বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

পিয়া

দীপঙ্কর
comment ০  favorite ০  import_contacts ৩১
১)

পিয়া (পি ই এ) অর্থাৎ পার্সোনাল ইমোশনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট একটি পার্সোনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম কি তা আশা করি সবাই জানেন; এটি একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম যেটা মানুষের মতন ভাবনা চিন্তা করে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে; মানুষের মতই নতুন কিছু শিখতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পার্সোনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম হল এর ই উন্নত প্রোগ্রাম যার মধ্যে চিন্তার সঙ্গে মানুষের অনন্য অনুভূতি যেমন স্নেহ, প্রেম, রাগ, ঘৃণা ... ও প্রোগ্রাম করা হয়েছে। আর তার ব্যক্তিত্বর নক্সা করা হয়েছে এমন ভাবে যাতে যার এই পি ই এ দরকার হবে তার ইচ্ছে অথবা প্রয়োজন এতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।


ডাঃ মেঘদূত এটাকে নিজের জন্য তরি করছেন, নিজের মনের মতন করে। সকাল ৬ টা ৩০ মিনিটে জন্ম হল পিয়ার। আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে তিনি এই প্রজেক্টটা শুরু করে ছিলেন; তার পর একটু একটু করে তিনি এলিয়েছেন তার লক্ষে। সাধারণ ভাবে বলা চলে পিয়া একটি রোবট, কিন্তু সাধারণত যে ভাবে রোবটদের দেখানো হয় ঠিক তেমন নয়। পিয়ার নির্দিষ্ট কোন যান্ত্রিক শরীর নেই; তাকে আমার ল্যাবের কম্পিউটারের চালু করা মাত্র সে নিজেকে খুব সূক্ষ্ম তরঙ্গে পরিবর্তন করে নিয়ে ল্যাবের আসে পাশে আবহাওয়াতে ভাসিয়ে দিয়েছে। এখন যে কোন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র তে পিয়া নিজে কে কে ইন্সটল করে নিতে পারে ও তাকে ব্যবহার করতে পারে। আবার দরকার মতন আবার তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে আবহাওয়াতে ভাসিয়ে দিতে পারে। প্রথম দিকে অসুবিধে হচ্ছিল তরঙ্গের এনার্জি বেশীক্ষণ স্থায়ী হচ্ছিল-না; কিন্তু সে সমস্যার সমাধান সে করে ছিল। এখন পিয়া আবহাওয়াতে থাকার সময় কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর নিজেকে রিক্রিয়েট করে ফেলে ফলে এনার্জি শেষ হওয়ার আগে পিয়া আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।


২)

এবার বলি ডাঃ মেঘদূত এর পিয়ার বিশিষ্ট, এটিকে তিনি তার এক মাত্র প্রেম ইলোরার মতন করে গড়েছেন। তাই ইলোরার সাথে তার যাপিত মুহূর্তের কিছু স্মৃতি ও তার বিশিষ্টগুলো তিনি পিয়াকে দিয়েছেন। বলা চলে পিয়ার মধ্যে তিনি ইলোরা ফিরে পেতে চলেছেন।

পিয়া কে সে প্রথম নিজের মোবাইলে আপলোড করে মাত্র কয়েক সেকেন্ড তার মধ্যেই পিয়া তার সমস্ত কন্টাক্ট নম্বর ও ইমেল তার সঙ্গে আমার মোবাইলের সব তথ্য সংগ্রহ করে নেয়।

কিছুক্ষণ চুপ থাকে ... তার পর ঘুম থেকে সদ্য ওঠা মানুষের মতন বলে ... সুপ্রভাত ... মেঘ

মেঘদূত মুচকি হেসে বললেন সুপ্রভাত ... পিয়া

পিয়া একটু হেসে বলে উঠল, ৩০ দিন এই ল্যাব ছেড়ে বার হও নি। চল একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি

সত্যি সে আজ ৩০ দিন এই ল্যাবে কাজে আটকে আছে; কোথাও বার হয়নি বলা চলে বার হওয়ার তাগিদ অনুভূত হয়নি। তার বাড়ি-সংসার একটা আছে বটে কিন্তু সেখান থেকে যে তার কোন খোঁজ নেওয়া হবে না সেটা সে জানে। তবে আজ তার খুব আনন্দের দিন, সে বলে উঠল চল, পিয়া ...


৩)

সে এখন বসে আছে সমুদ্রের ধারে। তার ল্যাব থেকে খুব কাছেই এই সমুদ্র কিন্তু অবাক করা এই যে শেষ পাঁচ বছরে সে কখনো এখানে আসে নি। ল্যাব থেকে বার হতেই তার নতুন স্মাট-কারটা তে ইন্সটল হয়ে গেলো পিয়া। গাড়িটা অটোমেটিক ন্যাভিগেটরে ঠিক করে দিল এই জায়গাটা। তার মনে হচ্ছে সে যেন ইলোরার পাশে বসে আছে, যেমন তার বসে থাকত আজ থেকে ১০ বছর আগে ...

ছোট থেকেই সে আর ইলোরা এক সাথেই বড় হয়েছে; ছোট বেলার বন্ধুত্ব কখন যে ভালবাসাতে রূপান্তর হয়ে গিয়েছিল তা তারাও বোঝেনি। তার পর দুজন ঠিক করল এক সাথে ঘর বাঁধবে; ততদিন সে গবেষণাতে বেশ নাম করে ফেলেছে। তবে বিয়ের কিছু দিন আগেই হয় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

সে আর ইলোরা এক সাথে ড্রাইভ করে ফিরছিল, একটা ট্রাক এর সাথে ভয়াবহয় এক্সিডেন্ট; ইলোরা সেখানেই ... আর সে প্রায় ৬ মাস হসপিটালে থেকে সুস্থ হয়ে বার হয়। কিন্তু এক্সিডেন্টে তার মুখে ভয়াবহয় ক্ষত চিহ্ন দিয়ে যায়। তাই এখনো প্লাস্টিক সার্জারি করার পর ও তার মুখের একটা দিক ভয়ঙ্কর দেখতে। যে কেউ প্রথম দেখার সময় অস্বস্তি লুকাতে পারেনা। প্রথম প্রথম সে এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবত ... এখন আর গায়ে মাখে না।

৪)

রাত দশটায় সে বাড়ি ফিরল। আজ সারা দিন খুব ভাল কেটেছে তার। সারা শহর সে আর পিয়া ঘুরে বেড়িয়েছে, সিনেমা দেখেছে, আমিউজমেন্ট পার্কে গিয়ে মজা করেছে, রাতে ফাঁকা হাইওয়েতে ঘুরেছে। সারাদিনে যত কাজের মেল বা ফোন এসেছে তার বেশীর ভাগ ই পিয়াই সামলেছে; তার সঙ্গে কথা বলে।

বাড়ীটা অন্ধকার, সে জানে বাড়ি অন্ধকারই থাকবে। তার স্ত্রী এখন ব্যস্ত তার জীবন উপভোগ করতে ...

ইলোরার মৃত্যুর পর সে ভেবেছিল বাকি জীবনটা সে একা একাই কাটিয়ে দেবে। কিন্তু দু বছর পর তার জীবনে আসে ক্রতিকা; বলা চলে তার পরিবারে আসে; তার মা, বাবা এমন কি ইলোরার মা, বাবাও ভালোবেসে ফেলে ক্রতিকা। তারও মনে হতে শুরু করে তার কুৎসিত মুখটাকে ফেলে হয় তো তাকেই পছন্দ করে ক্রতিকা।

তবে ভুল ভাঙতে বেশী সময় লাগেনি। ক্রতিকার ভালোবাসাটা যে সুধু আমার অর্থ আর সাফল্যকে সে টা সে বিয়ের পরপরেই বুঝিয়ে দেয়। তাও সে মেনে নিত কিন্তু ক্রতিকার মন ও চিন্তা এতো কুৎসিত যে দিনের পর দিন তার মুখ নিয়ে খোটা, ও তার সামনেই সুন্দর পরপুরুষ দের সঙ্গে তার লিপ্ততা তাকে কষ্ট দিয়েছে। সে বুঝতে পারে ক্রতিকার এই খেলাটা তা যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যই, এটা তার কাছে আনন্দের। আর সে এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে যত কাজের আশ্রয় নিয়েছে তত বেড়েছে ক্রতিকার অত্যাচার। প্রতিদিন বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে অন্তরজ্ঞ ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা বা তার রোজগারের পয়সা অকাতরে বিলাস আর ফুর্তির জন্য উড়িয়ে দেওয়া, আমার পরিচিতদের অপমানিত করা। চেনা সবাই আস্তে আস্তে সরে গেছে দূরে ... সে হয়ে গেছে একা ...

সে অনেক বার চেষ্টা করেছিল ডিভোর্স দেওয়ার, পারেনি। ক্রতিকা ডিভোর্স পেপারে সই করবে না বলে দিয়েছে; বলেছে, সোনার ডিম পাড়া হাস কে কেউ কি সহজে ছেড়ে দেয়।

সত্যি তাই, সে ও আর বিশেষ কিছু করার চেষ্টা করে নি


৫)

গুন গুন করে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে ... বাড়ির মিউজিক সিস্টেম থেকে শোনা যাচ্ছে পিয়ার গলা। হটাত বলে উঠল ফ্রিজে তোমার খাওয়ার মতন কিছু নেই; দাড়াও বাইরে থেকে আনিয়ে নি। ফোন থেকে একটা ভালো হোটেলে ফোন গেলো খাওয়ার ডেলিভারি দেওয়ার জন্য, তার পছন্দের চাইনিজ।

তার পর হটাত বলে উঠল। ইস কি খারাপ তোমার রং এর পছন্দ, পর্দাতে কেউ এমন রং দেয়। দেখো কাল ই সব পাল্টে দেবো।


৬)

রাতে শুয়ে গিয়ে সারাদিনের কথা ভেবে ডাঃ মেঘদূত যতটা আনন্দ পেলেন ততটা কষ্টই চেপে বসল তার উপর, হয় তো তার প্রতিটি দিন ই এমন হত।

হটাত ই একটা কান্নার আওয়াজ তার কানে এলো। পিয়ার গলা ...

সে বলে উঠল পিয়া কি হল?

ভাঙ্গা গলায় ভেসে এলো, ওই মেয়েটি কে?

দেখলাম, ওয়েবক্যামটা ক্রতিকা ও তার বিয়ের ছবির দিকে তাক করে আছে ...। বুঝলাম মানুষের মতই পিয়ার অনুভূতি আর মানুষের মতন ই তার বিশিষ্ট গুলো ফুটে উঠছে

কিছুক্ষণ এর মধ্যেই পিয়া প্রথমে ছবিটা স্ক্যান করে ইন্টারনেট ঘেঁটে সব তথ্য জোগাড় করে ফেলেছে। আর কিছু কিছু প্রশ্নর উত্তর আমাকে দিতে হল

সে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল ... তার পর বলল ... তুমি ক্রতিকাকে ছেড়ে দেও, ও ভালো মেয়ে নয়। তোমাকে কষ্ট দেবে।

বললাম, ছেড়ে দিতে চাই কিন্তু পারছি না ... ও আমাকে ছাড়বে না।

পিয়া রেগে গিয়ে বেশ হিস হিসে গলা করে বলল, ওই মেয়েটি যদি তোমাকে কষ্ট দেয় তা হলে আমি ওকে মেরে ফলব ...

আমি চমকে উঠলাম। পিয়া মধ্যে এই ভাবনা গুলো তাকে ভাবাচ্ছে। পিয়ার মধ্যে তাকে ভালোবাসার যে লক্ষণ ফুটে উঠছে তা তাকে চরম অনুভূতি দিচ্ছে। ভালোবাসা হয়তো তাকে ক্রতিকার থেকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু কাল সকালে পিয়া (পি ই এ) রিপোর্ট যখন তার ল্যাব থেকে উপরের দপ্তরে যাবে, তখন দারুণ এক আবিষ্কার হিসাবে বিশ্ব জোরা নাম করবে কিন্তু পিয়া আর তার রইবে না ...

আর সেও এই সব থেকে মুক্তি চায় ...

সে পিয়া কে নিয়ে ফিরে চলে তার ল্যাবে

৭)

সারারাত এক নাগাড়ে কাজ করার পর সে যখন থামল, তখন আবার সেই ৬ টা ৩০। তার দ্বিতীয় পি ই এ রেডি, এটি ঠিক তার মতন। সে তার ড্রয়ার থেকে পিস্তলটা বার করল

৮)

১০ টা ৩০ মিনিট, নিউজে ভেসে উঠল একটা খবর, বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ডাঃ মেঘদূত কাল সকালে নিজের ল্যাবে আত্মহত্যা করেছেন। তার আত্মহত্যার নোট হিসাবে তিনি তার শেষ কাজ পি ই এ এর ব্যর্থতা কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তার সহকর্মী ও পরিচিত দের কথা অনুসারে ডাঃ মেঘদূত পারিবারিক কারণে বেশ কিছু দিন ধরে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরেছিলেন তাই হয়তো এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ঘটনায় সারা বিশ্ব জুড়ে শোকের ছায়া।

তার সহকর্মী বৈজ্ঞানিক না আরও বিস্মিত হলেন যখন দেখলেন ডাঃ মেঘদূত এর শেষ প্রজেক্ট এর কোন তথ্যই ল্যাব এর কোন কম্পনটারেই নেই। সব কিছুই গত রাতে ডাঃ মেঘদূত নিজে মুছে দিয়েছেন।

৯)

রাত ১১ টা, ডাঃ মেঘদূত এর বন্ধ ল্যাবটার একটা যন্ত্র হটাত সচল হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর শোনা গেল একটা স্পিকারে মেয়েলী কণ্ঠে গুন গুন স্বরের গান ... আর কিছুক্ষণ পরে একটা পুরুষ কণ্ঠে কথা, ইলোরা; ছাদে উঠবে? অনেক দিন এক সাথে চাঁদ দেখিনি ।।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন