বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৭

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

অণুগল্পঃ হায় আল্লাহ! স্যারের নাক দিয়া ধোঁয়া বের হইতেছে!!

জালাল উদ্দিন মুহম্মদ

  • advertisement

    আমতলায় একে একে সবাই জমায়েত হচ্ছে। এরই মধ্যে নুরু, সিফাত, তন্ময়, আয়েশা, ঐশী ও নভ এসে হাজির হয়েছে। শুভটা যে কেন দেরি করছে কে জানে! কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই তারা মাঝে মাঝে এই আম্রকাননে গল্পের আসর জমায়। কত রকমের গল্প যে হয় তার ইয়াত্তা নেই। শুধু গল্প নয়, বলতে গেলে প্রায় নিয়মিত সাংস্কতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, ছোটখাট নাটক ইত্যাদিরও আয়োজন জমে উঠে বেশ। এরই মাঝে শুভ এসে জয়েন করল, কিরে তোরা এমন বসে বসে জাবর কাটছিস কেনো? তন্ময় ঝটপট উত্তর দিল- তা বলতে পারিস, তবে সভাপতি যদি লেট করে,অন্যদেরতো ভেরেণ্ডা ভাজা ছাড়া উপায় থাকে না। শুভ হাসল। অনেকটা বিজ্ঞের হাসি। এ হাসির অর্থ এমনও হতে পারে, লজ্জায় মরে গেলাম যে! আয়েশা বলল- যাকগে, শিগগির শুরু কর, বিকালে আমাদের সিফাত ও তন্ময়ের একটা ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা আছে। আমরা সকলে তাকে সাপোর্ট দেব। চতুর্থ শ্রেণীর আরমানের  ইউশার সাথে খেলা। ছোটদের সাথে হারলে যে আমাদের মান ইজ্জতের উপর দিয়ে একটা আস্ত ট্রাক চলে যাবে! শুভ বলল, তো শুরু হয়ে যাক। আয়েশা বলল, আজকের বিষয় ধূমপান । সে তো সকলেরই জানা, নাকি? নুরু বলল, আজকে সবাইতো মতি স্যারের ক্লাস করেছিস। স্যারের ক্লাসটা আমার খুবই ভালো লেগেছিল। আর তিনি আমাদের সকলেরই প্রিয় স্যার। কিন্তু  ---- কিন্তু  কি ? আমতা আমতা করছিস কেন ? বলেই ফেলনা - বলল আরিফ। নুরু বলল - স্যার ক্লাসে কী সুন্দর করেইনা বললেন, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর । বিড়ি, সিগারেট, তামাক,পানের জর্দা ইত্যাদিতে ক্ষতিকর নিকোটিন আছে। আর নিকোটিন এক প্রকার মারাত্মক বিষ। এরা মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ জীবাণু সৃস্টি করে। যেমন- হাচি-কাশি, যক্ষা, হৃদরোগ, এমন কি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। শুভ বলল, তো কি হয়েছে ? স্যারতো ঠিকই বলেছেন। নূরু বলল, তা ঠিক আছে, তবে আজ আমি নিজ চক্ষে যা দেখলাম, তা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সিফাত বলল, ব্যাপারটা খুলে বল। নুরু কেমন যেন ইতস্তত করতে লাগলো এবং সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো।। প্রিয় স্যারের সম্পর্কে এমন কথা সে বলে কেমন করে! শুভ বলল, তোকে নিয়ে হচ্ছে এই এক ঝামেলা! বুকে একদম সাহস নেই। তাড়াতাড়ি বলে ফেল বেকুব। বলেই শুভ একটু সরমিন্দা হল - সরি দোস্ত, তোকে বেকুব বলাটা আমার ঠিক হয়নি। আপটার অল তুই হলি আমাদের গুড বয়। নূরু বলল - সে যাক, আমি কিছু মনে করিনি। তো আসল কথাটা হচ্ছে,আমি গতকাল স্কুলে আসার সময় দেখলাম, মতি স্যার রাস্তায় হাঁটছেন আর সিগারেট টানছেন! কি সুন্দর করে ধোঁয়া ছাড়ছেন! ধোঁয়াগুলি রিং এর মত বাতাসে উড়ছে! কখনও নাক দিয়ে, কখনও মুখ দিয়ে। ঐশী চিৎকার করে উঠলো, স্যারের নাক দিয়ে ধোঁয়া বের হইতেছে! স্যারের মুখে আগুন লেগে গেছে!! সকলে একদম চুপ মেরে গেল যেন কথাটা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আয়শা বলল, নূরু তুই ভুল দেখেছিস। নিশ্চয় তিনি মতি স্যার নন, অন্য কেউ ছিলেন। ইউশা বলল, না না আমিও একদিন দেখেছি। শুভর কোন মতেই ব্যাপারটা মাথায় আসছে না। মতি স্যারের মতো একজন স্যার এমন কাজ করতে পারেন! ছাত্রদের শিখাবেন এক রকম আর নিজে করবেন অন্য রকম! নূরু বলল, আমাদের লেখাপড়া শিখে কি হবে বুঝতে পারছি না! শুভ বলল, এর সাথে লেখাপড়া শিখার অসুবিধা দেখলে কোথায়? নূরু কেমন যেন একটু উত্তেজিত হয়ে পরল। তার চেহারায় কেমন যেন রুক্ষ রুক্ষ ভাব চলে এল - শোন, মায়ের যেদিন অপারেশন হল, আমরা সবাই অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষা করছি। অপারেশন শুরু হওয়ার আগে নার্স ও ছোট ডাক্তারগণ সবকিছু রেডি করতেছে। বড় ডাক্তার সাহেব যিনি অপারেশন করবেন, তিনি পাশের রুমে ছিলেন। আমি কৌতূহল বশতঃ সে রুমে উঁকি দেই। দেখলাম বড় ডাক্তার সাব সিগারেট টানতেছেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। এই ডাক্তারগণই তো সবাইকে ধূমপানের কূফল সম্পর্কে সচেতন করেন! বলতে বলতে নূরুর চোখ দিয়ে জল এসে গেল। নূরুর মায়ের সেই অপারেশন সাকসেসফুল হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে তিনি মারা যান। আয়েশা এসে নূরুর হাত ধরল। নুরুর কান্নার বেগ আরও বেরে গেল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসলে শুভ বলল, আমরা জানি, না বড়রা কেন যে বলেন এক রকম আর কাজ করেন অন্য রকম। সব মানুষই কি বড় হলে খারাপ হয়ে যায়? তোদেরকে একটা গোপন কথা বলি, আমার বাবাও বলেন যে ধূমপান খুব খারাপ, অথচ তিনি আমাকে লুকিয়ে সিগারেট খান। শুভ'র কথা শুনে সবাই অবাক হলো। শুভ'র বাবা একজন বড় অফিসার। শুভ কত ভালো ছেলে। কিন্তু তার বাবা এতবড় বিদ্বান হয়ে ধূমপান করেন- এটা কেমন কথা! ইউশা বলল, বলল, আচ্ছা এই দেশে বিড়ি সিগারেট বানানো বন্ধ করে দিলেই তো হয়! তাহলে মানুষ ধূমপান করতে পারবে না। মানুষের রোগ বালাই কম হবে। মানুষ দেহ-মনে শান্তি পাবে। সিগারেট কেনার টাকাটাও বেঁচে যাবে। শুভ বলল, ভালো বলেছিস,সরকার তামাক জাতীয় পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করে দিলেই তো হলো। ব্যাস, কেল্লা ফ'তে! সিফাত বলল, ব্যাপারটা এত সোজা নয়।এমনটি শুধু বাংলাদেশেই হচ্ছে না। পৃথিবীর উন্নত দেশ সমূহ, যেমন- ধর, আমেরিকা,কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া---, ঐ সমস্ত দেশেও তামাক জাতীয় দ্রব্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং তারাও ধূমপান করছেন। আয়েশা বলল, ব্যাপারটি দেখছি খুবই জটিল। আমরা না হয় গরীব দেশের মানুষ, অত কিছু বুঝি না। কিন্তু উন্নত দেশে এসব হচ্ছে কেন? বিষয়টি আসলেই খুব জটিল। সবাই খুব ভাবছে। কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছে না। এমন কি হতে পারে যে, তামাক আসলে ভাল জিনিস! বড়রা ইচ্ছে করে তাদের ঠকাচ্ছে! শুভ বলল, বন্ধুরা, ব্যাডমিন্টন খেলার সময় হয়ে এসেছে। এখন আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আর আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তোমরা শুনতে চাও কি? সকলে একযুগে বলল, শুনতে চাই। তবে শোন, আগামীকাল আমরা টিফিন পিরিয়ডে স্যারদের অফিস রুমে যাব। তখন সব স্যারগণ একসাথে থাকেন। গিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে থাকবে দরজার সামনে। হেড স্যার নিশ্চয় আমাদের ডেকে কারণ জিজ্ঞেস করবেন-- তখন আমাদের মধ্যে একজনকে বলতে হবে, আমরা মতি স্যারের কাছে এসেছি। এরপর বলতে হবে, স্যার আমরা সবাই ঠিক করেছি যে আজ থেকে আমরাও সিগারেট খাব। বড়রা খায়- আমরা খেলে দোষ কি? আমাদের মতি স্যারও সিগারেট খায় স্যার! একটু হেসে শুভ আবার বলল, তাহলে কাল আমরা সবাই স্যারদের অফিসে যাচ্ছি? সবাই সমস্বরে বলল, অবশ্যই যাচ্ছি--- শুভ বলল, আসল কাজটা কে করবে? অর্থাৎ কথাগুলো বলবে কে? এবারে সবাই নীরব। কেউ কথা বলছে না। হঠাত নীরবতা ভঙ্গ করে নূরু বলল, আমি বলব! সকলে সমস্বরে বলে উঠলো, মারহাবা! মারহাবা!! সেদিন রাতে নূরুর ঘুম হলো না। শেষ রাতের দিকে কেমন জানি একটু চোখ বন্ধ হয়ে এলো। নূরু স্বপ্নে দেখল, সরকার দেশে তামাক জাতীয় পণ্যের উৎপাদন , বিপণন বন্ধ ঘোষনা করেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়। বাংলাদেশের দেখাদেখি পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ মহান উদ্যোগের জন্য জাতিসংঘ পুরস্কার ঘোষনা করেছে। নূরুর যখন ঘুম ভাংলো, তখন পূবাকাশে সোনালী রোদ ঝিকমিক করছে।

advertisement