বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ৭ আগস্ট ১৯৭৭

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

প্রিয়ার চাহনী ( না হওয়া দুটো গল্প)

মৃন্ময় মিজান

  • advertisement

    (প্রিয়ার চাহনি সংখ্যার জন্য লিখতে গিয়ে হাল ছেড়ে দেয়া দুটো গল্প)

    ১.

    ঝেড়ে দৌড় দিলাম। মৌচাকে ঢিল মেরে ক্ষুব্ধ মৌমাছির কামড় থেকে বাঁচার জন্য কৈশোরে যত ক্ষিপ্রতায় দৌড়াতাম তার চেয়ে তীব্র গতিতে পার হলাম পথটুকু। ফুটপাতে পৌঁছে গেছি প্রায়, পেছন থেকে তীক্ষ্ণ গতির এক ল্যান্ডক্রুজার আমাকে হাসির খোরাক বানিয়ে চলে গেল ত্রিশ ফুট সামনে।

    স্থানুর মত জমে গেলাম। হাসির শব্দ হুল্লোড়ে পরিণত হচ্ছে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গিয়ে কাদাজলে মেখে নিয়েছি শরীর। হঠাৎ উধাও বিবেকের বোধ। দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে আকাশে বাড়িয়ে মুখ ভিজতে থাকি অঝোর শ্রাবণে। তখনও অফিসের মানুষগুলো ব্যস্ত কাজে। আমি ব্যস্ততা ভুলে ভিজতে থাকি বৃষ্টির রোমান্টিক ঘ্রাণে!

    বৃষ্টির ঝাপটা বেড়েই চলেছে। মেঘের ডাক আর বিজলীর চমক চারপাশে। পিছিয়ে আসে ল্যান্ডক্রুজার। জানালায় উঁকি দেয় একটি নিষ্পাপ চাহনী। ছাতা হাতে বেরিয়ে আসে । আমার মাথায় ছায়া হয়ে ঝুলে থাকে। খুলে যায় জানালার ভাঁজ। ক্ষমা প্রার্থনা করে জানায় অবাক হয়েছে আমার আচরণে। জীবনে এই প্রথম কাউকে অফিসের ড্রেসে এভাবে ভিজতে দেখলো। তারও খুব সাধ ভিজবে কোনদিন এভাবে এমনি লোকারণ্যে!

    মহাকাল থমকে যায় আমাদের চত্বরে। দুপুরের বৃষ্টিস্নাত পিচঢালা পথে তখনো জ্বলেনি আলোঝলমল অলকাপুরী। আমার মনের কন্দরে জেগে ওঠে পৌরাণিক নগরীর আলোকচ্ছটা। এখানে ওখানে রঙিন মখমলে সাজানো ঘর, সুরা, সাকী, সুললীত গীতবাদ্য আর নূপুর ঝংকারে শিহরিত আমি। সুমিষ্ট ঘ্রাণ নাক হয়ে পৌঁছে যায় শরীরের অজানা কুহরে। সেখানে জেগে ওঠে শত পৃথিবীর পিপাসা।

    আমাদের পথচলা চলতে থাকে অনাদী কাল ধরে। আমরা সাতটি পৃথিবী পার হয়ে একটি কোয়াসারে থমকে দাঁড়াই। রঙিন পুকুরে ঝিকমিক করছে মৎসকন্যাদের রঙিন বসন। সেখানে নেই অফিসের তাড়া। নেই কাদাপানি পথে গাড়ির মাতম। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকি অনন্তকাল।

    হাতের তুড়িতে চমক ভাঙ্গে। সামনে দাঁড়ানো মনোহরী নারী ভ্রু পাকিয়ে জানতে চায় পাগলামোর উৎস। ‘ও চোখে নজর পড়লে পাগল তো ছার, মৃত্যুও নস্যি সে কি তুমি জান হে অসীত নয়না !’

    আমি আর অফিসে ফিরিনি। ফিরিনি এই টাকার চাকচিক্যে ঘেরা পার্থিবতায়। কোন এক মোড়ে লালবাতি আমাকে নামিয়ে দিলে হারিয়ে ফেলি দিকজ্ঞান। উদভ্রান্ত নয়নে খুঁজে ফিরি বৃষ্টিপলাতক সেই দুটি চোখ। আমার ঠোঁটে ভাজতে থাকি ‘ওই দুটি চোখ কোথায় তোমার! যে দুটো চোখ দিয়ে প্রথম ইশারাতে আমায় তুমি ডেকোছো!’ চোখের খোঁজে চোখ হারিয়ে যায়। চোখ আসেনা। মনের খোঁজে মন হারিয়ে যায় স্মৃতি জাগেনা।

    একটুকরো রুপালী মেঘ আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। আমি মেঘের রাজ্যে বাড়ি বানিয়ে সুখেই আছি। তুমি ভাল থেকো নিয়ন নয়না!

     

    ২.

    বৃষ্টি ঝরছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে । আমাদের জটলার আশেপাশে অনেক বনেদী মানুষ। নিজস্ব বাহনে আমাদের পিছে ফেলে যাচ্ছে। শীতের দিন। ছাতা আনিনি। এই বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে পড়ার ইচ্ছেও নেই। অনেকে ব্যঙীয় লাফ লেফে পেরিয়ে যাচ্ছে সামনে জমা কাদাপানিটুকু। কেউ কেউ মাথায় ব্যাগ ধরে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচিয়ে চলে গেছে বিআরটিসির ঘাটে। জটলা কমেছে।

    আমার সিগারেটের তেষ্টা পায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে পেলামনা। একটা পাজেরো থেমেছে। ইস্ এটায় করে যদি বাসায় যেতে পারতাম! থেমেই আছে ওটা। ভেতর থেকে কেউ বের হচ্ছেনা। আমি উঁকিঝুকি মারি। বৃষ্টির ছাট লাগায় আবার সরে আসি। ‘কে আছো আমায় উদ্ধার কর।’ ভেতরকার ফাউলটা ব্যঙ্গ করে ”ব্যাটা ছাগল, এইখানে দাঁড়াইয়া থাকবা আর মনে মনে ভাববা কোন রাজকন্যা আইসা তোমারে উদ্ধার করব ? ব্যঙের মত একটা লাফ দিয়া সামনের পাটিটুকু পার হই যা। তারপর সোজা দৌড় দিয়া একটা গাড়িতে ওঠ।” দাঁড়িয়ে থেকে পা ধরে গেছে। আরো দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো দাঁড়ানোর শক্তিও হারাবো।

    কেউ একজন আমাকে পাশ কাটায়। গা ঘেসে যাওয়ায় মনে মনে গাল পাড়ি। ’ব্যাটা উজবুক, এক্সকিউজ মি, বইলা জায়গা চাইলে কি আমি তোরে দিতাম না’। হুদাই দিলি আমার মেজাজ টং কইরা!’ আমরা যে বিল্ডিং এর নীচে দাঁড়িয়ে আছি তার নাম ইউনুস টাওয়ার। এখান থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে রাজউক ভবনের পাশ দিয়ে মেইন রোডে। ওখানে আমার গন্তব্যগামী দু-একটি বাস পাওয়া যেতেও পেরে। তবে আরেকটু এগিয়ে গুলিস্তান গেলে গাড়ী পাওয়া নিশ্চিত। কিন্তু বৃষ্টি আমার পথের একমাত্র কাটা।

    হঠাৎ পাজেরোর মধ্যে বাতি জ্বলে উঠল। পেছনের দরজা নড়ে উঠল। আমার গা ঘেসে চলে যাওয়া আধবুড়োটা পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ড্রাইভার খুলে দেয় দরজা। আমার চোখ জোড়া ড্রাইভার, আধবুড়ো আর পাজেরোর দরজার ফোকর গলে খুঁজে নেয় একজোড়া হরিণচোখ। আমি আরেকটু ঝুঁকে পড়ি। আরেকটু এবং আরো...। ততক্ষণে বেয়াদপের মত আমার চোখের সামনেই বন্ধ হয়ে যায় দরজা। নিভে যায় জ্বলে ওঠা আলো। গাড়িটি সোজা পথে রাজউক ভবন পার হয়ে মেইন রোডের সামনে দাঁড়ায়। এই বৃষ্টিতে জ্যাম মাশাল্লাহ বিরাট আকার ধারণ করেছে। আমি আবারও হরিণ নয়নাকে দেখার আশায় বৃষ্টিতে ভিজে পাড়ি দেই সামনের পথটুকু।

    গাড়ির কাছে গিয়ে উঁকিঝুকি চলে। ভেতরের কিছুই দেখা যায়না। ‘একবার দরজা খোল। দেখ কে এসেছে তোমাকে দেখতে। তোমার হাজার জনমের প্রতিক্ষীত সুখ তোমার সামনে। গ্রহণ কর।‘ কিন্তু কে শোনে এই রিক্তের বেদনাহুতি? আমি সামনের সোডিয়ামের দিকে তাকাই। একটা কাক একমনে ভিজে যাচ্ছে। ঝুরঝুর ঝরে যাচ্ছে পানির ফোটা। আমি তোমার মত হব কাক। প্রেয়সীকে দেখার জন্য প্রয়োজনে হব ধ্যানী বায়স!

    কখন জ্যাম ছাড়ে আর কখন চলে যায় অহংকারী পাজেরো আমি টের পাইনা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একসময় আবিষ্কার করি চলে এসেছি বাসার সামনে। পথটুকু কি হেঁটেই এসেছি ! নাকি বাসেও উঠেছিলাম আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে সেই রাতে দেখেছিলাম একটি হলিউডি স্বপ্ন। শাহবাগের মোড়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছি পাজেরোর জন্য। পাজেরো এলো। থামল আমার সামনে। আমি ফুল নিয়ে এগিয়ে যেতে সরে গেলো জানালার কাঁচ। ফুলগুলো এগিয়ে দিতেই ভেতর থেকে সুনয়না মিষ্টি হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়। এক হাতে ফুল নিয়ে অপর হাতে বাড়িয়ে দেয় চকচকে একশ টাকার একটি নোট। আমি নিজের দিকে তাকাই। কাদাজলে ভিজে আমি আর আমি নেই। নিষ্পলক দেখতে থাকি তাকে। তার বিস্মিত চোখের সামনে লালবাতি সবুজে গড়ায়। হাত থেকে টাকা পড়ে যায়। গাড়ি চলে যায় আপন গন্তব্যে। পেছনের গাড়ির একরোখা হুইসেলে ভেঙে যায় আমার সাধের ঘুম।

advertisement