লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ২১টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৭

বিচারক স্কোরঃ ৪.৪৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.০৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - রমণী (ফেব্রুয়ারী ২০১৮)

প্রতীক
রমণী

সংখ্যা

মোট ভোট ২৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৭

সালমা সিদ্দিকা

comment ২৫  favorite ০  import_contacts ৬৭৫
ঝকঝকে সাদা মার্বেলের মেঝের উপর শিমুর রুক্ষ শুষ্ক পায়ে কম দামি স্যান্ডেল জোড়া কি বেমানান লাগছে! নিজের পা দেখে নিজেই হঠাৎ চমকে ওঠে শিমু, গোড়ালির চামড়া ফেটে আছে । চট করে শাড়ির নিচে পা দুটো লুকিয়ে ফেললো সে । কোথায় যেন পড়েছিলো, নতুন পরিচয়ে মানুষ প্রথমে পায়ের জুতোর দিকে তাকায়। জুতো দেখে নাকি মানুষের রুচি, ব্যক্তিত্ব, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সব আন্দাজ করা যায়। নিউ মার্কেট থেকে কেনা সস্তার স্যান্ডেল জোড়া ওর ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করবে বলে বিশ্বাস হয় না কিন্তু ওর দারিদ্র্য হয়তো লুকাতে পারবে না।

শিমু এখানে আসার আগে যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো। সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে তার ভালো লাগে না। এমন অভিজাত চাকচিক্যময় দামী হোটেলে তার মতো সাধারণ মেয়েরা খেতে আসে না। শিমু আশেপাশে দেখলো। কিছুটা দূরে একটা সোফায় সুসজ্জিত দুই ভদ্রলোক বসে নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একজনের সাথে চোখাচোখি হলো শিমুর। ভদ্রলোকের চোখে একটুখানি তাচ্ছিল্য ফুটে উঠলো কি? শিমু চোখ সরিয়ে নিলো।

আরেকটা সোফায় বিদেশী ভদ্রমহিলা মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। হোটেলের লবিতে এই মুহুর্তে
আর কেউ নেই। শিমু মিনিট দশেক ধরে অপেক্ষা করছে লায়লার জন্য।

এখানে আসার আগে সময় নিয়ে তৈরী হয়েছে শিমু। আয়নায় নিজেকে দেখে অবশ্য খুব আনন্দিত হতে পারেনি। সবসময়ের মতো ক্লান্ত বিষণ্ণ লাগছে নিজেকে। গোপালী শাড়ির আভা তার মলিনতা দূর করতে পারেনি। বেরুনোর সময় তার ছেলে প্রতীক তাকে দেখে অবাক হয়ে বলেছে, "মা কোথায় যাচ্ছ এত সেজে?"
শিমু চমকে বলেছে, "বেশি সেজে ফেলেছি নাকি রে? "
প্রতীক হেসে উত্তর দিয়েছে, "না, তোমাকে সুন্দর লাগছে মা। পরীর মতো সুন্দর।"
প্রতীকের কাছে তার মা পরীর মতোই সুন্দর। বোকা ছেলে একটা।

এই হোটেলের রেস্টুরেন্টে আজকে শিমুর হাই স্কুলের বন্ধুদের গেট টুগেদার । এমনিতে স্কুলের বন্ধুদের সাথে শিমুর তেমন যোগাযোগ নেই। সেজন্য এর আগের গেট টুগেদারগুলোতে শিমু যেতে পারেনি । আসলে ইচ্ছা করেই যায়নি। তার স্কুলের সব বন্ধুরা নিজেদের জীবনে সফল, স্বচ্ছল। কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ সরকারি বড়কর্তা । ওদের ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রী লায়লা ঢাকার নামিদামি বুটিকের মালিক। লায়লা একটা কাজ ভালো পারতো সেটা হচ্ছে সাজগোজ করা আর নিত্যনতুন ফ্যাশনের কাপড় বানানো। মেয়েটা কি সুন্দর নিজের এই প্রতিভা ব্যবহার করে তরতর করে সাফল্য পেয়ে গেলো! কয়দিন আগে পত্রিকায় লায়লার ছবি দেখে শিমুর কেমন গর্ব হয়েছে। নিজের স্কুলের কারো সাফল্য দেখলে এমনই অনুভূতি হয় শিমুর। সেই সাথে নিজের ভেতর একটা হাহাকার বোধ যে কাজ করে না , তা না।

প্রতিবছর শীতের সময় প্রবাসী বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন দেশে বেড়াতে এসে অন্যদের সাথে দেখা করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। সবাইকে ফোন করে, মেসেজ দিয়ে একটা গেট টুগেদার করার তোড়জোড় শুরু করে। তাদের প্রবাসী জীবনে নিশ্চই পুরোনো বন্ধুদের জন্য একটা শূন্যস্থান থাকে। স্বল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে অস্থির বিদেশী বন্ধুগুলো বুঝতেই চায় না দেশের বন্ধুরা কত ব্যস্ত! তাদের সবার কাছ থেকে একটু সময় বের করা করো কঠিন! যারা অল্পতেই আশাহত হয়, তারা রণে ভঙ্গ দিয়ে গেট টুগেদারের আশা ছেড়ে ভগ্ন হৃদয়ে শীতের পাখির মতো বিদেশে ফিরে যায়।

কিন্তু নীলা আশা ছেড়ে দেয়ার পাত্রী না। সে জার্মানি থেকে এসে সব বন্ধুদের ক্রমাগত ফোনে ত্যক্ত বিরক্ত করে আজকের এই গেট টুগেদারের ব্যবস্থা করেছে। অগাধ ধন সম্পদের মালিক নীলা আজকের সব আয়োজনের ব্যয় বহন করছে। তার একটাই কথা ,"তোরা খালি আয়, বাকিটা আমি দেখবো।"
এতে কাজ হয়েছে। আজকে ছুটির দিনের দুপুরে মোটামুটি সবাই আসতে রাজি হয়েছে। পাঁচ তারা হোটেলে ফ্রি খাওয়ার ব্যাপারটা হয়তো কাজে দিয়েছে।

নীলা শিমুর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বিদেশ থেকেও মাঝে মাঝে ভাইবার হোয়াটস্যাপ কথা হয়। নীলা টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে এনাৰ্জি মেটেরিয়াল নিয়ে পড়ায়। অথচ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় নীলার কাছে নকল পাওয়া গিয়েছিলো বলে তাকে পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কার করা হয়! এমন না যে নীলা খারাপ ছাত্রী ছিল। শিমু আর নীলার মধ্যে পড়ালেখা নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা থাকতো কিন্তু সেটার ছায়া ওদের বন্ধুত্বে পড়তো না। এমন ভালো ছাত্রী কেন নকল নিয়ে পরীক্ষার হলে গেলো সেটা কেউ কখনো জানতে পারেনি, জানতো শুধু শিমু।

খটখট হিলের শব্দ তুলে হাসি মুখে লায়লা এগিয়ে আসছে। শিমুর ভেতরটা আরো কুঁকড়ে গেলো। লায়লাকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে! আধুনিক নকশার সিল্কের শাড়িতে লায়লাকে নায়িকাদের মতো লাগছে। কি সুন্দর রেশমের মতো চুল পিঠ ছাপিয়ে পড়েছে! আর শিমুর চুল পরে প্রায় টাক হয়ে গেছে। বাকি থাকা চুল পেকে যা তা অবস্থা। হবে না কেন? চল্লিশের শিমুর উপর দিয়ে কম ঝড় ঝাপ্টা গেছে?

"কেমন আছো শিমু? সরি, তোমাকে অনেকক্ষন অপেক্ষা করলাম। কেক এইমাত্র ডেলিভারি দিলো তো, সব গুছিয়ে রেখে এলাম।"
শিমু উঠে দাঁড়ালো। বেঢপ শরীরটা শাড়ির আঁচলে ঢেকে ম্লান হেসে বললো, "না না ঠিক আছে.....দেরি হয়নি। এখানে দুইটা রেস্টুরেন্ট। কোনটায় প্রোগ্রাম আমি জানি না, সেজন্য তোমাকে ফোন করলাম। নীলার ফোন বন্ধ।'
"সেজন্যই তো আমি এলাম তোমাকে নিতে। নীলা বলেছিলো তুমি আগে কখনো এই হোটেলে আসোনি।"
লায়লার চোখে মুখে করুণা ঝরে পড়ছে। মনে মনে হয়তো ভাবছে, "আহারে, ক্লাসের টপ ছাত্রীর আজকে কি অবস্থা?"

"তুমি আগের মতোই আছো লায়লা।" লায়লার পেছন পেছন রেস্টুরেন্টের দিকে যেতে যেতে বললো শিমু। লায়লা নিজের যত্ন করে, বোঝা যায়। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ উজ্জ্বল হয়ে ফুটেছে ওর সমস্ত অবয়বে।
"কি যে বলো, বয়স হয়েছে না।" গর্বিত লায়লা আরেকবার করুণার দৃষ্টি ফেললো শিমুর উপর। শিমুর গায়ের তাঁতের শাড়িটা গত বছর আসাদ কিনে দিয়েছে। তিন হাজার টাকার শাড়িটা কিনতে শিমুর খুব অস্বস্তি হয়েছে। এত দামে একটা সুতি শাড়ি কিনবে? কিন্তু আসাদ বার বার বললো, "এত চিন্তা করো না, এই গোলাপি শাড়িতে তোমাকে ভালো লাগবে।"

আসাদ মিরপুরে একটা শাড়ির দোকানের ম্যানেজার। তার ধারণা শাড়ির ব্যাপারে তারচেয়ে ভালো কেউ জানে না। দোকানে কমদামে ভালো শাড়ি পেলে সে ছবি তুলে শিমুকে দেখায়, পছন্দ হলেই কিনে দেবে এমন ইচ্ছা আসাদের। কিন্তু শিমু শাড়ি পরতে পছন্দ করে না। ছবি দেখে কোনো শাড়ির প্রতি তার আগ্রহ প্রকাশ পায়না।
আসাদ কত ভাবে শিমুর মন ভোলাতে চেষ্টা করে , কিছুইতেই কোনো লাভ হয় না। আসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশা ছেড়ে দেয়। দোকানে কত ক্রেতার মন জয় করে সে, অথচ নিজের বৌকে বুঝতে পারে না। শাড়ি পড়লে শিমুকে কি সুন্দর দেখায়! ঈদের সময় জোর করেই এই শাড়িটা কিনে দিয়েছিলে আসাদ। এতদিন আলমারি বন্দি ছিল ন্যাপথলিনের গুমোট গন্ধ জড়ানো হালকা গোলাপি শাড়িটা। লায়লা কি ন্যাপথলিনের পাচ্ছে?

একসময় শাড়ি শিমুর খুব পছন্দের ছিল। কলেজের বৈশাখী অনুষ্ঠানে শাড়ি পরে গিয়েছিলো, সেখানে আরেক বান্ধবীর মা তাকে দেখে পাত্রী হিসেবে খুব পছন্দ করে ফেলেছিলেন। পাত্র তার বোনের ছেলে, বিদেশে থাকে, প্রচুর টাকা। শিমুর মধ্যবিত্ত অসুস্থ বাবার কাছে অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব। বিয়েটা হয়ে গেলো খুব তাড়াতাড়ি। শিমুর দূর্বল প্রতিবাদ ঘরের দেয়াল ফুঁড়ে বের হতে পারেনি।

বিয়েটা টেকেনি। সাত মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা শিমুর জীবনের গতি স্তব্ধ হয়েছে। তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। নানা রকম বঞ্চনার মধ্যে হারিয়ে গেছে ছবি আঁকার আগ্রহ, গান গাওয়ার ইচ্ছা আর শাড়ি পড়ার শখ। সব ছাপিয়ে একটাই দুশ্চিন্তা, ছেলেটাকে কি করে মানুষ করবে।

ছেলের বাবা ফিরে তাকায়নি। প্রতীককে নিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে কেমন যেন সাদা কাগজের মতো অভিব্যক্তিহীন হয়ে গিয়েছিলো। অনেক কষ্টে বিএ পাশ করে স্কুলের চাকরিটা জোগাড় করে কিছুটা মাথা উঁচু করতে পেরেছে শিমু। আবার পারিবারিক চাপে আসাদকে নিজের জীবনের সাথে জড়াতে হয়েছে। প্রতীকের বয়স তখন ছয়।

রেস্টুরেন্টের ভেতর তিনটা গোল টেবিলে সবার বসার ব্যবস্থা। কয়েকজন টেবিলে বসেছে, বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শিমু ভালো করে সবাইকে লক্ষ্য করলো। কয়েকজনকে চিনতে না পারলেও ফারজানা, শাহানা, সোমাকে ঠিক চিনতে পারলো।

"শিমু, এখানে বাফে লাঞ্চের ব্যবস্থা । সবাই খাবার নিচ্ছে, তুমিও নিয়ে নাও। সাথে ড্রিংকসের অর্ডার দিয়ে দিও কিন্তু। " লায়লা বললো।
"আচ্ছা। নীলা কখন আসবে?"
"ওহ আর বলো না। নীলার ছেলে দুটোরই জ্বর। ও কখন আসবে ঠিক নেই। "
"সে কি! ও সব আয়োজন করে নিজেই আসতে পারছে না?"
"আমাদেরও খুব খারাপ লাগছে। হটাৎ বাচ্চা গুলো এভাবে অসুস্থ হয়ে গেলে কি করার থাকে বলো? ও এখন বাচ্চাদের নিয়ে হাসপাতালে। বলেছে সম্ভব হলে দুপুরের পরে আসবে। তুমি ভেবো না, খাবার নাও। "
লায়লা ব্যস্ত ভঙ্গিতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আবার লবিতে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো, হয়তো আরো কেউ আসবে।

শিমু খাবারের দিকে এগিয়ে গেলো। নানারকম খাবার দাবার সাজানো, সামনে নাম লেখা আছে। অনেক খাবার শিমু কখনো খায়নি। মাছ ওর খুব পছন্দ। কয়েক ধরণের মাছ আর সস নিয়ে একটা টেবিলে বসলো। তার পাশেই আরজু বসে ফোনে ফেসবুক দেখছে। তার সব মনোযোগ ফোনের দিকে, আরজু খেয়াল করেনি তার পাশেই শিমু এসে কখন বসেছে। আরজুর প্লেটে খাবার পড়ে আছে।

শিমু ওকে বিরক্ত না করে খেতে শুরু করলো। তার মন খারাপ হয়ে গেছে। নীলার পীড়াপীড়িতেই আজকে এখানে এসেছে অথচ সেই নীলাই আসতে পারছে না। বেচারা কত আগ্রহ নিয়ে সব আয়োজন করলো.....

সবুজ রঙের সসে মাখিয়ে ফিশ ফিঙ্গার মুখে দিয়ে চিবুতেই প্রচন্ড ঝাল গিয়ে যেন মাথার তালুতে আঘাত করলো! শিমুর নাক মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ও পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেলো।
"ওটা ওয়াসাবি সস, অনেক ঝাঁজ। একটু করে খেতে হয়, জানো না?" আরজু শিমুর দিকে আরেক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললো। মাথার ভেতরের তীব্র ঝালের অনুভূতি কমে এসেছে। টিস্যু দিয়ে নাক মুখ মুছে গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে ধাতস্ত হলো।
"তুমি শিমু না? আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল?"
"হুম, তুমি আরজু, চিনতে পেরেছি। কেমন আছো?"
"ভালো আছি। কোথায় আছো এখন?"
"ঢাকাতেই।"
"না না। আই মিন, কী করো?"
"ওহ, একটা স্কুলে পড়াই। " শিমু মনে মনে লজ্জা পায়। নার্ভাস হয়ে কেমন বোকার মতো বললো,"ঢাকাতেই"!
"কোন স্কুল পড়াও?" আরজু আবার জিজ্ঞেস করলো।
শিমুর কাছে স্কুলের নাম শুনে আরজুর মুখে নিরাসক্তি ফুটে উঠলো। শিমুর বলতে ইচ্ছা করলো, "আরজু, তুই আমাকে তুমি তুমি করে বলছিস কেন? আমরা একসাথে স্কুল থেকে বাসায় ফিরতাম, ভুলে গেছিস?কত বিকেলে একসাথে খেলেছি, মনে পড়ে না?" কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলো না। শব্দ গুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে মনের অতলে ডুবে গেলো।
"তুমি কী করো আরজু?"
"আমি সিমেন্স আছি। " বলে আরজু মিষ্টি হেসে আবার ফোনের জগতে ঢুকে গেলো। বোঝাই যাচ্ছে সে আর শিমুর সাথে আলাপচারিতা দীর্ঘায়িত করতে চায় না।

খাওয়া শেষে সবাই এসে গোল টেবিলগুলোতে বসলো। লায়লা দাঁড়িয়ে বললো ,"আচ্ছা আমরা তো কেউ সময়মতো আসিনি। অনেকেই প্রথম পরিচয় পর্ব মিস করেছিস।যার জন্য অনেকেই অন্যদের চিনতে পারছি না। এত বছর পরে তো আমাদের চেহারা আর দৈর্ঘ্য প্রস্থ দেখে চেনার সম্ভাবনা খুব কম। তোরা দাঁড়িয়ে যার যার পরিচয় দিয়ে দে। "

একে একে সবাই দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিলো। বেশির ভাগ মেয়েরা তাদের সাফল্যমন্ডিত চাকরি কিংবা ব্যবসার গল্প করলো। কেউ কেউ গৃহিনী, তারা তাদের সফল স্বামীর পদমর্যাদার বর্ণনা দিলো। শুনে শিমুর নিজেকে বড় বেমানান মনে হলো। এমন অনুষ্ঠানে আর কখনোই আসবে না সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।

এবার এলো শিমুর পালা। কুন্ঠিত শিমু দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলো, সেই সাথে বললো সেই অখ্যাত স্কুলের নাম, যেখানে সে চাকরি করে।
টেবিল থেকে মিতু প্রশ্ন করলো, "তুমি আমাদের ফার্স্ট গার্ল রায়হানা বেগম শিমু না? কি পড়াশোনা করেছো পরে?তোমার হাসব্যান্ড কি করে? বাচ্চা কাচ্চা কয়জন কিছুই তো বললে না। "

শিমু হতভম্ব হয়ে ভাবতে থাকে আসাদের কথা কিভাবে বলবে। বলবে, তার স্বামী মিরপুরে একটা শাড়ির দোকানের ম্যানেজার? সবাই কি ভাববে? একসময় যে মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কল্পনায় স্কুলের শিক্ষকরা গর্ব করতেন, সেই মেয়ে এখন জীবন যুদ্ধে পিষ্ট একজন সামান্য চাকুরে, শুনে সবাই হাসবে না?

শিমুর চোখের সামনে ভেসে উঠলো আসাদের চেহারা। একদিন হুট করে দোকানে উপস্থিত হয়ে দেখেছিলো আসাদ শাড়ি নিজের শরীরের উপর মেলে ধরে দেখাচ্ছে । সত্যি মিথ্যা কতকিছু বলে খরিদ্দারকে শাড়িটা গোছাতে চেষ্টা করছে। ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে দৃশ্যটা চোখের সামনে থেকে মুছে ফেললো।

"আমার স্বামীও চাকরি করে। এক ছেলে প্রতীক মাহমুদ। ক্লাস টেনে পড়ে , ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করে।ছোট এক মেয়ে, প্রিতু। টুতে পড়ে। " ক্ষীণ গলায় বললো শিমু। সে মিথ্যা বলতে পারে না তবে সত্যি গোপন করতে জানে।
"প্রতীক মাহমুদ? বাংলাদেশ অনুর্দ্ধ ষোলো টিমে খেলে নাকি? কিছুদিন আগে টুর্নামেন্টে ইন্ডিয়ায় বিরুদ্ধে হাইয়েস্ট রান স্কোরার?"
"হ্যা হ্যা, আমার ছেলে প্রতীক।" শিমুর মুখে হাসি ফুটে উঠে। ছেলের এই প্রাপ্তির কথা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলো কুন্ঠিত শিমু।
"ওরে বাবা! তোমার ছেলে তো জিনিয়াস। কয়দিন আগেই তো পত্রিকায় বিরাট আর্টিক্যাল দেখলাম , ওর জন্যই তো টূর্নামেন্ট জিতলো বাংলাদেশ টিম। প্রতীক জাতীয় দলে চান্স পেয়ে যাবে, সেটাও তো নিশ্চিত।" এবার আরজু উত্তেজিত হয়ে বোলো।

টেবিলে প্রতীককে নিয়ে একটা গুঞ্জন শুরু হলো। শাহানা বললো, "তুমি তো খুব লাকি শিমু ! কত ট্যালেন্টেড ছেলে তোমার। তুমি স্বাৰ্থক।"

সবার দৃষ্টি এখন শিমুর দিকে, সেই দৃষ্টিতে সমীহ। হটাৎ করেই আড্ডার মধ্যমনি হয়ে উঠলো শিমু। আড়ষ্ঠতার কঠিন আবরণ ভেঙে শিমু যেনো আবার স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে ফিরে গেলো। জীবনের কঠিনতম দিনগুলোর স্মৃতিগুলোকে আর দুঃসহ মনে হচ্ছে না শিমুর। একসময় কেউ ছিল না প্রতীক আর তার পাশে। হোঁচট খেতে খেতে আসাদের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো। লোকটা যেনো অদৃশ্য ভাবে আগলে রেখেছে শিমুকে। সত্যিই শিমুর কষ্ট স্বার্থক। অথচ ওর সবসময় মনে হয় ছেলের জন্য কিছুই করতে পারেনি। আসলেই কি কিছুই করতে পারেনি? প্রতীকের ক্রিকেটপ্রীতির জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে শিমুকে। এইতো সেদিন আসাদ শিমুর হাতে দুহাজার টাকা দিয়ে বললো, "পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছ, পার্লারে গিয়ে সেজেগুঁজে যেও। নিজেরতো কোনো যত্ন নাও না।" সেদিন বিকেলেই প্রতীকের নতুন জুতোর দরকার হলো। দুহাজার টাকা দিয়ে জুতো কেনা হলো। শিমুর ক্লান্ত চেহারাটা সাজানো হলো না।

পাঁচ বছর আগে যখন ভয়ে ভয়ে আসাদকে বলেছিলো প্রতীক ক্রিকেট একাডেমিতে যোগ দিতে চায়, আসাদ খুশি মনে রাজি হয়েছিলো । প্রতীকের খেলা দেখতে কতোবার মাঠে রোদের মধ্যে বসে থেকেছে আসাদ। একবার তো প্রতীকের জয়ে উচ্ছসিত আসাদ প্রিতুকে স্কুল থেকে আনতে ভুলেই গেলো। মেয়েটা দুই ঘন্টা স্কুলের বারান্দায় কেঁদেছে। আসাদ সবসময় বলেছে, "আমাদের ছেলে অনেক বড় ক্রিকেটার হবে,দেখো।" আসাদের কথা সত্যি হতে চলেছ। অথচ আজকে লোকটার পরিচয় দিতে লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিলো শিমু!

গল্পে গল্পে বিকেল হয়ে এলো। সবাইকে অবাক করে নীলা চলে এলো। অসুস্থ ছেলেদের সামলে এসেছে পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। নীলা ছুটে এসে প্রথমেই শিমুকে জড়িয়ে ধরলো। শিমুর চোখে পানি এসে গেলো। ক্লাস টেনে পড়ালেখা শিকেয় তুলে নীলা পাড়ার এক ছেলের প্রেমে পড়েছিল। নীলার বাবা ব্যাপারটা ধরে ফেলে বেদম পিটিয়েছিলেন ওকে। বলেছিলেন পাশ না করলে বিয়ে দিয়ে দেবেন। নীলার প্রস্তুতি ভালো ছিল না, তাই পাশ করার জন্য নকল করেছিল। এই ঘটনায় তার জীবনে একটা ঝড় বয়ে গিয়েছিলো কিন্তু মেয়েটা কি দারুন ভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছে! এমন একটা শক্ত মেয়ের সামনে শিমুর নিজেকে অতি সাধারণ মনে হতো। আজকে শিমুর নিজেকে প্রবল শক্তিশালী মনে হচ্ছে।

পুরোনো বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সন্ধ্যায় সেদিন অন্য এক শিমু বাড়ি ফিরে এলো। এই শিমুর নিজেকে নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement