বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৬ জুলাই ১৯৮৩

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

বইমেলার ডায়েরি- ‘বৃদ্ধ সম্রাট, ভূতের গলি আর ধুলি বসনের গল্প’

রনীল

  • advertisement

     

    ১।

     

    পুস্প বইটই খুব একটা পড়েনা। বই মেলা যাবার কথা শুনেই সে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। তিলোত্তমা নগরীর আধুনিক মানব- মানবীদের জীবনে আজকাল সময়ের খুব অভাব। দম ফেলার যেটুকু ফুরসৎ মেলে তার প্রায় পুরোটাই চলে যায়  ফেসবুক নামক দানবের উদরে।

    আমি ও খুব একটা জোর করলামনা। গেল বছর (প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দিন) মেলায় ঢোকার জন্য বিস্তর ঠ্যালাঠেলি করতে হয়েছিল। পাঠক- দর্শনার্থীদের লাইন গিজগিজ করছিল শাহবাগের ছবির হাট পর্যন্ত।

    শিশুপার্কের সামনে এসে বাস থেকে নেমে গেলাম। সুরাবরদি উদ্যানের ভেতর দিয়ে শর্টকাট মেরে টিএসসি মোড়ে এসে চোখ কপালে উঠে গেল। পত্রিকায় পাঠক- দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় জাতীয় কিছু পড়েছিলাম বোধ হয়। বাস্তবে তার ছিটফোঁটাও দেখা গেলনা। বিস্কুটের কার্টন কেটে বানানো ডোনেশন বক্স হাতে নিয়ে ক্যানসার আক্রান্তরোগীদের জন্য সাহায্যপ্রার্থী কজন বিমর্ষমুখে বসে আছে, কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা।

    সে তুলনায় প্রবেশমুখে দাড়িয়ে থাকা পুলিশ সদ্যসদের বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে, মুখে চাপা স্বস্তির আভাষ ও দেখলাম যেন।

    বাংলা একাডেমীর প্রবেশ পথের পাশের পুলিশ বক্সে ও একদঙ্গল পুলিশ বসা। মূল গেটের পাশে দাড়িয়ে আছেন দুজন মহিলা পুলিশ। কমবয়সী, মনে হয় খুব সম্প্রতি রিক্রুট হয়েছে।

    ডজনখানেক পুরুষ পুলিশ সদস্য অলসভঙ্গিতে বসে আছে আর সদ্য নিয়োগ পাওয়া বালিকা চেহারার দুজন নারী পুলিশ গেট সামলাচ্ছে- দৃশ্যটির মাঝে কিছু অস্বাভাবিকতা আছে, ব্যাপারটি কি কেউ খেয়াল করছেনা!

    এ জাতীয় অস্বাভাবিক দৃশ্যাবলী যিনি খুব আগ্রহ নিয়ে খেয়াল করতেন, সেই লোকটি অদূরেই একটা স্তম্ভের উপর ছবি হয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

    তথ্যকেন্দ্রের কম্পিউটারটা টিপেটুপে বের করলাম ভাষাচিত্র প্রকাশনের স্টল নাম্বার- ৪২ (এখান থেকে আমাদের গল্প সংকলন বের হবার কথা) সামনেই একটা গলির প্রথম স্টলের নাম্বার-৩৬, এতো সহজে! আমি খুশিমনে সেদিকে পা বাড়াতেই আবিষ্কার করলাম- এর পরের স্টলটি ৩৮, তারপর আবার ৩৬, ৩৮, ৩৮, ৪০ এবং ৩৬... হাঁটতে হাঁটতে আমি গলির শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম, ৪২ এর দেখা আর পেলামনা।

    আমার মাথাটা কিঞ্চিৎ চক্কর দিয়ে উঠলো। হতভম্বভাবে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়লো রুমানা বৈশাখীর সেই বিখ্যাত অবমানবের হাত। সেই হাতের ভেতর দিয়ে আরেকজন (কিংবা হতে পারে একই ব্যক্তি!) আবার কিছু বলার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর পাশের স্টলেই দেখলাম কাটা মন্ডু সাজিয়ে রেখেছে, তার পরেই স্টোকার সাহেবের ড্রাকুলা।

    বই মেলার মাঝে এরা দেখছি ভুতের গলি বানিয়ে রেখেছে। হঠাৎ করেই আমি লক্ষ্য করলাম, পুরো গলিতে শুধু আমি একা, আর কেউ নেই।

    আমি চকিতে চোখ মাটিতে নামিয়ে ফেললাম। স্টলে দাঁড়ানো বিক্রয়কর্মীদের দিকে তাকাইনা, যেন তাকালেই সেখানে থ্যাঁতলানো রক্তমাংসের বীভৎস সব জম্বীদের দেখতে পাবো।

    রুদ্ধশ্বাস সেই জীবন মরণ সংকটের মাঝে আমার ফোনটা বেজে উঠলো, বন্ধু পণ্ডিত মাহির ফোন।      

    -      ওস্তাদ, আপনে কই?

    -      আমি তো প্রায় চলে আসছি, একটু ওয়েট করেন।

    -      আরে মিয়া তারাতারি আসেন। আর বেশি দেরি করলে আমারে হয়তো আর পাইবেননা।

    -      হ্যাঁ... কন কি! আরে টেনশন নিয়েননা, আমি আসতাছি, জাস্ট ফাইভ মিনিটস।

    পণ্ডিতের বলার ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিল- শুনে আমি কিছুটা আশ্বস্ত হই। তাকিয়ে দেখি গলিতে আরো দুইএকজন দর্শনার্থী প্রবেশ করেছে, ভুতের বইয়ের পাশাপাশি বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ ও সাজানো আছে দেখলাম... অভিভূতের মত আমি তাকিয়ে দেখি স্টলের মাঝে বসে থাকা কমবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর চেহারার কোথাও পচন ধরেনি।

    পণ্ডিত মাহি আসতেই বুঝতে পারলাম মেলায় বাবাকে হারিয়ে ফেলে পুনর্বার তাকে ফিরে পেলে কমবয়সী শিশুটির কেমন অনুভূতি হয়।

    কাঁদো কাঁদো গলায় আমি পণ্ডিতকে বিচার দিলাম,

    -      দ্যাখছেন ওস্তাদ, মেলার মাঝে এরা ভুতের গলি বানায়া থুইছে। এইডা কিছু অইলো!

    সব দেখেশুনে পণ্ডিতের মত বিচক্ষণ লোক ও ধাঁধায় পড়ে যান।

    ভুতের গলির মুখটায় আমাকে দাড় করিয়ে পা টিপেটিপে তিনি প্রবেশ করলেন ভেতরে। তিন গোয়েন্দার কিশোর পাশার মত ঠোঁটের নিচে চিমটি কেটে কিছুক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবলেন। তারপর ফিরে এসে মিসির আলির চোখ পিটপিটিয়ে বললেন,

    -      আপনার ভুত সম্যসার সমাধান হইছে। আপনে মনে হয় সংখ্যাগুলো পড়ে বাকিটা আর দেখেননাই। তাকায় দেখেন সবখানেই সংখ্যাগুলোর শেষে বাংলাবাজার শব্দটা লেখা আছে। খুব সম্ভবত বাংলাবাজার এলাকায় ৩৬ থেকে ৪০ নাম্বারের মধ্যে অনেকগুলা প্রেসের অফিস আছে।

    সাথে সাথেই আমার বুকের উপর থেকে পাষাণভারটা নেমে গেল। তাকিয়ে দেখি ফাল্গুনের হাওয়ায় আকাশটাকে কি ভীষণ নীল দেখাচ্ছে, ভুতুড়ে আবহটাও আর নেই।

    না, ভুল বললাম মনে হয়। একদমই যে নেই, টা কিন্তু নয়। স্টলের জন্য নাম্বার বরাদ্দ করে সেখানে যদি বাংলাবাজারের নাম্বারটাই ঝোলাতে হয়, তবে সবার জন্য স্টল নাম্বার বরাদ্দ সংক্রান্ত পণ্ড শ্রমের দরকারটাই বা কি ছিল!

     

    ২।

    একটু পর এলেন রোশনি, তারপর মামুন ভাই। রোশনির মুখ দেখে বুঝলাম মেজাজ খারাপ। যা হোক সেটা পণ্ডিতের ডিপার্টমেন্ট, পণ্ডিত বুঝুক।

    আমার মন খারাপ হল মামুন ভাইয়ের বিমর্ষভাবটা দেখে। লোকাল প্রেস স্টল পায়নি। আমাদের বইগুলোর বরাদ্দ হয়েছে লিটল ম্যাগ কর্নারের খুদ্র একটুকরো জায়গা।

    মামুন ভাই আজকাল হতাশার কথা বেশি বলেন, মাথার চুলেও অল্পবিস্তর পাঁক ধরেছে। সরকারী চাকরির নানান হ্যাপা- অনিশ্চয়তা, ঝামেলা সামলে যেটুকু সময় পান- তা ব্যয় করেন লেখালেখিতে। মুকুল ভাইয়ের সাথে মিলে গাঁটের পয়সা খরচ করে ছাপিয়ে দিচ্ছেন আমাদের মতন নবীশদের কবিতা।

    মনে পড়ে গেল সেভিং প্রাইভেট রায়ানের ক্যাপ্টেন মিলারের কথা। কোন কিছু পাবার প্রত্যাশা না করে স্রেফ রায়ানের জীবন বাঁচানোর জন্য যিনি লড়েছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

    লিটল ম্যাগ কর্নারের সেই ক্ষুদ্র পরিসরে দাড়িয়ে নিজেকে হঠাৎ নবীন যোদ্ধা রায়ান বলে মনে হল আমার। ক্রুদ্ধভাবে আমি অদূরের প্রাসাদসম স্টলটির দিকে তর্জনী উঁচিয়ে ধরি,

    -      হে লাজহীন অথর্ব সম্রাট, নিঃস্বের মত এসেছি দেখে খুব পরিহাস করছ, কিন্তু যেনে রেখো তোমার দিন শেষ হল বলে... পরেরবার যখন ফিরবো, তখন তোমার মর্মর প্রাসাদের চুড়োতে আমার বিজয় নিশান নিশ্চিত উড়িয়ে দেব...     

advertisement