বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ২৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯৫

বিচারক স্কোরঃ ২.০৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯ / ৩.০

বুকের ওমে লেপ্টে থাকা কষ্টেরা, সুৃৃখ আমার

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

একটা অবয়ব খুজি

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

স্রোতের টানে নাচে মরণ আঁধার

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯৫ পিছু ডাকে সেই আট জন…

কাজী জাহাঙ্গীর
comment ১৪  favorite ০  import_contacts ২৭১
সমিউল এখন পুরোদুস্তর একজন মুদি দোকানদার। পান, বিড়ি-সিগারেটসহ কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী যেমন আলু পেয়াজ ইত্যাদি ছাড়াও দোকানের এককোন চুলা জ্বেলে বানানো হচ্ছে গরম গরম রং চা আদা লেবুর মিশ্রনে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই সমিউলই একজন নলি(সিডিসি)ধারি নাবিক। সরকারি জাহাজ সমুহের(শিপিং কর্পোরেশন ভুক্ত)একজন অস্থায়ী চাকুরীজিবী। সরকারী নলি’ধারি নাবিকরা একবার সাইন অন করে দশ থেকে এগার মাস জাহাজে এক ভয়েজ শেষ করে আসে তারপর ছ’মাসের অধিক সময় বিনাবেতনে বাড়িতে বসে থাকে, জাহাজ সংখ্যার চেয়ে কর্মচারী বেশী হওয়ায় এটাই নিয়ম, একই পদবীধারি নাবিকরা ক্রমানুযায়ী (রোটেশন)সাইন অন-সাইন অফ করে জাহাজে চাকরি করে চলে।
সবে মাত্র নির্বাচন শেষ হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আ্ওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে পূর্ববাংলার প্রধান এবং একমাত্র জাতীয়তাবাদী ধারার দলে পরিণত হয়েছে।এখন ক্ষমতার পালাবদল কিভাবে হবে এরকম জল্পনা কল্পনা বহুল একটা পরিস্থিতিতে সমিউল সাইন অফ করে বাড়ি ফিরে এলো। দু’সন্তান নিয়ে সাজানো সংসার,বেশ আনন্দঘন পরিবেশে দু’তিন মাস দেখতে দেখতেই কেটে গেছে যদিও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে গিয়ে ঘঠে গেল বিস্ফোরণ। ২৫মার্চের ক্রাকডাউনে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হওয়ার পর অনেক চেষ্টা করেও আর বাড়িতে থাকতে পারলো না। পরিবারকে অত্যাচারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে একদিন ছোট্ট বাচ্চাদু’টোকে কোলে কাঁধে নিয়ে পাড়ি জমালো কর্ণফুলীর পূর্বপাড়ে পাহাড় ঘেরা এই জামতলী গ্রামে আর চার জনের সংসারের অন্নের সংস্থান করার জন্যই বেচে নিয়েছিলো এই জীবিকা।
জামতলি গ্রামের এই অজ পাড়ায় ছিল সমিউলের নানার বাড়ি। গ্রামটা তখনো মাটির তৈরী গুদাম ঘরে সাজানো একটা ধুলি ধুসর নির্মল গ্রাম ‍ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল, ধুলা উঠা মেঠো পথ আর ঘাটঘর ছিলো পশ্চিম পাড়ের চট্টগ্রাম শহরের সাথে যোগাযোগের সংযোগ সু্ত্র তাই ঘাটঘরকে ঘিরে অনেক সাম্পানের পশরা,বাজার আর যাতায়াত ভিত্তিক লোকজমায়েত। জোয়ার ভাটায় স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে মাঝিদের বৈঠায় বাওয়া সাম্পানের সেই ‘ক্যাঁ কুরুত,ক্যাঁকুরুত’ শব্দ ছিল নিত্য পারাপারের যাত্রীদের প্রানের স্পন্দন। সেই বাজারে মুদি দোকান দিয়েই কোনভাবে চালিয়ে নিচ্ছিল সমিউল।দোকানের মালামাল শেষ হয়ে এলে সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে। যেতে হবে ঐকুলে, চারিদিকে ওৎপেতে আছে বিপদ, হানাদার সৈন্যদের ভয়ে জীবনটা হাতে নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। তার পরেও উপায় নেই, ওপাড়ের পাইকারী বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবেবিকিকিনির সামগ্রী। বিশেষ করে বিড়ি-সিগারেট আর চা পাতা হলো অতি প্রয়োজনীয় রসদ এই মুদি দোকানদারের জন্য সুতরাং শহরের কুলে যাওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না সমিউলের।
সমিউল শহরেরই লোক, বিপদে পড়ে নানার বাড়িতে আশ্রয় নিলেও শহরের আনাচে কানাচের গলিপথ অনেকটাই তার নখদর্পনে। তাই কোন দিক দিয়ে গিয়ে কোন দিকে বেরুলে তাড়াতাড়ি ফেরা যাবে সেই চিন্তা করেই চলে। আজও সেরকম হল, সল্টগোলা ঈশান মিস্ত্রির হাট থেকে সদাই পাতি কিনে জোয়ারের অনুকুলে তাড়াতাড়ি ফেরার জন্য চলে এলো গুপ্তখালি ঘাটে আর এসেই পড়ে গেল বিপদে। পাঁচ-সাতজন অস্ত্রধারী হানাদার সৈন্য পারাপারের জন্য একত্রিত হওয়া আটজন যাত্রীর সকলকেই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। যার মধ্যে আছে শহরে দুধ বিক্রি করতে আসা দু’জন গোয়ালা আর ছজন গ্রামবাসী যদিও দাঁড় করিয়ে রাখা কাউকেই চিনতে পারলো না সমিউল।
সমিউল ছিল সারির উত্তর প্রান্তে, সে স্পষ্টই দেখতে পেল দাঁড় করানো লুঙ্গি পরা ক’জনের লুঙ্গি খুলে তল্লাশি করা হচ্ছে। তার বুঝতে দেরী হল না যে তারা মুসলিম কিনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু সে একটা জিনিষ পরিস্কার বুঝলো দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই সৈন্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেনা কারন তার কেউ ঠিক মত উর্দু বুঝতে পারছনা, একটু একটু চেষ্টা করলেও উত্তর দিতে দেরি হওয়ায় মার খাচ্ছে। নয়জনের লাইনে সমিউলের পাশেই ছিল গোয়ালা দু’জন। সমিউলই লাইনের শেষ ব্যক্তি গুপ্তখালি রাস্তা পেরিয়ে ঘাঠ বরাবর রাস্তায় উঠার সাথে সাথেই সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে সৈন্যদের ধাক্কাধাক্কিতে।
সৈন্যগুলোর আচরণ দেখে মনে হলো তাদের মধ্যে কোন নেতা নেই, যার যা ইচ্ছে করছে তাই।যে যেভাবে পারছে নিরস্ত্র অসহায় যাত্রীদের সাথে যেমন ইচ্ছে হেনস্তা করে যাচ্ছে। এবার গোয়ালাদের কাছে এসে একজন জিজ্ঞাসা করলো
-তুম কেয়া করতে হ, গোয়ালাটা এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সমিউলের চোখাচোখি হলো ।
-অবাজি, আঁইত কিচ্ছু ন বুঝির, কী পুছার গরেদ্দে (অ’বাপ আমিত কিছু বুঝছিনা কি জিজ্ঞেস করছে) ।
-এই সালে(শালা), বলতে কিঁউ নেহি, তোমারা ধান্দা কেয়া হে, বলেই কাধের কাছে বাহুতে রাইফেল দিয়ে কসে একটা বাড়ি দিয়ে দিল।লোকটি হাউমাউ করে উঠল। এবার সমিউল সইতে না পেরে বলে উঠলো
-ইয়ে সব আম আদমি হে, ইয়ে লোগ গাঁইকা দুধ বিকতে হে, ইয়ে দুধওয়ালে হে সাব।
-তোমারা কাপড়া উতারো, বলেই টেনে হেঁচড়ে নেংটা করার অবস্থা হতেই লোকটি বলতে শুরু করল
-অ’বাজি আঁর নাম আদদুল করিম,আঁই মুছলমান অ’বাজি আঁই মুছলমান।(অ’বাপ আমার নাম আব্দুল করিম, আমি মুসলমান অ’বাপ আমি মুসলমান।)পরপরই সমিউল বলে উঠলো-
-সাব ইয়ে বলতে হে, ইসকা নাম আব্দুল করিম হে, ওয় মুছালমান হে সাহাব।
বলার সাথে সাথেই অতর্কিতে একজন এসে সমিউলকে সার্টের কলার ধরে হেচকা টানে লাইন থেকে সরিয়ে ফেলল আর বলতে লাগল-
-সালা তুম কিউ বলতে হ, তুম কউন হ?তুম কিউ বীজ মে আতে হ?
কথা শেষ না হতেই আরেকজন এসে সমিউলের পাছায় খুব জোরেই একটা বুটের লাথি বসিয়ে দিল। ধকল সইতে না পেরে সমিউল রেললাইনের উপর উপুড় হয়ে পড়ে গেল। সাথে সাথে আরো তিন জন এসে সমিউলের দিকে বন্দুক তাক করে ধরল। একজন পড়ে যাওয়া সমিউলের হাটুতে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করতে সমিউল কঁকিয়ে উঠলো, এবার প্রথম জন অন্যদের থামিয়ে দিযে তাকে টেনে তুলে জিজ্ঞেস করল-
-তোমারা নাম কেয়া হে,
-সমিউল, উচ্চারণ পরিস্কার হল না। সৈন্যটা বলে উঠল
-সমুল, ইয়ে মুছালমান কা নাম নেহি হে।
নিজের বিপদটা আরো বড় হয়ে যাচ্ছে বুজতে পেরে সমিউল এবার জোর গলায় বলে উঠল
-সমিউল ইসলাম সাব, হামারা নাম সমিউল ইসলাম। মেরা পাছ আমারা আইডেনটি কার্ড হে সাব।
আসলে মুখ ফসকেই সমিউল বলে ফেলেছে তার কাছে পরিচয় পত্র আছে। কিন্তু পরক্ষনেই হঠাৎ তার মাথায় এল আরে তাইত, তার নাবিক কার্ডটা তার সাথেই আছে, সকালে ঘর থেকে বের হবার সময়ে সে তার নাবিক পরিচয় পত্রটা পলিথিন দিয়ে মুড়ে পেন্টের পকেটেই রেখেছে। একথা মনে পড়তেই সাথে সাথে পকেট হাতড়িয়ে পরিচয় পত্রটা হাতে নিয়ে সৈন্যটাকে বলল-
-ইয়ে হে সাব, ইয়ে হে মেরা আইডেনটিটি কার্ড।
-ডানটি কার্ড, ইয়ে কেয়া হে? বলেই সৈন্যটি কার্ডটা এক নজর দেখে বলে উঠল-
-ইসকা কোই জরুরাত নেহী, যা সালা লাইন পে খাড়া হ যা। বলেই সমিউলকে আরেকটা লাথি দিয়ে লাইনে দাড়িয়ে থাকা ঐলোকগুলির দিকে ঠেলে দিল আর পরিচয় পত্রটা তার থেকে একটু দুরে বালির উপর আছাড় দিয়ে ফেলে দিল। সমিউল দেখল তার মালামালের বস্তাটা রেললাইনের খাঁজে পড়ে আছে। ভাবতে লাগল এবার বুঝি নিস্তার নাই, মৃত্যু অবধারিত দেখে আল্লাহকে স্মরণকরা শুরু করল আর ভাবতে লাগল যে পরিস্থিতিতে পড়েছে এখান থেকে আল্লার সাহায্য ছাড়া বাঁচারকোনউপায়নাই। আঘাত প্রাপ্ত পা’টাকে টেনে টুনে সোজা করার চেষ্টা করতে করতে এদিক ওদিক তাকাল সে, সত্যি কি তবে হায়াতটা শেষ হয়ে গেল। এবার বুঝিঐশ্বরিককোনকিছুনা ঘঠলে আর তবে বউ বাচ্চার কাছে ফেরত যাওয়া হবে না। তাই অনেক দ্বিধাগ্রস্থ মনে আল্লাকে ডাকতে ডাকতে উঠে দাড়াতে চেষ্টা করল আর ঠিকতখনই সমিউলের মুখ বরাবর এসে ব্রেক করল একটা জীপ গাড়ী। সে দেখল এটা একটা মিলিটারী জিপ গাড়ী। পিছন থেকে আরো দুজন অস্ত্রধারী সৈন্য নেমে এল। চালকের পাশের সিঠে বসা লোকটা নেমে আসতেই সব সৈন্য গুলা একসাথে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর নেমেই ঐ লোকটা প্রশ্ন করতে শুরু করল
-উসকা কেয়া হুয়া, কেয়া বলতে হে ওয় ?
ভাব দেখে বুঝা গেল সমিউলকে সৈন্যরা যে মারধর করছে সেটা দুর থেকে কমান্ডার দেখেছে। হয়তো এটাও খেয়াল করেছে যে সৈন্যদেরকে লোকটা কিছু একটা বলতে চেয়েছে। সমিউলও যেন চটকরে পরিস্থিতিটাকে একটা মোড়ে নিয়ে আসতে চাইল। বুদ্ধি করে বালির উপরে পড়ে থাকা পরিচয় পত্রটা চটকরে তুলেনিয়ে কমান্ডারের সামনে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো আর বলে উঠল-
-সাব হাম সরকারী নওকর হে, ইয়ে মেরা আইডেনটি কার্ড হে সাব, ইয়ে লোগ হামকা মারতা হে সাব, হামকো সুনতা নেহী সাব।
কমান্ডার মনে হলো একটু নরম হলো,পরিচয় পত্রটা বাম হাতে নিয়ে ভাজটা খুলতে গেল, ডান হাতে তখন মিলিটারীদের থাকা লাটিটা ধরে ছিল।কিন্তু সমিউল দেখল কার্ডটা খুলে পড়ার সাথে সাথে সেল্যুটের ভঙ্গিতে সালাম দিল, তাই সেও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। বাকি লোক যারা এতক্ষণ শব্দ করে কান্না করছিল আর আল্লাকে স্মরণ করছিল তারাও যেন কয়েক মিনিটের জন্য কেমন যেন চুপ করে গেল বলে মনে হল সমিউলের। কমান্ডার তখন একটু দুরত্বে থাকা সৈন্যটাকে ডেকে বলল-
-ইধার আও, জানতে হ ইয়ে কউন হে, ইয়ে হামারা আদমি হে, ইয়ে দেখো ইয়ে পাকিস্তান সরকার কা সীল হে, ইয়ে হামারা সরকার কা নওকার হে। সমিউল ইয়ে লো তোমার কার্ড।
তারপর যা দেখল সমিউলের যেন বিশ্বাস করতে পারছিলনা, অনেক কষ্টে দাড়িয়ে পরিচয় পত্রটা হাতে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে নিল।
-তুম সব ইধার আও, সব সৈন্যদের ডাকল কমান্ডার।
-তোমারা হাতিয়ার নিচে উতারো, সবাইকে অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রাখতে বলল।
-আব এক কদম পিছে যাও, অস্ত্র রেখে সবাইকে এক কদম পিছনে যেতে বলল, সমিউলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল
-সমিউল তুম কাহা যা্ওঅ গি।
-সাব ওস্পার হামারা গাঁও হে সাব।
- কেয়সে যাওঅ ‍গি
- সাব না্ও পে, ওয় নাও উস্পার যায়ে গা
সাম্পানগুলো ঘাট ছেড়ে দুরে জেটির নিচে পিলারের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ে,তবে দু’টো সাম্পানের মাথা দেখা যাচ্ছে ওখানে।
- বোলাও, নাও কো বোলাও, তুম যা সাকতে হ।
সমিউল যেন আকাশের চাঁদটা হাতে পেল। সমুদ্রতরঙ্গমালায় ডুবতে যাওয়া জাহাজ যেমনভাবে সাঁই করে উপরের দিকে ভেসে উঠে ঠিক তেমনি সমিউল যেন দাফন হতে যাওয়া গর্ত থেকে নিজেকে টেনে বের করে নিল। বুঝতে পারল হয়তো বেঁচে গেল সে, কিন্তু বাকী আট জনের কী হবে তাহলে? অনেক সাহস করে খোড়াতে খোড়াতে দাড়িয়ে কমান্ডারকে বলে ফেলল
- সাব ইয়ে সব আম আদমি হে , হামার গাও কা
এবার যেন কমান্ডার শক্ত হয়ে গেল। চোখটা অনেক বড় দেখাচ্ছে, একটু রাগতঃ স্বরেই বলে উঠল
- তুম যা সাকতে হ।
- সাব ইয়ে হামারা সামান হে সাব
মালামালের বাক্সটা নিয়ে খোড়াতে লাগল। সমিউল বুঝল আর ঘাটানো যাবে না। পরিস্থিতি আবারো খারাপের দিকে তার, অগত্যা ঘাটের দিকে নেমে একটা সাম্পানকে ঈশারা দিল।
সুর্য্ পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে, আধার ঘনিয়ে আসছে। সব সৈন্যরা এখনো অস্ত্র থেকে এক কদম দুরে দাড়িয়ে আছে কমান্ডারের আদেশ অনুযায়ী, সমিউল এখন একাই একটা সাম্পানের যাত্রী। কমান্ডার এখনো তাকিয়ে আছে সমিউলের দিকে, সাম্পানটা ক্যাঁ কুরুত ক্যাঁ কুরুত ‍নিজের শব্দ সহকারে ভাটার স্রোতের টানে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। খুব একটু একটু করে উজানে জামতলীর দিকে এগুচ্ছে সেটি। সমিউল সাম্পানের মাঝখানে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে পিছন দিক থেকে সারিবদ্ধ দাড়িয়ে থাকা সেই আট জনের দিকে। সাম্পানটা তাই সমিউলের পিছনের দিকে এগুচ্ছে, গুপ্তখালীর ঘাটটা আস্তে আসে যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। মাগরিবের লালাভ আলোয় আকাশটা অনেক রক্তিম হয়ে গেছে। সবকিছু ছায়ার মত লাগছে সমিউলের, কালো কালো কিছু অবয়ব যেন এদিক ‍ওদিক হয়ে যাচ্ছে মনে হল, তখনই শব্দগুলো ভেদকরে গেল সমিউলের কান। গুলির শব্দগুলো যখন তার কানে স্পস্ট হলো, বুঝাগেল না আট জনই লাশ হয়ে গেছে নাকি কেই বাঁচতে পেরেছে। কিন্তু তার অন্তরটা সে গোয়ালার মত হাউ মাউ করে উঠে শরীরটা ধপাস করে সাম্পানের মাঝখানে পড়ে গেল। লোকগুলোকে কোনভাবেই বুঝি হানাদারদের কবল থেকে বাঁচানো গেল না, সমিউলের মনে হল গুলি খেয়ে লাশগুলো গুপ্তখালির রাস্তায় রেললাইনের উপর যেভাবে পড়ে গেল সেই শব্দে সমিউলও সাম্পানের পাঠাতনে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। কান্নারত মাঝিটা সমিউলের নিথর শরীরটাকে বযে নিয়ে চলল জামতলীর ঘাঠের দিকে।
জ্ঞানহীন কতক্ষণ পড়ে ছিল ঠিক বুঝতে পারছেনা সমিউল, জ্ঞান ফিরতেই দেখল সাম্পানের মাঝখানে পড়ে আছে সে, আর সাম্পানে মাঝি মাল্লাদের বেশ কয়েকটা মুখ তার মুখের উপর উপুড় হয়ে তাকিযে আছে। কোন একজন তার মুখে পানি ছিটিয়ে দিয়ে ডাকছে তাকে
- অ বদ্দা, অ বদ্দা…
কিন্তু চোখ খুলতেই তার দিকে তাকিয়ে থাকা মাঝিদের সবগুলো মুখকে তার মনে হলো সে গোয়ালা দু’জন সহ আটটা মুখ তার দিকে চেয়ে আছে যাদের সে বাঁচাতে পারেনি, ভাগ্যগুনে নিজেই বেঁচে এসেছে শুধু, মুখগুলো যেন কিছুতেই তারে দৃষ্টির পিছু ছাড়ছেনা, বাধ্য হয়েই সে সাম্পানে পড়ে থেকে চোখ মুদে ফেলল আবার, এবার বুঝতে পারল মাঝিরা সবাই ধরাধরি করে তার দেহটাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে জামতলী বাজারের দিকে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন