'জিজ্ঞাসা' গল্পটি সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষকে নিয়ে লেখা। সমাজের নীচু স্তরের এই মানুষদের জীবন পরিচালিত হয় দারিদ্র আর অবহেলাকে পুঁজি করে। পদে পদে মিশে থাকে লাঞ্ছনা আর গ্লানি। কাঠখোট্টা,কঠোর আর নীতিহীন স্বামী জগ্লুর অবহেলায় পর্যুদস্ত স্ত্রী রোজিনা বেছে নেয় চরম প্রতিশোধ। সেই প্রতিশোধের কঠোরতায় বুক কেঁপে ওঠে। পক্ষন্তরে রোজিনার ছেলে কমল ক্ষুধার কঠোরতার সাথে পেরে ওঠে না। মাকে প্রতিদিন রান্না করতে না দেখে আর বাবার অনুপস্থিতিতে তার ছোট্ট মনে হাজার প্রশ্ন এসে ভর করে। মাকে জিজ্ঞেস করে সেসবের সদুত্তর পায় না সে। কাঠখোট্টা মুখের বুলিতে মা তাকে প্রতিবার হতাশ করে। মায়ের সেই কঠোরতার কাছে এসে তার কোমল মনের জিজ্ঞাসাগুলো সুতো কাটা ঘুড়ির মতো পালিয়ে যায়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৫৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কাঠখোট্টা (মে ২০১৮)

জিজ্ঞাসা
কাঠখোট্টা

সংখ্যা

ফাহমিদা বারী

comment ২৩  favorite ১  import_contacts ৮৩৬
এক
‘ও মা, বাবায় কবে আইবো?’
ছেলের প্রশ্ন শুনে রোজিনা ঘাড় ঘু্রিয়ে তাকালো তার দিকে। পাটের শুকনো বাকল দলা পাকিয়ে পানি আর কাদা দিয়ে মাটির মেঝে নিকোচ্ছিল রোজিনা। দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে মেঝের এক কোণে বসে আছে কমল। কিছুক্ষণ আগে রোজিনা এক বাটি মুড়ির সাথে দু’তিনটি বাতাসা এনে রেখেছে তার সামনে। কমল শুকনো মুখে চিমড়ানো মুড়ি চিবোচ্ছিল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। পাশে রাখা প্লাস্টিকের পানির মগটাতে একটুক্ষণ পরপরই গলা ভিজিয়ে নিচ্ছিলো সে।
মনে মনে কমল আতঙ্কিত বোধ করছে। বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। মা এখনো রান্নাবান্নার কোনো আয়োজনই করছে না। ইদানীং এমনটা মাঝে মাঝেই হচ্ছে। মা আর আগের মতো প্রতিদিন বেলা চড়ার আগেই চুলার পাড়ে গিয়ে বসে না। শুকনো পাতা জড়ো করে তাড়াহুড়ো করে ভাত আর শাক ডাল রান্না করে না। মাঝে মাঝেই ছোট মাছ আর কখনো সখনো মুরগীর গোশত।
বাবার জন্যই মা তাড়াহুড়ো করে রান্না বসায়। বেলা দু’টার মধ্যেই বাবা ভাত খেয়ে কাজে চলে যায়।
লরির ড্রাইভার কমলের বাবা জগলু। লরি চালিয়ে জিনিসপাতি আনা নেওয়া করে। গ্রামের সবজি, মাছ, মুরগি এসব গঞ্জে নিয়ে যায়। পাশের গ্রামের এক বিশাল ধনী ব্যবসায়ী এই ব্যবসা করেন। তার লরিই চালায় জগলু। লরি সেই ব্যবসায়ীর বাড়িতেই জমা রাখতে হয়। দুপুরবেলা সেই লরি সেখান থেকে নিয়ে জগলু গঞ্জে যায়। মহাজন তার লোকজন দিয়ে আগে থেকেই লরিতে জিনিসপাতি ভরে রাখে।
সপ্তাহে অবশ্য প্রতিদিন যেতে হয় না তাকে। তবে ইদানীং গঞ্জে গিয়ে কোন কোন রাতে জগলু আর বাড়িতে ফেরে না। সেখানেই থেকে যায়। হয়ত দু’একদিন পরে মাঝরাতে অথবা খুব ভোরে বাড়িতে ফেরে।
কমল বেশিরভাগ দিন তখনো ঘুমেই থাকে। বেশিরভাগ দিন সে জানতেই পারে না যে, তার বাবা বাড়িতে ফিরেছে। হয়ত সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে বাবার সাথে দেখা হয় তার। সে যখন ঘুম থেকে ওঠে, বাবা তখন গভীর ঘুমে।
হঠাৎ কখনো সখনো বাবার জোরে জোরে কড়া নাড়ার আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তবে তা খুব অল্প সময়ের জন্য। চোখ মেলে কিছুক্ষণ দেখেই আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে।
যেসব দিন কমলের বাবা বাড়িতে ফিরে আসে, কমল মনে মনে খুব খুশি হয়। নাঃ, বাবার বাড়ি আসা উপলক্ষে খুশি হয় না সে। খুশি হয় এই ভেবে যে, পরদিন খুব ভালো রান্নাবান্না হবে তাদের বাড়িতে। বাবা আসার সময়ে মাছ মাংস সাথে করে নিয়ে আসে। মা পরেরদিন সেগুলো কুটে বেছে রান্না বসায়। কমলের যেন ঈদ লেগে যায়।
খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কমলের বাবা ঠিক একেবারে রাজা বাদশাহ। বড় মাছ নিয়ে এলে মাছের মুড়োটা তার পাতে পড়া চাই। একটা মুরগি রান্না হলে তার দুই তৃতীয়াংশ একা একবেলাতেই সাবাড় করে ফেলে। কমল জুলজুলে চোখে তার বাবার খাওয়া দেখতে থাকে। মনে একটা ঢিপঢিপে ভীতি কাজ করে, ‘ইস! এক্কেবারে শ্যাষ হইয়া যায় যদি!’
শুধু খাওয়ার ব্যাপারেই কেন, মেজাজ মর্জিতেও কমলের বাবা জগলু রাজা বাদশাহ্‌র চেয়ে কিছু কম যায় না। যতক্ষণ বাসায় থাকে, কমলের মা রোজিনা বেগমকে একেবারে দৌড়ের ওপরেই রাখে। ভাত দিতে একটু দেরি হলে, গোসলের সময়ে কলপাড়ের বালতিতে পানি ভরে না রাখলে, হাতের কাছে জামা কাপড় না পেলে চিৎকার দিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে।
কমলের সাথে তার বাবার যেটুকু সময়ে সামনাসামনি দেখা হয়ে যায়, তাকে ঠিকমত খেয়াল করে বলেই মনে হয় না। কীসের যেন এক ঘোরের মধ্যে থাকে। কখনো ছেলেকে ডেকে দুটো ভালোমন্দ কথা জিজ্ঞেস করে না। কমল নিজেও তার বাবাকে দেখলেই পালিয়ে বেড়ায়।
সমস্যা যে কীসের, তা যে সে কিছুই একেবারে আঁচ করতে পারে না তা নয়। একেবারে গ্যাদা বাচ্চা তো আর নয়! বয়স নয় বছর চলছে। এটা বুঝতে তার মোটেও অসুবিধা হয় না যে, তার বাবা ভালোমতই নেশা ভাঙ করে।
গাঁয়ের ফেরিওয়ালা বল্টুকে সে মাঝে মাঝে ঐ জিনিস খেতে দেখেছে। অস্বচ্ছ মোটা কাছের বোতলে কী যেন নিয়ে এসে বল্টু গাছের আড়ালে বসে খায়। কমল দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছে। সেসব খেয়ে বল্টুর চোখদুটো কেমন জবা ফুলের মতো লাল হয়ে যায়। টলমলে পায়ে এদিক সেদিকে হাঁটতে থাকে। একদিন কমলের কাছে এসে পড়াতে মুখ দিয়ে ভকভকে কেমন একটা পচা গন্ধ পেয়েছিল সে।
তার বাবার মুখ থেকেও সেই একই রকম গন্ধ পেয়েছে কমল। আর চোখদুটো কেমন যেন ঘোলাটে লাল। মায়ের সাথে সে কখনো হাসিমুখে কথাই বলতে দেখেনি বাবাকে। সবসময় কেমন যেন গড়্গড়ে আওয়াজে কথা বলে মায়ের সাথে।
তবু বাবা এলে ভালো লাগে কমলের। প্রতিদিনের সেই একই শাকডাল থেকে মুখ ফেরে ওদের।
আজ প্রায় একমাস হয়ে গেল কমলের বাবা বাড়িতে ফিরছে না। মাকে সে বেশ অনেকবার বিষয়টা জিজ্ঞেসও করেছে। দু’একদিন পরে পরেই জিজ্ঞেস করে। মা ঠান্ডা গলায় বলে,
‘বড় খ্যাপ নিয়া গেছে এইবার। কইছে, ফিরতে ম্যালাদিন লাগবো। আমরা য্যান বেশি ভাবনা চিন্তা না করি।’
কমল ভেবে পায় না এত কীসের বড় খ্যাপ নিয়ে গেল বাবা এবার, যে আর বাড়িতেই ফিরছে না! প্রায় একমাস হতে চললো! বাবা ফিরছে না দেখে মায়ের রান্নাবান্নাতেও মনোযোগ নেই। ইচ্ছে হলে রাঁধে, ইচ্ছে না হলে এইরকম শুকনো মুড়ি, চিড়া, ছাতু এসব দিয়েই কোনমতে পার করে দেয়।
কমলের ভালো লাগে না। আজ কতদিন হয়ে গেল, মাছ মাংস খায় না সে। মাকে সেকথা বলার ইচ্ছে হয়েছে অনেকদিন। বলতে পারেনি। ছোট হলেও তার আত্মসম্মান জ্ঞান টনটনে। সামান্য খাওয়া নিয়ে কথা বলতে তার কেমন যেন লজ্জা লাগে।
কমলের প্রশ্ন শুনে রোজিনা ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপরে একটু উষ্মাজড়ানো গলায় বলে,
‘বাপ বাপ কইরা কইরা তো মুখ দিয়া ফেনা তুইল্যা ফেললি! বাপের কি পোলার লাইগ্যা এত জান পোড়ায় নাকি? একদিনও তো বাড়িত আইয়া বউ-পোলার খবর নিবার দেহি না! বাড়িত আইয়া খালি দেয় একখান ঘুম...নিজে খাওন আইনা নিজের প্যাডেই পারলে পুরাডা ঢুকায় দ্যায়! বৌ-পোলা পাইলো কী পাইলো না হেই খবর আছে নাকি তোর বাপের? আর তুই খালি দুইদিন পর পর...বাপজান কবে আইবো...বাপজান কবে আইবো?’
কথাগুলো শেষ করে হাঁপাতে থাকে রোজিনা। কমল আর একটাও কথা না বলে মুড়ি চিবানোতে মন দেয়। বোঝাই যাচ্ছে, আজ আর কপালে ভাত নেই।
তবে একটু বাদেই তার মুখ হাসিতে ভরে উঠলো। মা পেছনের জঙ্গল থেকে শুকনো পাতা জোগাড় করে এনে ভাত বসিয়েছে। কীসের যেন শাক পাতাও নিয়ে এসেছে কোঁচা ভরে। হোক শাক দিয়ে, তবু তো আজ পাতে ভাত জুটবে! মা এখন বিরতি দিয়ে দিয়ে ভাত রান্না করে।
কমলের আনন্দের তখনো বাকি ছিল। মা যখন তাকে কোচড় থেকে বিশ টাকা বের করে ডিম আনতে পাঠালো দোকানে, তার মুখের হাসি আর বাঁধ মানলো না । ইস, আজ কী আনন্দের দিন! শাক আর ডিম দিয়ে ভাত খাবে সে। কমল খুশিতে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে এক ছুট লাগাতে গেল। সেই ছুটের চোটে উঠোনের একপাশে মা’র নতুন লাগানো লাওয়ের মাচার একপাশ একটু হেলে পড়ে গেল। গাছ্গুলো সবে একটু খলবলে হয়ে উঠেছে। কমলের মা তাই দেখে হায় হায় করে উঠলো,
‘কতদিন কইছি তোরে, লাউয়ের মাচান দেইখা হাঁটবি। এত কষ্টের পর গাছগুলান একটু বড় হইছে। আর তুই ...!
কমল আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মা’র বকাঝকা শুনলো না। মনটা খুব খুশিতে আছে, সেটাকে সে আর নষ্ট করতে চাইলো না। মা বকতে থাকুক ইচ্ছামত। কী এক লাউয়ের গাছ নিয়ে ইদানিং মায়ের আগ্রহের শেষ নাই। সেই গাছে পানি দেওয়া, হাত দিয়ে নেড়ে নেড়ে মাটি আলগা করে দেওয়া, গোবর এনে গাছের গোড়ায় দেওয়া...সারাদিন গাছের পেছনেই পড়ে থাকে।
গরীবের বাড়িতে শাকপাতারই তো এমন কদর থাকবে!

দুই
ছেলের হনহনিয়ে ছুটে চলা দেখেই রোজিনা বুঝতে পারে, তার মনের মধ্যে এখন কেমন খুশির তুফান লেগেছে। মা হয়ে ছেলের মনকে চিনতে পারবে না, এমন অধম মা তো সে নয়!
কিন্তু কী করার আছে তার? কতটুকুই বা ক্ষমতা তার আছে যে, প্রতিদিন ছেলের মুখে তৃপ্তির আহারটুকু জুটিয়ে দেবে! যার এসবদিকে খবর রাখার কথা, সে তো দেখেও কিছু দেখলো না! নিজের খুশি, নিজের দুনিয়া, নিজের নেশা নিয়েই মত্ত হয়ে থাকলো।
স্বামীকে ফেরানোর অনেক চেষ্টা করেছে রোজিনা। ইনিয়ে বিনিয়ে, কেঁদে কেটে পায়ে পড়ে... যতভাবে বললে দাম্ভিক পুরুষের দম্ভ ছুটানো যায়...রোজিনা চেষ্টা করেছে। ছেলেটা বড় হচ্ছে। তার সামনেই মদ খেয়ে চোখ লাল বানিয়ে বাড়িতে ফেরে তার স্বামী। আগে তাও মাঝে মধ্যেই এটা ওটা বাজার করে আনতো। ইদানীং বাজারের টাকাটাও নেশার পেছনেই দিয়ে আসে।
মেয়ে মানুষের হাতে যতরকম অস্ত্র থাকে, রোজিনা তার সবটুকুই প্রয়োগ করার চেষ্টা করে দেখেছে। স্বামীর সামনে গিয়ে সেজেগুজে রাতের বেলায় রঙ ঢঙও করেছে। স্বামী তাকে কাছেও ভিড়তে দেয়নি। দূর দূর করে শেয়াল কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছে।
স্বামীর গা দিয়ে ভুরভুর করে পরনারীর গন্ধ বের হয়েছে। সমর্থ জোয়ান পুরুষ, স্ত্রীকে কেন কাছে ভিড়তে দেয় না এটা না বোঝা কারো পক্ষেই কঠিন নয়। রোজিনা নিজের আর ছেলের চিন্তায় সিঁটিয়ে থেকেছে। স্বামী ডানে যেতে বললে ডানে গিয়েছে, বাঁয়ে যেতে বললে বাঁয়ে। তবু মন পায়নি স্বামীর।
ইদানীং বাড়াবাড়ি সীমা ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁয়েছে। মাস ছয়েক আগেও রোজিনার মাস চলার টাকায় হাত দিত না তার স্বামী। মাসের বেতনের অনেকখানিই তার হাতে তুলে দিত। ফলে নেশা ভাঙ করলেও আপত্তি ছিল না রোজিনার। কিন্তু মেয়েমানুষের ফাঁদে পড়ার পরে থেকেই সেটুকু নৈতিকতাও বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে সে। এখন ইচ্ছে হলে মাস চলার টাকা দেয়, ইচ্ছে না হলে দেয় না। কিছু বলতে গেলেই মেজাজের গরম সীসা কানে ঢেলে দিয়ে বলে,
‘না পোষাইলে নতুন নাঙ্গর ধর। আমি না করছি?’
রোজিনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেছে,
‘পোলাডার দিকে চাইবেন না আপনি?’
‘ঐ পোলা আমার না!’

‘এইডা কী কন আপনি?’
‘ঠিকই কই। জন্ম দিবার গেছিলি ক্যান? কইছি আমি? এ্যাঁ, মা হওনের শখ লাগছে!’
‘আমি জন্ম দিছি বইলা কি হেই আপনার পোলা না?’
‘ম্যালা ফ্যাঁচড় ফ্যাঁচড় করবি না। ট্যাকা পাবি, এহন থেইকা কম পাবি।‘
রোজিনা আর কথা খুঁজে পায় না। স্বামী তো তাহলে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে!
মাস খানেক আগেও সে ঝগড়া বাঁধিয়েছে রোজিনার সাথে। মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছে,
‘ওহোন থাইকা আমারে বাইরে বাইরেই থাকন লাগবো বেশি। বাড়িত আমু না।’
‘আপনে বাড়িত না আইলে আমরা কী খামু, কই যামু?’
তুই আর তর পোলা কই যাইবি আমি তার কী জানি?’
ঝগড়া চরমে উঠেছে। রোজিনাও চুপ থাকেনি সেবার। স্বামীর মেয়েমানুষের কাছে যাবার কথা বলতেই যেন আগুনে গরম তেল পড়েছে। গর্জে উঠেছে জগ্লু,
‘বেশ করছি গিয়া। একশোবার যামু, হাজার বার যামু। তর মইধ্যে আছে ডা কী যে তরে নিয়া পইড়া থাকমু? এ্যাঃ যা একখান শরীল!’
রোজিনা ঘুমন্ত ছেলের দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে। তার ছেলের ঘুম খুব গাঢ়। একবার ঘুমালে সহজে ভাঙে না। রোজিনা তবু ছেলের ঘর আর তাদের ঘরের মাঝখানের দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। এই কুৎসিত আলাপন ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই বন্দী হয়ে থাক।
রোজিনা জানে, তার স্বামীর কাছে সবসময়ই টাকা থাকে। এই বাড়িতে এক জায়গায় তার স্বামী টাকা পয়সা গচ্ছিত রাখে। সেই জায়গাটাও সে চেনে। স্বামীর এক লোহার ট্রাঙ্ক আছে। সেখানেই সে টাকা জমিয়ে রাখে।
অনেকদিন রোজিনা মনে মনে ভেবেছে, সেই টাকা সরিয়ে ফেলবে। সাহস করতে পারেনি। যদি ধরা পড়ে যায়! টাকায় হাত দিলে ধরা তো পড়বেই! তাহলে পরিণতি কী হবে কে জানে! নিজের সাথে সাথে ছেলেটাকেও অকূল সমূদ্রে ভাসিয়ে দিতে মন চায়নি তার।
ছেলে দু’দিন পরে পরেই বাপের কথা জিজ্ঞেস করে। রোজিনা বুঝতে পারে, এই আকুতি কীসের জন্য। বাপের ভালোবাসা তো ছেলের কপালে জোটেনি। সে বাপের খোঁজ নেয় অন্য কারণে। কতদিন ছেলেটা মাছ মাংস খেতে পায় না! বাপ এলে যদি পাতে এক আধ টুকরা জোটে। বাপের কথা কী আর এমনি এমনি জিজ্ঞেস করে সে!
স্বামীর শরীর নিয়ে খোঁটা দেওয়া হজম করতে পারে না রোজিনা। কোথাও না কোথাও নারীত্বের অহংকার এখনো তার মধ্যে আছে। রাস্তায়, নোংরা গলিতে উগ্র সাজপোশাক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তার স্বামীর মতো চরিত্রহীন কত পুরুষই তার কাছেও আসতো! এই সংসারের রশি আঁকড়ে পড়ে আছে দেখেই আজ আর তার কোন কদর নেই।
স্বামীর কথা শুনে রোজিনাও হিসহিসিয়ে উঠেছে,
‘তাইলে আপনে এগুলান নিয়াই থাকবেন? বউ বাচ্চার কোন দায় নাই আপনার?’
রোজিনার মদ্যপ স্বামী বিদ্রুপাত্মক গলায় কীসের যেন খিস্তি ছাড়ে। রোজিনা আবার জিজ্ঞেস করে,
‘এই সংসারের কোনোই কামে লাগবেন না আপনে?’
‘কাম! কীয়ের কাম? ম্যালা লাগছি তর কামে...আর লাগবার পারুম না! ওহন নিজের কামে তুই নিজেই লাগ!’
হঠাৎ এক হাওয়ার ঝটকা এসে রোজিনার ভাবনার জাল ছিন্ন করে দেয়। রোজিনার মাথার মধ্যে তার নিজের বলা কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে,
‘কোনোই কামে লাগবেন না...কোনোই কামে...!’
সংসারের কোনোই কাজে যে পুরুষ আসে না, তাকে কেমন পুরুষ বলে কে জানে! মেয়েমানুষকে কীভাবে পায়ের নীচে চাপা দিয়ে ঠেসে রাখা যায়, এটাই এরা ভালোমত রপ্ত করে।
স্ত্রী সন্তানের ইজ্জত, মান আর পেটের ক্ষুধা মেটাতে নিজেকে দায়িত্বের নীচে চাপা দিয়ে রাখা কাকে বলে তা এমন পুরুষেরা জানবে কীভাবে?
এমন পুরুষকে তাই সেই ‘চাপা পড়া’ কাকে বলে সেটাই বুঝিয়ে দিতে হয়।

তিন
ধীরে ধীরে দু’একজন করে গ্রামবাসীরাও জেনে যায় যে, রোজিনার স্বামী জগলু আজ প্রায় একমাস ধরে বাড়ি ফিরছে না। পাশের গ্রামের সেই ব্যবসায়ী তো দু’দিন পরে পরেই লোক পাঠায়।
‘জগলু কই গ্যাছে? বাড়িত ফিরছে?’
রোজিনা আর কী বলবে? তার সেই এক গৎবাঁধা উত্তর ছাড়া আর কী বলার আছে!
‘আমারে তো কইছে বড় খ্যাপ নিয়া যাইতাছে এবার! ফিরতে ম্যালা দেরি হইবো।’
কিন্তু ব্যবসায়ীর লোকেরা বলে ভিন্ন কথা। রোজিনার স্বামী তো সেদিন লরিই নিয়ে যায়নি! আজ একমাস ধরে সে নাকি লাপাত্তা। কেউ তার কোন খবরই দিতে পারে না।
ব্যবসায়ীর তো আর জগলুর আশায় বসে থাকলে দিন চলবে না। সে অন্য ড্রাইভার ঠিক করে ফেলেছে। অর্থাৎ রোজিনার স্বামী তার এমন নিশ্চিত চাকরিটাও হারিয়ে ফেলেছে।
কমলকে রাস্তাঘাটে দেখলেই লোকে জিজ্ঞেস করে,
‘ঐ কমল, তর বাপে ফিরছে?’
‘না, ওহনো ফিরেনি!’
লোকে কানাঘুষা শুরু করে। নিশ্চয়ই গঞ্জে গিয়ে বড় কোন ফ্যাসাদে পড়েছে এবার জগলু। তার মদ, জুয়া আর মেয়েমানুষের খবর গ্রামের অনেকেই জানতো। গঞ্জে রাতের বেলা খারাপ পাড়ায় পড়ে থেকে সে দেদারসে টাকা উড়াতো। এত টাকা সে কোথায় থেকে পেত কে জানে!
ব্যবসায়ী চটেছেন ভিন্ন কারণে। জগলু তার ব্যবসাপাতির বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছিলো। তিনি যে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না তা নয়, তবে তাকে হাতেনাতে ধরার ইচ্ছে ছিল তার। সে যে পরিমাণ মাল নিয়ে যেত, তার অর্ধেক টাকাও ব্যবসায়ীকে বুঝিয়ে দিত না।
গঞ্জের খারাপ পাড়ায় গিয়ে টাকা ওড়ানোর বিষয়টা তার কানেও এসেছিল। লরির হেল্পারকে দিয়ে লরি পাঠিয়ে দিয়ে সে সারারাত গঞ্জে ফূর্তি করতো। এত উড়ানোর মতো টাকা সে কোথায় থেকে পায়, এটা তিনি ভালোই বুঝতে পারছিলেন। হেল্পারকে জিজ্ঞেস করলে সেও চুপ করে থাকতো। যোগ্য সাগরেদ একেবারে!
এটা নিয়ে জগলুকে বহুবার সতর্কও করা হয়েছে, কিন্তু সে কানে তোলেনি। চাকরির ভয় দেখালেও কাজ হতো না। সে এই ব্যাপারটা ভালোই জানতো যে, তার মতো ড্রাইভারের চাকরির অভাব হবে না। একটা গেলে আরেকটা পাবে।
ব্যবসায়ীও তাকে সুযোগ দিতে চাইছিলেন, কারণ জগলু গাড়ি চালায় বেশ ভালো। আর আশেপাশে ভালো ড্রাইভার চাইলেই পাওয়া যায় না। এত কম টাকায় কেউ কাজ করতে রাজি হয় না।
সে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার পরে এখন তার সাগরেদ ভয়ে ভয়ে মুখ খুলে ফেলেছে। যে তথ্য দিয়েছে তা ভয়াবহ। ব্যবসায়ী এখন জগলুর সন্ধান পেলে তাকে জ্যন্তই মাটিতে পুঁতে ফেলবেন।
সে নাকি নিয়মিত মোটা অংকের কমিশন নিয়ে অল্প টাকায় চোরাই কারবারীদের কাছে জিনিসপাতি বিক্রি করে দিত। ব্যবসায়ীকে টাকা কম দিলেও তার পকেট ভরা থাকতো সবসময়।
তিনি তাই টহল বসিয়েছেন জগলুর বাড়ির কাছে। কোন না কোন সময়ে তো সে বাড়িতে আসবেই। তখনই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে, কমিশন খাওয়ার কত মজা!
কিন্তু কোথায় সে? দিনরাত গোপন নজরদারী লাগিয়েও তার টিকিরও সন্ধান পাওয়া গেল না।
শুরু হলো রোজিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ।
‘কই গেছে তার স্বামী? এখনো কেন সে বাড়িতে ফিরছে না?’
একই উত্তর নানাভাবে দিতে দিতে রোজিনা মহাত্যক্ত। এখন সে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেও সোজা উত্তর দেয় না। মাথা বাঁকিয়ে রাজহংসীর মতো অহংকারী গলায় বলে,
‘বাড়ির মইধ্যে লুকায় থুইছি। পারলে খুঁইজা নেন!’
পাড়া প্রতিবেশিরও যেন একবার করে জিজ্ঞেস না করলে প্রতিবেশির দায়িত্ব পালন করা হয় না।
‘ও কমলের মা, কমলের বাপে ফিরছে?’
রোজিনা কখনো চুপ থাকে, কখনো মুখ ঝামটা দেয়,
‘ক্যাঁ, হ্যার কাছে ট্যাকা পাইবেন নাকি?’
জিজ্ঞাসাবাদ ফুরায় না। কমলের বাবাও ফিরে আসে না।
কমলের মাথার মধ্যেও দিনরাত একই চিন্তা ঘুরতে থাকে। তার বাপে কি সত্যি সত্যিই আর ফিরে আসবে না কোনদিন? গ্রামের অনেকে তো এমনটাই বলাবলি করছে। এই প্রথম যেন খানিকটা ভালোবাসাও বোধ করে সে বাবার প্রতি।
একদিন অনেক সাহসে ভর নিয়ে মাকে আবার প্রশ্নটা করেই বসলো,
‘ও মা, বাপে কি হাছায় আর ফিরবো না?’
তখন পড়তি বিকেল। একটু পরেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসবে। পেছনের বাঁশঝাড়ে বসে নাম না জানা কোন এক পাখি অজানা সুরে ডেকে চলেছে।
রোজিনা এঁটো থালাবাসন কলপাড় থেকে ধুয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। ছেলের জিজ্ঞাসা শুনে কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। তারপরে ঠিক একমাস আগের সেই সেদিনের মতো হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
‘আয়, দ্যাইখা যা তোর বাপে কই আছে। দ্যাইখা যা কেমুন সুন্দর কইরা হ্যারে কামে লাগায় দিছি। হ্যায় নাকি আমগো কোনো কামেই আর আইবার পারবো না! এইডা একটা কতা হইলো! মাটির নীচে ঢুইকা কতো সুন্দর কামে আইতাছে দ্যাখ! দ্যাখ...দ্যাখ...চাইয়া দ্যাখ! কী সুন্দর লকলক কইরা লাওপাতা খোল ছাড়ছে! দ্যাখ...’
কমল বিস্ময়ভরা চোখে মাকে দেখছে। মা কি শেষমেশ পাগল হয়ে গেল!
পাগল রোজিনা হয়নি। কিন্তু একমাস আগের সেই মাঝরাত্তিরে সে সত্যিই পাগল হয়েছিল। মেয়েমানুষকে চাপা দিয়ে রাখা পুরুষকে চাপা পড়া কাকে বলে এটা বোঝানোর তীব্র নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল।
হাতের কাছেই ছিল শিল নোড়া। জগলু রোজিনার দিক থেকে মুখ ফেরাতেই শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে শিলটা বসিয়ে দিয়েছিল তার মাথায়।
রক্তে যাতে সব ভেসে না যায়, তাই তাড়াতাড়ি করে তাকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল নিঝুম নিস্তব্ধ উঠোনে। শাবল দিয়ে নরম মাটি উঠিয়ে দাম্ভিক পুরুষকে চাপিয়ে দিয়েছিল তার ভেতরে...ঠেসে ঠেসে।
ঘরে ফিরে পরিষ্কার করে নিয়েছিল রক্তের সমস্ত দাগ। কমল তখনো পাশের ঘরে ঘুমে কাদা। এসবের কিছুই সে জানে না।
লোহার ট্র্যাঙ্ক ভেঙে পেয়েছিল অনেক টাকা। খুব ধীরে ধীরে, ভেবেচিন্তে খরচ করে রোজিনা। ছেলেকে মানুষ করে তুলতে হবে, বাঁচাতে হবে। ছেলে বড় হলে নিজে গিয়ে পুলিশের কাছে সব কথা বলে ধরা দেবে সে। নিজের জীবনের মায়া সে করে না।
সংসারের কোনোই কাজে আসবে না তার স্বামী, তাই কী হয়?
পরেরদিনই লাউয়ের বীচি কিনে এনে লাগিয়ে দিয়েছিল সেই আলগা মাটিতে। এই তো, মাত্র ক’দিনেই কী সুন্দর লকলক করছে কচি লাউপাতা!
অসার স্বামী সার হয়েই সংসারের কাজে লাগুক!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement