যে দেখে-শুনে কাজকর্ম করে সে জীবনে কক্ষনো বিফল হয় না । আর, তোর মধ্যে ধৈর্য-তো দূরের কথা চেষ্টারই কোন লক্ষনও নেই । না করলে আমার কি ! যা্ -, বসবি যা । গাধা কোথাকার’ ।

রাতটা গেল এমন করেই । এমন করেই দিন, কয়েকটি মাসও গেল দেখতে দেখতেই । কয়েকটি দিন বাদেই পরীক্ষাও এসে গেল । ফের ওই ভুলটাও- হলো আবার । অঙ্কের পরীক্ষার দিন ক্লাসের মধ্যে নাম কামানোর জন্য তাড়াতাড়ি খাতা ভর্তি করে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে জমা দিয়ে দিলাম । ভুল , কিংবা ঠিক লিখেছি কি না-, তা পুনরায় দেখার জন্য হাতে আরো আধা-ঘণ্টা ছিল । তবুও-, আমি যে- ‘গাধা এবং গরু’ । শুধু অঙ্কের ক্ষেত্রে নয়, সব বিষয়েই এমন হল । বাড়িতে এসে যখন দাদা কিংবা মা জিজ্ঞেস করে, ‘আরে- ফাটাফাটি, প্রশ্ন তো জলের মতো এসেছিল । একশো-তে তো ন’য়ের ঘরে অবশ্যই- আসবেই আসবে’ ।

ধীরে ধীরে পরীক্ষার ফলাফলের দিন এগিয়ে এল- । আমি খুব আনন্দিত হলাম । কারন, আমি জানি পাশই তো করবো । এমন জলের মতো প্রশ্নে কি কেউ ফেল করে নাকি ! যাই হোক ফলাফল হাতেই এল । ‘ফেল্’ । তারপর, আর বলার কিছুই নেই । বাড়িতে , পাড়াপড়শিতে, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ছড়িয়ে গেল- নাট্টু ফেল করেছে ।

পরে যখন দাদা স্কুলের গদাধর স্যারের ডাকে গিয়েছিল তখন জানতে পারি, আমার অস্থিরতা এবং ধৈর্য না থাকার কারনেই আমি ফেল করেছি ।আগে জানলে কি আর এমন করতাম । সত্যি “ভুলটা আমারই ছিল” ।








advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement