বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৩.২৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

গল্প - ভৌতিক (সেপ্টেম্বর ২০১৭)

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.২৫ আমি অন্তত পাগল বলতে রাজি নই

দীপঙ্কর
comment ৪  favorite ০  import_contacts ১০৭
- আচ্ছা তুমি কি ভুতে বিশ্বাস কর?
- বিজ্ঞানের যুগে দাড়িয়ে প্রশ্নটা রীতিমতো অপ্রাসঙ্গিকই নয় অবান্তরও বটে। শহরে আজকাল আর কেউ ভুতের আলোচনা করে না; বিশেষ করে ২৫/২৬ বছর বয়সী কোন ছেলে তো নয়ই। কিন্তু কুণাল কে আমি চিনি, আমার থেকে বয়সে একটু ছোট। কিন্তু সে যে এমন একটা কথা বলবে তা আমি আশা করিনি। আমাদের কথাবার্তা সাধারণত আধুনিক গেজেট, সিনেমা বা ফুটবল নিয়েই হয় তার বাইরে আজ এমন একটা প্রশ্ন শুনে আমি একটু অবাকই হয়ে ছিলাম। এক বার ভাবলাম জিগ্যেস করি গাজা-টাজা খেয়েছে কিনা? কিন্তু কুণালের মুখের দিকে তাকিয়ে তার আর প্রয়োজন হল না। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমিও খানিকটা হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম, কিছুক্ষণ। তার পর একটু জোরেই জানতে চাইলাম কি হয়েছে বলবি?
কুণাল কিছু বলল না; বরং বলল, আজ আসি পরে একদিন বলব।
আমাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো।

এর পরের ঘটনাটা ঘটল ঠিক এক সপ্তাহ পর। পাঁচ দিনের অফিস-টুর থেকে ফিরে সবে ঘরে ঢুকতেই এলো ফোনটা, বলল কুণাল নামে কাউকে চিনি কি না? হ্যাঁ বলতেই, ওপার থেকে বলে উঠল কুণালের বাড়িতে একবার দেখা করতে। কারণ জানতে চাইলে বলল, কুণাল আজ তিন দিন থেকে মিসিং। খানিকটা অবাক হয়েই, সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাম কুণালের বাড়িতে। গিয়ে দেখলাম পুলিশ; সংক্ষেপে বুঝতে পাড়লাম যে গত তিনদিন আগে কুণাল সন্ধের সময় বাড়ি থেকে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি বলে বাড়ি থেকে বার হয়ে আর ফেরেনি। বাড়ির লোক বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন সব খোঁজ নিয়ে দেখেছে, শেষে গত কাল সকালে পুলিশের কাছে যায়। আমার নাম্বারে ওরা কল করেছিল পায়নি। হ্যাঁ আমাকে ফোনে না পাওয়ার অবশ্য কারণ আছে, গত তিনদিন ধরে আমার মোবাইলটা মৃত। আর বাড়ির ফোন ধরার মতন কেউ ছিল না। বেশ কিছু রুটিন প্রশ্ন করার পর পুলিশের কাছ থেকে আমার ছুটি হল, সাত দিন আগের আমার ঘরে বসে কুণালের সেই কথা গুলো বললাম পুলিশকে। তবে তারা খুব একটা গুরুত্ব দিলো বলে মনে হল না। কুণালের বাবা-মা খুব ভেঙ্গে পড়েছেন; আমাকে বারবার করে বললেন আমি যদি পারি তা হলে যেন একটু খোঁজখবর করি। ওখানে থেকে বার হয়ে কাজ কর্ম মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেলো অনেক। খাওয়াদাওয়া করে করে একটু বই নিয়ে বসব, দেখলাম বাইরে বৃষ্টি নামল। হটাতই আবার কুণালের কথা মনে এলো, সাতদিন আগে এই চেয়ারেই বসে ছিল আর আজ কোন খোঁজ নেই। কি যে হলও ছেলেটার। কুণালের সাথে পরিচয় তিন বছর আগে। সে ডকুমেন্টরই ফিল্ম তরি করে, বেশ নামডাক আছে এ লাইনে। আমি তখন গ্রাম বাংলার প্রাচীন খেলা নিয়ে রিসার্চ করছিলাম, সেই সম্বন্ধে একটা ডকুমেন্টরই ফিল্ম বানিয়েছিল কুণাল। কি যে হল বড় আশ্চর্য লাগছে। হটাতই টেবিলের কোণায় একটা ডাইরি দেখে চমকে উঠলাম। এটা তো আমার নয়, কে ফেলে গেলো! হাতে নিয়ে ডাইরির প্রথম পাতা উল্টাতেই দেখতে পেলাম বড় হরফে লেখা "কুণাল বসু"।
তা হলে সেই দিন কুণালই ফেলে গেছে। এটা কি কুণালের মিসিং এর কোন প্রমাণ হতে পার? হতে পারে; কাল সকালেই পুলিশর হাতে এটা তুলে দিতে হবে। ডাইরিটা নামিয়ে রাখতে গিয়েও আবার তুলে নিলাম। বড় খচ খচ করছে মনটা, মনে হচ্ছে বেশ কিছু তথ্য জানা যেতে পারে এটা থেকে, একবার পড়ে ফেলি। অন্যের ডাইরি পড়াটা খুব একটা সম্মানের কাজ না; কিন্তু এই বিপদের দিনে, ডাইরির পাতা উলটে ফেললাম আজ ২০ তারিখ আমার কাছে এসেছিল ১৪ তারিখ। ডাইরিটা বেশ ফাঁকা মাঝে মাঝে কিছু লেখা। দেখলাম ২ থেকে ১৩ তারিখ অবধি টানা লেখা আছে, ওখান থেকেই শুরু করা যাক।

তারিখ -২, শুনাপাহাড়ি থেকে ফিরে সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে। শুটিং পুরোটা শেষ, এবার এডিটিং এ বসতে হবে। ডেড লাইন খুব কাছে চলে এসেছে। আমারদের বাড়িতে একটা রুম আছে যেখানে প্রাথমিক কাজ গুলো করা যায়। ওটা শেষে হলে প্রশান্তর সাথে স্টুডিয়োতে বসতে হবে। মোহনদা বার বার বলে দিয়েছে ফিল্ম যেন ৩৫ মিনিটের বেশী না হয়। আমাদের শুটিং আছে ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট, বেশ অনেকটাই এডিট করতে হবে।

তারিখ -৩, রাত এগোরাটা, পুরো রেকর্ডিঙটা বেশ কয়েকবার দেখলাম। প্রথম শুনাপাহাড়ির নাম শুনে ছিলাম মোহনদার কাছে, তিনি একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চালান। আমার কাছে এসে ছিলেন শুনাপাহাড়ি নিয়ে একটা ডকুমেন্টরই ফিল্ম তৈরির করানোর জন্য। কিন্তু কি আছে শুনাপাহাড়িতে জানতে চাইতেই মোহনদা বললেন,
- কলিয়ারি এলাকা, চারিদিকে শুধু পরিত্যক্ত খাদনের পর খাদন। অনেক আগে এই সব কয়লাখনি থেকে কয়লা তোলার কাজ হত তাই মাটির নিচে অনেক সুড়ঙ্গ কাটা হয়েছে, আর এখনো খনন চলেছে বেআইনি ভাবে। বেশ কিছু বছর আগে এই খাদনে আগুন লাগে, আর সেই আগুন সেই ভয়াবহয় আকার ধারণ করেছে। চারিদিকে ধোঁয়া আর আর ধস। কোথায় যে ধস নামবে তা কেউ জানে না; সেই ধসে জমি, বাড়ি, খেত, পশু, মানুষ কোনকিছু কেই রেহাই দিচ্ছে না। পাতালের আগুন কাকে কখন গিলে নেবে তা কেউ জানে না।
একটা আস্ত জনপদ কি ভাবে জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে তা শুনে খুব খারাপ লেগে ছিল কুণালের। সে ঠিক করেছিল তার ফিল্ম এর মাধ্যমেই সবার সামনে এই সমস্যার কথা তুলে ধরবে।

শুনাপাহাড়িতে এসেছে সে আর প্রশান্ত; প্রশান্ত তার সহকারী। প্রধান ক্যমেরাটা প্রশান্তই হ্যন্ডেল করে, প্রয়োজনে বা খুব ক্রিটিক্যাল কিছু শুট করতে হলে সে করে। তা ছাড়া তার একটা নিজস্ব ছোট হ্যান্ডিক্যাম আছে সেটা নিয়ে সে সুবিধা-মতন শুটিং করে। প্রশান্ত বলে উঠল
- কি কুণালদা, কাউকে তো দেখছি না। কে নিতে আসবে?
কুণাল ভাল করে চারিদিক দেখে নিলো। রুক্ষ অঞ্চল, চারি দিকে বেশ উঁচু উঁচু ঢিপি, পাথরে রঙ এ চারিদিকে ঢাকা, বাতাসে পোড়া পোড়া গন্ধ। সবুজ মাঠ ঘাট থেকে এসে এই আধা রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চল তার ভালই লাগছে। সে বলে উঠল
- হুম। মোহনদা তো বলে ছিল, তার সংস্থারই কেউ আসবে নিতে; এই অঞ্চলের লোক। দাড়া ফোন করে দেখি; ফোনটা নিয়ে ডায়াল করতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে একটা আওয়াজ শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল
- আপনিই, কুণাল বাবু।
কুণাল ঘুরে দাড়িয়ে দেখল, একটা ২১/২২ বছরের মেয়ে। খুব সুন্দরী নয়, কিন্তু সুশ্রী, একটা ব্যক্তিত্ব আছে যা চোখে মুখে ধরা পরে। সে একটু হেসে বলল - আমি কুণাল, কিন্তু বাবু নই।
- মেয়েটি হেসে উঠে বলল; বেশ। আমার নাম সুহানা; মোহনদা পাঠিয়েছেন।
- বেশ সুহানা দেবী, চলুন কোথায় যেতে হবে।
- সুহানা বলে উঠল, চলুন। তবে আমি সুহানা, কিন্তু দেবী নই।
ষ্টেশনের বাইরে একটা গাড়ি রাখা, ওটাতেই উঠে পড়লাম আমরা তিন জন। বলল আমারা যেখানে যাচ্ছি সেখানে যেতে ২০ মিনিট লাগবে। গাড়ি চলতে শুরু করল। গাড়িতেই জানতে পাড়লাম যত দিন আমরা শুনাপাহাড়িতে আছি তত দিন আমারদের গাইড প্লাস হোস্ট হচ্ছে সুহানা। তাই দেরি না করে, কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলাম কিছু সাক্ষাৎকার নিতে হবে, অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আর বিশেষ কিছু লোক জনের, সঙ্গে যাদের বাড়ি ঘর এর ক্ষতি হয়েছে বা নিজের কেউ মারা গিয়েছেন। স্থানীয় সরকারী প্রধান ও রাজনৈতিক নেতার ও বক্তব্য লাগবে। দেখলাম সুহান সব নোট করে নিচ্ছে।
গাড়ি যত এগোতে লাগলো বাতাসে পোড়া ধোঁয়া বাড়তে লাগল। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। গাড়ির ভিতর থেকেই দেখা যাচ্ছিল কথাও কোথাও মাটির ফাটল আর সেখান থেকে গলগল করে বার হচ্ছে পোড়া ধোঁয়া। রাস্তার ধারেই বেশ কিছু ভাঙ্গা বাড়ি দেখতে পেল, বেশ কিছু বাড়ি তে চওড়া ফাটল। সুহানা জানাল যে বাড়িতে থাকব, আগে সেটা ছিল স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোয়াটার, ধসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তলিয়ে যায়। সরকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায় যদিও কোয়াটারটা এখানে আছে; বিশেষ কেউ থাকে না। তার বাবা এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মচারী, সবাই নতুন কোয়াটার চলে গেলেও তিনি যায়নি। ফাঁকা কোয়াটারের একটা তে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।

পৌঁছে বেড়িয়ে পড়লাম শুটিং করতে। দৃশ গুলো সত্যি ভয়াবহয়। চারিদিকে ফাটল আর আগুন। স্কুলবাড়ি টাতে কিছু ছাত্র দেখলাম পড়াশুনা করছে, দেওয়ালে ফাটল, কিছু দূরেই মাটিতে ধস আর ধোঁয়া। স্কুলে সবারই বেশ উৎসাহ নিয়ে তাদের কথা বলল, কারো বাড়ি মাটিতে গিলে নিয়েছে কারো পরিবার। একটি ছেলে জানালো সে, রাতে মা ও ছোট বোনের সাথে শুয়ে ছিল, মাঝ রাতে বাথরুম করতে বাইরে বার হয় ফিরে ফিরে এসে দেখে খাট শুদ্ধ তার মা ও বোন ধসে তলিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এ ও নিখোঁজ হয়ে যায়। বেশ কিছু শুট শেষ করে যখন ফিরলাম তখন বেশ সন্ধ্যে। সুহানা বিকেল অবধি আমাদের সঙ্গে ছিল তার পর এক রিকশাওয়ালা কে আমাদের সঙ্গে দিয়ে ফিরে গেছে। হাত মুখ ধুয়ে বেশ খিদে পেলে; ভাবলাম বার হয়ে দেখি আসে পাশে কোন হোটেল পাই কিনা। ঠিক তখনি সুহানা এসে হাজির, হাতে চা আর গরম তেলেভাজা। হেসে বলে উঠলাম
- আপনি বেশ মনের কথা বুঝতে পারেন। ঠিক এমনই চা আর তেলেভাজা চাইছিলাম।
- সুহানা হেসে উঠল। তার পর বলল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন না হলে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে; আর কাল থেকে খাওয়া দাওয়া আমাদের বাড়িতে।
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, আমাকে থামিয়ে দিয়েই বলল, বেশী দূর নয় ওই সামনেটাই আমাদের কোয়াটার। বাবা বার বার বলে দিয়েছেন, আপনারা এখানকার অতিথি তাই খাওয়া-দাওয়াটা যেন ওখানেই করি।
সেই শুরু তার পর চার পাঁচ দিন যে কি ভাবে কেটে গেলো বোঝাই গেলো না। আর যত সময় গেলো তত বেশী করে আমার আসে পাশের জায়গা দখল করতে লাগলো সুহানা। ওর এক ভাই আছে, শহরে থেকে পড়াশোনা করে। মা অনেক দিন মারা গেছে, এখানে সে আর তার বাবা থাকে। সে নিজে কলেজ শেষ করে এখন উচ্চশিক্ষার চেষ্টা করছে কিন্তু বাবা কে একা ফেলে দূরে কোথাও যেতে চায় না।
মাঝে একদিন আমাদের প্রধান ক্যামেরাটা বিগড়ে গেলো। যদিও আমাদের শুটিং প্রায় শেষ, আর সামান্য কিছু বাকি। সেটা আমার হ্যান্ডিক্যাম দিয়ে শেষ করে নেবো ভেবে, ক্যমেরা দিয়ে প্রশান্ত কে শহরে ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। শেষ দুটো দিন প্রায় ছুটির মেজাজেই কাটালাম, সুহানার সঙ্গে অনেক ঘুরলাম। খুব ছোট ছোট জিনিসেও বাঁচতে জানে মেয়েটা, আমার হ্যান্ডিক্যাম এর অনেকটা রেকর্ডিং সুহানা কে নিয়ে। সত্যি বলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল ফেরার দিন, যদিও দুই দিন পর সে শহরে আসবে একটা কাজে আর সেদিন আবার আমরা দেখা করবো ঠিক করলাম, তবুও ফেরার দিন মনটা কেমন করে উঠল। কাল আসবে সুহানা রাতে সে তার বন্ধুর সাথে হোস্টেলে থাকবে তার পরদিন কাজ মিটিয়ে আবার ফিরে যাবে। সুহানাকে স্টেশনে নিতে যাবে; আবার দেখা হবে ভেবেই বেশ ভালো লাগলো।

তারিখ -৫, সন্ধের সময় সুহানা এলো; ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলাম, রাজি হল না। বলল পরে একদিন সময় নিয়ে আসবে। অনেকটা সময় এক সাথে সুন্দর সময় কাটিয়ে, রাতে ডিনার করলাম একটা রেস্টুরেন্টে। বন্ধুর হোস্টেলে ছাড়ার সময় ওকে প্রপোজ করলাম, অন্ধকারেও বুঝলাম ওর চোখ দুটো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দুজনা অনেকক্ষণ দাড়িয়ে রইলাম, ওর তরফেও যে হ্যাঁ সেটাও বলল। শুধু ফেরার শেষ বলেছিল, তোমার জীবনে অন্য কোন মেয়ে নেই তো? আমি কিন্তু অন্য কাউকে তোমার জীবনে সহ্য করতে পারব না।

তারিখ -৬, আজ আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম। একটা বড় প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছি, একটা শর্ট-ফিল্ম এর সিরিজ তৈরির। কিছু মিটিং ছিল কাস্ট ও লোকেশন ঠিক করার। সুহানা আজ ফিরে গেলো, যদিও যাওয়ার সময় দেখা হয়নি কিন্তু বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হল। ঠিক হয়েছে শুনাপাহাড়ি নিয়ে আমার কাজটা শেষ হলে ওকেই প্রথম দেখাবো।

তারিখ -৭, প্রশান্তর শরীর খারাপ, একাই শুরু করলাম এডিটিং এর কাজ। টানা ৬/৭ ঘণ্টা কাজ করার পর, সুহানা কে ফোন করলাম, "পরিষেবা এরিয়ার বাইরে বলছে"। এখন বিকেল, সকালেই পৌঁছে যাওয়া উচিত সুহানার। সে ঠিক করল ফোনে না পেলে রাতে সুহানার বাড়ি তে ফোন করবে। আবার কাজে ফিরলাম, এবার হ্যন্ডিক্যমটা নিয়ে নিয়ে। তবে কাজের চেয়ে বেশী সুহানার ক্লিপিং গুলই দেখছিলাম। হটাত নাকে পোড়া কিছুর গন্ধে চমকে উঠল সে; মনে হল যেন শুনাপাহাড়িতে পৌঁছে গেছে, চোখে জ্বালা জ্বালা করছে। তারপরই মনে হল আগুন লাগেনি তো কোথাও? দ্রুত আলো জ্বালিয় ভালো করে দেখলাম, ঘরের জানালা দরজা খুলে দিলাম কিন্তু পুরো ঘরটা ধোঁয়াতে ভরে আছে কিন্তু কোথাও আগুন দেখতে পেলাম না। বাইরে বা আসে পাশে কোথাও আগুন লেগেছে কিনা তা দেখতে বাইরে এলাম। না, কোথাও কিছু নেই। আবার ঘরে ফিরে দেখি সব ঠিক কোথাও ধোঁয়া বা গন্ধ কিছু নেই, বেশ অবাক হলাম। অনেকক্ষণ কাজ করার জন্য বোধহয় এমন হচ্ছে, নিজেকে বুঝিয়ে শান্ত করলাম।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে প্রথমে সুহানাকে ফোন করলাম, আবারো "পরিষেবা এলাকার বাইরে"। সুহানার বাড়িতে ফোন করলাম, ফোনটা বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেলো; তিন চার বার, মনটা খচ খচ করে উঠল। শেষে, ফিরে এলাম বিছানায়, ল্যাপটপটা খুলে বসলাম। সুহানার বেশ কিছু ভিডিও ল্যাপটপে নিয়ে নিয়েছে, তারই একটা বার বার সে দেখছিল। হটাতই তার মনে হল আবার ঘরটা ধোঁয়াতে ভরে উঠেছে, একটা পোড়া গন্ধ, গন্ধটা আরও তীব্র হচ্ছে। নিঃশ্বাস নেওয়া রীতিমত কষ্টকর হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই একটা ঘটনা; দেখলাম, শুনলাম ... ল্যাপটপে সুহানার ভিডিও টা তে সুহানা গান করছিল, কিন্তু হটাতই সেটা থেকে গিয়ে কান্নার ডুকরে ওঠার শব্দ ভেসে এলো মন হল সে দেখতে পেল সুহানা একটা গভীর অন্ধকার কূপের মধ্যে আটকে, সেও সেই তীব্র গুমোট, গরম আর দমবন্ধ হওয়া তাকে ও অবশ করে দিল ... মনে হল ... সে মরে যাচ্ছে ...

তারিখ ৮, সকালে যখন হুস এলো তখনে বেলা প্রায় দশ। দেখি ল্যাপটপটা সারারাত চলে ব্যাটারি শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। উঠে বসলাম, মাথাটা খুব ভারি হয়ে আছে। মুখে জল দিতে যাব এমন সময় ... এলো ফোন টা ... মোহনদা ...

তারিখ ১১, সুহানা নেই মারা গেছে! অন্তত পুলিশ তাই মনে করছে। সাত তারিখ শুনাপাহাড়ি তে বেশ কিছু জায়গায় ধস নেমেছে, পুলিশ মনে করছে তেমনি কোন এক ধসে ... । ৭ তারিখ দুপুরে কোন একটা কাজে সুহান বেড়িয়ে ছিল, তার পর আর ঘরে ফেরেনি। রাতে এলাকার সমস্ত অঞ্চল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। ৮ তারিখ সকালে পুলিশের কাছে যায়, মোহনাদার কাছে খবর পেয়ে সে তক্ষনি ছুটে যায় শুনাপাহাড়ি। সেখানে গিয়ে জানতে পারে, সুহানা কিছু দিন ধরে স্থানীয় অবৈধ কয়লা চোরাচালানকারী দের বিরুদ্ধে প্রচার করে জনমত গড়ে তুলচ্ছিল। বেশ কিছু লোকের বিশ্বাস তারাই সুহানার ক্ষতি করেছে। স্থানীয় চাপে শেষ পুলিশ, প্রশিক্ষিত কুকুর নামায়; কুকুরটা একটা ধসের সামনে এসে দাড়িয়ে যায়। বেশ কিছু লোক নিচে নামে, সে ও নামতে চায় কিন্তু সুহানার বাবা বারণ করে, বলে অভজ্ঞিতা না থাকলে এই সব খোদানে মৃত্যু অবধারিত। অনেক খোঁজা খুঁজির পর তারাও কিছু পায় না; আর মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন শেষ বার তাকে এই অঞ্চলেই থাকার কথা বলে। ফলে সবাই একটা এক্সিডেন্ট হিসাবে এটাকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু সে কেন মানতে পারছে না? সে আরও কিছুদিন থাকতে চেয়ে ছিল। মোহনদা এক প্রকার জোর করেই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

তারিখ ১২, তার কিছুই ভালো লাগছে না। সুধু একা থাকতে ইচ্ছে করছে, খুব খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে; কিন্তু পারছে না। সব কাজ সে বাতিল করে দিয়েছে। একা থাকলেই সুহানা মাথায় ভিড় করছে, তাই সে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও শান্তি পাচ্ছে না। রাতে সে ল্যাপটপটা আবার খুলে বসল। কিছুক্ষণ চলার পর তার মনে হল তার পাশে সুহানা দাড়িয়ে, ল্যাপটপের স্ক্রিনে এটা কে? কালো একটা মুখ, বিড়বিড় করে কি বলছে, সে শুনতে পাচ্ছে না। ল্যাপটপটা গরম হয়ে উঠছে, পোড়া গন্ধ, মনে হলে তার কাঁধে কেউ হাত রাখল, মাথাটা ঘোরাতেই ...

তারিখ ১৩, সে নিশ্চয় পাগল হয়ে যাবে। তার সাথে যে ঘটনা গুলো ঘটছে তার সে ব্যাখ্যা সে পাচ্ছে না। ভয় পাচ্ছে, কিন্তু দুর্বল হচ্ছে না। কাল রাতে একটা কালো পুড়তে মুখ তার কাঁধে হাত দিয়ে দাড়িয় ছিল। এতো ভয়ঙ্কর দৃশ্য সে কখনো দেখে নি। ভয়ে চোখ তার বুঝে গিয়েছিল। কিন্তু আজ সকালে মনে হল কাঁধের সে হাতের স্পর্শটা খুব চেনা। সে জোর করে কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর ঠিক করল, সে এই ঘটনাটার কারণ সে উদ্ধার করবে। রাত দশটা বাজতেই সে একা ঘরে ল্যাপটপটা খুলে বসল, কানে একটা হেড-ফোন নিলো যাতে সে খুব মৃদু শব্দও শুনতে পায়। ঘটনাটা ঘটল প্রায় দুই আড়াই ঘণ্টা পর, সুহানা কথা বলছিল; কথা গুলো চাপা পরে অন্য একটা শব্দ পিছন থেকে আসছে; কারো চিৎকার, কান্না; একবার মনে হল তার নাম ধরে সুহানা ডাকছে! পোড়া গন্ধ আর ততটা অসুবিধা করছে না, কিন্তু ল্যাপটপে এটা কোথাকার ছবি, এখানের শুটিং তো সে করে নি; এই ভিডিওটা এলো কোথা থেকে? হটাত মনে হল সে আগুনের উপর বসে আছে; ঝলসে যাচ্ছে তার দেহ সামনে দেখতে পেল, একটা মানুষের দেহ পুড়ে গলে গলে পরছে। আর সে পাড়ল না, এবার বোধে হয় চিৎকার করেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল। বাইরে তখন জোর ঝড় বৃষ্টি, তার চিৎকার কেউ শুনতে পেল না।

তারিখ ১৪, আজ সকালে আবার ঠিক লাগছে। সে বুঝতে পারছে সুহানা তাকে কিছু বলতে চায়। এতদিন সে ভুত বা সেই রকম কিছু তে বিশ্বাস করত না। কিন্তু এখন, তার ভাবনা গুলো ওলট পালট হয়ে গেছে। কারো সাথে এই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা দরকার। বিকেল কার কাছে যাবে, কাকে বলবে, কে বিশ্বাস করবে তাকে?


ডাইরিটা পড়ার পর আমি প্রায় থ হয়ে বসে আছি; সামনের জানালার দিকে চোখ, হটাত বাজ পড়ল, আলোকিত হয়ে উঠল বাইরেটা ...

আমার কি কর্তব্য ঠিক করার চেষ্টা করছি। তবে এই সব ভুতের গল্প পুলিশ কে বললে আমাকে পাগল তো বলবেই কুণালের মিসিং কেসটা ও পাগলের হারিয়ে যাওয়া বলে চালিয় দেবে। আর কুণালের বাবা মা কে এই বিষয় বলতে সাহস হচ্ছে না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যা করার দরকার তা খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।
প্রথমে ফোন করলাম প্রশান্তকে, তার কাছে থেকে ফোননম্বার নিয়ে মোহনদা কে। বললাম এখুনি চলে আসতে, শুনাপাহাড়ি যেতে হবে; কুণালের খুব বিপদ। দেখালাম এক ঘণ্টার মধ্যে দুই জনাই হাজির, তাদের কে ডাইরির গল্পটা একটু বানিয়ে বললাম, কুণাল বুঝতে পেরেছে সুহানাকে কে খুন করেছে তাই সে একাই শুনাপাহাড়িতে গেছে কিন্তু কুণালের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে সুহানার খুনিরা কুণাল কে খুন করবে। তাই খুব বল তাড়াতাড়ি আমাদের শুনাপাহাড়িতে যাওয়া দরকার। মোহনদা চটজলদি শুনাপাহাড়ির পুলিশকে খবর দিল, বুঝলাম পুলিশ মহলে তার বেশ জানা শোনা আছে।

এই সব শেষ করে ফিরছি শুনা পাহাড়ি থেকে, গত কালই কুণাল কে খুঁজে বার করা হয়েছে শুনাপাহাড়ির একটা খোদানের গুহা থেকে। মানসিক ভাবে খুব একটা ঠিক নেই, গায়ের চামড়া পুড়ে গেছে, কিন্তু বেঁচে। একটা পোড়া মৃতদেহ ও ফোন আগলে বসে ছিল। গুহাটার পাশেই ধস ও আগুনের কুণ্ড, এতো বেশী গরম যে যখন তখন সেও মারা যেতে পারত। তার থেকে বড় কথা সুহানার খুনিরা জানতে পেরেছিল কুণাল ওখানেই আছে, তাই তারাও বাইরে অপেক্ষা করছিল, কিন্তু গুহার ভিতরে ঢোকার সাহস পায়নি। সুহানা কে যারা খুন করে ছিল তারা ভেবেছিল খুন করে লাসটা আগুনের কুণ্ডে ফলে দেবে। কিন্তু খুন করার সময়ই আসে পাশে ধস নামে তাই তারা যখন আধমরা সুহানা কে মৃত ভেবে সেখানেই ফেল আসে কিন্তু সুহানা তাদের কথাবার্তা ফোনে রেকর্ড করে ফেলে। ফোন চালু ছিল কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় ফোন করতে পারেনি, আর পরে মারা যায়। তার পর পুলিশের খোঁজা খুঁজির সময় খুনিরা গা ঢাকা দেয়, ভেবেছিল কেউ জানতে পারবে না লাসটা কোথায় আছে। কিন্তু কুণাল এসে ওদের ভয় ধরিয়ে দেয়।

মোহনদা বলে উঠলেন, যাক ডাইরিটা আপনি পেলেন ও ডাইরি তে ইঙ্গিত ছিল তাই বাঁচোয়া। তা আছে নাকি ডাইরিটা দিন তো পড়ি। পড়ার পর বলল, যা এতো পুরো ভৌতিক ব্যাপার এ হয় নাকি। মনে হয় সুহানার মৃত্যু কুণাল কে পাগল করে দিয়েছে তাই এই সব লিখেছে, আর শুনাপাহাড়ি তে গিয়ে দৈবাৎ ও গুহাটা আবিষ্কার করে ফেলে। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে যে কুণাল ঠিক অই গুহাটাতেই আছে, আপনি তো পুরো ঠিক ঠাক গুহাটার আশপাশের বর্ণনা করলেন।
আমি হাসলাম, আসলে সত্যি কথা বললে এরা হয়তো আমাকেও পাগল ভাববে। তবে পাঠকের কাছে সত্যিটা বলতে বাধা নেই, আসলে সেই দিন রাতে ডাইরিটা শেষ করে যখন বসি তখন বাইরে বজ্রপাতের আলোতে আমি স্পষ্ট একটা পুড়ে যাওয়া কালো মূর্তিকে ঠিক এমনই এক গুহার সামনেই দারিয়ে থাকতে দেখেছিলাম ... তাই কুণাল কে আমি অন্তত পাগল বলতে রাজি নই ...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন