বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ অক্টোবর ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৪৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭১

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৪ / ৩.০

হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…

রাত মে ২০১৪

দালালী

বাংলার রূপ এপ্রিল ২০১৪

স্মরণাবর্তের বেলা অবেলা

মুক্তিযোদ্ধা ডিসেম্বর ২০১২

গল্প - এ কেমন প্রেম? (আগস্ট ২০১৬)

মোট ভোট ২৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭১ কাল কুষ্মাণ্ড

আহমাদ মুকুল
comment ১৭  favorite ০  import_contacts ৬১৩
আরেকটু জোরে দৌড়ান… … ধুর মিয়া, লাগেজটা কান্ধে লন… … কাম হইতো না, ক্ষ্যামা দেন… নানাবিধ মন্তব্য আর পরামর্শের মধ্য দিয়ে হনহন করে ছুটছে পলাশ।
...টিকেটখান হাতে লইয়া লাড়া দ্যান, ডেরাইভারের দয়া হইতে পারে… মন্তব্য শুনে পিত্তি জ্বলে উঠে পলাশের। চলতে শুরু করা ট্রেন বুঝি তার জন্য এখন এই স্টেশনেই থামবে! মন্তব্যকারীর দাঁতকেলানি দেখে মালপত্র ফেলে আগে ওর সাথে সুরাহা করতে ইচ্ছে হয়।
নাহ, এটা নিয়ম না। ট্রেন মিস করার উপক্রম যাত্রী এটা করতে পারে না। মানুষই বা কী বলবে- লোকটা ট্রেন ধরার কোন চেষ্টাই করলো না? উল্টো শুরু করেছে মারামারি।
এগারসিন্দুর ট্রেনটি ছেড়েছে, কিন্তু এখনও গতিতে ওঠেনি। কুলি, ফেরিওয়ালা কিংবা রেলছাদের সম্রাট টোকাইদের জন্য অবশ্য এই ট্রেনে ওঠা ছেলেখেলা্। ট্রেনের বিলম্ব নিয়ে কত গল্প কৌতুক হাস্যরস রয়েছে। অথচ কয়েকটি সেকেন্ডের জন্য পলাশ এ মুহুর্তে জীবনের বিশাল এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে ঠিক বলা যাবে না, এক হাতে একটি হাতব্যাগ, আরেক হাতে বিশাল এক লাগেজ নিয়ে ছুটন্ত।
সবকিছুরই একটা ব্যাকরণ আছে। পিছুলোক এড়ানোর জন্য চোরের একরকম দৌড়। বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানোর দৌড়ের গ্রামার আবার আলাদা- হালকা বৃষ্টিতে একরকম, ঝুম বৃষ্টিতে একরকম। সিনেমার নায়িকার আলুথালু দৌড়ে আবার শুধু গ্রামার না গ্ল্যামারও ঠিক রাখতে হয়। অলিম্পিক রেস হোক আর ঘরের কোনার এসএ গেমস হোক- প্রতিযোগিতার দৌড় হলো কেতাবি দৌড়। সেই কেতাবি দৌড় দিয়ে কেউ ট্রেন ধরতে গেলে পথচারি কিংবা সহযাত্রীসমাজ অবশ্যই মানবে না। ছিঃ ছিঃ না করুক, বাঁকা হাসি দিবেই।
দৌড়ের ব্যাকরণ আছে, হাসি-কান্নার নেই? আপনার পাড়ার রহিমের খালু মারা গেলে কি আপনি গার্লফ্রেন্ডের বিড়াল মরার খবর শুনার কান্না দিতে পারবেন? বসের হাজারবার শোনা জীবনযুদ্ধের কাহিনী আবারও শুনে হয়তো রিয়েলিটি শোর বিচারকের মতন কেঁদে ফেলতে পারবেন? কিন্তু পারবেন কি তাদের মত ধ্রুপদি ছলছল চোখে তাকাতে? মেকাপ অক্ষত রেখে টিসু দিয়ে চোখের শুষ্ক কোন ডলাডলি করতে পারবেন? আর হাসি? নাহ, হাসির মুডে নেই এখন পলাশ, তাই হাসির গল্প থাক।
স্টেশনের সিনটা যেন স্লো-মোশনে চলছে। নাটকের পরিচালক যেমন একজন পাত্র বা পাত্রীর একবার মাথা ঘুড়ানো তিনবার দেখাতে পারে। নায়িকা আছাড় খেয়ে নায়কের কোলে পড়ে স্থির হয়ে থাকতে পারে। ট্রেন-যাত্রী দৌড়ের এই কাহিনীচিত্রটি কেন এক ফ্রেমে আটকে থাকতে পারবে না? … পলাশের ফোন পকেটে বেজেই চলেছে, মাঝে মাঝে মেসেজের ‘পুটুং’ ও শোনা যাচ্ছে। ফোন ধরার অবস্থায় সে নেই। থাকলেও এখন আর ধরতো কিনা সন্দেহ। যার এত ঠ্যাকা, সে নিজের প্রায়শ্চিত্ত করুক। এরকম কল, মেসেজ জীবনে অনেক করেছে।
সন্ধ্যে ৬-৩০ এর ট্রেন। সকাল থেকে ছত্রিশবার মনে করিয়েছে পলাশ। এই ট্রেনটি রাইট টাইমে ছাড়ে- বারবার সতর্ক করেছে। সাড়ে পাঁচটায় স্টেশনে পৌছে ‘তাড়াতাড়ি করো’ রেকর্ডের মতন বাজিয়েছে।

-এই তো শাড়ি পড়া শেষ… এখনই বের হচ্ছি
-তাড়াতারি করো।

-কই তুমি?
-এই যে, স্যান্ডেলের ফিতা লাগাই
-তাড়াতাড়ি করো।

-কতদূর?
-এই তো পার্সটা নিয়ে বের হবো।
-তাড়াতাড়ি করো।

-আসছো?
-ধুর, লাগেজটা এত ভারী! সিএনজিতে তুলছি। তুমি নবাবজাদা কাছে থাকলে কি আমার এই কষ্ট হয়?
-তাড়াতাড়ি করো।

- আর তো টাইম নাই
- কাছাকাছি এসে গেছি, ভাগ্যিস সময়মত মনে পড়ছিল- লিপস্টিক লাগাতে ভুলে গেছিলাম। আবার বাসায় ঘুরে আসলাম। তুমি এত তাড়া দিলে কিভাবে পারি?
- তাড়াতাড়ি করো।


- এখন কই?
- তোমার পিছনে, বুদ্ধু!
- ওহ, বাচাইছো, তাড়াতাড়ি করো- আর দুই মিনিট আছে।
- হাপাইতেছি, পানি খাওয়াও। ধুর, আধখাওয়া বোতলে পানি খাই না। ইনট্যাক্ট বোতল আনো- মাম পানি আনবা।
- ট্রেন ফেইল করমু, জান। গাড়িতে উইঠ্ঠা পানি খাইও।

প্রতিক্রিয়ার অগ্নিদৃষ্টি দেখে পলাশ ট্রেনের আশা ছাড়ে, আগে নিজের জান বাঁচুক।

- এক কাজ করো, তুমি আগাইতে থাক, আমি পানি নিয়া দৌড়াইয়া আসি।

‘ওক্কে’ বলে বেমক্কা সাইজের লাগেজটা পলাশকে ধরিয়ে দিয়ে মহারানী সামনের পথ ধরলেন। এরমধ্যে পলাশের হাত থেকে খাবলা দিয়ে টিকেটটা নিতে ভুললেন না।

এরপর যা হওয়ার তাই হলো। পানির বোতল কিনে লাগজে টানতে টানতে তিন নম্বর প্লাটফর্মের কাছে আসতে না আসতেই শুনে ট্রেন লম্বা সিটি দিয়ে দিয়েছে। পলাশদের ‘গ’ বগি ট্রেনের একবারে সামনের দিকে। ও পর্যন্ত না গিয়ে যে কোন এক কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়ার চেষ্টা নিল পলাশ। কিন্তু কেন যেন ট্রেন আর নিজের দূরত্ব কমাতেই পারছে না।

পিউলির সাথে পলাশের পরিচয় কিন্ত এই রেলস্টেশনেই। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ট্রেন থেকে নেমে ওয়েটিং রুম পার হওয়ার সময় হঠাৎ এক তরুনীর আহবান শুনে থামে পলাশ। মেয়েটি সানুনয়ে তার লাগেজটি একটু দেখে রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলে, সে ওয়াশরুমে যাবে। তার সিদ্ধান্ত শোনার আগেই মেয়েটি দ্রুত মহিলা ওয়েটিংরূমে ঢুকে পড়ে। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকা পলাশ কী করবে ভাবতে ভাবতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মেয়েটি ফিরে আসে।

এক সাথে স্টেশনের বাইরে বেরুতে বেরুতে পলাশ জানতে চাইলো কোন রকম পরিচয় ছাড়া এভাবে লাগেজ কিভাবে তার কাছে রেখে গেল? পলাশের চেহারাতে নাকি কেমন যেন একটা নির্ভরতার ভাব আছে, তাই সে নিশ্চিন্ত ছিল। সেই নির্ভরতার মূল্য আজো দিয়ে চলেছে, দশাসই লাগেজ টেনে ছুটছে ট্রেনের দিকে।

অনেক কাছে এসেছে তারা এই কটি বছরে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে উঠতে আসা পিউলি আজ লেখাপড়া শেষ করে পরিণত হয়েছে। জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্তও প্রায় নিয়ে ফেলেছে তারা। কিন্তু কোথায় যেন একটা দূরত্ব রয়ে গেছে। ধাবমান পলাশের আর ট্রেনের দূরত্বটি যেন গত কয়েকমাসে ওদের সম্পর্কের প্রতিরূপ। জীবন বাঁচানোর দৌড় কিংবা স্বর্নপদক পাওয়ার জন্য লোকলজ্জাত্যাগী দৌড় দিয়ে হয়তো ট্রেনটি ধরে ফেলা যায়। ট্রেনের দরজা দিয়ে মেয়েটির বাড়িয়ে দেয়া হাতও হয়তো ছুটন্ত যাত্রীর পায়ে বিজলীর গতি সঞ্চার করতো। কিন্তু কোনটাই ঘটল না।

ব্যবধান ইঞ্চি, ফুট, গজ হতে মাইলের হিসাবে যেতে যেতে ধীর হয়ে আসে পলাশ। একটু আগে ট্রেনদাড়ানো লাইনটি এখন খালি। আরেকটি ট্রেন আসবেই। খালি থাকবে না, এটাই নিয়ম। ২৯-৩০ নম্বর আসনের কোন একটি কিছু সময়ের জন্য শুন্য থাকবে। আবার যাত্রী হবে কেউ! তবে ফেরত আসা মানুষটির মনের গতি প্রকৃতি অত সরলীকরণ করা যাবে না। পলাশের না খালি না ভরা অন্তরটির নিয়তি সময়ই বলে দেবে।

ফিরে আসার গল্পটি প্রায় আগেরই অনুরূপ। প্লাটফরমের গতানুগতিক সামাজিকতা। নানাবিধ উপদেশ, বক্রোক্তি, হাসি, ভ্রুকুটি। ফিরে চলেছে পলাশ। বাস আর ট্রেনের বড় তফাৎ হলো। একটা বাসের পরপর আরো বাস থাকে, একই গন্তব্যে সমান্তরালে অন্য বাসও চলে। নিদেনপক্ষে কাছাকাছি গন্তব্যে একই সময়ের অন্য গাড়ি মেলে। রেলের ক্ষেত্রে এই সুযোগ নেই। এক বেলা, দুই বেলা কিংবা পুরো একটি দিন লাগে একই গন্তব্যের পরের ট্রেন পেতে। তবে ট্রেন মিস করা যাত্রীটির চেহারায় কোন ব্যাকুলতার লেশমাত্র নেই।

পিউলির ঢাউস চকচকে লাগেজটি অবশেষে কাজে লাগলো। প্রথম শ্রেণির এসি ওয়েটিং রুমে বিনা বাধায় ঢুকে পড়লো সে। যাত্রীর পোশাক আশাকের কারণে না হলেও লাগেজের স্ট্যাটাসের কারণে এটেনডেন্ট কিছুই জিজ্ঞেস করলো না ওকে। একটা সোফায় শুয়ে পড়ে চোখ দুটো বন্ধ করলো পলাশ। একটু ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা। … এতক্ষণে বিমানবন্দর স্টেশন পৌছে গেছে ট্রেন। ‘গ’ বগির ২৯-৩০ সিট দুটির একটি কি খালি আছে এখনও? নাকি দুটি সিটই খালি, নাকি দুটি সিটেই লোক এখন? ভরা দুটি সিটে কি একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ? গোলাপি জামাপড়া মেয়েটি কি সিটে আছে? সহজাত ভাবনাগুলো ভিড় করলো, কিন্তু তেমন পাত্তা পেলো না হঠাৎ উদাসীন পলাশের অন্তরে।

সুইয়ের ফোঁড়ে এক সুতার চলনে সেলাই হয়। সরল সেলাই ভালই বাঁধে। তবে সুতা যতই পোক্ত হোক ঠুনকো এই বাঁধন সুতার এক মাথার টানে ফড়ফড় করে খুলে যায়। ফিনফিনে তন্তুর গাঁটবন্ধনে বুনন হয়। এই বুনন যেমন ঠাস তেমনি দৃঢ়। তন্তু যতই দুর্বল হোক, বেঁধে রাখে প্রাণপণে। পলাশের ভাবনায় ধরা পড়ে তাদের সম্পর্কের বহুমাত্রিক তন্তুর অভাব।

কি যেন চিন্তায়, নাকি কোন মনস্থিরতায় ঝটপট উঠে পড়ল পলাশ। লেফট লাগেজ কাউন্টারে লাগেজটা জমা দিল- পিউলির নাম ও মোবাইল নম্বর রেজিস্টারে উঠালো। ছোট্ট একটা এসএমএস পাঠালো- ‘‘কমলাপুর স্টেশনের লেফট লাগেজ কাউন্টারে ৫৭/২০১৬ এন্ট্রি নম্বরে লাগেজটি পাবে’’

মোবাইলের সিমটি খুলে ফেললো পলাশ, পরিচিতির একটি বড় জড় উৎপাটন করা দরকার। কাহিনীর প্রয়োজনে নয়, বর্ষার স্বাভাবিক রীতিতে বৃষ্টি হচ্ছে। স্টেশন ছেড়ে নেমে পড়ল রাস্তায়। মনে আউড়ালো অখ্যাত কবিতার পংক্তি-

… ছুড়ে ফেল্লাম ছাতা
এই বংশদণ্ড, আর এক টুকরো ত্যানা… প্রতিবন্ধ
আমার আর আকাশের সম্পর্ক

বর্ষাধারা গায়ে বসলো, হয়ে অনুভূতির রংহীন বর্ষাতি।

শুরু করলাম খোলা আকাশে পথ চলার কৃষ্টি
স্বাধীন আমি, মুক্ত চেতনার নয়া অনাসৃষ্টি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন