লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ এপ্রিল ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার বাবা (জুন ২০১৫)

বাবার আশীর্বাদ
আমার বাবা

সংখ্যা

মোহাম্মদ আবুল হোসেন

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৩৫
আকাশে কোটি কোটি তারার মাঝে তাকে খুঁজি। প্রতিদিন, প্রতি রাতে, পূর্ণিমায়, অমাবশ্যায়- সব সময়ই তাকে খুঁজি। বার বার দৃষ্টি আমাকে ফিরিয়ে আনে আপন মনের কাছে। সেখানেই নিপুণ এক কারিগরের হাতে গড়া একটি ছবি। সেই লম্বাটে মুখ। খোঁচা খোঁচা গোঁফ। লম্বা দাড়ি। প্রসারিত চোখ। কেমন করে যেন লুকিয়ে রেখেছেন রাজ্যির বেদনা। সেই ছবি এখনও আমাকে ডেকে বলেÑ কেমন আছিস বাজান। এখনও কি তুই আমার জন্য গোপনে কাঁদিস?
আমি নিরুত্তর।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি দূরের আকাশে। মেঘ উড়তে উড়তে একটি চমৎকার দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। ভালভাবে দৃষ্টি মেললে তাতে ধরা পড়ে একটি ছোট্ট ছেলেকে দু’হাত ধরে টেনে নিয়ে যা”েছ তার বাবা আর মা। বাস্তবে এমন দৃশ্য প্রতি ঘরে ঘরেই দেখা যায়। সন্তানকে আদরে, আবেশে জড়িয়ে রাখেন বাবা মা। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাবা আজও বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এমন করে আদর করতেন। বুকে জড়িয়ে ধরতেন। জ্বর হলে কুদ্দুসের দোকান থেকে কিনে আনতেন সামর্থ্যরে মধ্যে দু’টো টোস্ট। দু’হাতে লুকিয়ে রেখে পাশে বসতেন। বলতেনÑ বাবা চোখ বন্ধ করো তো।
চোখ বন্ধ করতেই মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দিতেন টোস্ট। গ্রামের কুদ্দুসের দোকানের টোস্ট। তখন এটাই ছিল আমাদের প্রিয় খাবার। সেই টোস্ট তখন আমাদের কাছে ছিল অমৃতের মতো। কিš‘ আজ বড় বড় বেকারির সেরা খাবারও সেই রকম ¯^াদ লাগে না। কেন জানি না। মনে হয়, এতে বাবার হাতের ছোঁয়া নেই। তাই এতে কোন তৃপ্তি আসে না। ই”েছ করে আবার যদি বাবা তার দু’হাতে সেই রকম দুটো টোস্ট এনে মুখের কাছে ধরতেন। এখনও ই”েছ করে নেই ছোট্ট বেলার মতো শিশু হয়ে যেতে। বাবা মার কাছে তার সন্তান তো চিরদিন শিশুই থাকে। সন্তান যখন সন্তানের জনক হয়, দাড়ি-গোঁফে পাক ধরে, নুয়ে আসে শরীর, তখনও সেই সন্তান তার পিতামাতার কাছে ছোট্ট থাকে। বাবা, ্আমিও তো এখন সেই ছোট্ট রতন হয়ে আছি। আমাকে আর একটি বার এসে কোলে নাও। তোমার হাতের ছোঁয়া এখন আমার হাতে লেগে আছে। বাবা, তুমি যেদিন আমাকে একটি নতুন লুঙ্গি কিনে দিতে হাটে নিয়ে গেলে, দোকানে নিয়ে গিয়ে বললে- বাবা তোমার কোন লুঙ্গিটা পছন্দ? আমি জবাবে বললাম- তোমার যেটা পছন্দ হয় কিনে দাও। কারণ আমার তখন এতটুকু বিবেক হয়েছে যে, আমি একটা লুঙ্গি পছন্দ করবো তার দাম যদি বাবার কাছে না থাকে, বাবা আমাকে সেই লুঙ্গি কিনে দিতে পারবে না, তাতে তিনি যে কষ্ট পাবেন মনে মনে, তা তো আমি কোনদিন দূর করতে পারবো না।
আমার পরিষ্কার মনে আছে, তুমি সেদিন দোকানিকে বলেছিলে- এটা আমার ছেলে। সে বাবা মার কথার বাইরে যেতে পারে না।
বাবার এই যে উ”চারণ, তা এখনও এতটা বছর পরে কানে বাজে। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। কথা আজ মনের ভিতর উঁকি দেয়। একবারে চিন্তা করতে গেলে এলোমেলো হয়ে যায়। কিছুই গুছিয়ে উঠতে পারি না। চোখের কোণে থেকে শুধু অশ্রæ ঝরে। হৃদয়টাতে ঝড় ওঠে। সে ঝড়ে উড়ে যায় সমস্ত কল্পনা। আমি কোথায়, কার কাছে, কে আমার অভিভাবক, বিপদে কার কাছে পরামর্শ চাইবো, কে আমাকে সৎ বুদ্ধি দেবে, কিছুই খুঁজে পাই না।
ভীষণ অভাবী সংসার ছিল আমাদের। মাঠে জমি বলতে কিছু ছিল না। বাবা দিনমজুরি করতেন। কিš‘ শারীরিক অসু¯’তায় তিনি বেশিদূর নিয়ে যেতে পারলেন না। গ্রামের বাড়িতে বসে বাঁশ দিয়ে বানানো শুরু করলেন মাছধরা ঘুনি, পলো, আরিন্দা, শাগরা আরও কত রকমের যন্ত্র। সেগুলো বাবার সঙ্গে আমিই নিয়ে যেতাম হাটে। কোনদিন তার দু’চারটি বিক্রি হতো। কোনদিন হতো না। বিক্রি হলে দু’এক সের চাল জুটতো বাড়িতে। রাতে বাপ-বেটা যখন সেই চাল নিয়ে বাড়ি ফিরতাম, দেখতাম বারান্দায় মিট মিট করে জ্বলছে চেরাগ। মা মুখে হাত দিয়ে বসে আছেন।
আমাদের ফেরার পরই শুরু হতো তার ব্যস্ততা।
তড়িঘড়ি করে চাল ধুয়ে দিতেন। চুলায় আগুন জ্বলত। পাশে বসে অপেক্ষায় প্রহর গুনতাম আমি, আমার দু’বোন শায়নি ও শায়ন্তি। সারাদিনের ক্ষুধায় তখন পেটে রাক্ষস খাবো খাবো করছে। মা তরকারি কুটতে কুটতে কখনও বাবা কখনও আমি চুলায় জ্বাল বাড়িয়ে দিতাম। ভাত হতে হতে মার কাটা তরকারি চুলায় উঠানোর জন্য প্র¯‘ত। তাতে শুধুই তরকারি। মাছ নেই। ডিম নেই। নিরামিষ তরকারি। এই রান্নার মাঝেই কত গল্প হতো। মা বলতেন- আমাদের এই দুঃখ আর থাকবে না। আমার বাজানরা যেদিন বড় অফিসার হবে সেদিন আমি হবো রাজরানী। বাবা বলতেন- আমার বাজানরা যে অফিসে চাকরি করবে সেখানে ঢুকতে গেলে দারোয়ানরা আমাকে ছালাম দেবে। বলবেÑ রতন স্যারের বাবা আপনি। আপনি এক মহান মানুষকে মানুষ করেছেন।
তাদের কথায় আমার বুকের ভিতর তখনই এক ¯^প্ন জন্ম নেয়। বাবা মার এই ¯^প্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাকে পড়াশোনা করতে হবে। আমাদের ক্ষেত, জমি কিছুই নেই। সম্পদ এক বিদ্যা। একে পুঁজি করেই জয় করতে হবে। পূরণ করতে হবে বাবা মার ¯^প্ন।
চৈত্র সংক্রান্তিতে কাদিরদী বাজারে মেলা বসে। মনে আছে, পাড়ার সব ছেলেমেয়ে সেই মেলায় যায় কত হই হুল্লোড় করে। তারা মাটির ঘোড়া, পুতুল, খেলনা, গরম জিলাপি কিনে আনে। পাড়াশুদ্ধ ছেলেমেয়ের বাঁশি বাজানোর সুরে মাতোয়ারা হতো। আমরা শুনতাম সেই সুর, আনন্দ হতো, ওদের আনন্দের সঙ্গে মিশে যেতাম, মনে মনে কষ্ট জিইয়ে রাখতাম বাবা মার সামর্থ নেই আমরা কিভাবে এসব উৎসবে যোগ দেব।

মনে আছে, একবার এমন এক মেলার দিন বাবা হাতে ধরিয়ে দিলেন ছয়টি টাকা। তখন ছয় টাকা দিয়ে অনেক কিছু কেনা যেত। বাবা টাকা হাতে দিয়ে বললেন- যাও মেলায় যাও। যা খুশি কিনে খাও। খেলনা কেন। আনন্দ করো।
ঠিকই বাবার হাত থেকে সেই টাকা নিলাম হাতে। নিয়ে চলে গেলাম ঠিকই মেলায়। সারা বিকেল ঘুরলাম মেলায়। এটা ওটা দেখি। মাটির কত সুন্দর সুন্দর খেলনা সাজিয়ে রাখা। বাঁশের তৈরী খেলনা খালুই। তাতে রঙ লাগানো। লাল-সবুজ রঙ। বসেছে চুড়ি-আলতার দোকান। নানা রকম খাবারের দোকান- জিলাপি, রসগোল্লা, আমৃত্তি, কদমকুসি, ছানার সন্দেশ, সন্দেশ আরও কত কি! ঘুরে ঘুরে দেখলাম সব। ছেলেমেয়েরা ই”েছ মতো কিনছে সে সব। কেউবা মনের আনন্দে বাঁশি বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে ছুটে যা”েছ বাড়ির পানে। আমি শুধুই দেখলাম। সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরে এলাম তখন আমার হাত খালি। অন্য বা”চাদের মতো আমার হাতে খাবার নেই, খেলনা নেই।
বাবা আমাকে দেখে বললেনÑ কিরে বাবা সব খাবার খেয়ে এসেছিস?
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা বললেন, টাকা হারিয়ে ফেলেছিস?
আমি পকেট থেকে বের করে আনলাম ছয় টাকা। বাবাকে দেখালাম।
বাবা চমকে উঠলেন। বললেনÑ কিরে বাবা কিছু কিনিস নাই?
আমি বললাম, না বাবা। আমি কি”ছু কিনি নাই। এই টাকাটা আমি ভাঙি নি। কারণ, আমার খাতা কিনতে হবে। আমি এই টাকা দিয়ে খাতা কেনবো। এটা দিয়ে খাবার কিনে খেয়ে ফেললে তো শেষ হয়ে যেত। আমি একটা খাতা কিনতে পারলে তাতে আমার পড়াশোনা একটু এগিয়ে যাবে।
বাবার চোখে তখন অশ্রæ।
গণ্ড বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। আমি বুঝতে পারলাম না সেই কান্নার অর্থ। পাশের বাড়ির চাচীদের ডেকে বললেন- দেখ ভাবিজানরা আমার ছেলের কান্ড দেখ। ওকে টাকা দিয়ে মেলায় পাঠিয়েছিলাম। একটি টাকাও ভাঙে নি আমার রতন। সবটা ফিরিয়ে এনেছে বাড়ি। এই টাকা দিয়ে নাকি খাতা কিনবে। বল তোমরা এমন ছেলে আর হয়? আমি ওকে কি আশীর্বাদ করবো ভাবি। আমার কি আশীর্বাদ করার দরকার আছে? আল্লাহ তো সব দেখেন।
আজ বুঝি বাবা কেন সেদিন কেঁদেছিলেন। কোন আবেগ তার চোখে অশ্রæ এনেছিল।
আর একটি দিনের কথা বলি।
আমাদের বাড়ি থেকে কানাইপুর বাজার ৬/৭ মাইল দূরে।
একদিন বাবার সঙ্গে ছাগল নিয়ে গেলাম সেই বাজারে। শুক্রবার দিন। হাঁটছি তো হাঁটছিই। চানপুর বাজার হয়ে বড়ঘাট। অনেকটা পথ। পথে পথে গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নি”িছ বাপ-বেটা। তারপর করিমপুর। চানপুর থেকে করিমপুর হালট পথ। বিন্ন্যা গাছের ভিড়। তার মাঝ দিয়ে সরু পথ। এখন সেই পথ পাকা রাস্তা। গাড়ি চলে হন হনিয়ে। করিমপুর পাড় হয়ে মূল সড়ক। সেই সড়ক ধরে দেড়/দু’মাইল দূরে কানাইপুর। সে রাস্তায় তখন গাড়ি চলে তবে তা সংখ্যায় অনেক কম। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে। আমরা যখন বাজারে পৌঁছলাম তখন জুম্মার নামাজের আযান পড়ে গেছে। জমে উঠতে শুরু করেছে হাট।
ছাগলের দড়ি ধরে বসে আছি আমি।
গৃহ¯’ ক্রেতা কম। বেশি দালাল। তারা কম দামে ছাগল কিনে শহরে চালান দেয়। আমাদের ছাগল নিয়েও তারা দালালি শুরু করে দিল। তাদের দৌরাত্ম্যে গৃহ¯’ ক্রেতারা ধারেকাছে ভিড়তে পারলো না। বাধ্য হয়ে বাবা অনেক কম দামে বিক্রি করে দিলেন ছাগল। বিক্রির টাকা নিয়ে বাজারের মাঝখানে মিষ্টির দোকানে আমাকে নিয়ে এলেন বাবা। সেখান থেকে কিনলেন পাউরুটি। দোকানি দিলেন রসগোল্লার একটু শিরা। সেই শিরায় পাউরুটি ভিজিয়ে মুখে দিতেই মনে হলো বেহেস্তি কোন খাবার খা”িছ। এত মজা হতে পারে পাউরুটি আর রসগোল্লার শিরা এ তো জানা ছিল না। পাশেই বসে রসগোল্লা দিয়ে পাউরুটি খা”েছ অচেনা এক লোক। খুব লোভ হলো। ই”েছ হলো বাবাকে বলি। কিš‘ সঙ্গে সঙ্গেই মুখে কুলুপ এঁটে দিলাম। না, এটতা ¯^ার্থপর কিভাবে হতে পারি। বাড়িতে মা, দু’বোন অভুক্ত। তাদের রেখে আমি কিভাবে এটতা ¯^ার্থপর হতে পারি!
বাবা আর আমি বাজার করে ফিরছি। আবার সেই হাঁটা পথ। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। পায়ের ব্যাথায় আর হাঁটতে পারছি না। এক সময় বাবা বুঝতে পারলেন। বসলেন বড়ঘাটে। খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে আমাকে কাঁধে তুললেন। তারপর হাঁটা শুরু করলেন। চানপুর গিয়ে নামিয়ে দিলেন। আবার হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে যখন বাড়ি পৌঁছলাম দেখি মা সেই আগের মতোই বারান্দায় বসে আছে। আমাদের দেখে পানি এগিয়ে দিলেন। ব্যস্ত হয়ে উঠলেন রান্না নিয়ে।
রাতে শুয়ে শুয়ে বাবা মাকে বললেন- আজ আমার বাজানের অনেক কষ্ট হইছে। এতপথ হাঁটা! এতটুকুন বা”চা। তবু মুখ ফুটে কিছু খেতে চায় নি। আমার রতন দেখ ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি আশীর্বাদ করি ও একদিন অনেক বড় হবে। ও আমার রতন। রতনের মতোই উজ্বল হবে সবার জীবন।
আজ আমি অনেক বড় কিনা জানি না।
আমার অভাব নেই। কষ্টে হলেও দিন কেটে যায়। অভুক্ত থাকতে হয় না। হাত পাততে হয় না কারো কাছে। সৎ উপার্জনে বেঁঁচে আছি- এটাই সান্তনা। হয়তো বাবা আমার জন্য এমনটাই চেয়েছিলেন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement