লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ১৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২২

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভালবাসা (ফেব্রুয়ারী ২০১১)

কৃষ্ণকলি
ভালবাসা

সংখ্যা

রাজিব ফেরদৌস

comment ১৫১  favorite ৫৫  import_contacts ৩,৮৭২
খবরটা পাবার পর রজনীর বুকের খুব গভীরে চিনচিনে একটা ব্যথা দিনভর তাড়িয়ে বেড়ালো তাকে। অথচ খুব কি আশা করেছিলো সে? অবশ্যই করেছিলো। তিল পরিমান আশার বীজ কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল। নইলে ফোনটা পেয়েই নিথর হয়ে গেল কেন শরীর? বুকটা কেমন ফাকা ফাকা লাগলো। সকালেই ফোনটা এলো। মিজানের ফোনফ্যাক্সের দোকানে। মিজানের দোকানে ফোন করে রঞ্জুর নাম বললেই রজনীকে ডেকে দেয়। রঞ্জু রজনীর ছোট ভাই। রঞ্জু যেবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়লো, সেইবার বাবা ওই অত বড় ছেলের কান ধরে বলেছিল, এখনই দুর হয়ে যা বাড়ি থেকে।
রঞ্জুর তাতে কোন আপত্তি ছিলনা। সে তো তখন উড়ছে। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে বম্বে যাবার তাল খুঁজছিল। শাহরুখের মত লম্বা লম্বা চুল রেখে আয়নার সামনে দাড়িয়ে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে হিন্দি ছবির ডায়ালগ ঝাড়ত। রজনী সেটা লক্ষ্য করতেই রঞ্জু হেসে বলতো, কিরে আপা হচ্ছে তো? রজনী রাগ রাগ চোখে তাকাতেই সে শুঁড় শুঁড় করে মিজানের দোকানে যেত। ওটাই হচ্ছে ওদের আড্ডাখানা।
যখন মিজান ফোনের দোকান দিল তখন তাদের গ্রামে সেভাবে ফোন ঢোকেনি। বড় রাস্তার মোড়ে মিজানের দোকানের গ্ল্যামার বেড়ে গেল। হু হু করে লোক আসতো ফোন করতে। এখন অবশ্য সবার হাতে হাতে ফোন। কিন্তু রজনীদের কোন ফোন নেই। রজনীর মনে হয় একটা মোবাইল কেনার মত অবস্থা হয়তো কোনদিনই তাদের হবেনা।
তো মিজানের দোকানেই সবাই তাদের খবরা খবর পাঠায়। এবারও পাঠাল, “পাত্রীকে আমাদের পছন্দ হয়নি। খবর শুনে রজনীর মা সারা সকাল গজ গজ করতে থাকলো নিজের মনে। শেষে ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না।
রঞ্জুর এসবে কোন ইন্টারেস্ট নেই। তার যত আগ্রহ রাজ্যের ফিল্ম ম্যাগাজিন, ডিশ চ্যানেলের নাচ গান আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা। একটা কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলেভারী বয়ের চাকরী করে সে। মাস গেলে পনেরশো। তার প্রায় সবটাই যায় নিজের পিছনে। কারও জন্য সে ভাবে না। রজনীর মনে হয় রঞ্জুর জন্যও কি কেউ ভাবে? অন্তত সে তো নয়ই। কেন ভাববে সে?
রজনীর মনে হয় তার নিজের জন্যই বা কে ভাবছে? মাও কি তার বিয়ে দেবার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস? মা জানে যে তার বিয়ে হয়ে গেলে সংসার টানতে সে অথই জলে পড়বে। সেলাই আর হাতের কাজ করে যা আয় করে সে তাতে টেনে হিঁচড়ে হাড়ি তো চড়ছে চুলায়।
রজনীর মাঝে মাঝে মনে হয় মা আজকাল অনেক কথাই তার কাছে চেপে যায়। সেবার মোতালেব কাকা পাবনা থেকে যে সম্বন্ধটা আনল মা এক কথায় তা কেটে দিল কেন? পাত্র বিবাহিত, এক ছেলের বাপ, তাতে কি। এর আগেও তো এরকম একটা বিবাহিত পুরুষের সামনে সেজে গুজে তাকে বসতে হয়েছিল।
মোতালেব কাকা রজনীর বাবার কিরকম যেন বন্ধু। সে-ই আসে কোথা থেকে সব সম্বন্ধের খবর নিয়ে। গ্রামের পোস্ট অফিসের পিয়ন, বড় বাজারে গদিতে খাতা লেখার চাকুরে, পোলট্রি ব্যবসায়ী এইসব। রজনী সেদিন লক্ষ্য করেছে মা আর মোতালেব কাকা বারান্দায় বসে ফিস ফিস করে কি সব বলছে। সে কাছে যেতেই তারা চুপ করে গেল। রজনীর মনে হল মা তাকে বিয়ে না দেবার ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু সে তা কিছুতেই হতে দেবেনা। মা কি ভেবেছে, সে কিছুই বোঝে না? এবার সে নিজেই চেষ্টা করবে। সে যতই কালো, কুৎসিত হোক, একটা বর সে নিজের জন্য ঠিকই জোগাড় করে নেবে।
সেদিনই বিকেলে হাতের কাজ করা থ্রি পিছগুলো পৌঁছে দিতে সে বাবলু ভাইয়ের দোকানে যাচ্ছিল। প্রতি সপ্তায় যেমন যায় তেমনই। হঠাৎ সে দেখতে পেল বড় রাস্তার মোড়ে কালভার্টের সামনে যে সাদা একতলা বাড়ি আছে তার জানালা থেকে কে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। রজনীর বুকটা ধুক করে উঠলো। গতি কমিয়ে আড়চোখে তাকাতেই কে যেন নিমিষে জানালার আড়ালে চলে গেল।
সেদিন সারারাত বিছানায় ছটফট করে কাঁটালো সে। একে তো কালো, তার উপর এই ত্রিশ বছর বয়সেও যে কেউ তার দিকে তাকায় তা ভেবে মনে মনে অবাক হল রজনী।
পরদিন বিকেল বেলায় বেণী ঝুলিয়ে, মেরুন শাড়িটা পরে যখন সে বের হচ্ছিল, তখন মায়ের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে পড়ে গেল। সে মিথ্যা করে বলল, বাবলু ভাই কিছু থ্রি পিছ দেবে বলেছেন। তার দোকানে যাচ্ছি। সেদিনও ঠিক ওই সময়ে সাদা বাড়িটার সামনে কে যেন দাড়িয়ে ছিল। রজনীর মনে হয়েছিল, কার যেন একটা মুগ্ধ দৃষ্টি তার সারা শরীর ধুয়ে দিচ্ছিল। অহেতুক বড় রাস্তার মোড় পেড়িয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে সে বাড়ি ফিরে এলো। আসতে আসতে সে ভাবল, সাদা একতলা বাড়িটা এতদিন তালা বন্ধ ছিল। হঠাৎ কে এলো ওখানে? নতুন ভাড়াটে, নাকি বাড়ির মালিকই আবার ফিরে এলো। লোকটা কি জানে যে সে প্রতি শনিবার বিকেল চারটায় ওই রাস্তা ধরে হাটে। যদি জানেই তবে আজ রবিবারেও কেন দাঁড়ালো? ও কি লুকিয়ে চুরিয়ে সব মেয়েদেরকেই দেখে। নাকি শুধুই তাকে। রজনী ভেবে কোন কুল কিনারা পেল না।
ফেরার সময় দোকান থেকে আবার একটা ফেয়ারনেস ক্রিম কিনল সে। আর একটা সাবান। টিউবের পর টিউব ক্রিম আর প্রতিদিনই সাবান ঘষে সে। তবু ফরসা হয়না। টিভিতে যে এত দেখায়, মাত্র তিন থেকে ছয় সপ্তায় রূপ ঝলমলে চেহারা নিয়ে সব বিউটি কুইন হয়ে যাচ্ছে সে সব কি তবে মিথ্যে? মা বলে, ঘষ ঘষ। ঘষে মুখের চামড়া তুলে ফেল পোড়ামুখি। রজনীর তবু মনে হয় চামড়াটা একটু চক চক করছে ইদানীং। সে কি তার মনের ভুল? রজনী বুঝতে পারেনা।
পরদিন রজনী যখন সেই সাদা বাড়িটার উদ্দেশে বেড় হতে গেল, মা বলেই ফেললো, আজ আবার কোথায় যাচ্ছিস? মায়ের এরকম প্রশ্নে খুব রাগ হল তার। তার কি শখ আহ্লাদ বলে কিছু নেই? একটা বন্ধুও নেই তার যে মনের দুএকটা কথা বলবে। একবার যদি বিকেলে বের হয় তাতে মায়ের এত আপত্তির কি আছে তা সে ভেবে পায়না। মায়ের কথার কোন জবাব না দিয়েই সে ধুমধাম বেড়িয়ে যায় বাড়ি থেকে।
সাদা বাড়িটার সামনে গিয়েই তার পা জোড়া ভারী হয়ে গেল। আড়চোখে সে দেখল, জানালার পাশে আবছা মত একজন পুরুষ মানুষ দাড়িয়ে তাকে দেখছে। রজনীর নিশ্বাস উষ্ণ হয়ে এলো। পা আর চলতে চাইলো না।
কারণে অকারণে রজনী আজকাল রাস্তায় হাটে। ঠিক ওই সাদা বাড়িটার সামনে এসে বুকের কাপড় ভাজ করে। কোমরের নিচের শাড়ি টানটান করে। এসব করতে করতে রজনীর মনে হয়, জানালার আড়াল থেকে লোকটা নিশ্চয়ই তাকে দেখছে। আচ্ছা লোকটা কি তার প্রেমে পড়ে গেল? ভাবতেই রজনীর বুকটা কেপে ওঠে।
ছোটবেলা থেকেই রজনীর প্রেমে পড়ার রোগ। ছেলে দেখলেই হুট হাট প্রেমে পড়ে যেত। কেউ বাদ যেত না। কেউ একবার তার দিকে তাকালেই হল। তাকে নিয়ে আকাশ কুসুম ভেবে ফেলত। কিন্তু সে প্রেমে পড়ে ছটফট করলে কি হবে। আজ পর্যন্ত তার প্রেমে কেউ পড়েনি কোনদিনও। সে যখন কলেজে পড়তো তখন তারও খুব ইচ্ছা হতো কেউ এসে তার বইয়ের ভাজে চিঠি গুঁজে দিয়ে যাক। তাকে কেউ সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাক। যমুনার ধারে কারো হাত ধরে সে বসে থাকবে চুপচাপ। কেউ এসে তাকে বলেনি কোনদিনও-রজনী আমি তোমাকে ভালবাসি। রজনীর মাঝে মাঝে কান্না পায়। সে কি খুব খারাপ দেখতে? মা বলে, আমার পেটে তুই কি করে জন্মালি। সত্যিই তাই। মা দেখতে সুন্দর না হলেও সুশ্রী। মায়ের পাশে সে নিতান্তই বেমানান। তবে তার এক একসময় মনে হয় তার থেকেও কি কেউ খারাপ দেখতে নেই। তাদের কি বিয়ে হয়না।
সেদিন রঞ্জুর বিছানায় একটা ম্যাগাজিন পড়েছিল। রজনী সেটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখতেই চোখ আটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনে। একটা কালো মেয়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। মুখের আদল অনেকটা তারই মতো। তার মতই পুরু ঠোট, চাপা নাক। কপালটা উঁচু আর বেশ চওড়া। এদেরকেও তো লোকে সুন্দরী বলে কদর করে। সুন্দর আসলে ঠিক কি- রজনী বুঝতে পারেনা। তবু সে রাস্তায় বেরুলে তার থেকেও খারাপ দেখতে মেয়ে মনে মনে খুঁজে বেড়ায়।

প্রেমে পড়তে গিয়ে রজনীকে কম ঘা পেতে হয়নি। চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছে তবুও গায়ে মাখেনই। তাকে ভুলে গিয়ে আবার অন্য কারো প্রেমে পড়েছে। রফিক ভাই ছিল তার আর রঞ্জুর গৃহশিক্ষক। মনে মনে রফিক ভাইকে নিয়ে স্বপ্নের সাগরে ভেসেছে সে। তার কাছে পড়তে বসলেই রজনীর মন উদাস হয়ে যেত। অকারণ শিশুসুলভ চাঞ্চল্য প্রকাশ পেত। প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খেয়েছে। পড়তে বসে টেবিলের নিচ দিয়ে রফিক ভাইয়ের পা ছুঁয়ে চোখের ইশারায় আগুন জ্বালাতে চাইতো।
একদিন কোণের ঘরে পড়তে বসেছে। মা রান্না ঘরে। বাবা তখনো বাড়ি ফেরেনি। হঠাৎ লোডশেডিং হওয়াতে রঞ্জুকে পাঠাল হ্যারিকেন আনতে। ঠিক তখনই রজনীর কি যেন কি হয়ে গেল। সে রফিক ভাইকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেত গেল। অন্ধকারে ঠোট খুঁজে না পেয়ে কপাল ঠুকে গেল গালে। একি করছ তুমি বলতে বলতে ছিটকে সরে গেল রফিক ভাই। পরদিন আর পড়াতে এলো না। তার পর আর কোনদিনও এলো না। মনে পড়লেই রজনীর হাসি পায়।
রফিক ভাই ছাড়াও তার রানু কাকী মার দেওর আতাহার ভাই, এমনকি বাবার অফিসের সহকর্মী কাওছার কাকু, কার জন্য না তার মন একসময় পাগল ছিল। সবাই তাকে শুধু ফিরিয়েই দিয়েছে। শুধু একজন, সেই সাদা বাড়িতে তাকে দেখার জন্য দাড়িয়ে থাকে! ভাবতেই সারা শরীর জুড়ে শিহরণ জাগে রজনীর। কেউ একজন শুধু তার জন্য অপেক্ষায় আছে!
প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ফিরে আলমারি খুলে একটি কাঠের বাক্স নামায় রজনী। বাক্সটা খুলে চুপচাপ বসে থাকে সে। বাক্সটা খুললেই তার বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা খুব সুন্দর করে বাক্সটা সাজিয়ে দিতে চেয়েছিল। পারেনি। পাত্র পক্ষের সামর্থ্য নেই জেনে বাবা বিয়ের বেনারসি শাড়ি এবং আরো টুকিটাকি জিনিস কিনতে শুরু করেছিলো। নগদ চল্লিশ হাজার টাকা আর কানের, গলার, হাতের গয়না। গয়না গুলো গড়াতে দেয়া হয়েছিল। টাকাটাও জোগাড়ের চেষ্টা করেছিলো বাবা। কিন্তু বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে মারা গেল। এত অবিশ্বাস লাগে রজনীর! দিব্যি জলজ্যান্ত মানুষটা অফিসে গেল পান মুখে দিয়ে। বিকেলে ফিরল লাশ হয়ে। বিয়েটা ভেঙ্গে গেল। গয়না গুলো নেয়া হল না। বাবার বিদেশি ফার্ম সামান্য কিছু টাকা দিয়ে হাত গুটিয়ে নিলো। কিছু টাকা জোগাড় হয়েছিল বিয়ের জন্য। কিছুদিন চলল সেসব ভেঙ্গে। তারপর মা-ই বোলো, একটা সেলাই মেশিন কেন। কিছু একটা কর। তুই তো হাতের কাজ শিখেছিলি।
অগত্যা রজনীকে সেলাই আর হাতের কাজ ধরতে হল। আর সেই যে ধরল, সাত বছর হয়ে গেল। তার জগতটা শুধু সুই-সুতা, প্যাটার্ন, মাপ এই সবে আটকে গেল। বাবা থাকলে সে এতদিনে অন্যের ঘরে চলে যেত। তারও ছেলে মেয়ে হতো। পাড়ার বান্ধবীরা যখন বাচ্চা কোলে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে, তাদের দেখে রজনীর চোখ তখন চিক চিক করে ওঠে। তারও তো ওরকম হতে পারতো, যদি না বাবা হার্ট এ্যাটাকে মারা যেত। এসব কিছু ভাবতে ভাবতে রজনীর বুকটা ভেঙে যায়।
মুখে ক্রিম মাখতে মাখতে রজনী দেখল মা আড় চোখে তাকে দেখছে। ঢং তো কম দেখছিনা। রোজ রোজ ক্রিমের পিছনে অত পয়সা ঢাললেই কি আর সংসার চলবে?
ঝাঁঝিয়ে উঠতে গেল রজনী, চলছে না তো কি। কিছু তো আর বসে নেই। কিন্তু সে এসব কিছুই বলল না। অন্য সময় হলে বলতো। আজ তার মন খুব ভালো। আজ সাদা বাড়িটার সামনে ব্যাগে কিছু একটা খুঁজছে- এমন ভাব করে দাড়িয়ে ছিল দুই মিনিট। লোকটা তখনো জানালার আড়ালে। কেন যে সামনে আসেনা। শুধু কি দেখেই যাবে? দেখুক না যত খুশি। কিছুই তো বলেনা। রজনী ভাবে, একদিন কি সে নিজেই কোন এক অজুহাতে ওর বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসবে? কাজটা খুব দুঃসাহসিক মনে হয়না তার কাছে। এতদিন ধরে এত রকম সংকেত পাঠাল সে। অথচ লোকটা ধরতে পারলো না। তাকে যদি লোকটা ডেকে কিছু বলতো তাতে সে কিছুই মনে করতো না।
সকালবেলা মোতালেব কাকা এলো। মার কানে কি ফুসমন্তর দিল কে জানে। মা রান্না ঘরে ডেকে পাঠাল রজনীকে। কাল বিকেলে আবার টইটই করতে বেড়িয়ো না যেন। লোক আসবে তোমাকে দেখতে। মা আর বিশেষ কিছু বলল না। রজনী ঘরে এসে রাজ্যের কাজ নিয়ে বসলো। ঘরদোর ঝাড়াঝাড়ি, বিছানার চাদরও কাঁচল। বিয়ের কথা শুনে একটা ভাবনা সারাক্ষণ হুল ফোটাল তাকে।
চুপচাপ ভাত খেয়ে নিলো। সারা দুপুর ঘুমাতে পারলো না। এপাশ-ওপাশ করলো কেবল। সিদ্ধান্ত নিলো, সাদা বাড়ির ও যদি কিছু না বলে আজ সে নিজেই তাকে সরাসরি বলবে, আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকেন কেন? আমাকে কি কিছু বলবেন? জানেন কাল আমাকে দেখতে আসবে। আপনি কিছু একটা করবেন না? এখনও এরকম চুপ করে থাকবেন। রজনীর মনে হয় তার এরকম কথায় লোকটা নিশ্চয়ই লজ্জা পাবে। কিন্তু আজ যে ওর সঙ্গে মুখোমুখি হতেই হবে তাকে। রজনী ভাবে, কেমন দেখতে ও? খুব একটা আহামরি না হলেও চলবে তার। রজনীকে যে ভালবাসবে, তাকে ভালবেসেই রজনীর সুখ। এরকম আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই বিকেল হল।
সাবান ঘষে গোসল করলো সে। শীতের বিকেলে গা শিরশির করছিল। তাই দেখে মা ঘ্যানঘ্যানে গলায় বলল, মর মর। ঠাণ্ডা লেগে মর। রজনী ভাবে, কারো মা কি এভাবে কথা বলে! মার মনে কি একটুও মমতা নেই। সে অবাক হয়। আজ মাকে সে দুচার কথা শুনিয়ে দিলো না অন্য দিনের মত। আজ তার মন খারাপ করার দিন নয়।
হলুদ সবুজ ডোরার তাতের শাড়িটা সে কিনেছিল গতবার ঈদে। ওটা পড়লে তাকে বেশ মানায়। কপালে সবুজ রঙের একটা বড় টিপ, কানে ঝোলা দুল, ঠোটে হালকা লিপস্টিক। সেজে গুঁজে সে বের হল। এলোমেলো পায়ে হেটে এসে দাঁড়ালো সাদা বাড়িটার সামনে। দুএক মুহূর্ত থমকে দাড়িয়ে থাকলো। বুকটা তার ঢিবঢিব করছিল। মনের ভিতর রাজ্যের সংশয়। ও যদি না থাকে! অন্য কেউ থাকলে কি পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করবে। আর কথাটাই বা বলবে কি, ওর দেখা না পেলে।
গেটটা লোহার। ঠেলে ভিতরে ঢুকল রজনী। ঘাস মাড়িয়ে সোজা বারান্দায় উঠে এলো। দরজা ঠেলতে গিয়ে সে থমকে গেল। দরজায় মস্ত একটা পুরনো জং ধরা তালা ঝুলছে। তার উপর দিয়ে মাকড়সার জালের নকশা। বুকটা ভেঙে গেল রজনীর। মনে হল পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। চোখ ছাপিয়ে জল আসতে চাইলো। নিজেকে সে কোনমতে সামলে নিলো। ভাবল এমনও তো হতে পারে হয়তো ও কাছে পিঠেই কোথাও গেছে। এখুনি এসে পড়বে। একটু অপেক্ষা করেই দেখা যাক না। বন্ধ দরজার সামনে চুপচাপ বসে পড়লো রজনী।
সন্ধ্যা হয়ে এলো একসময়। আশে পাশের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠলো। কিন্তু তখনও ওই বাড়িতে কেউ এলো না। রজনী এবার আস্তে করে নেমে এলো রাস্তায়। ধীর পায়ে হেটে এসে দাঁড়ালো নিজেদের বাড়ির সামনের ঝুপড়ি বটগাছটার তলায়। লম্বা একটা নিশ্বাস নিলো সে। আজ থেকে তার স্বপ্নের দিন শেষ। কাল থেকে শুরু হবে আবার অন্য রকম এক দিন। কারণ সেতো জানে, সাদা বাড়িটার জানালায় তার জন্য কেউ কখনো কোনদিনও অপেক্ষায় ছিল না। কেউ না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement