লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ২৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৪)

আই পাটনার
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

সংখ্যা

মোট ভোট ৩০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৩

সালমা সিদ্দিকা

comment ২৬  favorite ৩  import_contacts ২,৮৫১
গত কিছুদিন থেকেই অফিসে আসাদ সাহেবের মেজাজ খারাপ, ব্যপারটা খেয়াল করেছেন পাশের টেবিলের মনোয়ার সাহেব।
মনোয়ার সাহেব অফিসে সবার খোজ খবর রাখেন, এর কথা তাকে বলে আনন্দ পান।কয়দিন পরে ঈদের ছুটি , সবাই ঈদ বোনাস পাবে আজকে। এই রকম একটা আনন্দের দিনে আসাদ সাহেব মুখ অন্ধকার করে কেন বসে আছে বোঝা দরকার।
মনোয়ার সাহেব ঘাটাঘাটি করে যেটা জানতে পারলেন তা হচ্ছে আসাদ সাহেবের স্ত্রী সুরমা দুই সপ্তাহ ধরে রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছেন। আসাদ এবং তার মধ্যে নাকি গত তিন চার মাস ধরেই সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।
'কি বলেন আসাদ সাহেব, ভাবির তো আপনার জন্য কত টান , পারলে জান দিয়ে দেয়।'
'হুহ , জান দিয়ে দেয়, না আমার জান কবজ করে নেয়। আরে ভাই, আজকালকার যুগে কি ঘরের কাজ করা কোনো সমস্যা? রুটি বানানোর মেশিন, রান্নার মেশিন, কাপড় ধোয়া শুকানোর মেশিন, ঘর পরিষ্কার করার মেশিন সবই তো আছে, খালি দরকার মেশিনটার যত্নআত্তি করা আর সময় মত মেশিনটা চালিয়ে দেয়া। এই মহিলা সেটাও করবে না। আরে বাবা, দু মাস আগে রুটি বানানোর মেশিন 'রুটিরাজ' কিনে দিলাম, সেদিন সকালে বলে কিনা সেটা নষ্ট। আমি মেশিন চেক করে দেখি দুইটা তেলাপোকা ভিতরে মরে পড়ে আছে। আচ্ছা ভাই বলেন, খালি মেশিন থাকলেই হবে? সেটার দেখা শোনা করা লাগবে না? আমি ভাই শুধু সেইটাই বললাম, অমনি মহিলার মুখ চালু। যা তা বলে দিলো। আমি নাকি তাকে বন্দী দাসী বানিয়ে রেখেছি। সারাদিন খালি কাজের কথা বলি। কঞ্জুসী করে একটা কাজের লোক রাখছি না।'
'তো, একটা কাজের লোক দিচ্ছেন না কেন?'
'মনোয়ার সাহেব, আপনি কোন দুনিয়ায় আছেন? কাজের লোকের জন্য ছয় মাস আগে থেকে এজেন্সিতে নাম লিখাতে হয়, পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়, রেফারেন্স লাগে। আরো কত গেঞ্জাম। তারপর যদি আপনার ভাগ্য ভালো থাকে তো একটা লোক পাবেন তাও বেতন আকাশ ছোয়া। যে বেতন পাই তা দিয়ে আর খাওয়া পরা লাগবে না, কাজের লোকের বেতনেই সব যাবে।'
'আপনি ফোন করে ভাবির রাগ ভাঙিয়ে নিয়ে আসেন না কেন?'
'আপনি কি ভেবেছেন আমি ফোন করিনি? দুইবার ফোন করেছি, মুটকি নাকি আমার সাথে আর সংসার করবে না।'
আসাদ সাহেবের মুখ আরো বেশি অন্ধকার হয়ে গেছে।
'আরে ওসব তো রাগের কথা , ভাবির রাগ পড়ে যাবে কয়দিন পর।'
'নাহ, সুরমার সাথে এভাবে আর হচ্ছে নারে ভাই, কথায় কথায় ঝগড়া। এত খিটমিট করে সংসার করা যায়? আমার কোনো কথা কাজ তার পছন্দ না। তাছাড়া.....'
'তাছাড়া? কি ভাই? নিঃসংকোচে আমাকে বলেন' মনোয়ার সাহেব গলা লম্বা করে এগিয়ে আসেন।
' আর বলবেন না, ওর সাথে আমার ইয়ে হয়না কতদিন জানেন?'
'ইয়ে মানে ?'
'ইয়ে মানে উ উ ' মুখ ছোট করে বিশেষ ভঙ্গিমা করলেন আসাদ।' তিন মাস হয়ে গেছে।'
'ওহ বলেন কি?'
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আসাদ।
মনোয়ার সাহেব কি যেন একটা ভাবলেন কিছুক্ষণ, তারপর গলা নিচু করে বললেন 'একটা iPartner কিনবেন নাকি আসাদ সাহেব?'
'কি যে বলেন, যে দাম, আমি পারব না। তাছাড়া আমি মেশিন টেকনোলজি একেবারেই বুঝি না, সুরমা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত রান্নার মেশিন 'সেফ-৮২' এখনো চালাতে পারি নাই একদিনও, আর আপনি বলছেন বাসায় একটা আস্ত রোবট নিয়ে আসতে। '
'না না, iPartner ব্যবহার একেবারেই সোজা। আর, কে বলেছে রোবট? দেখতে ১০০% মানুষের মতো , মাত্র দুই মাস হলো বাজারে এসেছে, এখনি হিট। কয়দিন আগে আমার কাজিনের বাসায় গেলাম, চা নিয়ে আসল এক সুন্দরী মেয়ে। আমি ভাবলাম ওদের বাসায় কোনো আত্বীয় হয়ত বেড়াতে এসেছে। পরে বলল ওটা iPartner ছিল! আমি পুরা টাসকি খেয়ে গেছি ভাই, কি তার চেহারা আর কি তার ফিগার! আর কি দারুন চা! আহ. বাসার সব কাজ iPartner করে. হাতের কাজ অত্যন্ত ভালো। আপনি একটা কিনে বাসার সব কাজের ভার iPartner এর হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন। ভাবিও খুশি, আপনিও খুশি। তাছাড়া আপনার উ উ সমস্যাও সমাধান হয়ে যাবে।'
'কি বলেন ? কিভাবে?'
'iPartner এর সব শারীরিক বৈশিষ্ট মেয়েদের মত, ভিতরে বাইরে সব। iPartner মধ্যে ওয়াইফ অথবা গার্লফ্রেন্ড এপ্লিকেশন লোড করলেই হলো। যত খুশি....।বুঝলেন' মনোয়ার সাহেব চোখ টিপে হেহে করতে লাগলেন।

এরপর দুই তিন দিন আসাদের মাথায় iPartner এর চিন্তা ঘুরতে লাগলো।টিভিতে iPartner এর আকর্ষনীয় বিজ্ঞাপন, ইমেইল ফেসবুকে স্পেশাল অফারের হাতছানি আর মনোয়ার সাহেবের সেই চোখ টেপা এড়ানো সম্বব হলো না। ঈদ বোনাস হাতে নিয়ে গুলশানের Apple iPartner শোরুমে হাজির হলেন।
চকচকে ঝকঝকে দোকান। তাকে দেখেই টাই পরা একটা সুদর্শন ছেলে ছুটে আসল।
'স্যার কিভাবে সাহায্য করব?'
'ইয়ে......একটা iPartner দেখতে চাচ্ছিলাম।'
ছেলেটা ভেতরে একটা বড় হলরুমে নিয়ে গেল। কাঁচের ডিসপ্লের পিছনে হরেক রকম iPartner। সবাই রূপবতী, চেহারা গায়ের রঙে সামান্য ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। দেখে মনে হয় কোনো সুন্দরী রমনী কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে আছে, একটু পরেই কথা বলে উঠবে!
সেলসম্যান ছেলেটা আগ্রহ নিয়ে একেক iPartner এর গুনাগুন বলতে লাগলো ।
'এই যে দেখছেন, এই iPartner গুলোর গায়ের চামড়া টেট্রা সিলিকনিয়াম দিয়ে তৈরী যেটা মানুষের চামড়ার মতই উষ্ণ এবং নরম। এদের চুল কট্রিয়াম এনজি দিয়ে তৈরী। এই যে স্যার, মানুয়ালে সব আছে। শারীরিক ভাবে এর সাথে মানুষের কোনো তফাৎ নেই।বরং মানুষের চেয়ে অনেক ভালো আর বেশি কাজ করতে পারে এরা।শুধু ঘাড়ের পেছনে একটা লাল টাচ বাটন অন আর অফ করার। এর মধ্যে আপনি হাজারটা অপ্প্লিকেসন ডাউনলোড করতে পারবেন।
'সে তো বুঝলাম, এদের আচার ব্যবহার কেমন?'
'এক্কেবারে মানুষের মতই , আপনার বাসার সমস্ত কাজ করবে, আপনি শুধু কাজের প্রোগ্রাম সেট করে দেবেন। আপনার সাথে গল্প করবে। আপনি যদি ওর সাথে স্পোর্টস নিয়ে আলাপ করতে চান, স্পোর্টস অপ্প্লিকেশন ডাউনলোড করবেন, মুভি নিয়ে আলাপ করতে চান, মুভি অপ্প্লিকেশন ডাউনলোড করবেন, গান সুনতে চান তো গান ও শোনাবে, যেকোনো বিষয়ে এদের জ্ঞান অপরিসীম। ওর পায়ের কাছে USB পোর্ট আছে, আপনার কম্পিউটারের সাথে কানেক্ট করে নেবেন। তার উপর আছে তিন বছরের গ্যারান্টি, কোনো বডি পার্টস বা সিস্টেম এরর হলে আমরা ঠিক করে দিবো , Apple এর জিনিস বলে কথা হেহেহে'
'আমি কিন্তু মেশিন টেশিনের ব্যাপারে একেবারেই আনাড়ি , কিভাবে একে চালাবো ?'
'স্যার এসব নিয়ে ভাববেন না, আমরা সব কিছু সেট করে দেব, আপনি বলবেন কি কি চান, তারপর fully installed iPartner নিয়ে যাবেন বাসায়, আপনার কিচ্ছু করতে হবে না'
একটু ইতস্তত হয়ে আসাদ বললেন, 'ইয়ে ওয়াইফ আর গার্লফ্রেন্ড এপ্লিকেশন কি সেট করে দেয়া যাবে?'
'অবশ্যই যাবে, তবে ওগুলো প্রিমিয়াম এপ্লিকেশন , কিছু ফিস লাগবে।'
'তা , সব মিলিয়ে কত পড়বে ?'
দাম শুনে আসাদ ভিমরি খেলেন, ঈদ বোনাস দিয়ে হবে না, সেভিংসের উপরও টান পড়বে !
সেলসম্যান এসব দেখে অভ্যস্ত। বললো মাসিক কিস্তিতে কেনা যাবে।
একটু ভাবলেন আসাদ। সুরমা কিভাবে নেবে ব্যাপারটা? নাহ, সুরমার কথা ভেবে আর লাভ কি? আঠারো বছরের বিবাহিত জীবনকে গুল্লি মেরে সামান্য একটা কারণে বাপের বাড়ি গিয়ে বসে আসে। ভালো করেই জানে, সুরমা না থাকলে বাসায় কত কষ্ট হয় আসাদের। ঘর ভর্তি মেশিন, একটাও ঠিক থাক চালাতে পারে না আসাদ, রান্না হয় না, ঘর থাকে এলোমেলো, সব কিছু উলট পালট হয়ে যায়। তারপরও একটা বার খোজ নিলো না মহিলা? পাষান।
iPartner কিনতে বেশ কিছু ফর্মালিটি আছে বেশ কিছু কাগজ পত্র সাইন করতে হলো, কিভাবে অন অফ করতে হয়, এপ্লিকেশন ডাউনলোড করতে হয় সেসব বুঝতে হলো, ঘন্টা খানেক বাদে একটা ঝকঝকে সুন্দরী iPartner নিয়ে গাড়িতে উঠলেন আসাদ।
ঢাকায় এখন ছয় স্তরে ওভার পাস, রাস্তায় কোনো ট্রাফিক নেই, গাড়ি চলছে হুহু করে।
আসাদের কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে। এত সুন্দর একটা মেয়ে বসে আছে, কেউ দেখলে ভাববে বিশ বাইশ বছর বয়স!
'ইয়ে , তোমার নাম কি?'আসাদ জিগ্যেস করলেন।
'তুমি আমাকে যে নাম দেবে, আমার নাম সেটাই' মেয়ের গলা মিষ্টি! কে বলবে রোবট! আসাদ শিহরিত হলো।
'তোমার নাম দিলাম সুহা ' অনেক বছর আগে সুহা নাম একটা মেয়ের সাথে আসাদের প্রেম ছিল। মেয়েটা অবশ্য এত সুন্দরী ছিল না। কিন্তু প্রথম প্রেম তো, আসাদ ভুলতে পারেননি।
আসাদ ভয়ে ভয়ে সুহার হাত ধরলেন। সুহা মিষ্টি করে হাসলো।
প্রথম প্রেমের সুহাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলে আসাদের একটা ব্যপারে খুব অস্বস্তি হতো, ড্রাইভার খালি ব্যাক ভিউ মিররে পিছনের সিটে কি হচ্ছে দেখতো। এখন সেসব সমস্যা নেই। অটোমেটিক গাড়ি ড্রাইভার ছাড়াই চলে। গাড়িতে উঠে গন্তব্যের নাম বললেই হয়। সেজন্য চলন্ত গাড়ি তরুণ তরুনীদের চলন্ত প্রেম কানন এখন!
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
সুহাকে নিয়ে এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। মেয়েটার কাজে কর্মে কোনো খুত নেই। যেমন রান্না তেমন ঘর ঘোছানো। বাসার সব দেখাশোনা সুহার হাতে।
দুই একবার ওয়াইফ আর গার্লফ্রেন্ড এপ্লিকেশন অনও করেছেন আসাদ, সুহা বিছানাতেও দারুন!
আসাদের মনে হচ্ছে এর চেয়ে বেশি সুখ কোনো পুরুষ মানুষ পেতে পারে না। বাসায় শুধু শান্তি আর শান্তি। একটা মানুষ তো সেটাই চায়। বাসায় ফিরে শান্তি , বৌএর কটকটানি বিহীন নিরবিচ্ছিন্ন মৌনতা। টিভিতে নিজের খুশি মত চ্যানেল দেখা, হাতের কাছে গরম চা , ঝালমুড়ি, পিয়াজু ! চাইলে যেকোনো বিষয় নিয়ে খাজুরে আলাপ করা। আহ, কি শান্তি!
অফিসে মনোয়ার সাহেব খেয়াল করলেন আসাদ সব সময় বেশ খুশি খুশি , মাঝে মাঝে চালু গানের দুই এক কলি গুন গুন করেন।
'কি ভাই, iPartner নিয়ে খালি আপনি মাস্তি করবেন, আমাদেরও একটু দাওয়াত দেন, iPartner এর হাতের রান্না খাই। আমরা তো ভাই কিনতে পারব না। আপনারটা দেখেই শান্তি পাই।'
আসাদ অফিসের কয়েকজনকে দাওয়াত দিলেন শুক্রবার রাতে সুহার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য।
বাসায় ফিরে সুহাকে বললেন শুক্রবার দাওয়াতের কথা। সুহা বলল সে সব ব্যবস্থা করবে। অনলাইনে মাছ মুরগি শাকসবজির অর্ডার দেবে।
শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্না ঘরে খুটখাট আওয়াজ শুনে গিয়ে আসাদ দেখলেন সুহা এর মধ্যেই সব বাজার ছড়িয়ে বসেছে। একটা টুকরিতে তিনটা মুরগি, হাড়িতে তাজা মাছ আর নানান রকম সবজি।

হটাত সুহা যেটা করলো আসাদ সেটার জন্য প্রস্তূত ছিলেন না। সুহা একটা জ্যান্ত মুরগির কল্লা চেপে ধরে এক ঝটকায় মুরগির ধড় থেকে গলা ছিড়ে ফেলল, এক টানে! ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল! অমানুষিক দৃশ্য।সুহার গায়ে অমানবিক শক্তি! আসাদ হা করে থাকলেন। তারপর নির্বিকার ভাবে নিপুন হাতে মুরগির চামড়া টেনে আলাদা করে ফেললো সুহা। তারপর ধারালো ছুরি নিচে কচ কচ করে মুরগির ছোট ছোট পিস হয়ে গেল! পুরো প্রক্রিয়া তিন চার মিনিটে শেষ!
আসাদের কেমন যেন বমি আসতে লাগলো। জ্যান্ত একটা প্রানীকে এভাবে মেরে ফেললো? বাকি দুটো মুরগির হত্যা কান্ড দেখায় ভয়ে তাড়াতাড়ি রান্না ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন আসাদ।
রাতে মনোয়ার সাহেব সহ আরো কয়েকজন এসে খাবারের বাহার দেখে মুগ্ধ। খাচ্ছেন তো খাচ্ছেনই! আসাদের সামনে মুরগির রোস্ট, কিন্তু সকালের দৃশ্যটা খালি মনে পড়ছে। মুরগি নিয়ে নাড়া চাড়া করলেন, গলা দিয়ে নামাতে পারলেন না।
সবাই চলে যাবার পর সুহা পরিপাটি করে সব গুছিয়ে নিল। আসাদ টিভির সামনে রিমোট দিয়ে চ্যানেল বদলে যাচ্ছেন, কোনটাতেই আগ্রহ নেই।
'আচ্ছা, সকালে তুমি এমন করে মুরগি গুলো মারলে কিভাবে?'
'না মারলে রান্না করব কিভাবে?’
আসাদের মনে হলো সুহার সাথে এটা নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না। ব্যপারটা জান্তব ছিল, সুহা বুঝবে না।
রাতে আসাদের ভালো ঘুম হলো না, বুকের ভিতর কেমন চাপ ব্যথা।দুঃস্বপ্ন দেখে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ধরমর করে উঠে দেখেন খাটের পাশে চেয়ারে সুহা বসে আছে। চুল এলোমেলো, চোখ খোলা!
আসাদের বুক শুকিয়ে গেল। দৃশ্যটার মধ্যে কি যেন ভয়ংকর একটা ব্যাপার আছে। ভয়ে চি চি করতে করতে আসাদ বললেন ' তুমি এখানে কি করছো সুহা?'
'চার্জ নিচ্ছি। আমি প্রতি রাতে এখানেই থাকি, তোমার যদি কিছু লাগে।'
'তুমি টিভির রুমে চার্জ নিতে পারো, হটাত তোমাকে দেখে ভয় পেয়েছি।'
'আমি দুঃক্ষিত।টিভির রুমে থাকলে তোমার কিছু লাগলে আমাকে কাছে পাবে না। তোমাকে কি এক কাপ ক্যামো মিল্ক দেব? ভালো ঘুম হবে।'
'কিচ্ছু লাগবে না, তুমি এই ঘর থেকে যাও।'
সুহা কথা বাড়ালো না, উঠে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সকালে পুরো ব্যাপারটা কিছুটা হাস্যকর লাগলো। কিন্তু বুকের ভেতর খচখচানি গেল না।
অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে iPartner এর ব্যাপারে একটা অনলাইন সার্চ দিলেন।
এপর্যন্ত iPartnerএর তিনটা কেস পাওয়া গেছে যেখানে iPartner মানুষকে কোনো না কোনো ভাবে শারীরিক আঘাত করেছে।সব গুলোই দুর্ঘটনা বসত কারণ iPartne এর মানবিকতা বোধ মানুষের পর্যায়ে না। Apple এটা নিয়ে এখনো গবেষণা করছে।
iPartner এর দুর্ঘটনার ছবি গুলো দেখে আসাদের বুক আবার ধর ফর করতে লাগলো। এক লোককে এমন থাপ্পড় মেরেছে , তার গালের হাড় ভেঙেছে আর দুইটা দাঁত পড়েছে। 'এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেব' একেই বলে!
-------------------------------------------------------------------

বাসায় ফিরে দেখেন ড্রয়িং রুমে তার ছেলে রুদ্র বসে আছে।এক বছর হলো রুদ্র হোস্টেলে থাকে, বাসায় থাকলে নাকি অর স্বাধীনতা থাকে না।
রুদ্র বেশ গম্ভীর।ওর সামনে চা বিস্কিট দিয়েছে সুহা, রুদ্র ধরেও দেখেনি।
'বাবা, তুমি এসব কি শুরু করেছো বলোতো? মাকে নানুর বাসায় দিয়ে একটা একটা রোবট নিয়ে সংসার করছো। তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?'
'রুদ্র , সুহা একটা iPartner। তার কাজ বাসার কাজের মেয়ের মত, এখানে সংসার করা কোথায় দেখলি?'
'তুমি কয়দিন আগে তোমার ওই iPartner কে নিয়ে শপিং করতে যাওনি? ওখানে মা তোমাদের দেখেছে। এর পর থেকে মা শুধু কাদছে, অসুস্থ হয়ে গেছে। কিভাবে এসব করতে পারলে এই বয়সে?' রুদ্রর গলায় উত্তাপ।
কথা মিথ্যা নয়। সুহাকে নিয়ে শখ করে সেদিন গিয়েছিলেন শপিংএ। সুহার তখন ওয়াইফ এপ্লিকেশন অন ছিল। কেন জানি বউকে নিয়ে ঘুরতে ইচ্ছা করছিল আসাদের।
সুহাও মার্কেটে গিয়ে এটা সেটা কেনার বায়না করছিল বৌএর মত। সবি অভিনয়, তাও বেশ লাগছিল। দোকানদার হটাত বলল, 'কিনে দেননা স্যার, আপনার মেয়ে এত শখ করছে', শুনেই সব উচ্ছাস মরে গেল। তাড়াতাড়ি সুহাকে নিয়ে বাসায় চলে আসলেন। আত্ববিশ্বাসের বেলুন চুপসে গেছে ততক্ষণে।
'বাবা তুমি এই iPartner কে দূর কর, মাকে ঘরে নিয়ে আসো , তা না হলে কিন্তু আমি কোনদিন এই বাড়িতে আসব না, তোমার সাথে সম্পর্ক রাখব না, মনে রেখো' রুদ্র তখন রুদ্রমূর্তি।
হটাত সুহা কোত্থেকে এসে রুদ্রর গালে টকাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল! রুদ্র হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনে চায়ের কাপ রাখা টেবিলের উপর। ঘটনা আচমকা ঘটল, রুদ্র হতভম্ব, আসাদ নিঃসাড়!এটা কি হলো!
আসাদ দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে ধরলেন, 'সুহা কি করলে এটা ?' চিত্কার করে বললেন।
'তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছিলো, আমি এটা সহ্য করব না, তুমি জানো সেটা আসাদ'
'তোমার মাথা খারাপ হয়েছে সুহা, রুদ্র আমার ছেলে।'
'আমার মাথা খারাপ হয় না। তোমাকে রক্ষা করা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।'
'আমাকে রক্ষা করতে হবে না, তুমি যাও।'
সুহা সামনে থেকে চলে গেল।
রুদ্র নিজেকে সামলে উঠেছে।হেচকা টানে আসাদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে হুঙ্কার দিয়ে বললো 'এই জন্তুর সাথে থাকছ তুমি? মাকে সরিয়ে দিয়ে? এই ডাইনির হাতে তুমি মরবে একদিন বাবা, মরে এই বাসায় পরে থাকবে, কেউ জানতেও পারবে না। থাকো তুমি এর সাথে।...' বলে হন হন করে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
আসাদ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। সুহা কখন যেন এসে দাড়িয়েছে। সুহার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, চোখ শান্ত।
'তোমার চা খাওয়ার সময় হয়েছে। আমি চা নিয়ে আসছি'
যেন কিছুই হয়নি, সুহা চলে গেলো রান্না ঘরে।
আসাদ দেখেছেন, রুদ্রর গালে পাচ আঙ্গুলের দাগ পরেছে, লাল হয়ে।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আসাদের কিছুই ভালো লাগে না। টিভি দেখতে দেখতে সুহার সাথে গল্প করতে ভালো লাগে না, সুহা সব বিষয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি জানে। নিজেকে বোকা লাগে। ফুটবল খেলা দেখতে দেখতে হটাত চায়ের তেষ্টা পেলে সুরমা কেমন করে টের পেয়ে যেত, এক কাপ চা এগিয়ে দিত, সুহা সেটা দেয় না, সুহা প্রোগ্রামের বাইরে কিছু করে না। ঝুম বৃষ্টি হলে সুরমা জানালা খুলে তাকিয়ে তাকিয়ে গুন গুন গান করত, আসাদের খুব ছেলেমানুষী মনে হত। সুহা সেটা করে না, শুধুমাত্র বললেই গান করে সুহা। নিশ্চুপ একটা প্রাণ সুহা, কোনো ঝগড়া নেই সারা নেই শব্দ নেই, নিস্তব্দ উপস্থিতি শুধূ। মন মানতে চায়না তবু কেমন যেন একঘেয়ে , সব পরিপাটি কিন্তু কেমন যেন অসাড়। সুরমার স্মৃতি গুলো অনেক বেশি কথা বলে যায় মাথার ভেতর। সুরমাকে খুব মিস করতে সুরু করেছেন আসাদ। মাথার ভেতর মাঝে মাঝে সেই মুরগি, ইন্টারনেটের ছবি আর ছেলের গালে চড়ের দাগ - খুব খোচাচ্ছে।
এর মধ্যেই iPartner এর শোরুমে ফোন করেছেন, ফেরত দিতে চান iPartner কে। ওরা বলেছে ৩০% দাম কেটে বাকিটা ফেরত দেবে।
শেষ পর্যন্ত iPartner সুহাকে ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আসাদ।
এক সন্ধায় সুহার সাথে বসে টিভি দেখছিলেন। পরদিন সুহাকে ফেরত দিতে যেতে হবে। আজ রাতেই পাওয়ার অফ করে রাখতে হবে প্যাকেটে ভরে।
আসাদ পিছন থেকে তার চুল সরিয়ে পাওয়ার বাটনটা বন্ধ করতে গেলেন, সুহা হটাত মাথা ঘুরিয়ে তাকালো
'কি করছ তুমি?'
'তোমার পাওয়ার অফ করছি সুহা। তোমাকে দোকানে ফেরত দেবো। '
'কেন? আমাকে তোমার ভালো লাগেনি? কি ভুল করেছি আমি?'
এই ব্যপারটা নতুন, সুহা কখনো পাল্টা প্রশ্ন করে না।
'সেটা না, তোমাকে আমার আর দরকার নেই এখন। '
'দরকার নেই?' সুহার গলায় ঝাঝ. ' আমার দরকার শেষ? না, তুমি আমাকে ফেরত দিতে পারবে না। '
খুব অবাক হলেন আসাদ আবার একটু ভয় ও পেলেন। এমনতো কখনো করে না সুহা।
'আহ সুহা, বললাম তো তোমার দরকার শেষ' বলে জোর করে হাত বাড়িয়ে পাওয়ার বাটনে হাত দিতে গেলেন, সুহা এক ঝটকায় আসাদের হাত মুচড়ে ধরল, তারপর এক লাথিতে ছুড়ে মারলো। কোনো একটা শক্ত জিনিসে মাথা গিয়ে পড়ল আসাদের, এর পর সব অন্ধকার।
---------------------------------------------------------------------
চোখ পিটপিট করে তাকালেন আসাদ, জ্ঞান ফিরেছে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। ঘাড় কাত করে দেখেন সুরমা পাশের চেয়ারে বসে আছেন। বেশ উদ্বিগ্ন লাগছে সুরমাকে, কিযে শান্তি লাগলো সুরমাকে দেখে , কেন সেটা আসাদ ঠিক বুঝলেন না।
'সুরমা, আমাকে ক্ষমা করে দাও, অনেক বড় ভুল হয়েছে' কান্না কান্না ভাবে বললেন আসাদ।
'পাছায় লাথি খেয়ে তোমার মাথা খুললো ? চল্লিশে পুরুষ মানুষের ভিমরতি হয়, তোমাকে দেখে বিশ্বাস হলো?ভিমরতি গেল? ' অভিমান স্পষ্ট সুরমার কথায়।
সুরমার হাত খপ করে ধরে আসাদ অনুনয় করতে লাগলেন।
'সুহা একটা ডাইনি ছিল, আমি বুঝিনি, আমাকে মেরেই ফেলত।'
'হু, মেরেই ফেলত, তোমার ছেলে ঠিক সময়ে তোমাকে বাচিয়েছে, পুলিশ দিয়ে তোমাকে বাসা থেকে বের করে এনেছে, তা না হলে ওই রোবট তোমাকে ছাড়তো ?'
কিছুক্ষণ পর iPartner এর শোরুম থেকে একজন আসল আসাদকে দেখতে। সেই টাই পরা সেলসম্যান!
'স্যার, আমরা খুবই দুঃক্ষিত আপনার এই অবস্থার জন্য, আপনার চিকিত্সার সব খরচ আমরা দেব। আমরা আন্তরিক ভাবে লজ্জিত, আমরা ব্যপারটা তদন্ত করে দেখছি। আমাদের কোনো iPartner এরকম করেনি কখনো। প্রাথমিক তদন্তে যেটা পেয়েছি সেটা হচ্ছে আপনার iPartner ওয়াইফ মোডে ছিল। আমরা ধারণা করছি অর ওয়াইফ প্রোগ্রামে কোনো বাগ ছিল। আমরা ব্যপারটা দেখছি।আমরা সব ঠিক করে রিবুট করে iPartner টাকে আপনার কাছে ফেরত দিতে পারি যদি আপনি চান।
হটাত সুহার চেহারাটা ভেসে উঠলো, সেই লাথি , সেই ঠান্ডা খুনি খুনি চোখ।
'না না ভাই, আমার iPartner লাগবে না, মাফ চাই ভাই।‘
আসাদ সুরমার দিকে তাকালেন, মুখ গম্ভীর হলেও সুরমার চোখ হাসি হাসি, এই চোখ আসাদ চেনেন।
-------------------------------------------------------------------------------------------------

iPartner এর কাহিনী শুনে হতাশ হবার কিছু নেই। বাজারে আসছে iPartner2। এরা আরো বেশি মানবিকতা সম্পন্ন, আরো বেশি সুন্দর, আরো বেশি আবেগপ্রবণ। মানুষের সাথে এদের পার্থক্য নাকি একেবারে শুন্যের পর্যায়ে। অনেক অবিবাহিতরা নাকি আগে থেকেই প্রি-বুক করে রেখেছে এইসব iPartner2।
iPartner2 এর গল্প নাহয় আরেকদিন বলবো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement