বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮২

ন্যায্যাধিকার বঞ্চিতা

  • advertisement

    আমাদের দেশে মেয়েদেরকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখার ইতিহাস কবে থেকে সেই সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। অনেক যুগ পার হয়ে গেলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কতখানি পরিবর্তন এলো? আমাদের দেশে মেয়েরা কি পাচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকারগুলো? মেয়েদের কে বঞ্চিত করার কত কৌশল আমাদের সমাজে সুপ্রচলিত। কতভাবে আমরা তাদেরকে ঠকিয়ে যাচ্ছি। হলোই বা। আমাদের কি তাই না? আমাদের গা বাঁচিয়ে চলতে পারলেই হল। কার না কার কি সমস্যা তা নিয়ে আর মাথা ঘামাই কেন? আজ তো আমরা অনেক প্রগতিশীল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। কার কি অধিকার এলো গেলো তা নিয়ে ভাবার সময় কই আমাদের? অনেক দুঃখ ভরা কথা রয়ে গেছে এই আক্ষেপের পিছনে।

     

    কিছুদিন আগে জানতে পেরেছিলাম আমাদের দেশের কিছু প্রগতিশীল নারী ইসলাম ধর্মের উত্তরাধিকার বিধানের পেছনে বৈষম্য খুঁজে পেয়েছেন আর তার পিছনে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছেন। আন্দোলনের প্রসঙ্গে না গিয়ে আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করীই শুধু নয় বরং প্রলয়ঙ্করীও বটে। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিতে কোন মেয়ে পাবে তার ভাই এর অর্ধেক। ব্যাস! শুরু হয়ে গেল নারীবাদীদের জোর গলায় চিৎকার। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে ছোটা যেমন মূর্খতা তেমনি শরিয়তের জ্ঞান না নিয়ে ওটা নিয়ে কথা বলতে যাওয়া তার চাইতে বেশী মূর্খতা। উত্তরাধিকার বিধানের শুধু একটা দিক দেখেই তারা বলে দিলেন ইসলাম নারীর প্রতি বৈষম্য করেছে। কেমন হাস্যকর কথা! অথচ তাদের কি জানা আছে, পুরুষরা সম্পত্তি পায় শুধু মাত্র বাবার কাছ থেকে, আর সেখানে একজন মেয়ে পায়, বাবা, স্বামী, ভাই, ছেলে ইত্যাদি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে? ছেলে শুধু মাত্র বাবার কাছ থেকে সম্পত্তি পাওয়ার পরেও সেখান থেকে আবার বোনকে তার ন্যায্য অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে। ইসলাম তাহলে কি নারীর প্রতি বৈষম্য করলো নাকি নারীকে অধিকার বেশী দিল? এইবার আপনাদের কাছে প্রশ্ন করি, আপনাদের জানা আছে কি, হিন্দু ধর্মে একজন নারীকে উত্তরাধিকার দেয়া হয় কি না? উত্তরটা দয়া করে আপনারাই খুঁজে নিন।

     

    আমাদের দেশের মেয়েরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। বলা যেতে পারে আমাদের সমাজে সুকৌশলে তাদের কে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সব রকম উপায় খুঁজে নিয়েছে। কয়জন বাবা আমাদের সমাজে তাদের মেয়েদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়েছে? কয়জন ভাই তাদের বোনকে সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়েছে? ক’জন স্বামী তার স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়েছে? মোহরানার টাকাই যেখানে স্বামী প্রবররা দেন না সেখানে সম্পত্তির চিন্তা করা তো আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। গ্রামাঞ্চল, শহর সবদিকেই দেখুন। কি সুন্দর করে মেয়েকে সম্পত্তি থেকে চিরতরে বঞ্চিত করে দেয়া হচ্ছে। অথচ আমরাই নিজেদের ধার্মিক বলে জাহির করছি। ইসলাম ধর্মে অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করাকে চিরতরে নিষিদ্ধ তথা হারাম করেছে এবং হারাম ভক্ষণের ভয়াবহতা বর্ণনাও করেছে। বহুল প্রচলিত একটি পবিত্র হাদীসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বর্ণনা করেন, ‘হারাম দ্বারা প্রতিপালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। ইবনে মাজাহ শরীফের আর এক হাদীসে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসুলুল্লহ (সাঃ) বলেন, ‘যে তার ওয়ারিসকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করলো, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের ওয়ারিস থেকে বঞ্চিত করবেন’। বুখারী শরীফের অপর এক হাদীসে হযরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লহ (সাঃ) বলেন, ‘কেউ যদি অন্যায় ভাবে কারো এক বিঘৎ জমি আত্মসাৎ করে, কিয়ামতের দিন ওই জমি বরাবর সাত তবক জমিন তার গলায় লটকে দেয়া হবে’।  মোহরানা সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীস থেকে জানা যায়, রসুলুল্লহ (সাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মেয়েকে মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করল কিন্তু তার ইচ্ছা যে সে তা পরিশোধ করবে না; সে ব্যভিচারী’।

     

    উপরোক্ত হাদীসের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করলে আমাদের রক্তের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা খুব সহজেই করে নিতে পারি। নামাজ কবুল হবার প্রথম শর্তই হল, শরীর পাক হতে হবে। অজু গোসল করে কিভাবে আমার শরীর পাক হতে পারে যদি না আমাদের গ্রহন করা অন্ন, আমাদের অর্থ অন্যের হক্ব তথা অধিকার থেকে মুক্ত না হয়? কিভাবে আমাদের নামাজ কবুল হতে পারে যদি আমরা আমরা আমাদের মা, বোন, স্ত্রী’র প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দেই? ভেবে দেখার সময় এসে গেছে। আমার পিতা যদি আমার ফুফু অর্থাৎ তার বোনকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন তাহলে কি তিনি আমাকে হারাম সম্পদ দ্বারা প্রতিপালন করেন নি? আমার পিতা যদি আমার মা’কে তার ন্যায্য মোহরানা পরিশোধ না করেন, তাহলে কি তিনি আমাকে ব্যভিচার করে জন্ম দেননি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোথায়? আর কেই বা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যায়?

     

    অনেক বিবাহিত পুরুষের ধারণা  বাসর রাতে বৌয়ের কাছ থেকে মোহরানা মাফ করায়ে নিবে। এই বিধান আমাদের শরিয়তে কোথায় আছে বলতে পারেন? নাকি কোথাও মোহরানা মাফ হয়ে যাবে এমন কিছু বলা আছে? পবিত্র কোরান শরীফের সূরা নিসা এর ৪ নং আয়াতে স্পষ্ট করে বলা আছে, স্ত্রী’র মোহরানা দিয়ে দেবার পরে যদি সে স্বেচ্ছায় তা থেকে কিছু দেয় তবে তা গ্রহন করা বৈধ।

    আমি আয়াতটির তর্জমা উল্লেখ করছি। “আর স্ত্রীদের মোহরানা আদায় কর নিঃস্বার্থভাবে; কিন্তু যদি এর কোন অংশ তারা তোমাদের দিতে খুশি হয় তবে তা গ্রহন কর সানন্দে, তৃপ্তির সাথে”। জোর করে স্ত্রীর কাছ থেকে তথাকথিত মাফ চেয়ে নেয়া কি তার উপরে জুলুম করা নয়?

     

    আমাদের ভেবে দেকার সময় হয়ে গেছে। এইভাবে আর কতদিন চলবে? কতদিন এইভাবে আমাদের সমাজের মেয়েদের আমরা বঞ্চিত আর নিষ্পেষিত করে রাখব? যতদিন পর্যন্ত আমাদের সমাজের নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল সম্ভব নয়।

advertisement