বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬২

বিচারক স্কোরঃ ১.৮২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

keyboard_arrow_leftদিগন্ত (মার্চ ২০১৫)

প্রতীক্ষা
দিগন্ত

সংখ্যা

মোট ভোট ২৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬২

মনজুরুল ইসলাম

comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৭৭৫

অপ্রসন্ন আকাশ। বিস্তীর্ণ কালো মেঘ। অমানিশার চাদরে অবরুদ্ধ প্রকৃতি। সকাল অবধি অঝোর ধারায় ঝরছে ঝমঝম বৃষ্টি। বৃষ্টির ঝাঁঝালো উপস্থিতি। তবু কোথাও নেই পিনপতন নীরবতা। দৃশ্যটা অভাবিত। ক্রমাগত বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঢল। প্রকৃতির বৈরি শিকল তাদের আবেগের প্রাচীরে বিন্দুমাত্র চিড় ধরাতে পারেনি। সকল ব্যস্ততা মাটি চাপা দিয়ে স্যাঁতসেঁতে পিচ ঢালা পথ,সবুজ ঘাস,বারান্দায় অপেক্ষমাণ সবাই। অতি উৎসুক অভিভাবক ও আশান্বিত বিদ্যার্থীদের হৃদয়ের গহীনে প্রোথিত প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলবে আজ। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রকাশিত হবে জে.এস.সির ফল।

জ্ঞাননেত্র হাই স্কুলের ফল বরাবরই সন্তোষজনক। তবে এ প্লাস খরা কাটাতে এবার সমভিব্যাহারে প্রাণপাত করেছেন শিক্ষকগণ। সংক্ষেপে বক্তৃতা শেষ করলেন হেড স্যার। সাহেবি টুপি পরিহিত শরীর চর্চা শিক্ষক শুরু করলেন ফল ঘোষণা। পাঠ করলেন সি গ্রেড হতে এ গ্রেড প্রাপ্তদের ফল। অত:পর ফলাফল হস্তান্তর করলেন হেড স্যারের নিকট। মুহূর্তেই হাসি আর কান্নার শব্দে ভারী হল জ্ঞাননেত্র স্কুলের আকাশ বাতাস।

চাপা কষ্ট নিয়ে অর্ধনগ্ন ছাতা হাতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধ শেফালী। বুঝতে পারল ফেল করেছে। তবু সুউচ্চ পরিমাণ আত্মবিশ্বাস সেই সরল সত্য মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাল। নিজের জন্য নয়, সেলিনা আপার কথা ভেবে মুষড়ে পড়ল সে। ফেল করবে এ তার কল্পনারও বাইরে। রেজাল্ট শিট নিজ চোখে দেখতে উদ্যত হল। খানিকটা এগিয়েও গেল। পেছন পেছন এগুতে থাকল সেলিনা আপাও। শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবার আমরা সফল হয়েছি। জ্ঞাননেত্র স্কুলের অহংকার শেফালী বেগম এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে”। মাইক হতে হেডস্যারের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকল। চারদিক হতে ছন্দোবদ্ধ করতালি সীমাহীন আনন্দের ঢেউ তুলল। অহর্নিশ অশ্রুসিক্ত শেফালী শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সেলিনা আপাকে।

ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে স্বপ্নপুর। নিভৃত পল্লী। চার বৎসর ধরে স্বপ্ন ফেরি করছেন সেলিনা বেগম। স্কুলের পাশেই শুক্কুর আলীর শীর্ণ কুটির। চার ভাইবোনের মধ্যে শেফালীই বড়। একটি মাত্র খড়ের ঘরে আড়ষ্ট বসবাস। চটের বস্তা দিয়ে বেষ্টিত আধপাকা ল্যাট্রিন। শূন্য উঠোনেই চলে রান্না বান্না। স্বপ্নপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়ত শেফালী। পি.এস.সিতে রেজাল্টও ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু দূরত্ব ও আর্থিক বিবেচনায় পড়াশুনা আপাতত স্থগিত।শেফালীর মৃতপ্রায় স্বপ্ন জীবিত করতে এগিয়ে আসলেন সেলিনা। টিফিন সেরেই রওয়ানা হলেন শুক্কুর আলীর উদ্দেশ্যে।
শুক্কুর চাচা,বাড়ীতে আছেন?
সেলিনা আপার কণ্ঠস্বর শুনে উদোম গায়েই গামছা পেঁচিয়ে মৌন সম্মতির সাথে মুচকি হাসি শুক্কুর আলীর। পেছনে শেফালী।ঘরের ভেতর হতে বাচ্চাদের কোলাহল আর কান্নার শব্দ। বোঝাই যাচ্ছে পরী বানু সন্তান সামলানোয় মহা ব্যস্ত।
শেফালীকে কি স্কুলে ভর্তি করাবেন না,চাচা? রেজাল্ট তো অনেক ভালো করল।
কি করব আপা,আমরা গরীব মানুষ। লেখাপড়া তো আমাদের কাছে বড় বেমানান।
শোনেন চাচা,লেখাপড়া ধনী,গরীবের বিষয় না।মেধা আর পুরোপুরি চেষ্টার ব্যাপার।
কিন্তু আমার যে নুন আনতে পান্তা ফুরায় ।
কষ্ট করে হলেও পড়াতে হবে। যদি না পারেন তবে আমার বাসায় রাখতে পারেন। ছোটবোনের মতো মানুষ করার চেষ্টা করব। আমার বিশ্বাস ও সুযোগ পেলে একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে। বাসায় বৃদ্ধ মাকে সঙ্গ দেবে আর টুকিটাকি কাজ করবে। কিরে শেফালী, পারবি তো ?
“পড়াশুনার জন্য আমি সবকিছুই করতে পারব আপা”-শেফালীর প্রত্যয়ী উচ্চারণ।

দারিদ্র্যের কাছে সমর্পিত হয়েছিল অসহায় আবেগর জীবন্ত কলিগুলো। তিন বছর পূর্বে সন্তপ্ত মনে শুক্কুর আলী বিদায় জানিয়েছিল প্রাণ প্রতিম শেফালীকে। সঙ্গে ছিল পরীবানুর ম্লান অবয়বের অদৃশ্য কষ্ট আর ভাইবোনের স্বচ্ছ আকুতির সীমানা। সবকিছু ভেদ করে সেলিনা আপার হাত ধরে স্বপ্নিল জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছিল শেফালী।

নিশ্চুপ,নিস্পন্দ,প্রাণহীন নিথর দেহে হাসপাতালের বিছানায় শায়িত শেফালী। সম্পর্কটা শুধুই আবেগ ও স্নেহের। কিন্তু সেলিনার দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতির নিকট সবকিছু পরাজিত। নিরন্তর ছুটছে সেলিনা। ডাক্তার,নার্স,ফার্মেসী,বাজার সবখানেই সতত সঞ্চরণ। সুস্থ করতে হবে শেফালীকে। পৌঁছে দিতে হবে সাফল্যের সাঁকোয়। চারদিন ধরে ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা আর হৃদয়ের শেষ প্রকোষ্ঠ হতে উৎকলিত ভালোবাসার টানে সুস্থ হয়ে উঠেছে শেফালী। শিশিরের স্বচ্ছ শুভ্র ফোটার মতো অপূর্ব লাগছে তাকে। প্রাণশক্তির স্ফুরণে সুনসান বাড়িতে উল্লাসের জোয়ার আনতে উদগ্রীব ঝরঝরে শেফালী। সেলিনাও দ্রুত হাসপাতালের অনুমতি নিয়ে বাড়ী ফেরার কাজ ত্বরান্বিত করল।
কিরে বুড়ি,কেমন আছিস? সেলিনার মায়ের জিজ্ঞাসা।
হ্যাঁ নানী, ভালো। তবে খুব ভয় পেয়েছিলাম।
ধুত বোকা,মানুষের তো রোগ বালাই হবেই,এতে ভয়ের কী আছে? যা যা,গোসল করে খেয়ে নে।

তাহমিনা বেগমকে আজ বড্ড প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। আদরের ছোট ভাই বদরুল এসেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর ওই বদরুলই বটগাছের মতো আগলিয়ে রেখেছে তার পরিবার। সেলিনার পড়াশুনার ভার পুরোটাই নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে। অত্যন্ত রাশভারী। শিক্ষকতা করেন বেসরকারি কলেজে। পাশের গ্রামেই থাকেন। পাত্রপক্ষের পাকা কথা নিয়ে আসায় আনন্দের মাত্রা বাড়িয়েছেন বহুগুণ। পাত্র সরকারি কলেজের শিক্ষক। গত সপ্তাহেই দেখে গিয়েছিল সেলিনাকে। সেলিনা যে সম্মতি জানাবে এ বিশ্বাস পুরোপুরিই ছিল বদরুল আলমের। তাই বিশ্বাস ও বর্ণিল জীবনের বাঁধন গড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মামা। সামনের মাসের প্রথম শুক্রবার সেলিনার বিয়ে।

মামী ও মামাত ভাই সমেত শহরে এসেছে সেলিনা। সঙ্গে শেফালীর সরস উপস্থিতি। পুরোদমে চলছে বিয়ের কেনাকাটা। শেফালীর ইচ্ছে বিয়েতে পছন্দমতো জামা পড়বে। একের পর এক চলছে জামা নির্বাচন। পারলে সব জামাই কিনবে শেফালী। চুলচেরা বিশ্লেষণের পর সিলেকশন পেল শেফালীর জামা। জামার সঙ্গে হলুদের শাড়ীও পেয়েছে। মনে মনে ভীষণ উৎফুল্ল­ শেফালী। সামর্থ্যের গণ্ডির মধ্যে দিয়ে কেনাকাটার উত্তেজিত পর্বটা শেষ হল অবশেষে। বাড়ীতে এসেই হলুদের শাড়ী পড়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে শেফালীর জিজ্ঞাসা-
আপা দেখেন তো কেমন লাগছে? ভালো করে দেখবেন কিন্তু।
খুব সুন্দর লাগছে,এখন যা বলছি,আমি ব্যস্ত আছি।
শেফালী একটু মন খারাপ করে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হলুদের শাড়ী খুলে নূতন জামা ও পুরাতন গহনায় সজ্জিত হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করল। গেটের কর্কশ শব্দ শেফালীর স্বপ্নিল জগতে বিচরণে বাঁধ সাধল। ছুটে গেল সে। অকস্মাৎ বাবার আগমনে শেফালী চমকে উঠল।
আব্বা,তুমি হঠাৎ,মা ভালো আছে। রতনরা কেমন আছে? আব্বা।
সবাই ভালো আছে। বহুদিন হল তুই যাস না আর ক্ষেতের ধানও পাকছে তাই আসলাম তোকে নিয়ে যেতে।
কিন্তু বাবা সামনের শুক্রবার যে আপার গায়ে হলুদ। বিয়েটা শেষ করে যাই। আচ্ছা আগে ভেতরে আসো।
আরে শুক্কুর চাচা,হঠাৎ কোন খবর না দিয়ে। বাড়ীর সবাই কেমন আছে?
আপনাদের দোয়ায় ভালো আছে। তবে শেফালীর মায়ের শরীরটা বেশী ভালো না। ক্ষেতের ধানও পাকছে তাই ভাবলাম মেয়েটারে নিয়ে যাই।
খুব ভালো করছেন।ওর অবশ্য স্কুলও বন্ধ। চাচীকে কি ডাক্তার দেখাইছেন?
না এখনও দেখাই নি। এবার গিয়ে দেখাব।
কি সর্বনাশ,দ্রুত দেখাবেন। সমস্যা বেশি হলে নিয়ে আসবেন। আমি শহরে ভালো ডাক্তার দেখাব। আর সামনের বৃহস্পতিবার সবাইকে নিয়ে আসবেন। আমাকে একটু দোয়া করে যাবেন চাচা।
হ্যাঁ,আজকে সকালেই স্কুলের সামনে মাস্টাররা বলাবলি করছিল। খুব ভালো খবর। দোয়া করি মা অনেক সুখী হও। অনেক বড় হও। আসব,অবশ্যই আসব।
একদিকে সেলিনা আপার বিয়ে অন্যদিকে বাবার আগমন। হাসি ও আনন্দে পরিপূর্ণ শেফালী। সেলিনা আপার বদৌলতে অনেক রেসিপি শিখেছে শেফালী। বাবার জন্য নাস্তা তৈরিতে নিমগ্ন সে। এক গাল হাসি,সঙ্গে নাস্তা নিয়ে হাজির শেফালী।
আব্বা খাও। শেফালীর সানুনয় আবেদন।
পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই শেফালীকে নিয়ে চিরচেনা পথের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল শুক্কুর আলী।

দু’চেয়ার বিশিষ্ট সোফা। মাঝারী সাইজের আলমারি। সাজানো ড্রইং রুম।পুরাতন আসবাবগুলোয় নতুনত্বের ছাপ। ড্রইং রুম ডিসটেম্পার করা হয়েছে। বাকীগুলোতে জুটেছে সাদা চুন। চকচকে স্টিলের গেটে প্রায় অচেনা সেলিনাদের বাড়ী। কলাপাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে বিয়ের গেট। ভেতরের ছোট্ট মঞ্চে হলুদের সাজ সাজ রব।কাঠিযুক্ত মিষ্টি,পায়েস,ফলমূল কুলোয় সাজানো হয়েছে। পুরো মঞ্চ গাঁদা ও রজনীগন্ধায় মোড়ানো। অসম্ভব সুন্দর লাগছে মঞ্চটি। সবচেয়ে অপূর্ব লাগছে হলদে শাড়ী,রেশমি চুরি,লাল টিপ,ঁেসউতি ও সোদালী ফুলে মোড়ানো হাত,সিঁথিতে লাল গোলাপ,আলপনা খচিত পায়ে সজ্জিত সেলিনাকে। তবুও নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে তাকে। আড়চোখে তাকিয়ে বার বার খুঁজছে শেফালীকে। প্রত্যাশা করছে শেফালীর প্রত্যাবর্তন। বান্ধবী ও মামাত ভাইদের দুষ্টুমি একটুও টলাতে পারছে না সেলিনাকে। চরম চূড়ায় উঠে গেছে তার নীরবতা। বার বার মামাতো ভাইদের নিকট ব্যাকুল জিজ্ঞাসা-শেফালী আসছে? এই মুহূর্তে শেফালীই যে তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি। অবশেষে সেলিনার সুপ্ত যন্ত্রণার প্রশমন ঘটল স্কুল হতে আসা শিক্ষকদের দেখে। কুশল বিনিময়ের আগেই সেলিনার জিজ্ঞাসা,শেফালী কি আপনাদের সঙ্গে এসেছে?
শেফালী,শেফালীর তো গত পরশুই বিয়ে হয়ে গেছে। মনস্তাপে দগ্ধ সেলিনা। মেনে নিতে পারছে না এই অপ্রত্যাশিত সংবাদটি। বিয়ের পিঁড়িতে বসেই কল্পনার আকাশে উড়ে ছিনিয়ে আনতে চাইছে অর্ধপ্রস্ফুটিত পদ্মকলি শেফালীকে। ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে সেলিনা। নিজেকে সংযত রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টা। কিন্তু শত প্রচেষ্টা পরাজিত হয়ে বারংবার একই প্রতিধ্বনি হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করছে-“আপা,তোমার বিয়েতে আমি অনেক মজা করব,দেখে নিও আমি ঠিক ঠিক বৃহস্পতিবার চলে আসব।”

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন