বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩২

বিচারক স্কোরঃ ২.৫২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

গল্প - কামনা (আগস্ট ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩২ বিনয়

দীপঙ্কর
comment ২  favorite ০  import_contacts ১১৪
১)
চায়ে শেষে চুমুকটা দিয়ে ঘড়িটা দেখে নিলো বিনয়, এখন ৩-৩০; এখনো ৩০ মিনিট এর অপেক্ষা। অগত্যা, সে সামনের পার্কটার দিকে এগিয়ে গেলো। এখনো পার্কে লোকজন কম, আস্তে আস্তে বাড়বে। একটা বেঞ্চ খুঁজে বসল, যেখান থেকে পার্কে ঢোকার রাস্তাটা সে যেন পরিষ্কার দেখতে পায়। বলার অপেক্ষা রাখে না সে এক জনের জন্য, বলা যায় বিশেষ এক জনের জন্য অপেক্ষা করছে। তবে বোকামিটা তারই; সময়ের থেকে এক ঘণ্টা আগে সে এখানে পৌঁছে গেছে। এই শহরটার সাথে সে খুব একটা পরিচিত নয়, প্রায় পনেরো বছর পর এ শহরে সে পা রেখেছে। তাই একটু হাতে সময় নিয়েই বাড়ি থেকে ... মনে মনে হেসে উঠল বিনয়। সুধু কি তাই! না ফোনের অপর-প্রান্তে যে কণ্ঠস্বর তাকে এখানে আসতে অনুরোধ করে ছিলে তার অমোঘ টান। না! সে জানে না। সত্যি জানে না।

২৫ মিনিট ...। তার গ্রামের বাড়ি ছিল ভাটি। কাছে পিঠে দুটো বড় শহর একটা এটা, হেতেমপুর আর একটা নবনিশ্চিন্তপুর। নবনিশ্চিন্তপুর কে সে ভালো চেনে, কারণ কলেজের পাঠ সে সেখানেই নিয়েছে। আর ... নবনিশ্চিন্তপুর এর অনেক অলিগলি, নদীর ধার ছিলে তার আর গহনার একান্ত সময়ের সাক্ষী। অন্যদিকে, হেতেমপুর ছিল তার পিসির বাড়ি, ছোটবেলায় দু'এক বার সে এসেছে এই মাত্র। এর বাইরে শুনেছিল গহনার শ্বশুরবাড়ি হেতেমপুর। নাহ ... এখন আর কোন কিছুই তার কাছের নয়, চেনা নয়; ভাটির সাথেও সম্পর্ক চুকে গেছে প্রায় দশ বছর। বিশেষ করে মা মারা যাবার পর মাত্র তিন মাস সে ভাটি তে ছিল। তারপর, সে অনেক গল্প সে সব আর ভাবতে ভালো লাগে না তার।

২১ মিনিট ...। ফোনটা বেজে উঠল। সে!? না; অন্য অচেনা নাম্বার। হ্যালো। হ্যালো ...। যাহ, কেটে গেলো। পিসি বাড়ি থেকে কেউ কল করে নি তো? না অফিস থেকে কেউ? নাহ! তেমন তো কিছু হওয়ার কথা না। তিন বছরে এই প্রথম সে ছুটি নিয়েছে। সে জানে সে যদি দুএক দিন বেশিও ছুটি করে তাও তাকে কেউ কিছু বলবে না। সে এখন থাকে মিরিজে, পাহাড়ের গাছে একটা ছোট্ট শহর। হাতে গোনা লোক জন বলা চলে সবাই সবাই কে চেনে। দুই বছর হল সে সেখানে একটা বাড়িও কিনেছে। তবে লোক বলতে সে একা। মাঝে মাঝে আত্মীয় স্বজনেরা ঘুরতে গিয়েছে। কেউ দুই কেউ চার কেউ বা বড়জোর সাত দিন। তার পর আবার সেই একা। আর সবাই এর সেই এক কথা; এবার বিয়ে কর; না হলে এতো সুন্দর বাড়িঘর, চাকরী বিয়ে করবি কবে ... ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিবারই সে সযত্নে এড়িয়ে গেছে। আর ভেবেছে যাকে সে এই জীবনের মালকিন করবে বলে ভেবে ছিল, সে এখনো অন্যত্র অন্য কারো সংসার দেখভাল করছে। এই যন্ত্রণা সে সুধু একাই ভোগ করে গেছে। যন্ত্রণা, ... না রাগ। গহনার প্রতি তার তীব্র রাগ।

১৭ মিনিট ... । আজ মা এর কাছে এসেছিল গহনা। বেশ কয়েক দিন ধরে মা এর শরীর খারাপ। আমিও গত দুই দিন কলেজে যেতে পারিনি। দু জনে বসে অনেকক্ষণ গল্প করেছিলো। আমি গেলেই ভাগিয়ে দিয়ে বলছিল, এখানে কি তোর, যাহ দেখছিস না দুটো মেয়ে গল্প করছে। চলে যাওয়ার সময় গহনা যখন বাবার ছবিতে প্রণাম করছিলো আমি মা এর চোখে জল দেখে ছিলাম। রাতে মা অস্ফুট স্বরে বলেছিল, কলেজ শেষ করে তাড়াতাড়ি একটা চাকরী জোগাড় কর। এই মেয়েটাকে এই বাড়িতে আমি বউ দেখে যেতে চাই।

১৫ মিনিট ... । নাহ, গহনা বউ হয়েছিল বটে কিন্তু আমাদের বাড়ির না। যে দিন গহনার বিয়ে হয় সেই দিন মা মৃত্যু শয্যায়। এক বছর ধরে ক্যানসার নামক এক রোগের সাথে লড়তে লড়তে ক্লান্ত। হসপিটালের বেডে সারাদিন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকে তাকে কোন দিনই গহনার বিয়ের কথা বলা হয় নি। তার পর মাত্র আর তিন দিন, তার পর সব শেষ। সুধু কি শেষ, এক বছর ধরে বিনয় শুধু চেষ্টা করে গেছে, কাজের কাজ কিছু করতে পারে নি। বছর শেষে যখন পিছন ফিরল দেখল তার পাশে কেউ নেই, মা, গহনা, জমি ঘরবাড়ি সব শেষ। তিন মাস পাগলের মতন ঘুরে বেড়াত। কত বার নিজেকে শেষ করে দেবে বলেও শেষ করে দিতে পারে নি। কেন? সে উত্তর সে আজও খুঁজে পায়নি। তারপর একদিন পিসেমশায়ই প্রায় জোর করেই তাকে তাকে পাঠিয়ে দেয় তার এক পরিচিতর কাছে দূরের এক শহরে। সেখানেই সে কাজ শুরু করে, সাথে পড়াশোনাও। তার পর মিরিজে এই চাকরী।

১২ মিনিট ... । পার্কে লোকজন বাড়ছে; বিশেষ করে কচিকাঁচা দের দল সাথে আসা মেয়ে/বউরা জটলা করে গল্প করছে। না এখনো তেমন কাউকে চোখে পরছে না। বলেছিল নীল সাড়ি পরে আসবে, এখনো সে নীল সাড়ি পরা কাউকে দেখেনি। গত পরশু তার পিসতুতো বোনে মানে হিমানীর বিয়ে ছিল, তাই এখানে আসা। পিসি অনেক দিন আগে থেকেই তার বিয়ে নিয়ে চাপ দিচ্ছিল, এক দুই বার ভেবেছিল বিয়ে তে আসবে না। কিন্তু পারে নি, বিশেষত পিসেমশায় এর মারা যাওয়ার পর, এই বিয়েতে তার থাকাটা দরকারি মনে হয়ে ছিল। এক মাস আগে পিসি একটা মেয়ের ছবি পাঠিয়ে ছিল, বলেছিল যদি পছন্দ হয় তা হলে হিমানী ও তার বিয়েটা এক সাথেই দিয়ে দেবে। ছবিটা তার পছন্দ হয়েছিল কিনা সে জানে না তবে অপছন্দও ছিল না। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরের মেয়ে যেমন হয়। তবে সে এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়; আর হয়তো কখনো হবেও না। ভেবেছিল হিমানীর বিয়েটা মিটে গেলে সে পিসিকে না বলে দেবে, আর মানা করে দেবে তার জন্য মেয়ে না দেখতে। কিন্তু গত কাল ই এলো সেই ফোন। অচেনা নম্বর, ফোন তুলতেই অপর-প্রান্ত থেকে বলে উঠল আমি বিদেহী বলছি, আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই। বিদেহী, সেই ছবির মেয়েটি। ভেবে ছিল ফোনেই সে কথাবার্তা মিটিয়ে ফেলবে কিন্তু পারল না। মেয়েটির কণ্ঠ ও কথার মধ্যে অদ্ভুত আন্তরিকতা ও আবেগ মিশেছিল যে তার জন্যই আজকের এই অপেক্ষা।

১০ মিনিট ... । একটি বল এসে পড়ল তার পায়ের কাছে। তার বেঞ্চের পিছনেই একটি ৫-৬ বছরের বাচ্চা খেলছিল তারই বলটা; বলটা নেওয়ার জন্য সে এ দিকেই আসছে। সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাটা, মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল, হাসিমাখা মুখ। বলটা নিয়ে সে তার পাশেই বসে পড়ল; একটু বেশীই হাঁপাচ্ছে। সে তার জলের বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দিতেই সে মাথা নেড়ে না করলো।
- চিনতে পারছ?
- গলার স্বরটা তাকে এক লহমায় এই পৃথিবীতে এনে ফেললো। হ্যাঁ সে, সেই। গহনা। গত দশ বছরে তার মুখের বিন্দু মাত্র পরিবর্তন হয় নি; সুধু একটু বেশী ফ্যকাসে আর রোগা। চোখের তলায় বেশ কালি পরেছে। বেশ মলিন সাড়িটাও, রোগা হাতে এক জোরা অনুজ্জ্বল চুড়ি বড় বেমানান লাগছে।
- সত্যি চিনতে পারিনি মনে হচ্ছে!
- সে উঠে দাঁড়ালো; ইতস্তত করে বলে উঠল। না, না, তেমন কিছু নয় ... চিনতে পেরেছি। কেমন আছো ... তুমি... মানে আপনি?
- দাঁড়াচ্ছও কেন, বস। বলেই গহনা তার পাশেই বেঞ্চটা তে বসে পরল। ছোট্ট একটা হাসি, এসেই মিলিয়ে গেলো, যেন একটা গভীর অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে এলো - ভালো। তার পর কিছুটা ফ্যস ফ্যসে গলায় নকল কৌতুক এনে বলল। তুমি কেমন আছো সেটা আমি জানতে চাইবো না। আমি বেশ ভালো ভাবে জানি তুমি ভালো আছো, বেশ ভালো আছো।
- মনে মনে হেসে ফেলল বিনয়। এক ভালো থাকার হাসি। তারপর নিজেকে চাগাড় দিয়ে জানতে চাইলো বাড়িতে সব কেমন আছে, মানে ... মা, বাবা, স্বামী ... । হটাত তার সিঁথির দিকে চোখ যেতেই থমকে গেলো।
- গহনা নিজেই বলে চলল। বুঝতেই পারছ, স্বামী মারা গেছে; ৪ বছর প্রায়। শ্বশুর শাশুড়িও নেই, এখন মা আর ছেলের সংসার।
- তক্ষুনি চোখ গেলো সেই বাচ্চা টা গহনার পাশে বসে তার সাড়ির আচল নিয়ে খেলছে।
- গহনা তখনো বলে চলেছে- বাবা মা ভালো আছেন বোধ হয়। ৪/৫ বছর কোন খবর নেন না। আমারও আর খবর দিতে ইচ্ছে হয় না। ভাটি শেষ গিয়েছিলাম প্রায় ৭ বছর আগে। ভাই এর বিয়েতে। তার পর আর কোন খবর নেই। তুমি বল তোমার বোন এর বিয়ে ঠিক ঠাক হল?
- শেষ লাইনটা তাকে চমকে দিলো। সে ভেবেছিল আগের কথা গুলো গহনা বোধ হয় কৌতুকের সাথে বলে ছিল। কিন্তু তার বোনের বিয়ের কথা সে জানলো কি করে? তা হলে কি কেউ তার কথা গহনা কে আগেই বলেছে, এই শহরে আসার কথা, এখানে আসার কথা। কে, কে তার খবর ...?
- সে বেশ জোর গলায় বলে উঠল- কে? ... গহনা আরও কিছু বোধ হয় বলতে যাচ্ছিল। আমার কথায় শুনে থমকে দাঁড়ালো ... কিছু ক্ষণ মাত্র। তার পর মুখে এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলে উঠল
- কে; কে আবার, তোমার হবু বউ। যার সঙ্গে দেখা করার জন্য তুমি এখানে এসেছ।
- কে! বিদেহী? তার একটু রাগ হল এবার। বিদেহীর উপর নিজের উপর। এক কথায় এখানে আসাটা ঠিক হয়নি তার। আসলে সে জানে গহনার কথা ভাবলে তার মাথায় এলো যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি ভিড় করে যে সে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনা। এখন এই সময় তার পাশে বসে ভিতর টা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। আবার এক রাশ প্রশ্ন ও ভিড় করে। গহনা কে বিদেহী চেনে কি করে? তার বর্তমান সম্বন্ধে বা গহনা কি জানে আর তার অতীত সম্বন্ধে বিদেহী।
- কি বিদেহীর কথা ভাবছ? ভেবো না; ও এখনি আসছে। আমিই একটু আগে চলে এলাম তোমার সাথে কথা বলার জন্য।
- কথা গুলো বলার ভঙ্গিতে এতোটা খোঁচা ছিল যে সে খানিকটা কঠিন স্বরে বলে উঠল- না। আমি কিছু ভাবছি না।
কথা গুলো বোধ হয় বেশীই রুক্ষ ছিল যে গহনা চুপ করে গেলো। তবে আবার স্বীকারোক্তি ভঙ্গিতে বলে উঠল;
- আগে তুমি আমায় খারাপ ভাবতে, এখন বোধ হয় খুব খারাপ ভাববে। কিন্তু এখন আর কিছু মনে হয় না, মনে করার মতন বিলাসিতা আর নেই। খুব বেশী হলে দুই এক দিন একটু কাঁদবো তার পর আবার যে কা সেই। কিন্তু আমার কিছু কথা বলার ছিল তোমাকে।
- বিনয় আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না। সে আর গহনার স্বীকারোক্তি শুনতে চায় না। সে এখান থেকে চলে যেতে চায়। যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে সে গেছে, বা এখনো যা তাকে পলে পলে দগ্ধ করে সে যন্ত্রণা কোন স্বীকারোক্তিই তেই শান্ত হবে না। তার মনে পরে সেই এক বছর যখন সে মা এর তীব্র অসুখে, তীব্র আর্থিক সমস্যার মধ্যেও একটু দেখা করার জন্য আকুতি নিয়ে তাকে বার বার দেখা করতে চাইতো। সেই সব আকুতি বারে বারে শূন্য পাথরে ধাক্কা লেগে ফিরে এসেছে। কখনো ভেবেছে বাড়ির লোক তাকে জোর করে ধরে রেখেছে, সময় পেলেই সে দেখা করবে বা কখনো ভেবেছে এই বোধ হয় তার এই দুঃসময় তার পাশে একদিন গহনা দাঁড়াবে। কিন্তু, সরকারী চাকুরে বর যে তার মতন নিঃস্ব বেকারের থেকে হাজার লাখ গুন বেশী ভালো তা সে ধীরে ধীরে টের পেয়েছে। মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দিতে মন চেয়েছে, মাঝে মাঝে গহনা কে। কিন্তু মা এর অসুখ তাকে কিছু ভাবতে দেয়নি, মনে হত মা ঠিক হয়ে গেলে গহনাও ফিরে আসবে। কিছু ঠিক হয় নি, কিছু না। আজও না। গহনা কিছু বলে যাচ্ছিল ... অসুখ ... অসুখ, সে কিছু শুনছে না শুনতে ইচ্ছে করছে না, তার মাথা ভো ভো করছে। সে উঠে দাড়িয়ে পড়ল। নীল সাড়ি পরা এক জন পার্কে ঢুকছে, সে চলে যেতে চাইছে এখান থেকে, এদের সবার কাছ থেকে। সে জোরে পা বাড়াল।
- পিছন থেকে আকুতি ভরা কণ্ঠে সুধু সে একটা কথাই সুনতে পেলো। দয়া। সে একটু থমকে দাঁড়ালো।
- জানি তুমি আমাকে ঘেন্না করো। কিন্তু আমি তোমার ঘেন্নারও যোগ্য না। কিন্তু তুমি যদি একটু দয়া না করো তা হলে এই জীবন শেষ করে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
- বিনয় থমকে আছে, অতীত ভবিষ্যৎ, আকুতি, দয়া, সব সব কেমন যেন মিলে মিশে এক হয়ে যাচ্ছে। সে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো।
- গহনা কি বুঝল কি জানে, সে পাস দিয়ে হেটে চলে যাওয়ার আগে। তার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে গেলো। দেখতে থাকলো একটা বাচ্চার হাত ধরে গহনা ধীরে ধীরে পার্ক থেকে বার হয়ে গেলো।

বৈদেহী একটু দূরেই দাড়িয়ে ছিল। ধীরে ধীরে সে সামনে এসে দাঁড়ালো। খানিকটা মাথা নত করেই বলল - আপনি বোধ হয় সব ই শুনেছেন। তবুও আমার কিছু বলা ছিল, আপনার সামনে কথা গুলো বলতে পারবো না, তাই লিখে এনেছি। দয়া করে পড়বেন আর পারলে ক্ষমা করবেন।

বৈদেহী চলে যাওয়ার পরও সে যে কতক্ষণ ও খানে বসে ছিল সে তা নিজেও জানে না। তবে ঘোর কাটল ফোনের আওয়াজ শুনে। সন্ধ্যে ঘন হয়ে এসেছে, পিসি ফোন করছে, কন্যাযাত্রীরা সবাই রেডি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তার হাতে তখনো দুটো কাগজ, সে তৎক্ষণাৎ কাগজ দুটো পকেটে ভরে রাস্তায় নেমে আসে।

২)

মিরিজে যাওয়ার ট্রেনে সে বসে। গত কাল কন্যাযাত্রী থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ সকাল থেকেই আবার টিকিটের জন্য সে অনেক দৌড়াদৌড়ী করেছে, অবশেষ রাতের এই ট্রেনে সে ফেরার একটা টিকিট পেয়ে গেছে। দুই দিন পর তার টিকিট কাটা ছিল, কিন্তু সে আর ওখানে থাকতে পারছিল না। যদিও পিসি একটু কান্না কাটি করছিল, তবুও ... । ট্রেন ছেড়ে দিল। রাতের ফাঁকা শহর ছেড়ে ট্রেন ছুটছে। তার মনে পরে গেলো কালকের দুটো কাগজের কথা। ও দুটো সাথে নিয়ে যাওয়া যাবে না পড়া হয়ে গেলে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলে দেবে এখানেই।

এবার সে কাগজ দুটো দেখল, একটা স্পষ্ট চিঠি, খামে ভরা, উপরে জ্বলজ্বল করা তার নাম। অন্য একটি একটা বিজ্ঞাপনের কাগজ, সস্তা, চার ভাজ করে মোড়ান। সে বিজ্ঞাপনের কাগজটি খুলল - একটা আবেদন, একটা বাচ্চার ছবি সহ। হ্যাঁ, কালকের সেই বাচ্চাটা, মানে গহনার ছেলে। নিচে আবেদন " পাঁচ বছরের এই ছেলে টি দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রথমে পর্যায় তাই যথাযথ চিকিৎসা হলে রোগমুক্তি সম্ভব। কিন্তু তার জন্য চাই প্রচুর আর্থিক সহয়তা। তাই সহৃদয় ব্যক্তির কাছে আর্থিক সাহায্যের আবেদন করা হয়েছে"। সাথে একটি ব্যাঙ্কের একাউন্ট নাম্বার ও ফোন নাম্বার। সে খানিকটা হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। কাল গহনা তা হলে এই অসুখের কথাই বলছিল। এই দয়া যে সে কিছু আর্থিক সাহায্য চায়। তার কি খারাপ লাগলো গহনার জন্য, না, সে সুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

এবার সে চিঠি টি খুলল - বিনয় বাবু, নমস্কার। প্রথমেই আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি যা করলাম তা ঠিক কি ভুল তা জানি না সুধু জানি এটুকু করে হয়তো আপনার কাছে আমি অপরাধী হলাম কিন্তু নিজের মনের কাছে কিছুটা দায় কমলো। আপনি হয়তো আমাকে এক মাস আগে থেকে চেনেন কিন্তু আমি আপনাকে প্রায় এক বছর হল চিনি। আমি আর হিমানী একই কলেজে পড়ি; বিশেষ করে এক বছর আগে যখন হিমানী আপনার ওখান থেকে ঘুরে এলো তখন থেকে। সত্যি বলছি, ওর কাছে আপনার ফটো আর গল্প শুনে আপনার প্রেমে পরে গিয়েছি। তাই আপনার পিসি যখন আমার বাড়িতে আপনার বিয়ের ব্যাপারে আমার কথা তুলল তখন আমি মনে মনে খুশিই হয়ে ছিলাম। হিমানীর কাছে আপনার একটা ফটো তখন থেকেই আমার ফোনে সেভ করা আছে। এবার আসি গহনাদির কথায়; আমাদের পাশের বাড়িতেই গহনাদি থাকত। বিয়ের পর থেকেই দেখছি, চুপচাপ একটা মেয়ে যেন মনমরা অথচ সংসার টা কে সুন্দর গুছিয়ে রেখেছে। বিয়ের দু বছরের মধ্যেই গহনাদির শ্বশুর ও শাশুড়ি মারা গেলেন। গহনাদির স্বামী মানে উৎপল দা একটু বয়সে বড় আরে মদ এর নেশা তাকে অনেক দিন থেকে তাকে ধীরে ধীরে কাবু করেছে। গহনাদির কোন চেষ্টাই উৎপল দা কে ঠিক করতে পারেনি। এর মধ্যে পাঁচ বছর আগে একটাই সুখের দেখে ছিলাম গহনাদির মধ্যে, সেটা তার ছেলে। কিন্তু গহনাদির সুখ বোধ হয় সহ্য হয় না, এক বছরের মাথায় উৎপল দা মোটর বাইক এক্সিডেন্ট করে মারা গেলেন। আর গত বছর বাচ্চার ক্যানসার ধারা পরে। সেই থেকে দেখছি কি ভাবে তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে সে তার সন্তান কে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাড়ি ঘর সব বিক্রি হয়ে গেছে, ব্যঙ্কের শেষ পুঁজিটুকুও শেষে, ভাই-মা-বাবা আর খোজ নেয় না। আমাদের বাড়ির নিচের তলাতে এখন ভাড়া থাকে, উৎপল দার চাকরি টা পাওয়ার জন্য ধরা ধরি আর ছেলের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যাস। নিঃস্ব, নিঃস্ব হয়েও এই লড়াই আমাকেও কাঁদিয়ে দিতো। আমরাই বন্ধু বান্ধব মিলে বাচ্চাটার জন্য টাকা তোলার চেষ্টা করছি, সবার সাহায্য, যে যা পারে। কিন্তু তাতে আর কত, এখনো অনেক টাকার দরকার। ভেবেছিলাম আপনার সাথে বিয়ে হলে বলবো, বিয়েতে খরচা না করে টাকাটা গহনাদি কে দিতে আমি জানতাম আপনি ঠিক রাজী হবেন। দিন কুড়ি আগে গহনাদি কে আপনার কথা বলি। খুব খুশি হয় আমার এক তরফা প্রেমের কথা শুনে। কিন্তু আপনার ছবি দেখে গহনা দি চমকে উঠেছিল, গহনাদির মুখে যে ছবি ফুটে উঠে ছিল তাতে আমি মেয়ে হয়ে বুঝেতে পারি অন্য কিছু ব্যাপার আছে। তার পর ধীরে ধীরে জানতে পারি আপনার আর গহনাদির প্রেম আর বিচ্ছেদের কথা, আপনাদের গ্রামের কথা, আপনার মায়ের কথা। তবে আমি জানি না সেই সময় গহনাদি কেন বাড়ি ছেড়ে আপনার পাশে দাড়ায়নি, আমাকেও বলেনি। হয়তো আপনাকেই বলবে বলে জমিয়ে রেখেছে। তবে এটুকু বুঝেছি একটা মেয়ে কোন ছেলেকে এমন ভাবে এক বার ই ভালবাসতে পারে। আর আপনার সাথে গহনাদির দেখা করানোটা আমার প্ল্যান, আমি জানি হিমানীর বিয়ের পুরো খরচা আপনি করছেন। গহনাদি কিছুতেই রাজী হচ্ছিলো না, আমাকে অনেক মানা করেছে, অনেক কেঁদেছে। তবু, অনেক অনুনয় ও বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে সে এটা করছে। তাই এই অপরাধটা আমিও জেনে বুঝেই করলাম। পারলে তাকে ক্ষমা করবেন এবং আমাকেও। ইতি - বৈদেহী।

কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে বিনয়। তার পর ধীরে ধীরে আবার বিজ্ঞাপনের কাগজটা মেলে ধরল, স্পষ্ট অক্ষরে ছেলেটির নাম লেখা আছে - বিনয়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন