বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৬ মুক্তপ্রাণ অথবা কথকের গল্প

তুহেল আহমেদ
comment ৫  favorite ০  import_contacts ১৩৪
‘তোরা থাকবি তো কাল?’
‘এইতো, থাকছিই…’ এক স্বরে বলে ওঠে কয়েকজন।
‘আর শ্রুতি, তুই না বললি তোদের জুনিয়র কয়েকটা বেশ আগ্রহী ছিল, ওদের সাথে আর যোগাযোগ করেছিলি পরে?’ বাম পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা রাশেদ নামের একটি ছেলে উল্টা দিকের পিলারের পাশের একটি মেয়েকে লক্ষ্য করে বলে। রাশেদের ডাক নাম রুশো।
মেয়েটি ওর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ বলেছিল তো, তবে কালকের প্রোগ্রামে সবাই আসতে পারবে বলে মনে হয় না। কয়েকটা আসবে।’
‘কালকেরটা তো গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সবকয়টি দিক নিয়ে আলোচনা হবে।’ রুশো বলে।
ওর দিকে ইশারা করে কাছের অন্য একটি ছেলে বলে, ‘না রুশো ভাই, সমস্যা হবে না তো। আমাদের মূল গ্রুপের সবাই অ্যাটেন্ড এটা থাকলেই হলো, ফেসবুক গ্রুপে তো সবাই আছেই। ওখান থেকে জেনে নিতে পারবে।’
‘তাও ঠিক, তবু অন প্লেইস মিটিং বেশি কাজে আসে কিনা!’
‘আচ্ছা ভাইয়া, জায়গার কি করলেন? মূল প্রোগ্রামের জায়গা কি সামনের ওটাই হবে?’ অন্য একটি ছেলে রুশোর দিকে তাকিয়ে বলে।
‘জায়গা তো এটাই… আমাদের অপেক্ষাতেই আছে বসে।’ মৃদ্যু হেসে জবাব দেয় রুশো।
‘সরকারী জায়গা না এটা? অনুমতিপত্র লাগবে না?’
এবারের রুশোর মৃদ্যু হাসি পুরো মুখেই ছড়িয়ে পড়ে, ‘তোমার তো ভালোই ধারনা আছে দেখি এসব নিয়ে… হ্যাঁ, লাগে। তবে এটা ব্যাপার হবে না। আমার খুব কাছের এক বন্ধুর মামা হলেন এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ওর সাথে কথাও বলে নিয়েছি, ও ওর মামাকে বলে ব্যবস্থা করে দেবে, সমস্যা নেই। সামনেই ইলেকশন, উনাকে শুধু অতিথি লিস্টে রাখতে হবে আরকি।’
হালকা রকম হাসি ছেয়ে যায় সবাইকে, এবার অনেকেই সম্মতিতে মাথা নাড়ে।
--- সিলেট রেলওয়ের পুরাতন স্টেশনের পিছন দিকের দেয়াল ঘেসে বসে ১৫-২০ জনের এক দল ছেলে মেয়ে কিছু একটা করার পরিকল্পনায় আলোচনায় বসেছে। বিগত কয়েকদিন ধরে ওরা এখানে নিয়মিত বসছে, বিকেলের দিকে।

-
‘কলিকানন’ একটি শব্দ, একটি সংগঠন।
যেটা এখন এক ইচ্ছেশক্তি হয়ে কাজ করে যাচ্ছে অনেকগুলো জায়গায়, অনেকগুলো পার্কের বিকেলে অথবা সন্ধ্যের সোডিয়াম বাতির আলোতে।
তাদের ইচ্ছে শক্তির মূল লক্ষ্য হলো, পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করা। তারপর থাকে সাহিত্য আর সাহিত্যপ্রেমীদের সাহিত্যকে আরো বেশি ভালোবাসার সুযোগ করে দেয়া। আর সেই সময়ে সকল প্রেমীকে তাদের দিকে ডেকে নেয়া।
যারা সাহিত্যকে ভালোবাসে তারা অবশ্যই স্রষ্টার সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসে। আর, এই ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়েই এগিয়ে চলেছে ‘কলিকানন’।
তাদের চলার পথের নিত্য সূচি, কিছু ‘মুক্তপ্রাণ’ কিশোর-কিশোরী তাদের ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধুর সাথে কাটানোর সুন্দর মুহূর্তগুলো বিসর্জন দিয়ে ছোট ছোট কচি কাচাদের সাথে কাটায়। যাদের ‘টোকাই’ শব্দটি ছাড়া আর কোন নাম বা পরিচয় নেই এই সভ্যতায়, সেই তাদের জানায় যে, ওরাও এই সভ্যতার এক বিশেষ অংশ।
যারা স্কুলে যায় না তাদের স্কুলে যেতে আগ্রহের সৃষ্টি করে, প্রয়োজনে এদের অনেকের দিন মজুর বাবা-মায়ের সাথেও কথা বলে, বোঝায়।
এইসব কচি কাচাদের অনেকেই আগে মুদি দোকানে বা চায়ের স্টলে কাজ করতো, এখনো ওরা সেখানে কাজ করে। আর কাজ শেষেই ফিরে আসে মুক্তপ্রাণদের কাছে, নির্ধারিত স্থানে। সেটা হোক ভোর, বিকেল অথবা সন্ধ্যা।
মুক্তপ্রাণরা নিজেদের লেখাপড়া, টিউশনী শেষে সময় মিলিয়ে মিলিয়ে এসে মিশে কচি কাচাদের সাথে। তাদের স্বপ্নকে বড় হতে দিতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়। শেখায় ব্যক্তিসত্তা আর আত্মসম্মানবোধটা নিজের ভিতরে লালন করতে।

.
স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি উপহার স্বরূপ এক মুক্তপ্রাণ। নিজের মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার দায়িত্ববোধ থেকে দেখা স্বপ্নের বাস্তবায়নে ছোট পরিসরে ঢাকায় নিজের পাড়া থেকে শুরু করে ‘কলিকানন’ এর যাত্রা। তারপর চলতে চলতে আজ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
এই এখন ঢাকার বিভিন্ন অংশ সহ আরো দুটি শাখা আছে, চট্রগ্রাম আর রংপুরে।
প্রথমে এই মুক্তপ্রাণ একা এক শরীর ছিলেন, তারপর ধীরে ধীরে এসে তার পায়ের পাশে পা রাখে আরো অসংখ্য মুক্তপ্রাণ। যারা বিশ্বাস করে, ‘আমি মানুষকে অনুভব করতে জানি, জানি ভালোবাসতে।’

-
রাশেদ হাসান রুশো।
লেখা পড়া জীবনে প্রথমে স্থানীয় এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ২য় বর্ষে থাকাকালীন ‘ছাত্র ভিসা’য় দেশের বাইরে চলে যায়। ওখানকার প্রতিকূল পরিবেশে নিজের উচ্চতর লেখাপড়ার স্বপ্নকে জিয়িয়ে রেখে রেখে আসছিল সে। তবু, বিধির লিখন।
ওখানেও ২য় বর্ষে ওঠার পর ভর্তি জটিলতা দেখা দেয়। পরে সেসব কাটাতে কাটাতে এক সময় সব শেষ হয়ে যায়। ওকে ফিরে আসতে হয় দেশে।
এর সাথে ওখানকার কলেজ থেকে অর্জন করা ওর সাফল্য সনদগুলোও ওরা আটকে দেয়!
রুশো ছিল স্বপ্নময় তবু বাস্তববাদী একটি ছেলে। ও বুঝতে পেরেছিল যে, এই সভ্যতায় নিজের অবস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে দেখা স্বপ্নের বাস্তব রূপ আসবে না কখনো।
ওর স্বপ্নের একটিও কিন্তু বেঁচে থাকা জীবনের নয় বরং সব স্রষ্টার সৃষ্টির ভালোবাসায়।
দেশে ফেরার পর ও বুঝতে পারে, ওর ব্যর্থ জীবনটা ক্রমশই তার পূর্ণতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

এরকম হতাশাময় এক সময়ে ও ফেসবুকের সুবাদে ‘কলিকানন’ নামের কিছু একটার খোঁজ পায়।
দেখেই প্রথমে খুব বেশি আগ্রহী হয় যদিও, তবু ভাবে, কি আর হবে? এই শূন্য শতকে এরকম ‘মুক্তপ্রাণ’ এর অস্তিত্ব টিকে থাকা সম্ভব?
তারপরের কিছু সময় ওদের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা দেখে দেখে সে এতোই অবাক হয়! এই ‘কলিকানন’ ই তো ওর অনেকগুলো স্বপ্নের একটি! যে স্বপ্ন জিয়িয়ে জিয়িয়ে ও ভেবে কাটিয়েছে কত শত মুহূর্ত!
ও ওর সবটুকু সপে দিতে চায় এখানে।
তবু, সর্বহারাদের কাতারে দাঁড়ানো একটি ছেলে যার কাঁধে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মের অভিশাপ, কিই বা করতে পারে সে?
তবু ও যোগাযোগ করে ‘কলিকানন’ এর কেন্দ্রের সাথে, নিজের জন্মের শহরে শাখা নিতে। কিন্তু, ওরা আবেগের ছল ভেবে ওকে পাত্তা দেয় না তখন। এরপরও সে থেমে থাকে না।
কাছের-দূরের অনেক দিন কথা না হওয়া বন্ধুদের খুঁজে বের করে, বলে ‘কলিকানন’ এর কথা। কিন্তু, কে আর নিজের অর্থপূর্ণ সময় অর্থহীন কাজে ব্যয় করতে প্রস্তুত?
রুশো আর ওর কয়েক কাছের বন্ধুর ইচ্ছাশক্তির জোরেই আজ এই এখানে এসে দাঁড়াতে পেরেছে ওরা।
ছয় মাস আগের পাত্তা না দেয়া ‘কলিকানন’ এর নিয়ন্ত্রকরা নিজেরাই এগিয়ে আসে পরে ওদের দিকে।
স্থানীয় সকল সেচ্চাসেবকদের রুশোদের সাথে কাজ করতে বলা হয়।

তারপর আর থেমে থাকেনি ওদের চলা। পথে-ঘাটে, পার্কে, রেল স্টেশনে, যেখানে পারছে অবহেলিত শিশুর খোঁজ নিয়ে নিয়ে তালিকা তৈরি করেছে। প্রয়োজনে অনেকের বাসা অব্দি গিয়ে দিন মজুর অভিভাবককেও বুঝিয়েছে।
এই শহরের একটি শিশুও যেন বাদ না পড়ে অখেয়ালে, অগোচরে। এই এক লক্ষ্যেই ওরা এগুচ্ছিলো।
আর, এগুনোতে গিয়ে বেশ কয়েক জায়গায় সমস্যার সম্মূখীনও হতে হয়েছিল।
নিজের লেখাপড়া, মধ্যবিত্ত টানাপোড়ন এর সাথে সাথে এতগুলো মুক্তপ্রাণ এগিয়ে চলছিল কিছু একটা করার স্বপ্ন নিয়ে, স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে। ওদের স্বপ্নের মূলে ছিল, এই শহরে ‘কলিকানন’ এর জন্ম দেয়া।
আর এর এই শহরের শাখার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তারিখ মিলিয়ে মিলিয়ে ফেলা হয় কাছাকাছি থাকা বাংলা বছরের প্রথমদিন, পহেলা বৈশাখে। পৃথিবীর সুখ নামক বস্তু থেকে দূরে থাকা শিশুরা নববর্ষের নতুন আলো থেকে নিজেদের নতুন করে জানতে শুরু করবে।

-
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে ওরা বসে পুরাতন স্টেশনের পিছন দিকের দেয়াল ঘেষে।
ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে সেচ্ছাসেবকের আহবান করে। একসাথে শহরের সব শিশুকে তো আর নিয়ে আসা সম্ভব না, তাই যতটুকু সম্ভব প্রথমবারে, ওদের যথাসাধ্য।
অনুষ্ঠানটি কোথায় হবে ভাবতে গিয়ে ওরা ঠিক করে, রেল স্টেশনের পাশের অব্যবহৃত পড়ে থাকা পরিত্যক্ত মাঠ। সরকারী জায়গা, সে হিসেবে অনুমতিপত্রও যোগাড় করা হয়ে যায় একজনের মামা, স্থানীয় কাউন্সিলরের ক্ষমতা বলে।

-
মূল অনুষ্ঠানের সাত দিন আগের এক বিকেলে বসে ওরা আলোচনা করছিল, সাথে পথ শিশুর কয়েকজনকে নিয়ে গান, নাচ, অভিনয় শিখিয়ে শিখিয়ে চলছিল প্রস্তুতি। যারা এক আধটু গান জানে, ওরা গানে আর যারা নাচ জানে ওরা নাচে বা অভিনয়ে।
সে সময় হঠাৎ কয়েকজন বড় সড় লোক ওদের দিকে এগিয়ে আসে।
এসেই কড়া গলায় ওদের হুমকি ধামকি দেয়, গালিগালাজ করে, এই সবকিছু বন্ধ করে দিতে শাসায়। আর, বন্ধ না করলে খবর খারাপ হবে বলে দিয়ে যায়। ওদেরকে ‘ছেলেধরা’ নামে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ারও ভয় দেখায়।
কাছেই দাঁড়ানো নিঃশ্বাস টেনে বেঁচে থাকা অনেকগুলো মানুষ আর তাদের কৌতুহলী চোখ, উচ্চস্বরের কথা বার্তা শুনে তাকিয়েই দেখে শুধু।
আর ‘থ’ হয়ে ভয় মাখা অভিব্যক্তি নিয়ে বসে থাকা মুক্তপ্রাণরা ঠিক বোঝে না, ওরা কারা?
কেনই বা এসব বলছে? কচি কচি ছেলে মেয়েদের একটু হাসি পাওয়ার সাথে ওদের কি এমন সংঘর্ষ হতে পারে?

সেদিনের পর ওরা আর সেখানে না গিয়ে অন্যথায় বসে। তবু ওরা বুঝে না, আগের বিকেলের আগন্তুক কারা ছিল?
ওরা জানে না যে, সে মানুষরূপী শরীরগুলো হলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিকের পোষা প্রাণী।
এই এলাকার সকল ভিক্ষুক সহ পথ শিশুদের ভিক্ষার উপার্জন সে নেতার কোষাগারে জমা দিতে হয়, আর সেখান থেকে নাম মাত্র দেয়া হয় এদের মজুরি স্বরূপ।
এইসব পথশিশুরা যদি এখন মুক্তপ্রাণদের সাথে মেশা শুরু করে তবে কি আর ওদের ব্যবসা জমবে?
ওরা যখনই জানতে পারে, পথশিশু নিয়ে কাজের নামে কিছু ছেলে-মেয়ে বসছে, তখন প্রথমে ওরা ভাবে, এই বসা ছেলে-মেয়েগুলো ওদের মতই হবে। যারা পথশিশুদের নাম মুখে নিয়ে নিয়ে ছবি তুলবে নিজেদের নাম প্রচারের স্বার্থেই। কিন্তু কয়েকদিন নজর রাখার পর নিজেরাই অবাক হয়, এরা তো ভিন্ন!
তখনই লোক পাঠিয়ে ভয় দেখায়, ভাবে এইটুকুন ছেলে-মেয়ে ওতেই কাজ হবে।
তবু এইসবে কি থেমে যেতে পারে মুক্তপ্রাণরা?

-
তার ঠিক পরের দিন ফোন আসে শহরের নগর ভবন থেকে। ফোন করে রুশোদের যেতে বলা হয় সেখানে।
‘আশ্চর্য! নগর ভবন থেকে ফোন!’ রুশো অদ্ভুত রকমের অবাক হয়।
ওরা প্রথম দিকেই ভেবেছিল যে, মহৎপ্রাণ সিটি মেয়রকে ওদের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে রাখতে অনুরোধে যাবে, কিন্তু সরাসরি মেয়র অফিস থেকে রুশোকে ফোন করার মত তো কোন কারণ থাকতে পারে না। আর উনারা নাম্বারই বা কোথায় পেলেন ওর?
কিন্তু ওদের অবাক হওয়ার অনুভূতি সীমা ছাড়িয়ে যায়, অফিসে গিয়ে মূল কথাটা শুনার পর।
--পুরাতন স্টেশনের ঐ মাঠে ওদের অনুষ্ঠান করতে দেয়া হবে না।
প্রথমত, ওখানে নাকি বৈশাখী বানিজ্য মেলা বসবে, ওদের এইসব ছেলেমানুষী অনুষ্ঠান থেকে ওটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রুশোরা বলে, ওরা বেশ আগেই অনুমতিপত্র নিয়েছে জায়গাটার জন্য। তবু ওদের কথা শোনা হয় না বরং উল্টা শাসিয়ে এইসব আজাইরা কাজে সময় করে করে মা-বাবার পয়সা নষ্ট না করে নিজের ভবিষ্যতের দিকে মন দিতে বলা হয়।
ওরা আরোও কিছু বলতে চাইলেও বলতে না দিয়ে বের করে দেয়া হয় অফিস কক্ষ থেকে।
এ নিয়ে সে কাউন্সিলর মামার সাথে কথা বললে, দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না তিনি।
ওরা বুঝতে পারে, এরা চায় না ওরা মাঠটা অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করুক।
কিন্তু ওরা এটা জানে না যে, এই মাঠে মেলা বসানোর জন্য কিছুক্ষণ আগে একটা মোটা অংকের পরিমাণ হাত বদল হয়েছে এই কক্ষেই।

ওরা বেরিয়ে আসে সেখান থেকে, ভাবে এবার তো অনুষ্ঠানটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তারপর আগের দিনের লোকগুলোর শাসানোতে অনেকেই আজ আসেনি, আসবেও না আর জানিয়ে দিয়েছে।
তবু কয়েকজন দৃঢ়কন্ঠে বলে, আমরা যদি এই ক্ষণে থেমে যাই তবে যাদের আমরা স্বপ্ন দেখিয়েছি, সে ওরা এখানেই মরে যাবে। ওদের স্বপ্ন দেখার ইচ্ছাশক্তিগুলো এই সভ্যতাকে ভুল বুঝবে। কিন্তু আমরা তো ওদেরকে এই সভ্যতার অংশীদার প্রমাণের প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

-
পহেলা বৈশাখ, ভোর ছয়টা।
ভোরের হালকা রক্তাভ আলোতে ভাসে শত শত কলিতে ভরে ওঠা ‘কলিকানন’।
সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, রেল স্টেশনের পাশের একটি খোলা জমিতে। আগের সন্ধ্যায় বৃষ্টি দেয়ায় মাটি একটু নরম। এর উপর পলিথিন বিছিয়ে ওরা বসার ব্যবস্থা করেছে।
হুমকি ধামকি? জায়গা না দেয়া?
থেমে যাবে মুক্তপ্রাণরা?
নাহ্! ওরা থেমে থাকেনি।
নববর্ষের প্রথম আলোতে হাজারো স্বপ্নের জন্ম হলো, হাজারো অঙ্কুর প্রাণ ফিরে পেলো যেন!
ওরা যত ভেবেছিল ততো হয়তো আনতে পারেনি তবু এই কয়টি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব ওরা কাঁধে তুলে নিচ্ছে এই পবিত্রতম ভোরে।
বেশি ভোরের পরিকল্পনায় অনেকে না আসলেও আস্তে আস্তে উপস্থিতি বাড়বে আর অনেককেই তুলে এনেছে সেচ্ছাসেবকরাই।
এক জাগ্রত স্বপ্নের শক্তিতে ঘুমের কথা ভুলেই গিয়েছে যেন মুক্তপ্রাণদের ঘুমহীন চোখ।

এই অনুষ্ঠানের পর পরই ‘কলিকানন’ কে পাড়া ভিত্তিক আলাদা করা হয়ে যাবে।
আজকের দিনব্যাপী ওদের আছে কত পরিকল্পনা, ‘স্বপ্ন’ শব্দটির সাথে পরিচিত না হওয়া কচি কচি প্রাণরা আজ স্বপ্নের সাগরে ভাসবে।
আর মুক্তপ্রাণরা! ওরা ওদের ছেলেবন্ধু বা মেয়েবন্ধুর সাথে বৈশাখের ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটা বিলিয়ে দিচ্ছে জন্ম থেকে আনন্দহীন ভাবে কাটানোদের আনন্দে।

ঊষার প্রথম কিরণের সাথে স্বাগত বৈশাখী গানে শুরু হয় অনুষ্ঠান। তারপর একে একে অন্যসব আয়োজন।
কচিকাচার নৃত্য আর গানের ফাঁকে ফাঁকে মুক্তিপ্রাণরাও নিজেদের প্রদর্শন করে।
রুশো নিজের লেখা কবিতার একটি একটি করে আবৃত্তি শুনায় কিছুক্ষণ পর পর।
বসে থাকা শত কলিতে ভরে ওঠা কলিকাননের কলিরা অদ্ভুত ভাবেই উপভোগ করছে, যেন স্বর্গীয় অলীক কিছু! যেটা ওদের ভুল করে দেখা স্বপ্নেও আসেনি কখনো, ছিল না ধারনা সীমার ভিতরে।

আজ মুক্তপ্রাণরা অনেক বেশিইই সুখী ওদের স্বপ্ন সুখে।
অনুষ্ঠান পুরোদমে চলতে চলতে যখন মধ্যাহ্ন বিরতিতে যাবে, সে সময় হঠাৎ আসে সাইরেনের শব্দ।

খোলা জমির পাশের মহাসড়কে এসে থামে কয়েকটি পুলিশের গাড়ি। নেমে আসা পুলিশরা অনুষ্ঠানের দিকে আসছে দেখে কচিকাচারা সবাই দাঁড়িয়ে যায় নিজ নিজ জায়গায়।
মুক্তপ্রাণরা হতবিহবল হয়ে পড়ে, ভয়ে অনেকের চেহারা পাংশু বর্ণ ধারন করে নেয়।
পুলিশের দায়িত্বশীল একজন মঞ্চে থাকা রুশো আর ওদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে।
কথা বলার এক পর্যায়ে সেটা কথা কাটাকাটির দিকে চলে যায়। আর তৎক্ষণাৎ পুলিশের কয়েকজন জাপটে ধরতে শুরু করে রুশোদের কয়েকজনককে।
এই দৃশ্যটি দেখার সাথে সাথেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেচ্ছাসেবকের কয়েকজন পালাতে দৌঁড় শুরু করে, আর সেটা এক মুহূর্তে ছড়িয়ে যায় পুরো অনুষ্ঠানের সবার মাঝে। শুধু না পালানো কয়েকজনের সাথে চলতে থাকে পুলিশের হাতা হাতি আর লাঠি চার্জ।
রুশো আর ওদের সাথের বেশ কয়েকজনকে একরকম টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তোলা হয়। বাম চোখের উপর থেকে রক্ত ঝরা রুশোকে টেনে নেয়ার সময় ও মঞ্চের উল্টে যাওয়া টেবিল আর আশের মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভেঙে যাওয়া ছোট ছোট খেলনা ধরনের ক্রেস্টগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলতে থাকে, ‘হায়! আমরা চেয়েছিলাম তোমাদেরও এই সভ্যতার ভবিষ্যত বানাতে, ভবিষ্যতের প্রতিটি ধাপে তোমাদের ভাগটা, অধিকারটা বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু না, ওরা সেটা হতে দিতে চাচ্ছে না। ওরা চাচ্ছে, বর্তমানে যেমন ওরা আছে, ভবিষ্যতে যেন ওরাই থাকে। আর কেউ যেন না আসে ওদের পাশে।’

কিছু সময় আগে যেই কানন শত কলিতে ভরপুর ছিল, কিছু অদৃশ্য ঘৃণার ছোবলে সেটা কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে এক মৃতের শ্মশানে পরিনত হয়।
এটা কোন সাধারণ মানব শরীরের শ্মশান নয় বরং অজস্র স্বপ্ন আর তার ইচ্ছেশক্তির পুড়ে যাওয়া এক বধ্যভূমি।

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন