বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২ / ৩.০

আমার অন্ধকার ভবিষ্যত

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

কালো হাওয়া

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

অংশুমানকে আমি কখনো ভালোবাসিনি

কামনা আগস্ট ২০১৭

গল্প - ঘৃণা (সেপ্টেম্বর ২০১৬)

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮৮ বাতাসের ছুরি

সাদিয়া সুলতানা
comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৬৫৩
১.
তিনদিন টানা বৃষ্টির পর আজকের রোদ বড় কাঙ্ক্ষিত, ভালোবাসার। নিজের গুরুত্ব বোঝাতে রোদও যেন আহলাদীপনা করে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ডুবসাঁতার কাটে। বৃষ্টিধোয়া গাছের পাতায় সোনারোদ পিছলে পড়ে পাতার বাহার দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমড়া, করমচা, কদম, পেয়ারা, আম, জামসহ নানা জাতের গাছের শোভায় আমোদ আলীর বাড়িটাকে কোনো এক জমিদারের বাগানবাড়ির মতো দেখায়। বিশেষ করে উঠানের করমচা গাছের রূপ এই ভরা বরষায় দেখার মতো হয়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে করমচার লাল থোকা আর সাদা ফুলের রূপ দেখে খুব আত্মভোলা মানুষও একবার থমকে দাঁড়াবে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদর করে দিবে একবার। যদিও এই বাড়ির কারো কাছেই করমচার আদর-কদর কোনোটাই নেই। অথচ জাহানারার মা ডালে ফোঁড়ন দেবার পর পাঁচ/ছয়টা করমচা দিয়ে ডালে বগল তুলে সেই ডাল দিয়ে দুই থালা ভাত খেয়ে ফেলা যেতো। এই বাড়িতে সেই ডাল রান্না করলে কেউ দাঁতে ভাত কাটবে না।

কিন্তু তাই বলে কি আর জাহানারার খাওয়া বন্ধ থাকবে? এক বাটি করমচা ছেঁচে ঘানিভাঙা সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ আর সরিষা বাটা দিয়ে ভর্তা বানাতে গিয়ে লবণ চেখে চেখেই ভর্তা অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে এসেছে জাহানারা। নিজের কাণ্ড দেখে ওর নিজেরই হাসি পায়। ছেলের বউকে হাসতে দেখে উঠানে দাঁড়ানো নিলুফারও হাসে অকারণ। পোয়াতী বউটা শখ করে টক ফল খায়। দেখেই বুকের ভেতর সুখ উথলে ওঠে। এই সময়টাই বেশ, যা দেখো হাসো আবার অল্প কিছুতেই কাঁদো। জাহানারাকে খুশি দেখে নিলুফার আবদার করে,
-ও বৌমা, চুলে তেল দিবি না আইজ? মাথাটা উকুনে কুটকুট কইরা খাইতাছে। মরার বিশটির লাইগাতো দাওয়ায় বহি না কয়দিন। ভত্তা খাওন শ্যাষ হইলে তেল আর উকুন মারা চিরুনিটা নিয়া কাছে আয়তো দেহি। অবেলায় অত টক খাইস না। ভাত খাইতে পারবি না।
- তোমার মাথা উকুনে খায় না গো মা। পাকা চুলের গোড়াত কুটকুট করে। আইতেছি খাড়াও। পাকা চুল বাইছা দিমুনে।
-খবরদার ছেমড়ি, আমার চুল পাকার কথা কইবি না! তোর তন ম্যালা চুল কালা আমার।
শাশুড়ির কথা শুনে জাহানারা হাসিতে ভেঙে পড়ে।
-হ মা। তুমি তো কচি লাউয়ের ডোগা! মন চায় কচকচ কইরা খাই।
-তোর মতো তো কচি শইল আমার! ছেড়ি মুরুব্বি মানে না, যা মন চায় কইয়া ফালায়!
নিলুফারের কপট ভর্ৎসনা শুনে জাহানারার হাসি আরো বাড়তে থাকে। হাসির দমকে হাতের তেলের শিশি ছলকে পরনের শাড়িতে খানিকটা তেল পড়ে যায়। তাই দেখে দুজনে আরো হাসে। যেনো এই বাড়িতে একমাত্র হাসিরই সুখরাজ্য।

জাহানারার স্বামী ফিরোজ মালয়েশিয়া থাকে। বিয়ের পাঁচ মাসের মধ্যেই ফিরোজকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে জাহানারার শ্বশুর আমোদ আলী। জাহানারার শাশুড়ি ওকে বলেছিল, এটা হলো আমোদ আলীর আরেকটা কূট চাল যাতে ওদের স্বামী-স্ত্রীর নৈকট্য আমোদ আলীকে অসহায় করে না ফেলে। আমোদ আলীর বিধি নিষেধের তর্জনী জাহানারাকে দিন দিন অতিষ্ট করে তুললেও স্বামীর ভিনদেশে থাকা ওকে খুব বেশি কাবু করতে পারেনি। বরং প্রাত্যহিক গৃহস্থালির কাজে ছোটাছুটির ব্যস্ততা আর রাতে ঘুম চেখে স্বামীর রুটিনমাফিক চাহিদা মেটাতে পাঁচ মাসেই জাহানারার হাপ ধরে গিয়েছিল। শরীরের সাথে মনের আকর্ষণের বিযুক্তি দুজনের সম্পর্কের কোনো ইতিবাচক শুরুর ইঙ্গিত বহন করতো না বলে ফিরোজের চলে যাওয়াতেও জাহানারার হাসির খলবলানি বন্ধ হয়নি।

তবে জাহানারার এই হাসি ঐশ্বর্যের আরেকটি কারণ হলো শাশুড়ি নিলুফার। প্রিয় সখীর মতো ছায়া সঙ্গী হয়ে যিনি জাহানারার দৈনন্দিন সময়টুকু তরঙ্গময় করে রেখেছেন। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দুপুরের তেজ মরবার পরের সময়টুকু এভাবেই বউ-শাশুড়ি দুজনে মিলে উপভোগ্য করে তুলছে। গল্পে, কথায়, বুকের ভালোবাসার তোরঙ্গ উপুড় করে দিচ্ছে।

২.
মাইকে নিজের নাম শুনে খুব আমোদ লাগে আমোদ আলীর। ওর নামের প্রতিধ্বনিতে কেমন গমগম করে চারপাশ। উপস্থাপক ছেলেটার গলা যেমন ভরাট তেমন দরাজ দিলে বিশেষণ ব্যবহার করেছে। যেসব শুনতেই আমোদ আলীর বুকের ছাতি প্রশস্ত হয়ে যায়। হয়তো সামনে অপেক্ষমান আমজনতাকেও সেই অনুভব স্পর্শ করে তাই বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মোহাম্মদ আমোদ আলীর নাম ঘোষণার সাথে সাথে অহংকারী করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।

আমোদ আলী বেশিক্ষণ বক্তৃতা দিতে পারেন না। উপস্থিত জনতা ধরে নেয় আবেগে তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর একটা সারসংক্ষেপ তিনি মুখস্থ করে রেখেছেন। তবে আজকাল ছেলেপেলে বড্ড বেশি প্রশ্ন করে। প্রশ্ন শোনার সমস্যা হলো, এক প্রশ্নের সাথে অন্য প্রশ্নের উৎপত্তি। আমোদ হাতে রাখা বাদামী ফাইলটা খুলে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নেন সনদটি। লেমিনেটেড সনদটি ফাইল থেকে কেমন ব্যঙ্গের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

যুদ্ধ দিনের বিশেষ বিশেষ বর্ণনা দিতে যেয়ে আজ তার গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে। বার বার শব্দবিচ্যুতি ঘটছে। মুক্তিযুদ্ধের বদলে গণ্ডগোল শব্দটা তার জিবের ডগায় এসে গণ্ডগোল পাকাচ্ছে। তবে ফজরের ওয়াক্তেই তিনি বেশ বুঝেছিলেন, দিনটা তার জন্য ভাল হবে না। সকালটা ভাল করে শুরু হয়নি তার। সাতসকালে জাহানারার চোখদুটো কেমন রক্তজবার মতো লাগছিল। তবে এ আর নতুন কী! আমোদ আলীর কোনো মিটিঙের খবর পেলেই জাহানারার চোখজোড়ায় রক্ত এসে জমা হয়।

কিন্তু জাহানারার রক্তচক্ষু ছাপিয়ে আজ ইতিহাসের নির্মাণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বয়স হচ্ছে তো, আজকাল অনেক কিছুই মনে থাকে না। এইতো আরেকটু হলেই বিশাল একটা ভুল হয়ে যেতো। গ্রামবদলের মতো ব্রিজের নামটাও মুলিপাড়া থেকে কুলিপাড়া হয়ে যাচ্ছিল। আমোদ চারপাশে তাকিয়ে কি যেন খোঁজে। সামনের পরিচিত, অর্ধপরিচিত, অচেনা মুখগুলোর ইতিবাচক দৃষ্টির সামনে নিজেকে তার অসহায় লাগে। আমোদ টের পায় ঝিরিঝিরি বাতাসে স্মৃতির অণুর ভাসে না, ভাসে শুধু ছলচাতুরির শব্দগুচ্ছ।

দূর আকাশে কয়েকটি শকুন উড়ছে উদ্দেশ্যহীন। দুপুরের লাজলজ্জাহীন আলোতে ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ। নিজেকে সামলে নিয়ে আমোদ বলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। এইবার সব কথার ফুল ওর বুকপকেটে। মাঝে মাঝে গলা কাঁপে। ওঠানামা করে আবেগের তরঙ্গ। এসব ওঠা নামা রপ্ত করেছে বহুবছর হলো।

ইতিহাসের সাক্ষী থাকে নাকি বয়সী চুল আর বটের দীর্ঘছায়া। নদীর গতিপথেও নাকি মেখে থাকে ইতিহাসের রঙ। আমোদ এইসব মানে না। আমোদ জানে কুহকের ছন্দে কি করে ইতিহাস রচনা করতে হয়। দুপুরের তপ্ত বাতাস আমোদের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। আর সে আরো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। একসময় স্তোত্রপাঠ শেষ হয়। সম্মাননা স্মারক আর গলায় ফুলের মালা নিয়ে আমোদ স্টেজ থেকে নামে। পিছনে এক মিছিল প্রতারিত মানুষকে ফেলে আমোদ এগিয়ে চলে। সাথে চলে কয়েকজন অন্ধ অনুগামী।

সরষে খেত ঘেঁষে আমোদ হাঁটে। পাকুরিয়া ময়দান থেকে তার বাড়ি দুই কিলো হাঁটা রাস্তা। দুটো ছেলে ছাতা ধরে আমোদের পাশাপাশি হাঁটে। এদের সাথে আমোদের কথোপকথন বড় সাবধানী। আজকাল এত সতর্কতা ভাল লাগে না। বয়স বাহাত্তর ছুঁয়েছে। স্থানবদলে খানিক নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। কিন্তু গ্রামের প্রভাব প্রতিপত্তি রেখে শহরে যেতেও মন টানে না আর। ছেলেটাকে বিদেশ পাঠিয়ে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেও, ছেলে বউ জাহানারার বেয়াড়াপনা আজকাল সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাড়িতে পা দিলেই দেখা যায় পর্দাপুশিদার বালাই নাই, মাথার কাপড় নাই। এক একজন বাজারি মেয়েমানুষের মতো হাসিতে ঢলে ঢলে পড়ছে। আমোদ আলী খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।

খেতের ভেতর থেকে ঘুঘুর আর্তনাদ শোনা যায়। রাখাল বালকের পেতে রাখা ফাঁদে থেকে আসছে সেই করুণ সুর। রোজ ভোরে খেতে নামে ঘুঘু। ফাঁদে অসর্তক পা ফেলার সাথে সাথে জালবন্দী হয়ে যায় দু একটি পাখি। আমোদ দূরে তাকায়। দুষ্ট রাখাল বালকের ফন্দি আঁচ করতে পেরে সরলরেখায় উড়ে বেড়াচ্ছে পরিযায়ী পাখির দল। ঐ যে দূরে রুপালি-ধূসর ডানার রুপাচিল। খেতের কোল ঘেঁষে বারকতক খেলনা বিমানের মতো শো শো করে উড়ে যায়, তবু হলদে জমিনের লোভে পড়ে না। পাখিটা ফাঁদে পা দেয় না। বেঁচে যায়।

কী শান্তি! কী শান্তি! আমোদের মন বিস্তীর্ণ প্রশান্তিতে ভেসে যায়।

৩.
ফুলেরা যখন পরিণতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে তখন তাদের যেমন মলিন ও বিধ্বস্ত দেখায় জাহানারাকেও তেমন দেখাচ্ছে। আমোদ আলীর তবু দয়া হয় না জাহানারাকে দেখে। বরং জাহানারার মলিন জবুথবু মুখটা দেখে ওর মনে জ্বলে ওঠে আগুনের ফুলকি। এবার আমোদ এমন ভাবে জাহানারাকে মারে যেন জাহানারার কোনো শরীর নেই। চ্যালা কাঠটির ক্রমাগত আবর্তনে জাহানারার মাঝবয়সী শরীরে দাগ বসে যায় তবু যেন ব্যথা লাগে না। জাহানারার স্তব্ধতায় মনে হয় তার জাগতিক বোধসমূহ হওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। তবু ধরা দিচ্ছে না জাহানারা। একটিবারের জন্যও সৃষ্টিকর্তাকে বা আমোদকে বলছে না, আমাকে ছাড়েন! রহম করেন!

আমোদ আলী আর জাহানারার চোখের দৃষ্টিতে আগুন ঘোরপাক খায়। সেই সাথে দুটি মানুষের বিপরীতমুখী অন্তর্জগত আর বর্হিজগতের ইতিহাস মুদ্রিত হতে থাকে বাতাসের সমুদ্রে। সেই সমুদ্রের ঢেউ আচমকা আছড়ে পড়ে জাহানারার মুখে, চোখে, চিবুকে। জাহানারা এবার ফুসে ওঠে।
-ওই হারামি!
জাহানারার স্পর্ধা দেখে আমোদ আলীর ইচ্ছে হয় আরেকটা চ্যালা কাঠ ভাঙে বেটির শরীরে, বেপদ্দা, বেলেহাজ! আকাইম্মা মাগী! কিন্তু আমোদের দু’হাত সক্রিয় হওয়ার আগেই নিলুফারের দুই হাত তার পা জড়িয়ে ধরে,
-বৌমারে ছাইড়া দ্যান। আমরা থাকুম না। এই ভিটা ছাইড়া বৌমারে লইয়া যামুগা। নরম শরীর, ম্যায়াডা বাঁচবো না। এমনেই ছাওয়ালডা দুনিয়ায় আইসাও মইরা গেল। সেই শোকে ম্যায়াডার মাথার ঠিক নাই।
আমোদ আলী গর্জে ওঠে,
-যা মাগী....তুই যা। তোর বৌমারে আমি এহানেই পুতমু। পাড়ার পোলাগো লগে গুজুর গুজুর। আমারে ইতিহাস শিখায়! সাম্বাদিক শিখায়!
হঠাৎ জাহানারার কি হয়। হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ায়। যেন খুব জরুরি কিছু একটা মনে পড়েছে। এক ছুটে জাহানারা রান্নাঘরে যায়। বটি হাতে রক্তচোখে জাহানারা গর্জে ওঠে,
-মা কোনোখানে যাইবো না, আমিও যামু না। তুই যাবি রাজাকার, বেজন্মার বাচ্চা। তোর চক্ষু দুইটা খুইল্লা ফালামু আজ। হারামি। রাজাকার!

জাহানারা ক্রমাগত জগতের সব নোংরা শব্দের বিশুদ্ধ ব্যবহার করতে থাকে। সেই শব্দযজ্ঞে বিপন্ন আমোদ পালাবার পথ পায় না। বাতাসের ঘূর্নিতে শব্দ গুচ্ছ পাক খেতে থাকে। আর আমোদ আলীকে সেই ঘূর্নি থেকে বের হবার পথ করে দেয় না। অদূরে দাঁড়ানো নিলুফার থরথর করে কাঁপে। ভয়ে। আশংকায়। জাহানারার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আমোদ। দুই পা ধরতে খানিক ইতস্ততঃ করে আবার হাত বাড়ায়। জাহানারার হাতে ধরা বটিতে রোদের আলো পিছলে যায়।
-রাজাকারের বাচ্চা! মুক্তিযোদ্ধা হইছস! ভেক ধরস। আইজ তোর ভেক ছুটামু। হারামি রাজাকার!

শরীরের সব ঘৃণা নিংড়ে জাহানারা গালি দিতে থাকে। গালির পুনরাবৃত্তিতে শব্দটার অন্তর্গত ঘৃণা যেন ওর মস্তিস্কের গোপন কুঠুরিতে বিরতীহীন আঘাত করতে থাকে। এই জাহানারা যেন সবার অচেনা। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আসন্ন প্রেক্ষাপটের ভয়াবহতা যেন তার কাছে দৃশ্যমান হয়ে যায়। দুনিয়াদারির ঝাপসা আবছায়া থেকে যেন টেনে হিঁচড়ে ইতিহাস বের করে আনবে জাহানারা। বাতাসের ছুরিতে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিবে আমোদের নিজ হাতে তৈরি ইতিহাস।
-হারামি রাজাকার, গেরামথন পলাইয়া গেছিলি। মুক্তিগো দাবড়ানি খাইয়া ঠ্যাং ভাঙছোস! এহন ন্যাতা হইছোস রাজাকারের রাজাকার!
হঠাৎ থেমে যায় জাহানারা। যেন বিদ্যুত চলে যাওয়ায় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। চারপাশ সুনসান। আঁচলের খুট থেকে চাবির গোছা বের করে জাহানারা ভেতর ঘরে পা বাড়ায়। নিলুফার চমকে পিছু ডাকে, জানারা, জানারা! কিন্তু সেই নিস্প্রাণ কণ্ঠস্বর দ্রুত বাতাসে হারিয়ে যায়। আমোদের দিশেহারা লাগে। কী হলো! কী হবে! জাহানারার এই রূপ আমোদ, নিলুফার কখনো দেখেনি। পাকঘর আর কলঘরের বৃত্ত ডিঙিয়ে নিলুফার কখনো দু’পা সামনে দেয়নি। গ্রীবা উঁচু করে কথা বলেনি আমোদের সাথে। এত বছরের সংসার জীবনে নিলুফারের সমান্তরাল আচরণের বিপরীত প্রতিমূর্তি আজ আমোদের সামনে দাঁড়ানো।

আমোদ আলীর পা সরে না। ঘরের ভেতরের রহস্যময়তা ভাঙার কোনো তোড়জোড় দেখা যায় না তার মধ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহানারা বের হয়ে আসে। এলোকেশে জাহানারাকে ঝড়ের মতো দেখায়। ওর হাতের সবুজ রঙের ফাইলটি দেখে আমোদ আলী গর্জে ওঠার শেষ চেষ্টা করে। ফাইলের ভেতরে কত সযতনে রাখা আমোদের লেমিনেটেড সনদ।

ফাইলটি নিয়ে জাহানারা চুলার পাড়ে যেয়ে বসে। ওর চোখে মুখে কোমল অহংকার। বোধ বিলুপ্ত আমোদ মুহুর্তেই বুঝে যায় কি ঘটছে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে হয় ছুটে যায়। কিন্তু কী অদ্ভুত ভাবে আমোদের দুই পা চোরাবালিতে গেঁথে যায়। কুলকিনারাহীন বিহ্বলতায় আমোদ শক্তিহীন ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। তবু শেষ চেষ্টা করে সে। এবার ছুটে যাওয়ার বদলে হাঁটার চেষ্টা করে আমোদ। কিন্তু ততক্ষণে ধানের সবুজ ঘ্রাণে একাকার ফসলী মাঠের সুবাসের সাথে বাতাসের ঘূর্ণিতে নিবিড় ভাবে প্লাস্টিক পোড়া গন্ধ জুড়ে যায়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন