লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জানুয়ারী ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৬টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুলাই ২০১৪)

আদর্শ বাবা
বাবা দিবস

সংখ্যা

শাহ্ আলম শেখ শান্ত

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩৩৪
শ্রদ্ধেয় আব্বাজান নামাক্ষর সম্পন্ন একজন সহজ সরল মানুষ । এছাড়া অন্য কোন অক্ষর জ্ঞান তাঁর কলবে নেই । বড় কৌতুহলের সহিত একদিন শুধালাম ,
" আব্বা , আপনি কি শৈশবে একদিনও স্কুল যাননি ।"
একটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কয়েক সেকেণ্ড চুপ থেকে উত্তর দিলেন ,
" নারে বাবা , সক করিয়েও যাং নাই । "
লক্ষ করলাম , ওনার আধা পক্ক দাড়িযুক্ত মুখখানি কষ্টের কালো ছায়ায় আবৃত । ফের শুধালাম ,
" কেন ? "
" সে কতা কৈসনেরে বাবা , মনোত উডলে দাউ দাউ করি আগুন জ্বলে । তোর দাদায় হামাকগুলেক কপাল পোড়া বানাইচে । হামার অনেক জমা জমি আচিল্ । পাঁচ সাত ঝোন চাকরও আচিল্ । সেই জন্যে কচিল পড়ানেকা করি কি হইবে ? হামারো অতগুলে বুজ আচিল্ নে । তিস্তে নদী যহন সোউগ ভাঙ্গি নিয়ে গেল , হামারো কামলা খাডা কপাল শুরু হইলো ।"
এই বলেই ওনি হুক হুক করে কাঁদতে লাগলেন । বাকি দুঃখের কথাগুলো অসম্পুর্ণ রয়ে গেল । আমি তাঁর অশ্রু মুছে দিয়ে যতটুকু সম্ভব সান্ত্বনা দিলাম । দাদা কখনো ভাবেনি এভাবে তিস্তা তাদেরকে সর্বহারা করে ছাড়বে ।

আমি স্বচোখেই দেখেছি , আব্বা অন্যের জমিতে কাজ করতো । বেচারা দৈনিক কাজ করতে অপারগ ছিলেন । শৈশব থেকেই আলালের ঘরের দুলালের মত বেড়ে উঠেছে । কঠোর পরিশ্রম কোমল গতরে সহ্য হতোনা । একদিন কাজ করলে দুই দিন বিশ্রাম নিতেন । একবার অভাবের তাড়নায় এক নাগাড়ে সপ্তাহ খানেক কাজ করে মাস খানেক অসুস্থ ছিলেন । আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে মেজো ও বড় ভাই উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে । মেধা শক্তি তেমন দুর্বল ছিলনা বিধেয় আজও স্পষ্ট স্মরণ আছে । সংসার ও পড়াশুনার ব্যয় বহন আব্বার পক্ষে সম্ভব ছিলনা । আর বর্ষায় তো দু'মাস ধরে কাজেই থাকেনা । তখন এমনও সময় গেছে একটি আটার রুটি ও পানির সাহায্যে পেট ভরিয়ে সারাদিন পার করেছি ।

মায়ের সামান্য কিছু গহনা সম্বল ছিল , তা বিক্রি করে একটি বকনা বাছুর কিনেছিলেন । আমি বাছুরটিকে প্রাণাধিক ভালবাসতাম । ওর ক্ষুধার হাম্বা ধ্বনি আমার দেহে অসহ্যের আগুন ধরিয়ে দিতো । সব কাজ ফেলে দিয়ে গাছের পাতা পেড়ে দিতাম । দৈনিক স্কুল থেকে ফিরে ওর জন্য ঘাস কাটা আমার ডিউটি হিসেবে ধার্য্য ছিল ।
অল্প দিনেই বেশ বেড়ে উঠলো , বাছুরও জন্ম দিল । প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন কেজি দুধ দিতে লাগল । আল্লাহ যেন কষ্টের বোঝা হালকা করতেই গাভীটিকে ফেরেশ্তা রুপে পাঠিয়েছেন । ঐ সময় দুধের কেজি দশ টাকা চালের কেজিও দশ টাকা । আমি দৈনিক বিকেলে বাজারে দুধ বেচে চাল কিনে আনতাম । এখন নুন দিয়ে হলেও দু'বেলা পেট পুরে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছন মহান আল্লাহ ।

একদিন পাশের বাড়ির জাহিদ ও আমি দু'জনেই বাজারে যাচ্ছি দুধ বেচতে । বাড়ি থেকে কাশিম বাজার প্রায় মাইল খানেক দুরে । রাস্তা দিয়ে গেলে যে সময় লাগে বিলের মাঝ দিয়ে গেলে অর্ধেক সময় লাগে বলেই আমারা বিল দিয়েই যেতাম । দু'জনে ধান ক্ষেতের আঁইল দিয়ে যাচ্ছি । সেদিন দুভার্গ্য ক্রমে আঁইলে হোঁচট খেয়ে আমার বালতির বেশি অর্ধেক দুধ পরে যায় । আমি কাঁদতে শুরু করলাম । কারণ আজ কম চাল দেখলে আব্বা মারবে । হয়তো ভাববে আমি টাকা দিয়ে অন্য কিছু করেছি । আমার কাঁন্না দেখে জাহিদ কি যেন ভেবে বলল ,
" কাঁন্দিসনে মোর একটা বুদ্দি হইচে ।"
আমি বললাম ,
" কি বুদ্দি ?''
জাহিদ আমার প্রশ্নের জবাবের ভুরুক্ষেপ না করে হাত দিয়ে ধান ক্ষেতের পানি তুলে দুধের সাথে মিশালো । এখন পূর্বের চেয়ে দুধের পরিমাণ বেশি মনে হলো । এমন দুষ্ট বুদ্ধি আমার মগজে ছিল না । সব চিন্তা দূর হলো । গান গাইতে গাইতে বাজারে পৌছিলাম । পৌছার সঙ্গে সঙ্গে খরিদ্দার এসে জাহিদের দুধের বালতি খালি করে দিল । জাহিদ আমার জন্য অপেক্ষা না করে বাড়িতে চলে গেল । আব্বাকে গিয়ে বলল ,
" তোমার বেটা আইজকে বেশি অদ্দেক দুধ ফেলে দিচে ।"
এ কথা শুনে আব্বাতো রেগেমেঘে আগুন । বাড়িতে গেলে নিশ্চিত মার খেতে হবে ।

এদিকে আমি আছি চরম বিপদে । কোন ক্রেতা আমার দুধ কিনেনা । কারণ দুধ থেকে ছোট্ট ছোট্ট কালো পোকা বালতির কিনারা বেয়ে দলে দলে উপরে উঠছে । এক মুরব্বি বলেই ফেলল ,

" এইল্লে তো ধান বাড়ির পোকা , তুই চুরি করি ভুঁইয়ের পানি মিশেছিস্ ।"
আমি দু হাতে কান ধরে কাঁন্দা কাঁন্দা স্বরে বললাম ,
" মুই কোনো পানি দেং নাই ।"
চিন্তায় আমার কলিজা শুকিয়ে গেল । দুধ বিক্রি না হলে বিপদ আছে । বেলা ডুবার পূর্বেই আমার ছাড়া সকলের বালতি খালি হলো । মাথায় এক হাত দিয়ে একাই বসে রইলাম । হঠাত্ কোথ থেকে যেন এক বৃদ্ধা এসে অন্ধকারেই আমার দুধ কিনে নিলো । আমি মহা আনন্দে অনতি বিলম্বে চাল কিনে বাড়ি রহনা দিলাম ।
বাইরের উঠান থেকেই আব্বার তর্জন গর্জন শুনে ভয় পেলাম । পা থর থর করে কাঁপতে লাগল । ভাবলাম , নিশ্চয় জাহিদ আব্বাকে বলেছে । এক পা দু পা করে বাড়িতে ঢুকে দেখলাম , আব্বার হাতে মোটা একটি লাঠি । মারের আতংকে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল । আব্বা হাত পাঁচেক দূর থেকে বলল ,
" চাউল কই ?"
আমার মন বলছিল চাউল দেখলে হয়তো আর মারবে না । তাই একটু সাহস করে চালের ব্যাগ সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম ,
" এই যে ।"
ব্যাগ ভর্তি চাউল দেখে আব্বা থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । মা তখন বলে উঠলেন ,
" পালোয়ান হইচে , মাইনসের ছাওয়ার কতা শুনি নিজের ছাওয়াক ডাংবার জন্যে হাত সুসসুরেয় ।"
আব্বা তখন নরম স্বরে বললেন ,
" মুই শুন্নু তুই দুধ ফেলে দিছিস ।"
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম । মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে মায়ার স্বরে বললেন ,
" বাপ ক তো দ্যা হোং , দুধ ফেলে দিচলু ?"
আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম ,হ্যাঁ ।
" তাহাইলে চাউল কিনলু কেমন করি ?"
" জাহিদ দুধোত পানি মিশেল করি দিচে ।"
এ কথা শুনে আব্বা রাগের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়ে লাঠি উঠালেন । আমি ভয়ে ও মাগো বলে একটা চিত্কার দিলাম । আমার আতংকিত চেহারা দেখে আব্বা লাঠি ফেলে দিলেন । কিন্তু আমার ওপর তাঁর রাগ নিবারন হয়নি । মাকে বললেন ,
" এই চাউল তুই হাড়িত্ দিবের পাবান্নোইস । আর আইজকে যদি উয়েক ভাত দেইস ,তাহাইলে এ ভিডেত তোরো ভাত নাই ।"
মাকে এমন কঠিন সতর্ক বাণী নির্দেশ করলেন । আর আমাকে রাখলেন ঘরে তালা দিয়ে । ক্ষুধার চোটে আমি চোখের পাতা জোড়া লাগাতে পারিনি । মাও সারা রাত জেগে ছিল । একটু পর পর বিছানা ছেড়ে দরজা ও জানালার নিকটে গিয়ে বলতেন ,
" বাবা ঘুমেছিস ?"
মধ্য রাতে আব্বা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মা আমার জন্য চুরি করে ভাত আনতে গেছে তৈজসপত্রের আওয়াজে আব্বার ঘুম ভাঙ্গে । মায়ের হাত থেকে ভাতের থালা কেড়ে নিয়ে মাকে দুইটা চর মারে । আমি হতভাগার পেট ভাতের গন্ধও পেলনা । আব্বা ফজরের নামাজ পড়ে তালা মুক্ত করে দিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে আমাকে ডাকলেন ,
" বাইরে আয় ।"
এক রাতের অনাহারে আমার শরীরে এক তোলাও বল ছিলনা । মুখ শুকিয়ে যাওয়াতে কথাও সরছে না । আস্তে আস্তে বের হলাম । মা অশ্রুসিক্ত চোখে আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে আছে । আব্বা আদেশ করলেন কান ধরে উঠা বসা করতে । আর নির্দেশ দিলেন বলতে , কোন দিন যেন এমন অন্যায় না করি । আমি কান ধরে বসতে গিয়ে দুর্বলতার দরুণ হুড়মুড়ি খেয়ে মাটিতে পরে গেলাম । মা ছুটে এসে আমাকে বুকে টেনে নিলেন । আর নিভর্য়ে আব্বাকে বকতে লাগলেন । আমার অবস্থা দেখে আব্বা মায়ের বকাকে প্রাপ্য বলেই মেনে নিয়ে চুপ থাকলেন ।

আব্বা কিছুক্ষণ পর ঐ চাল বিক্রি করে টাকা নিয়ে ইমাম সাহেবের নিকটে গিয়ে বললেন ,
" এই টেকাটা আল্লার ঘরে দিবেন ।"
এ কথা শুনে ইমাম সাহেব হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । এতই অবাক হলেন যে , কোন কথাও বলতে পারলেন টাকাটা নিতে হাতও বাড়ালেন না । আব্বা তখন ইমাম সাহেবের হাতে টাকাটা ভরিয়ে দিলেন । ইমাম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন ,
" ব্যাপার কি ! আপনি নিজেই হাভাতে মারা যাচ্ছেন । আসছেন মসজিদে দান করতে ! যান , এই টাকা দিয়ে চাল ডাল কিনে নেন । মসজিদে দান করার জন্য আল্লাহর অনেক সম্পদশালী বান্দা আছেন ।"
আব্বা উত্তর দিলেন ,
" এই টেকার বদল মাডি খায়য়া প্যাট ভরা ভালো হইবে ।"

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement