লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.১৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - রমণী (ফেব্রুয়ারী ২০১৮)

আনন্ত্য যাত্রায়...............
রমণী

সংখ্যা

মোট ভোট ৩৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫

মনজুরুল ইসলাম

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৩৯৫
প্রখর বাস্তবতার সামনে যখন কোনো মানুষ অবতীর্ণ হয় তখন অপূরণীয় মূল্য দিয়ে হলেও ভালোবাসার মানুষগুলিকে সন্তুষ্ট রাখবার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে একজন মা কিংবা পরিবারের প্রধান কর্তা হিসেবে একজন নারীকে যখন আকস্মিকভাবে উক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই তার জন্যে অত্যন্ত প্রতিকূল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বর্তমান সমাজে এমন অনেক ঘটনাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে আজ নারীদের জীবনে। কেউ হয়তো স্বামীকে হারিয়ে, কেউবা তালাকপ্রাপ্তা হয়ে অথবা ভিন্ন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এ ধরনের জীবনে নিজেদের পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সে ধরনের প্রতিকূলতায় অবতীর্ণ হয়েই নিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে মায়ামানি। এ ধরনের জীবনকে যে যাপন করতে হবে সেটি ছিল তার কল্পনারও সুদূর অতীত। কিন্তু পৌষেই শ্রাবণের আবির্ভাবের মতো উপায়হীনভাবে এ অপ্রত্যাশিত বিষয়টি মেনে নিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে সে। প্রতিনিয়ত হোঁচট খাবার পরেও কোনোভাবেই প্রতিকূলতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবার চিন্তাও করছে না। বাস করছে প্রশান্ত প্রকৃতির শহর প্রান্তনগরের নতুন পাতা গ্রামে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দুই শতক জমির ওপর কোনোরকমে একটি টিনের চালা এবং একটি খড়ের ঘরে দীর্ঘদিন অবধি কাটাচ্ছে পরিবার নিয়ে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ীতে বসবাস করলেও অতি-আকস্মিক সমস্যায় পতিত হয়ে সে বাড়ীটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয় মায়ামনি।
মধ্যবয়স উত্তীর্ণ দীর্ঘাঙ্গী, মুখের রঙ শ্যামলা, কপালের দু’প্রান্তের শিরা-উপশিরাগুলি যেন স্পষ্ট কালচে দাগে অস্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে। দু’হাতের তালুর চর্মদেশ ফেটে রুক্ষ আকার ধারণ করেছে। হাতে পড়া মোটা নীল রঙের প্লাস্টিকের চুরিগুলি নিয়ত কাজ করবার মধ্যে দিয়ে প্রায় সার্বক্ষণিক পানির স্পর্শে ফ্যাকাশে আকার ধারণ করেছে। নৌকোর ঠোঁটের মতো নাক, শিরিশ পাতার তন্ত্রীর মতো চিকন ভ্রু, বড় বড় চোখ, পরিচর্যার অভাবে ঘন কালো লম্বা চুলের প্রতীত সৌন্দর্য ম্লান হয়ে এলেও সহজেই ধারণা করা যায় ওর অতীত সৌন্দর্যের শোভনীয় মাত্রাটিকে। ধূসর বেগুনী রঙের একটি শাড়ী পড়ে সকাল আটটা থেকে অপেক্ষা করছে ও প্রান্তনগর সদর হসপিটাল ব্লাড সেন্টারের সামনে। সন্ধিগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। চেষ্টা করছে ভেতরে প্রবেশ করবার, কিন্তু কোনোভাবেই তাকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। নিয়তই এখানে দেখা যায় ওকে। উদ্দেশ্য- রক্ত বিক্রিকরণ। এর আগে অন্তত কয়েকবার রক্ত বিক্রি করেছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে অনেক কাকুতি মিনতি করবার পরেও যখন রক্ত গ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ তার রক্ত গ্রহণে সম্মত হলেন না তখন আর কোনো উপায় না দেখে ফুলপুর সড়ক অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলো মায়ামনি।
হাসপাতাল থেকে ফুলপুরের দূরত্ব সামান্য। দু’বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত আছে ফুলপুরের একটি বাসায়। প্রতিদিন সকাল ন’টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কাজ করতে হয় সেখানে। ঘরদোর পরিস্কার থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ। বিনিময়ে একবেলা খাবারের পাশাপাশি মাসিক বেতন হিসেবে পায় হাজার খানিক টাকা। রাস্তায় পাশের ওই বাসাটি দ্বি-তলবিশিষ্ট। নিচতলায় থাকেন ভাড়াটে। পরিবার নিয়ে দোতলায় বসবাস করেন বাসার মালিক। একটি আধুনিক বাসায় যে ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকবার কথা তার সবকিছুই রয়েছে বাসাটিতে। বাসার মালিক ইয়াকুব আলী একজন ব্যবসায়ী। স্ত্রী ডলি আক্তারকে গৃহিনী বলবার আগে অনায়াসেই একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ণ এসে দাঁড়ায় মনের গভীরে। যেহেতু শপিংয়ের বাইরে আর কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় না তাকে। আট বছর বয়সী তার একমাত্র সন্তানটিকে স্কুল পর্যন্ত আনা নেয়ার কাজটি করে তের বছর বয়সী একটি কিশোরী। সন্তানকে স্কুল থেকে আনা নেয়ার পাশাপাশি সকাল বেলার নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশনসহ দু’বেলা ডলি আক্তারের শরীর ম্যাসাজ করতে হয় সেই কিশোরীটিকে। হালকা পাতলা গড়নের শ্যামল রংয়ের মেয়েটির নাম কুহেলী। বেশ কিছুদিন যাবৎ কাজ করছে। সকাল থেকে দুপুর অবধি স্কুলেই থাকে। মায়ামনি চলে যাবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাসায় এসে পৌঁছে। প্রান্তনগর শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের উপজেলায় বাস করে কুহেলীর মা রাশেদা বেগম। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর আর্থিক অভাবের তাড়নায় কোনো উপায় না দেখেই কুহেলীকে কাজের মেয়ে হিসেবে রেখে দিয়েছে ঐ বাসায়। মেয়েকে দেখবার জন্যে এক ধরনের অকৃত্রিম ইচ্ছে প্রতিনিয়ত জাগ্রত হয় তার মননে। কিন্তু দূরত্ব এবং ডলি আক্তারের দেয়া কিছু কঠিন শর্তের কারণে সেই সাধটি পূরণ হয়ে ওঠে না। শর্তগুলো মূলত- তিন মাস না পেরুলে দেখা করা যাবে না, বাসায় গেলে একদিনের বেশী থাকা যাবে না ইত্যাদি।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত বারান্দায় বসে কফির জন্যে অপেক্ষা করছেন ডলি আক্তার, বিষয়টি বুঝতে পেরে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে মায়ামনি। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রতিদিন আসতে হয় ওকে। আজও চলে আসলো। যদিও আজকে দেরিতে আসার সম্ভাবনাই ছিল প্রবল। কিন্তু রক্ত বিক্রিতে ব্যর্থ হবার কারণে দেরী হলো না তার। কলাপসিবল গেট খুলে স্যান্ডেলগুলো সু-কর্ণারে রেখে সরাসরি কিচেনে প্রবেশ করলো। রুমটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন হলেও আয়তনে ক্ষুদ্র। দক্ষিণ এবং উত্তর প্রান্তে রয়েছে সিমেন্টের তৈরী আলমিরা। গ্যাসের চুলোটি রয়েছে পশ্চিম প্রান্তে। গ্যাসের চুলোর উপর কিছুটা দূরত্ব রেখেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি ছোট্ট জানালা। সেই জানালা দিয়ে স্বল্প মাত্রায় বাতাস প্রবেশ করলেও তা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় অসহনীয় গরমের মধ্যে থাকতে হয় মায়ামনিকে। কফি তৈরীর সকল উপকরণের ব্যবস্থা করার পর দ্রুত গ্যাস অন করলো। কফি তৈরী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলো। ইতোমধ্যে কফির জন্যে দু’বারের মতো ডলি আক্তারের কণ্ঠস্বর সপ্তমে উঠেছে। তৃতীয়বার যাতে আর অষ্টমে না ওঠেÑভেবে অস্থির হয়ে উঠলো মায়ামনি। গ্যাসের চুলোর উপর চাপানো পাত্রটির ঢাকনি খুলে তাকাতে থাকলো। পাত্রটিতে প্রচুর বুদবুদের সৃষ্টি হয়েছে। বোঝা গেল কফিটি তৈরী হয়েছে।
কফির পেয়ালা নিয়ে বেডরুমের ভেতর দিয়ে বারান্দায় গিয়ে ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো মায়ামনি। উজ্জ্বল রংয়ের ম্যাক্সি পড়ে আছেন ডলি আক্তার। ম্যাক্সিটি স্লিভলেস হবার কারণে দু’ডানার স্থুল মাংস দেখা যাচ্ছে যা একটি বিশ্রী আকার ধারণ করেছে। ডান পাটি বা পায়ের উপর রেখে রকিং চেয়ারে বসেই ছিলেন তিনি। বয়সের তুলনায় ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে। উচ্চতা কম হবার কারণে সেটি অধিক মাত্রায় ফুটে উঠেছে। গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা হলেও তাতে কোনো ধরনের লাবণ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বব কাট করে কাটা কালার করা চুলগুলি কোনোভাবেই তার শরীরের সাথে এ্যাডজাস্ট করছে না। সাদা ধবধবে মোটা হাতটি বাড়িয়ে কফির পেয়ালাটি নেবার পর তীক্ষè দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মায়ামনির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, ভুলেও যেন আর দেরী না হয়। তাকিয়ে থাকার সময় তার স্থুল মাংসে পরিপূর্ণ গ-দেশের উভয় প্রান্তে ভাঁজের সৃষ্টি হলো। মুখাবয়বজুড়ে প্রবল উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করবার পর কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা বোধ না করলেও চুপ রইলো মায়ামনি। যত ভালো করে, যত দ্রুততার সাথেই কোনো কাজ সম্পন্ন করা হোক না কেন, তার আচরণ অপরিবর্তিত থাকবেই-এটি বুঝতে পেরে প্রথমদিকে ভীত হলেও এখন আর তেমন কিছু অনুভব করে শঙ্কিত হয় না সে। শুধু তার কাজগুলি সুচারুভাবে সম্পন্ন করবার দিকেই মনোযোগী থাকে। বারান্দায় বসেই নির্দিষ্ট বিরতিতে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন আর রাস্তার দিকে তাকাচ্ছ্নে ডলি আক্তার। কফি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে কিচেন রুমে গিয়ে কাজ শুরু করলো মায়ামনি।
দুপুরের খাবার ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাতের খাবারগুলি ফ্রিজে রেখে টেবিলের সামনেই অপেক্ষা করতে থাকলো সে। ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন ডলি আক্তার। ড্রইং রুম থেকে ডাইনিং রুম দেখা যায়। মায়ামনিকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখবার পর মুখ ভার করে ডাইনিং টেবিলের কাছে আসলেন তিনি। টেবিলে বিভিন্ন ধরনের তরকারি থাকবার পরেও কাতল মাছের ছোট্ট একটি টুকরো, একটুখানি সবজি এবং স্বল্প পরিমাণে ভাত দেবার পর পরবর্তী দিন সময়মতো আসবার জন্য সতর্ক করলেন মায়ামনিকে। তরকারির স্বল্পতা প্রাপ্তির বিষয়টি প্রথমদিকে মায়ামনিকে আহত করলেও এখন সেটিও স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যত উন্নত মানের রান্নাই হোক না কেন, সেটি যে সেও ভোগ করতে পারবে, তা আর কখনো ভাবে না সে। খাবারের বাটিটি আঁচলের এক প্রান্ত দিয়ে ঢেকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে সোজা নতুন পাতা গ্রামের দিকে যাত্রা করলো মায়ামনি।
হাঁটবার সময় তিন সন্তানের মুখাবয়ব আপনা আপনি ভেসে উঠলো। যদিও এই মুহূর্তে বড় ছেলের সাথে দেখা হবার কোনো সুযোগ নেই। শুধু রাতে বাড়ীতে ফেরার পর দেখা হয় ওর সাথে। ছেলেটির নাম উচ্ছ্বাস। শহরের শ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে বিবেচিত প্রান্তনগর জেলা স্কুলে পড়াশুনা করে ও। অষ্টম শ্রেণি পাশ করে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে এ বছর। বর্তমানে যে সাংসারিক দীনতা রয়েছে সেটি বিরাজমান থাকলে হয়ত মায়ামনির পক্ষে কখনই সম্ভব হতো না তাকে জেলা স্কুলে পড়ানোর মতো দুঃসাহস দেখানোর। ছোট ছেলে উদ্ভাস এবং একমাত্র মেয়ে উষা এখন যেমন এনজিও পরিচালিত স্কুলে পড়ছে হয়ত তাকেও পড়তে হতো এ ধরনের স্কুলে। কিন্তু উচ্ছ্বাস যখন পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছিল তখন তাকে নিয়ে মায়ামনি এবং উজ্জ্বল আলোকিত ভুবন গড়বার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল। সেই স্বপ্নটি পূরণে দুজনই দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে এসেছিল। জেলা স্কুলে তাদের সন্তান যাতে পড়তে পারে সে লক্ষ্যে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু জলোচ্ছ্বাসের মতো হঠাৎ করে ধেঁয়ে আসা বিপদের কারণে তাদের জীবনজুড়ে যে অন্ধকার পর্বের সূচনা হবে, সেটি কখনোই কল্পনা করতে পারেনি মায়ামনি।
উজ্জ্বল। মায়ামনির স্বামী, তার জীবনে আবি®কৃত শ্রেষ্ঠ মানুষ। উজ্জ্বলের অবয়বটি লক্ষ করলে খুব সহজেই অনুমান করা যায়- তার লাজুকতা, বিনয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতার আবহটিকে। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করলেও তার আচরণে উচ্চ মাত্রার বিশিষ্টতা পরিলক্ষিত হতো সবসময়ই। হাসোজ্জ্বলভাবে যখন সে কথা বলতো তখন দু’গালের মাংসে এবং থুতনীতে পড়া টোলে তাকে অসাধারণ লাগতো। উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণের মুখটি যেন আরোও সপ্রতিভ হয়ে উঠতো। গোল গোল চোখ দুটিও যেন কথা বলতো চাইতো। চওড়া কপালের উপরে পরিপাটি করে আচড়ানো ঘন কালো চুলে রাজকীয় ভাবটি ফুটে উঠতো। উচ্চতা দীর্ঘ না হলেও মাঝারি ধরনের ছিল। মেদহীন শরীরে টি শার্ট এবং প্যান্ট পড়ে দোকানেই থাকতো সবসময়। ব্যবসা করতো কনফেকশনারির। বাড়ীর পাশেই ছিল দোকানটি। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দিনে দিনে আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটাতে শুরু করেছিল উজ্জ্বল। মায়ামনিকে বিয়ের পর সেই সমৃদ্ধির মাত্রাটি আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিয়ের পর দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতার গভীরতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস সর্বোচ্চ মাত্রাকে স্পর্শ করেছিল। আর্থিক সামর্থ্যরে মাঝেই সুযোগ পেলে অদূরের কোনো বিনোদন পার্ক অথবা শহরের বাইরে গ্রামের প্রকৃতির দিকে মায়ামনিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াত উজ্জ্বল।
প্রায় এগার বছর ধরে ওদের সংসার বেশ ভালোভাবেই চলে আসছিল। উচ্ছ্বাসও জেলা স্কুলে পড়াশুনা করবার সুযোগ পেয়েছিল। ছোট সন্তান দুটিও ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই উজ্জ্বলের মধ্যে এক ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ করতে পেরেছিল মায়ামনি। প্রথম দিকে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখবার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে অস্বাভাবিক আচরণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে প্রবলভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল সে। তিল তিল করে গড়ে তোলা কনফেকশনারির দোকানটি তালাবন্দি করে সময়ের আগেই কখন যে বাইরে বেড়িয়ে যেত উজ্জ্বল বুঝতে পারতো না মায়ামনি। এবং পরিবারের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই দোকান পরিচালনার ভার গ্রহণ করতে হয়েছিল তাকে। এই দোকান পরিচালনার মাঝেই সময় বের করে উজ্জ্বলকে খুঁজে বেড়াতো শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। কিন্তু মায়ামনি যখন বুঝতে পেরেছিল উজ্জ্বল নেশাক্রান্ত হয়ে পড়েছে তখন হতাশ না হয়ে এবং হাল ছেড়ে না দিয়ে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গিয়েছিল দোকানটিকে টিকিয়ে রাখবার। এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য উজ্জ্বলকে ভর্তি করিয়েছিল বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে রাজধানীর উন্নত মানের পূনর্বাসন কেন্দ্রে। আর সে কারণেই স্বামীর একমাত্র আশ্রয়স্থলটুকুও বিক্রি করতে হয়েছিল। যে কোনো মূল্যেই স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবে- এটিই ছিল মায়ামনির একমাত্র প্রত্যাশা।
এ্যাডিকটেড হবার পর থেকেই উজ্জ্বল সবসময়ই নিজেকে গুটিয়ে রাখতো মায়ামনির কাছ থেকে। প্রতিটি মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। কখনো ঘরের কোণায় উদাস দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকতো। আবার কখনোবা ঘর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গিয়ে ফিরে আসতো গভীর রাত্রে। তার এই নীরবতা, উদাসীনতা এবং গভীর রাত অবধি বাইরে অবস্থান করা প্রতি মুহূর্তে মায়ামনিকে সর্বান্তঃকরণে ক্ষত বিক্ষত করে তুলতো। অসীম সাহসের ওপর ভর করে সীমাহীন প্রচেষ্টার মাধ্যমে তার স্বামীকে স্বাভাবিকতার পথে ফিরিয়ে আনবার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল মায়ামনি। কিন্তু পারেনি তাকে সুস্থ করে তুলতে। ইদানিং হাল ছেড়ে দিলেও ওর স্বামী যেখানেই যাক, যাই করুক না কেন, কোনো খোঁজ খবর রাখবার আগ্রহ বোধ না করলেও সবসময়ই প্রত্যাশা করে থাকে-ওর যেন আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। কারণে অকারণে গ্রামের অনেকেই তার স্বামীকে নিয়ে অবজ্ঞাভরে কটুক্তি করলেও কোনো উত্তর না দিয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে চোখের পানি দিয়ে সহ্য করে নিত সেসব কটুক্তিকে। উদ্ভাস এবং উষার পড়াশুনার প্রতি ততটা মনোযোগী হতে না পারলেও উচ্ছ্বাস যাতে পড়াশুনার মাধ্যমে একজন যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সেই চেষ্টাটিই মনপ্রাণ দিয়ে করবার চেষ্টা করছে এখন পর্যন্ত মায়ামনি।
হাসপাতালের পাশ দিয়ে কিংবা শিক্ষা অফিসের পেছনের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটবার সময় আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকতো মায়ামনি। খুঁজবার চেষ্টা করতো তার সর্বোচ্চ ভালোবাসার মানুষটিকে। স্বভাবজ ভঙ্গিতে আজও হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখবার চেষ্টা করতে থাকলো। ব্ল্যাড সেন্টারের সামন দিকটায় একবার দেখেও নিলো। কিন্তু দেখতে পেলো না উজ্জ্বলকে। একদিন এই হাসপাতালের ব্ল্যাড সেন্টারের সামনেই উজ্জ্বলকে দেখতে পেয়েছিল মায়ামনি। অনেকটা জোর করেই রক্ত দেয়া থেকে বিরত রেখে বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত রক্ত প্রদান থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারেনি কোনোভাবেই। সে সূত্র ধরেই মায়ামনি নিজেও রক্ত বিক্রিতে উৎসাহিত হয়েছিল। নিয়মিত বিরতিতে রক্ত প্রদান করলে শারীরিক কোনো ক্ষতি হয় না, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হবার পর নিশ্চিত উপার্জনের অবলম্বন হিসেবে সেও পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল-রক্ত বিক্রির বিষয়টি। তবে উপুর্যপরি দু’বার রক্ত বিক্রির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে আজ প্রবলভাবে বাঁধা দিয়েছিল। যে কারণে আজ আর রক্ত বিক্রি করা হয় নি মায়ামনির। আবার নিয়মিত বিরতিতে রক্ত বিক্রি করে আসলেও অতি প্রয়োজনের কারণে এবারের মতো বাধ্য হয়ে রক্ত বিক্রি করবার নিমিত্তে লাইনে দাঁড়িয়েছিল মায়ামনি। সে নিজেও চায় নি শরীরের ক্ষতি করে এভাবে রক্ত বিক্রি করতে। কিন্তু এছাড়া আর তার কোনো উপায় ছিল না।
প্রায় ত্রিশ মিনিট হাঁটবার পর বাড়ীতে এসে পৌঁছলো মায়ামনি। উঠোনের এক প্রান্তে মাটির একটি চুলোয় ভাত উঠিয়ে দেবার পর দ্রুত একটি ডিম এবং দু’টুকরো আলু সিদ্ধ করে আলুর ডাল রান্না করলো। ডিম এবং ডলি আক্তারের বাসা থেকে নিয়ে আসা মাছের ছোট্ট টুকরোটিকে দুভাগ করে মোট চার ভাগ করলো। মাছের ছোট্ট টুকরো দুটি উদ্ভাস এবং উষাকে দিয়ে নিজে সামান্য সবজি দিয়ে খেয়ে নিলো। আলুর ডাল এবং ডিমের দু’টুকরো অংশ রাখলো উচ্ছাস এবং তার বাবার জন্যে। বেশিরভাগ সময়ই উজ্জ্বল দুপুরের রেখে যাওয়া খাবারটি গ্রহণ করে না। সেক্ষেত্রে বিকেলের নাস্তা হিসেবে খাবারটি খেয়ে নেয় উদ্ভাস এবং উষা। ইতোমধ্যে কালীগঞ্জে যাবার সময় হয়ে যায় মায়ামনির। তাই বিশ্রাম নেবার সুযোগ হয় না ওর। কালীগঞ্জের বাসায় কাজ করতে হয় বিকেল থেকে কাজ শেষ না হওয়া অবধি সময় পর্যন্ত। বাসাটি পাঁচতলা বিশিষ্ট। তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটেই ভাড়া থাকেন আখতার পরিবার। আখতার হোসেন চাকরি করেন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে, স্ত্রী লাবনী আক্তার গৃহিণী। অত্যন্ত সুশ্রী এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারিণী লাবনী সরকারের বাসায় কাজ করে অনাবলি প্রশান্তি অনুভব করে মায়ামনি। লাবনী সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য কিংবা বকুনি তো শুনতে হয়ই না বরং হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার তার এই সংগ্রামী জীবনে এতটুকু হলেও বেঁচে থাকবার স্বপ্ন দেখায়। ঘরদোর থেকে শুরু করে বাসন কোসন পরিস্কার করলেও রান্নার কাজটি লাবনী সরকারই করে থাকেন নিজ হাতে। মসলা বাটা, মাছ-মাংস কিংবা সবজি কাটার কাজটুকু করে মায়ামনি। বাসার কাপড় চোপড় পরিষ্কার করলে অতিরিক্ত অর্থও পেয়ে থাকে এখানে।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে কালিগঞ্জ রোডের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলো মায়ামনি। হাতে এখনও পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। তাই ওর হাঁটবার মধ্যে কোনো ধরনের তাড়া লক্ষ করা গেল না। পুরানো বাজারের সামনে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। কোলের ওপর রাখা অবস্থায় স্কুল ব্যাগসহ উচ্ছ্বাসকে দেখতে পেলো তারই এক সহপাঠীর সাথে রিকশায় করে বাড়ীর দিকে যেতে। এর আগেও কয়েকদিন ওর সাথেই রিকশায় যেতে দেখেছিল মায়ামনি। দ্রুততার সাথে ওদের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে নিলো। রিকশা পেরিয়ে যাবার পর আবার হাঁটতে হাঁটতেই ভাবতে থাকলো - ওর সন্তানটি যদি এভাবে প্রতিনিয়ত এক বন্ধু থেকে আরেক বন্ধুর অনুগ্রহ গ্রহণ করবার ব্যাপারটিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে তাহলে সেটি তার ব্যক্তিত্ব গঠন এবং বিকাশে ভবিষ্যতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। এমনটি ভাবতেই বুকের ভেতর একটি সূক্ষ্ম চাঁপা কষ্ট অনুভব করলো মায়ামনি। ভাববার সময় হাঁটার গতি কমে এলেও আবারও গতি বাড়িয়ে দিলো। অতঃপর নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পৌঁছে গেল লাবনী সরকারের বাসায়। কলিং বেল চাপবার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো দরজার সামনে। দরজা খুলবার পরই লাবনী সরকারের হাসোজ্জ্বল মুখ দেখবার পর পুলকিত বোধ করলো নিজের ভেতর। মায়ামনিকে বুবু বলে সম্বোধন করেন লাবনী সরকার। স্বতস্ফূর্ত ভাব নিয়ে কুশল বিনিময়ের পর দুজনই ভেতরে প্রবেশ করলো। ড্রইংরুমে বসে টিভির সুইচ অন করলেন লাবনী সরকার। হাতে পড়া কাঁচের সবুজ রংয়ের চুরির শব্দে হঠাৎ কাঁচের ওপর সূর্যরশ্মির ঝিলিকের মতো একটি মোহনীয় দ্যোতনার সৃষ্টি হলো। সবুজের সাথে লাল পেড়ে শাড়ি পড়েছেন তিনি আজ। ঘন কালো চুলের গ্রামের ভেতর দিয়ে সোজা বেরিয়ে যাওয়া গ্রামীণ পথটির সরু সিঁথিটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লম্বা লম্বা চুলগুলি ঘাড় অবধি ছড়িয়ে পড়েছে। চুলগুলি সামান্য পরিমাণে ভেজা থাকায় কালো রংয়ের ঘনত্বটি তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হচ্ছে। উচ্চতায় অনেক লম্বা তিনি। গায়ের ত্বক শ্যামল রংয়ের হলেও তার মোহনীয় দৃষ্টিভঙ্গি, সদাহাসোজ্জ্বল অবয়ব সেই শ্যামল রংটিকেই মযার্দাবান করে তুলেছে। লাবনী সরকারের সাথে বসেই টিভি দেখছিল মায়ামনি। কোনো ধরনের আড়ষ্টতা কাজ করে না এখানে তার। লাবনী সরকারকে প্রচ- ভালোবাসে সে। নিজ সংসারের সমস্যাগুলি অকপটে বিনিময় করে তার সাথে। লাবনী সরকারও তার সামর্থ্যরে মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেন সাহায্যের হাতটি প্রসারিত করবার। কিছু সময় অবধি টিভি দেখবার পর রান্নাঘরে গিয়ে কাজ শুরু করলো মায়ামনি। সন্ধ্যে পেরিয়ে গেলে নিজে থেকেই লাবনী সরকার মায়ামনিকে ডেকে পর্যাপ্ত খাবার প্রদান করে রাত্রি বাড়বার আগেই বাড়ী যেতে পরামর্শ দিলেন।
টিনের চালবিশিষ্ট ঘরটিতে টেবিলের এক প্রান্তের চেয়ারে বসে পড়ছে উচ্ছ্বাস। টেবিলটি চৌকির সাথে লাগানো। চৌকিতে বসে টেবিলের অপর প্রান্তে আঁটসাট হয়ে পড়ছে উদ্ভাস। খড়ের বেড়ার সাথে লাগানো টেবিলের প্রান্ত অংশটুকুজুড়ে কিছু পাঠ্যপুস্তক এবং খাতা সাজানো রয়েছে। ছোট বোন উষাকে চৌকিতে বসেই পড়তে হয় এবং এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে ও। তিন সন্তানের শারীরিক অবয়ব দেখবার পর তাদের অভ্যন্তরীণ দীনতার কথা কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না। উচ্ছ্বাস এবং উদ্ভাসের শারীরিক অবয়বে তাদের বাবা উজ্জ্বলকেই খুঁজে পাওয়া যায় পুরোপুরি। এবং উষা দেখতে হয়েছে ঠিক তার মায়ের মতোই। ওদের তিনজনের চেহারার মধ্যেই কোমলতার ছাপ পরিলক্ষিত হবার পাশাপাশি খুঁজে পাওয়া যায় ইতিবাচক কিছু করবার তেজোদীপ্ত অভিপ্রায়। প্রতিদিনই ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ীতে ফিরবার পর নিষ্পাপ সন্তানদের মুখগুলির দিকে তাকিয়ে থাকবার পর অপরিসীম প্রশান্তি খুঁজে পায় মায়ামনি। পড়াশুনার প্রতি ওদের প্রবল আগ্রহটি উপলব্ধি করবার পর কাক্সিক্ষত গন্তব্যটিতে পৌঁছোনোর জন্যে আরো প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে ও। বাড়ীতে এসে খাবারটি রাখবার পর উষার মাথায় হাত বুলিয়ে গালে একটি চুমু -------- বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে থাকে ও। পড়াশুনার মুহুর্মুহ শব্দের মাঝে উজ্জ্বলের অতীত প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে তার মননজুড়ে। উজ্জ্বলের হাসিমাখা মুখ,স্বাপ্নিক সংসার গড়বার আগ্রহ এবং সন্তানদের নিয়ে তার সাজানো স্বপ্ন ইত্যাদি। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবার পর উঠে দাঁড়ায় ও। একটি প্লেটে খাবার সাজিয়ে খড়ের ঘরটিতে রেখে আসতে বলে উচ্ছ্বাসকে। অতঃপর উচ্ছ্বাস এবং উদ্ভাসকে খাবার দিয়ে নিজেই একটি প্লেটে করে উষাকে খাওয়ানোর পাশাপাশি নিজেও খেতে থাকে। খাবার পর্বটি সম্পন্ন হলে উচ্ছ্বাসকে ডেকে নিয়ে বাইরের আঙিনায় আসে মায়ামনি। ইতোমধ্যে প্রকৃতি নীরবতা ধারণ করেছে। মাঝে মধ্যে দূর থেকে ব্যাঙ ডাকার শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় মাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে উচ্ছ্বাস। মায়ের মুখাবয়বজুড়ে ক্ষীণ উত্তেজনার ছাপ লক্ষ করবার পর আড়ষ্ট হয়ে পড়লো ও। উচ্ছ্বাসের কোমল ডান হাতটি শক্ত করে ধরলো মায়ামনি। ধরবার সময় মায়ামনির হাতের তালুতে সৃষ্টি হওয়া আড়ের ঘর্ষণে অস্বস্তি বোধ করে মায়ের মুখের দিকে তাকালো উচ্ছ্বাস। পুত্রের তাকানোর ভঙ্গিটি লক্ষ করে বুঝতে পারলো মায়ামনি-ডান হাতটি দিয়ে ওর উচ্ছ্বাসের হাতটি চেপে ধরা ঠিক হয় নি। হাতের গ্রন্থি শিথিল হয়ে এলো মায়ামনির। উচ্ছ্বাসের কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে তীব্র ভাষায় বকুনি দিতে চাইলেও সেটি আর করলো না। পক্ষান্তরে সন্তানকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে অশ্রু বিজড়িত কণ্ঠে বললো-‘আমরা গরীব, রিকশায় চড়ে স্কুল অথবা অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের যে নেই, তুই জানিস। তারপরেও তুই যদি তোর কোনো বন্ধুর সাথে রিকশায় চড়ে কোথায় যাস তাহলে তোকেও কোনো না কোনো দিন যদি রিকশা ভাড়াটি দিতে হয় তাহলে কি তুই পারবি দিতে? যদি না পারিস তখন তোকে তোর নিজের কাছে কি ছোট মনে হবে না? আর এতে কি আমি অপমানিত হবো না!’- আঁচল দিয়ে চোখ মুছলো মায়ামনি। আর্থিক দীনতা থাকলেও ব্যক্তিত্ববোধ অর্জনের ক্ষেত্রে যেন তার সন্তানেরা সমৃদ্ধ হতে পারে এ ধরনের ইতিবাচক ভাবনা হয়ত মায়ামনিকে বাধ্য করলো উপর্যুক্ত কথাগুলি বলতে। তাছাড়া রিকশায় বন্ধুর সাথে উচ্ছ্বাসকে দেখার পর থেকেই বিষয়টি প্রচ-ভাবে ভাবিয়ে তুলছিলো তাকে। উচ্ছ্বাস মায়ের হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে কতকটা যেন চাপা কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুধু বললো- ‘আমি আর কোনোদিন রিকশায় চড়বো না মা, তোমাকে আমি কথা দিলাম।’ এবার মায়ামনি যেন আরো আবেগে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে একের পর এক চুমু দিতে থাকলো।

ইলেকট্রিসিটি না থাকবার কারণে গভীর রাত অবধি পড়াশুনার সুযোগ পায় না উচ্ছ্বাসরা। খেয়ে নিয়ে চৌকির প্রস্থের দিকে শুয়ে পড়লো চারজনই। কিন্তু সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুমোতো পারলো না মায়ামনি। একটি শব্দ শুনবার অপেক্ষায় জেগে রইলো। কাক্সিক্ষত শব্দটি কান অবধি না পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলো। কখনো কখনো শব্দটি অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই মায়ামনির শ্রবণে পৌঁছে যায় আবার কখনো কখনো এই একটি শব্দের জন্যে গভীর রাত অবধি অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার প্রহরটি প্রলম্বিত হচ্ছে আজ। বেশ কিছু সময় অপেক্ষার পর শব্দটি যখন শ্রুত হলো না তখন বাম হাত দিয়ে জানালাটি খুললো মায়ামনি। জানালাটি খুলে শুক্লপক্ষের রাত্রির প্রায় পূর্ণাঙ্গ চন্দ্রটিকে এক দৃষ্টিতে তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো দেখতে থাকলো। জ্যোৎস্না রাত্রিতে চাঁদের সৌন্দর্যের রূপ যে এত মোহনীয় হতে পারে তা বোধকরি আজকেই প্রথম উপলব্ধি করলো সে। চাঁদের এই বাঁধভাঙ্গা আলোর উৎসবে খুঁজে নেবার চেষ্টা করতে থাকলো উজ্জ্বলকে। অসংখ্য তারার মাঝে একটি তারা হয়ে তার কাছে ছুটে আসা উজ্জ্বলকে কল্পনা করে প্রশান্তি অনুভবের চেষ্টা করলো। মোহনীয় সুখাবেশে নিজেদের মননকে জুড়িয়ে নেবার অভিপ্রায়ে ওকে নিয়ে হারিয়ে যেতে চাইলো দূর থেকে অতি দূরের কোনো স্বাপ্নিক নীল নগরে। সেই দৃশ্যকল্পটি রোমন্থন করবার এক পর্যায়ে এসে থমকে যেতে হলো মায়ামনিকে। শ্রবণে শ্রুত হলো সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শব্দটি। বুঝতে পারলো উজ্জ্বল এসেছে। এ শব্দটি তারই আগমনী বার্তা। কোনো কোনো দিন এভাবে গভীর রাতে উজ্জ্বল ফিরে এলে মায়ামনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আড়চোখে তাকিয়ে দেখবার চেষ্টা করতো- উজ্জ্বল খাচ্ছে কিনা? আজও তাই করে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো মায়ামনি।
এভাবেই কেটে গেল মায়ামনির দুঃখগাঁথা সাংগ্রামিক জীবনের একটি বছর। সন্তানরাও একটি করে শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উঠলো। যদিও সন্তানের কৃতিত্ব প্রতিটি বাবামায়ের জন্যেই প্রচুর আনন্দ এবং স্বস্তির তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বিপরীত ঘটে যায় কখনো কখনো। যেমনটি আজকে ঘটেছে মায়ামনির ক্ষেত্রে। মায়ামনি আনন্দ এবং স্বস্তিবোধ করলেও মুহূর্তেই আবার হতাশার অন্ধকারে ডুবে গেল। সময় প্রবাহের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেলো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ পড়াশুনার সকল সামগ্রীর ব্যয়। কিন্তু মায়ামনির মজুরির কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে সে। তাছাড়া দশম শ্রেণিতে উঠবার কারণে উচ্ছ্বাসের পড়াশুনোর ব্যয় বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় নেবার পর নিরুপায় হয়েই কিছুদিন ধরে অপর একটি বাসায় অতিরিক্ত সময় কাজ করছে মায়ামনি। ডলি আক্তারের বাসার কাজ শেষ করে ঘণ্টাখানেকের জন্য কাজ করে সেখানে। বিষয়টি কষ্টকর হবে জেনেও বাধ্য হয়েই ছুটো কাজটি নিতে হয় তাকে। বিষয়টি সবার কাছে গোপন রাখে সে। ডলি আক্তারের বাসায় ঠিকমতো কাজ করলেও সম্প্রতি তিনদিন দেরি করেছে সে। রক্ত বিক্রি করবার কারণে একদিন এবং অন্য দু’দিন ঘুম থেকে দেরীতে উঠবার জন্যে। সঙ্গত কারণেই ডলি আক্তারের রুক্ষতার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণে অকারণে মায়ামনিকে কটাক্ষ করে কথা বলতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করছেন না তিনি। আজও দুপুরবেলা আসবার সময় মায়ামনিকে সাবধান করে দিয়েছেন-যাতে কোনোভাবেই দেরী না হয়। যদি হয় সেক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেবার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না তিনি। বিষয়টি দিনে দিনে সহ্যসীমার বাইরে চলে যাবার কারণে এক ধরনের অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে ছুটো কাজের বাসার দিকে যাত্রা করে মায়ামনি। নতুন বাড়ীর পরিবেশটি এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নি। নির্দিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করেই বাড়ীর দিকে যাত্রা করে সে। খুব দ্রুততার সাথে নিজ গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের বেশী সময় ধরে বিছানায় শুয়েই থাকে ও। এক সময় চোখ দুটি বুজে আসে। ঘুম থেকে উঠবার পর তড়িঘড়ি করে লাবনী সরকারের বাসার দিকে দ্রুত যাত্রা করে।
বাসায় এসে দু’বার কলিং বেল চাপলেও কেউ দরজা খুলে না দেয়ায় কিছুক্ষণ দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ওকে। কিছুক্ষণ পর আখতার হোসেন এসে দরজা খুলে দেন। অসময়ে আখতার হোসেনকে বাসায় দেখে আশ্চর্য হয় মায়ামনি। ছুটির দিন ব্যতীত এই সময়গুলিতে কখনই তাকে দেখতে পায়নি সে। কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। ড্রইং রুমে বেশ কয়েকটি ট্রলি এবং বড় ব্যাগ দেখবার পর বুঝতে পারে না- এতগুলি ব্যাগ এক সাথে রাখা হয়েছে কেন? মনের ভেতর অজানা আতঙ্ক নিয়ে লাবনী সরকারের কাছে ছুটে যায় সে। বেডরুমে টুকিটাকি কাজ করছিলেন তিনি। মায়ামনিকে দেখবার পর ঠোঁটের কোণে হাসি সৃষ্টি করবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন লাবনী সরকার। মায়ামনি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই ওকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকবার পর বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও তার কাছে বসে যান। মায়ামনির মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন- ‘বুবু, আপনার ভাইয়ের হঠাৎ করেই বদলী হয়েছে, কালই যোগদান করতে হবে। তাই আজকে রাতের ট্রেনেই আমাদের যেতে হচ্ছে।’ কথাগুলি বলবার সময় লাবনী আক্তারের ঠোঁট দুটি কাঁপছিল। নিজেও কিছুটা আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়ছিলেন। তিনি যে বলবার সময় কষ্ট পাচ্ছিলেন তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। এমনভাবে যে মায়ামনিকে হঠাৎ কথাগুলি বলতে হবে লাবনী সরকারও সেটি ভাবতে পারেন নি। মায়ামনির সন্তানরা যাতে লেখাপড়া ঠিকমতো চালিয়ে যেতে পারে সেটি মনে প্রাণে চাইছিলেন তিনি। এবং চাইবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আর্থিকভাবে সাহায্যও করেছিলেন। নির্বাক হয়ে লাবনী সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো মায়ামনি। কোনোকিছু বলবারই শক্তি পেলো না। মুহূর্তেই ওর অন্তর্করণ প্লাবিত হতে থাকলো। দেহের প্রতিটি শিরা-উপশিরা জুড়ে প্রবল উত্তেজনা অনুভব করতে থাকলো ও। লাবনী সরকার পাশেই ছিলেন। বুঝতে পারছিলেন, তাদের চলে যাওয়াতে মায়ামনির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই ওকে সান্ত¡না দেবার চেষ্টা করছিলেন। বিদায় দেবার সময় চলতি মাসের বেতনসহ অতিরিক্ত কিছু অর্থ এক প্রকার জোর করেই মায়ামনির হাতে পুরে দিলেন।
চিন্তার রেখা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকলেও বাস্তবতাকে মেনে নিতে চেষ্টা করলো মায়ামনি। যত ধরনের লাঞ্ছনাই সহ্য করতে হোক না কেন দীর্ঘদিন ধরে ডলি আক্তারের বাসায় কাজ করছে তো। নিরুপায় হয়ে ডলি আক্তারের মধ্যে ভালো গুণাবলীর অণ্বেষণ করে নিজেকে সান্ত¡না দেবার চেষ্টা করলো। এক ধরনের অপ্রসন্ন প্রেরণা নিয়ে প্রত্যয়ী হয়ে উঠলো- আগামীকাল ভোরের সূর্য উঠবার সাথে সাথেই যাত্রা করবে ডলি আক্তারের বাসায়। যে দুটি বাসায় কাজ করছে, আপাতত সেখানেই পুরোপুরি কাজের মধ্যে ডুবে থাকবে। পরবর্তীতে অন্য কোনো বাসায় কাজের সংস্থানের চেষ্টা করবে। যদিও কাজের মধ্যে কখনই ফাঁকি দেয় নি মায়ামনি অথবা সে ধরনের চিন্তা তার মননে কখনোই কাজ করে নি। স্বল্প সময়েই বাড়ীতে চলো এলো ও। প্রতিদিনের মতো আজও সন্তানদের মুখগুলির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। কীভাবে তাদের মানুষ করবে সেটি ভাবতেই আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। কাক্সিক্ষত মানুষটির বাড়ীতে প্রবেশ করবার মুহূর্তে যে শব্দটি উচ্চারিত হয় তা শুনবার জন্যে আজ আর অপেক্ষা করতে পারলো না সে। ক্লান্ত এবং বিষণœতায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হবার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো।
বেশ কিছুদিন হলো কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। এই সময়টিতে প্রান্তনগর শহরে কুয়াশার মাত্রা বেশি থাকে। সে কারণেই দেশের অন্যান্য জেলার থেকে এই জেলার মানুষদের শীতের মধ্যে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়। গ্রামের মধ্যে সেই ভোগান্তির পরিমাণটি আরো বেশি হয়। আজও কুয়াশা পড়েছে। কুয়াশার ঘোমটায় আড়ালে রয়ে গেছে সূর্য। সামান্য দূরত্বে স্থিত বৃহদাকার স্থাপনাগুলি কুয়াশার কারণে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাস্তার দু’প্রান্তে মাঝে মাঝে দু’একটি দোকানের সাটার খুলতে দেখা গেলেও প্রায় সব দোকানই বন্ধ। কখনো কখনো দু’একজন লোককে দেখা যাচ্ছে। কেউ শরীরকে ফিট রাখবার জন্যে হাঁটছে, আবার কাউকে প্রয়োজনে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। ধূসর মেরুণ রংয়ের একটি ভাঙাচোড়া কার্ডিগ্যান পরে তীব্র কুয়াশার মধ্যেই হেঁটে চলেছে মায়ামনি। ওর শরীরের একদম পাশ দিয়ে ঢাকাগামী একটি বাস চলে গেল। বাতাসের দ্রুত বেগের কারণে প্রচ- শিরশিরে অনুভূতি অনুভব করলো সে। কার্ডিগ্যানের উর্ধ্বাংশের খোলা বোতামটি লাগিয়ে নিলো যাতে পরবর্তীতে বাতাসের অনুভূতিটি কার্ডিগ্যান ভেদ করে বুকের ভেতর প্রবেশ করতে না পারে।
নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই ডলি আক্তারের বাসায় চলে এলো ও। কলিংবেল চাপবার সাথেই দরজা খুলে গেল। কুহেলীকে দেখতে পেলেও কিছু জিজ্ঞেস না করেই রান্নাঘরের দিকে যাত্রা করলো। রান্নাঘরে প্রবেশ করবার পূর্ব মুহূর্তেই গ্যাসের চুলোর শব্দে আঁতকে উঠলো। দেখবার জন্যে রান্নাঘরে প্রবেশ করবে এমন সময় বারান্দা থেকেই ডলি আক্তারের ইঙ্গিতে ড্রইং রুমে প্রবেশ করলো মায়ামনি। দূর থেকেই অনুমান করতে পারলো-রান্নাঘরে যে মহিলাটি কাজ করছে সেও তারই মতোই মধ্যবয়স উত্তীর্ণ একজন নারী। ড্রইং রুমের মেঝেতেই বসে পড়লো সে। ধীর গতিতে বারান্দা থেকে এগিয়ে এসে সোফায় বসলেন ডলি আক্তার। ঘুম থেকে জেগে উঠবার বেশি সময় যে অতিক্রান্ত হয় নি তা বোঝাই যাচ্ছে। অনুনয়ের দৃষ্টি নিয়ে ডলি আক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকলো মায়ামনি। তার শরীরের ভাষা জুড়ে শেষবারের মতো বিবেচনা করবার এক ধরনের বিনীত আকুতি ফুটে উঠেছে। কিন্তু মায়ামনির আকুতি কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করলো না ডলি আক্তারের মুখাবয়বে। বরং মায়ামনি বুঝতে পারলো কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আকুতিকে চূর্ণ করে দিয়ে গর্জে উঠবেন তিনি। এবং হলোও তাই। কর্কশ দৃষ্টিতে মায়ামনির দিকে তাকিয়ে বললেন -‘অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছি একজন নতুন লোক পেলে তোকে আর রাখবো না, বুঝতে পারছিস তো আমি কী বলতে চাইছি, এখন যত দ্রুত সম্ভব বিদেয় হ।’ কথাগুলি শোনার পর বুঝতে পারলো মায়ামনি- অনুরোধ করেও কোনো কাজ হবে না। মেঝেতে বসা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে পুরো বাসাটি দেখে নিলো একবার। বেশ কিছুটা সময় মেঝেতেই বসে রইলো। এরই মধ্যে ডলি আক্তার বেডরুমে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর মেঝে থেকে উঠে কুহেলীর মাথায় হাত বুলিয়ে অতি পরিচিত সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামতে থাকলো মায়ামনি।
মনের অজান্তেই চোখের পাতা বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো মায়ামনির। শাড়ীর আঁচলের প্রান্ত অংশ দিয়ে চোখ দুটি মুছে ফেলে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে মূল সড়ক ধরে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু হাঁটতে গিয়েই যেন আরো অধিক মাত্রায় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লো ও। অতীতের স্মৃতিগুলি বার বার করে ওর দৃষ্টিকে ঝাপসা করে তুলছিল। অনেক চেষ্টা করেও অশ্রুধারাকে কিছুতেই রোধ করতে পারছিলো না। বার বার চোখ মুছবার পরে অশ্রু ফোঁটা যেন থেকেই যাচ্ছিল দু’চোখের কোণে। এ কারণে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলা পথচারীদেরকেও পূর্ণ অবয়বে প্রত্যক্ষ করতে পারছিলো না। সঙ্গত কারণেই হেঁটে চলা মানুষগুলির দৃষ্টিতেও বিষয়টি এড়িয়ে গেল না। কিছু সময় পূর্বেই এখানে যথেষ্ট কুয়াশার আস্তরণ থাকলেও এখন তা অনেকটাই কেটে গিয়ে কিছুটা ফর্সা রূপে পরিবর্তিত হয়েছে। এরই মধ্যে সূর্যেরও দেখা মিলেছে। সূর্যের আলো ঝলমলে সোনালী রোদের রঙ যেন প্রকৃতিকে এক অপরূপ নববধূর সাজে সজ্জিত করেছে। হেমন্তের ঝলমলে আলোর নৃত্যে কিছুটা তাপ অনুভব করলো মায়ামনি। এই বিপুল আলোর ঝরনায় স্নাত হবার লক্ষ্যে নিজের গায়ে থাকা ভাঙ্গাচোড়া কার্ডিগানটি শরীর থেকে খুলে এক হাতে নিলো। এই মুহূর্তে কোথায় যাবে কিংবা কোথায় যাওয়া উচিত সেটি জানে না সে। শুধু মস্তিষ্কে অসীম চিন্তাকে ধারণ করে গন্তব্যহীনভাবে হেঁটেই চলেছে। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে সদর হাসপাতালের পেছনের ফাঁকা রাস্তার সামনে চলে এলো। রাস্তার পাশেই কিছু মানুষের ভীড় দেখতে পেলো। একবার ভীড়ের দিকে এগিয়ে যাবার কথা চিন্তা করে পরক্ষণেই আবার সামনের দিকে এগিয়ে চললো। হাসপাতালের পেছনের সড়কটি অতিক্রম করে মূল সড়কেও চলে আসলো সে। মূল সড়কে আসবার পর আর হাঁটতে ইচ্ছে করছিলো না তার। কেন জানি বার বার হাসপাতালের পেছনের রাস্তায় ফেলে আসা ভীড়ের দৃশ্যকল্পটি ভেসে উঠতে থাকলো তার মননজুড়ে। সেই জায়গাটিতে যাবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। সামনের দিকে আর এগুলো না। দিক পরিবর্তন করে আবারো পেছনের রাস্তা অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলো। অতি দ্রুততার সাথে চলে এলো। পূর্বের তুলনায় কোলাহল কিছুটা কমে এলেও কিছু মানুষ এখনও রয়ে গেছে সেখানে।
ভীড়ের খুব কাছাকছি এসে সে ভীড়ের ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলো মাটির ওপর শায়িত লোকটিকে। কিন্তু পুরোপরি দেখতো পারলো না। কারণ উবু হয়ে পড়েছিলো মানুষটি মাটির ওপর। কিছু সময় চেষ্টার পর মানুষটির পায়ের জুতো এবং প্যান্টের নীচের অংশ দেখেই যেন আঁতকে উঠলো মায়ামনি। ছেড়া জুতো এবং ধূসর সাদা শার্টটি দেখেই বুঝবার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না, যেন হৃৎপি- ফেঁটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসবার উপক্রম করলো। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে দু’হাত দিয়ে লোকজনকে দু’পাশে সরিয়ে দিয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকলো। হৃদয়কে সামলাতে পারলেও চোখদুটিকে সামলাতে পারলো না। অশ্রু আর বাধ মানলো না, গড়তে থাকলো দু’গাল বেয়ে। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন থেকে ঘনতর হতে শুরু করলো। ভীড় ঠেলে কোনোমতে লোকটির মাথার কাছে গিয়ে বসে পড়ে মাথাটি মাটি থেকে তুলেই চাপা স্বরে যেন চিৎকার করে উঠলো-‘উজ্জ্বল! এখানে, এভাবে কেন তুমি?’- আর কোনো কথা না বলে ওর বুকে কান লাগিয়ে হৃৎপিন্ডের স্পন্দন বুঝবার চেষ্টা করলো। নাকের সম্মুখে হাত দিয়ে বুঝতে চাইলো শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি। উজ্জ্বলের মুখ থেকে লালা ঝরছে। উবু হয়ে থাকবার কারণে একটি গালে মাটির সাথে ঘর্ঘণের ফলে পুড়ে যাওয়া চামড়ার মতো যেন দেখাচ্ছিল ওর ওই গালটি। শাড়ীর আঁচল দিয়ে সে গালের মাটি এবং মুখের লালা মুছে দিয়ে সব লোকদের প্রতি আকুল মিনতি করে শুধু বলতে থাকলো -‘একটি ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিন, ওকে এখুনি হাসপাতালে নিতে হবে। দয়া করে একটি ভ্যান গাড়ীর ব্যবস্থা করে দিন।’ উজ্জ্বলের কপালে হাত রেখে আবার বললো- ‘এখনও হয়তো শেষ নিঃশ্বাসটি রয়ে গেছে, আপনারা দয়া করুন, আমাকে সাহায্য করুন, আমার স্বামীকে বাঁচান।’
ওর এই আকুতি শুনে একজন বলে উঠলো-‘ভ্যান এখানেই আছে, রাস্তার পাশেই, ওকে ভ্যানে তুলে দেবার ব্যবস্থা করুন, আমিও ধরছি।’ বলে লোকটি এগিয়ে এসে আরও তিন চারজনসহ উজ্জ্বলকে ভ্যানে তুলে দিয়ে মায়ামনিকেও ওর কাছে বসতে বললো। মায়ামনি দ্রুত ভ্যানের ওপর উঠে উজ্জ্বলের মাথার কাছে বসে উজ্জ্বলের মাথাটি নিজের কোলে উঠালো। ভ্যানটি দ্রুত হাসপাতালের দিকে চলতে শুরু করলো। পেছন পেছন সব লোকগুলিও আসতে থাকলো। এতক্ষণ ধরে যে চ্যাচামেচি, চিৎকার, কোলাহল, হাঙ্গামা ছিলো- সে সব থিতিয়ে এলো। এখন সবার আকাক্সক্ষা একটিই -উজ্জ্বলকে বাঁচাতে হবে। এ মুহূর্তে অন্য কিছুই আর যেন ওদের ভাববার অবকাশ নেই।
অত্যন্ত দ্রুতই পৌঁছে গেলো ভ্যানটিসহ মানুষগুলি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি কক্ষের কাছে। কাল বিলম্ব না করে যত দ্রুত সম্ভব ইমার্জেন্সিতে নেয়া হলো উজ্জ্বলকে। কর্তব্যরত চিকিৎসক ইমার্জেন্সির বিছানায় ওকে শুইয়ে দিয়ে কিছু পরীক্ষা করে নার্সকে নির্দেশ দিলেন পেশেন্টকে অক্সিজেন দিতে। অক্সিজেন সিলিন্ডার বিছানার পাশেই ছিলো। সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বলের মুখম-লে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো হলো। কাজ করতে শুরু করলো অক্সিজেন। চিকিৎসকের দৃষ্টি অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং রোগীর শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে। এভাবে কিছুক্ষণ কেটে গেল। খুবই ধীর গতিতে অক্সিজেন প্রবেশ করতে থাকলো রোগীর শরীরে। চিকিৎসকসহ সবাই আশান্বিত হলো। কিছু কথাবার্তা বলাবলিও শুরু হলো। ‘যাক বেঁচে গেল হয়তো’। কেউ কেউ বললো -‘ঠিক সময় মতো আনা না গেলে হয়তো আর বাঁচতো না।’
চিকিৎসক সবাইকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। ইনজেকশনের নাম সম্বলিত একটি স্লিপ মায়ামনির হাতে দিলেন। স্লিপটি আর একজন তরুণ মায়ামনির হাত থেকে নিয়ে বললো-‘আপনি থাকুন, আমি নিয়ে আসছি।’ স্লিপটি নিয়ে চলো গেলো তরুণটি। সবাই রুদ্ধশ্বাসে রোগীর দিকে তাকিয়ে আছে। সময় ধাবিত হচ্ছে, সবার উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর মধ্যেই চিকিৎসকের ভেতর একটি আকস্মিক অস্থিরতা আর চাঞ্চল্য লক্ষিত হলো। চিকিৎসক অক্সিজেন সিলিন্ডারের কাছ থেকে দ্রুত এসে পেশেন্টের বুকের উপর দু’হাত দিয়ে চাপ দিতে শুরু করলেন। হঠাৎ এ রকম একটি অবস্থায় সবাই যেন একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দিকে তাকাতে থাকলো। লক্ষ করলো-রোগী আর অক্সিজেন নিতে পারছে না। স্থির হয়ে গেছে অক্সিজেনের নিঃসরণ।
এরই মধ্যে তরুণটি ইনজেকশনটি নিয়ে ইমার্জেন্সিতে প্রবেশ করে চিকিৎসকের হাতে দিতে উদ্যত হলো। কিন্তু চিকিৎসক ইনজেকশনটি আর না নিলেন না। বললেন- ‘ওটির আর প্রয়োজন নেই’। বলেই পেশেন্টের মুখম-ল থেকে অক্সিজেন মাস্কটি খুলে দিলেন এবং খুবই শান্তভাবে বললেন-‘আর নেই,ওকে নিয়ে যান।’ চিৎকার করে উঠলো মায়ামনি-‘আল্লাহ’। মায়ামনিও যেন স্থির হয়ে গেলো।
সবাই মিলে উজ্জ্বলকে সেই ভ্যানেই তুললো যে ভ্যানটিতে করে ওকে ইমার্জেন্সীতে নেয়া হয়েছিলো। সবাই মায়ামনিকে ওর স্বামীর শিয়রে বসতে বললো। মায়ামনি জড় পদার্থের মতো ওদের নির্দেশ মেনে স্বামীর শিয়রে বসলো। ওই তরুণটি, যে ইনজেকশন আনতে গিয়েছিলো সে কোথা থেকে যেন একটি সাদা রঙের চাদর এনে সেই চাদরটি দিয়ে মৃত উজ্জ্বলের শরীরটি ঢেকে দিলো। কিন্তু যখনই মুখটি ঢাকতে গেলো - বাঁধা দিলো মায়ামনি। কিছুতেই মুখটি ঢাকতে দিলো না নির্বাক শুকনো চক্ষু মায়ামনি। উজ্জ্বলের মুখটি খোলাই থাকলো। ভ্যানটি চলতে শুরু করলো।
নিদারুণ এক অনিশ্চিত আর দুর্বোধ্য ভবিষ্যতের দিকে স্বামীর লাশটি নিয়ে যাত্রা করলো মায়ামনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান ভাল লাগল চরিত্র চিত্রনে ও বুননে।
    প্রত্যুত্তর . ২ ফেব্রুয়ারী
  • মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া
    মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া কিছুতেই মুখটি ঢাকতে দিলো না নির্বাক শুকনো চক্ষু মায়ামনি। উজ্জ্বলের মুখটি খোলাই থাকলো। ভ্যানটি চলতে শুরু করলো।
    নিদারুণ এক অনিশ্চিত আর দুর্বোধ্য ভবিষ্যতের দিকে স্বামীর লাশটি নিয়ে যাত্রা করলো মায়ামনি.. বাতাসটা দু’ভাগ করে দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে গেল। অমন একটি গল...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৫ ফেব্রুয়ারী
  •  মাইনুল ইসলাম  আলিফ
    মাইনুল ইসলাম আলিফ কিন্তু যখনই মুখটি ঢাকতে গেলো - বাঁধা দিলো মায়ামনি...........................নিদারুণ এক অনিশ্চিত আর দুর্বোধ্য ভবিষ্যতের দিকে স্বামীর লাশটি নিয়ে যাত্রা করলো মায়ামনি।//একেবারেই বাস্তব একটি গল্প,সুন্দর বিষয় আর উপস্থাপনা।দারুন।ভোট আর পছন্দ রইল।
    প্রত্যুত্তর . ৬ ফেব্রুয়ারী
  • বালোক মুসাফির
    বালোক মুসাফির এমন একটি গল্প লিখেছেন যার প্রসংশা না করলে নয়। কিন্তু গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনে একটাই কৌতুহল আপনার গল্পে মায়া মনি চরিত্রটি কি মুসলীম না হিন্দু। একটু পরিস্কার করবেন। গল্পটি অসম্ভব ভালো লেগেছে। পছন্দ এবং ভোট রইল। পারলে সময় করে আমি অদমের গল্পটিও পড়ে দেখবেন।
    প্রত্যুত্তর . ৭ ফেব্রুয়ারী
  • মোহাম্মদ  বাপ্পি
    মোহাম্মদ বাপ্পি আপনার জন্য শুভকামনা রইল।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৭ ফেব্রুয়ারী
  • আসাদুজ্জামান খান
    আসাদুজ্জামান খান সুন্দর গল্প। ভালো থাকুন। আরো লিখুন।
    প্রত্যুত্তর . ৭ ফেব্রুয়ারী
  • খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
    খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি সচরাচর চেনা কাহিনী ... তবে গল্প লেখার বিষয়ে সিদ্ধহস্ত বলে পাঠক মনে গল্পটি স্থান করে নিতে পারবে বলে মনে করি....খুব ভালো লাগলো ..... ভোট করলাম....আসবেন আমার কবিতার পাতায়....অন্যদের লেখা না পড়লে বা ভোট না করলে.....আপনার লেখার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কি করে? ......  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৯ ফেব্রুয়ারী
  • সাদিক ইসলাম
    সাদিক ইসলাম তিন ধরনের নারী চরিত্রের চমৎকার রূপায়ন। মায়ামনির মতো অসহায়ারা আমাদের সমাজের প্রতিদিনকার নির্মমতার শিকার। গল্পটি পড়ে রাইডার্স টু দা সি এর নোরার ট্রাজেডি মনে পড়লো। ভালো লাগলো ভোট রইলো।
    প্রত্যুত্তর . ১০ ফেব্রুয়ারী
  • মো: নিজাম  গাজী
    মো: নিজাম গাজী অসাধারন লেখনী। শুভেচ্চাসহ ভোট রেখে গেলাম। শুভকামনা শতত।
    প্রত্যুত্তর . ১০ ফেব্রুয়ারী
  • মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
    মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী আপনি যে চমৎকার গল্প লেখেন, তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। এবারও আপনার গল্প চমৎকার হয়েছে। মায়ামনিদের মত অসহায় নারীদের বাস্তব জীবন কাহিনী ফুটে তুলেছেন। এ ছাড়াও সামাজিক আরও কিছু কর্মকান্ড রুপায়িত করেছেন, যা খুব ভালো লেগেছে। আচ্ছা করবার, পারবার, দেখবার শব্দগুল...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১০ ফেব্রুয়ারী

advertisement