জগৎ সংসারের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন- গল্পকবিতার সৌখিন শব্দ শিকারী আহমাদ মুকুল ভাইয়ের গর্ভধারিণী মা। খবরটা জানার সাথে সাথেই মুকুল ভাইয়ের মোবাইল ফোনে রিং দেই। ফোন রিসিভ করে উনি শিশুর মত কাঁদছিলেন, আমি সান্তনা দেয়ার কথা ভুলে যাই। হয়ে যাই অনেকটাই বাকহীন, আবেগ আপ্লুত। কিছু বলতে পারিনি আমি। আসলে এ শোকের সান্তনা দেয়া যায় না। এ রকম শোকের ঘটনায় সান্তনা বানী হিসেবে যথার্থ কোন শব্দ বা শব্দাবলী আছে বলে আমার বিশ্বাসও হয় না।

গতকাল সকালে ছুটে যাই জানাযার নামাজে শরীক হওয়ার জন্য। মুকুল ভাইকে দেখে চমকে উঠি। বিধ্বস্ত এলোমেলো অন্য রকম। 

বার্ধক্য অভিশাপ- বলে একটা কথা আছে। অন্তিম সময়ে শরীর কার্যক্ষমতা হারায়। কেউ বিশ্রী শব্দে কাঁশেন, কেউ বা জামাকাপড় বাড়ী ঘর নষ্ট করেন। যান্ত্রিক সভ্যতার টিপটপ ফিটফাট যুগে সবাই পরিপাটি থাকতে চায়। অনেকেরই এই সব অচল মানুষগুলিকে ঘরে রাখতেও লজ্জা হয় আবার লোক লাজের ভয়ে ফেলে দিতে গেলেও লজ্জা পেতে হয়। অনেকেই ভুলে যান নিজের জীবনের কাছে বাবা মায়ের ত্যাগ তিতিক্ষার কষ্ট গাঁথা। বুড়ো বাবা মা অনেকের কাছে অনেক সময় হয়ে উঠেন- বোঝা, জঞ্জাল।

জানাযার নামাজের পর মুকুল ভাই বলছিলেন ২৫/৩০ বছর আগের কথা। ছয় ভাই বোনের সংসারে উনি তখন স্কুলের নবম শ্রেণীতে পড়েন। তখন একদিন বাবা অসময়েই চলে গেলেন।

এই মা-ই তখন হয়ে উঠেছিলেন সংসারের মা, বাবা সব। খুব ভাল করেই অনুভব করতে পারি ২৫/৩০ বছর সময়টা এই মা একটা যুদ্ধকালীণ সময় পার করেছেন। আমিও ছোট বেলা বাবাকে হারিয়েছি আমার মাকে জীবনের সাথে লড়তে দেখেছি।

মুকুল ভাইয়ের মা যুদ্ধ জয় করেছেন। উনি ছেলেমেয়েদেরকে বড় করছেন, মানুষ করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই প্রতিষ্ঠিত একজন মুকুল ভাইকে আমরা দীর্ঘ দিন থেকে দেখেছি একজন সফল মানুষ হিসেবে, শক্তিমান লেখক হিসেবে, অসম্ভব রকমের সফল সংগঠক হিসেবে।

গত দুদিন ধরে আমি আহমাদ মুকুলকে নতুন করে দেখেছি, জেনেছি একজন শিশু হিসেবে। মায়ের জন্য কাতর, উদ্ভ্রান্ত এক শিশু মুকুল! শোকের আবহে থেকেও মুকুল ভাইয়ের মাতৃপ্রেম, মাতৃভক্তি দেখে মুগ্ধতায় আমার মন ভরে উঠেছে।

মা, স্রষ্টার অবধারিত নিয়মে সাড়া দিয়ে তুমি চলে গেছ লোকান্তরে। তুমি তোমার কর্ম, ভালবাসা, দায়িত্ব দিয়ে সব কিছু জয় করে গেছ। তোমার সন্তানদের হৃদয় জুড়ে তুমি অম্লান, অক্ষয়! তুমি বিজয়ীনির মুকুট সুশোভিত হয়ে ইহকাল পরকালে তোমার সন্তানদের হৃদয় সাম্রাজ্যে বিচরণ করবে!

 

[আমার এই শব্দমালা প্রিয় ভাই বন্ধু আহামাদ মুকুল ভাইয়ের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে উৎসর্গ করলাম।]