বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৫২ / ৩.০

প্রেমের এপিটাফ

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সূর্যের তীব্রতা নয়, চন্দ্রের স্নিগ্ধতা চাই

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

শুক্লপক্ষের অপেক্ষায়

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৪ বৃষ্টি এবং নিছক প্রেমের গল্প

মনোয়ার মোকাররম
comment ১৪  favorite ১  import_contacts ৫৭৪
মাথার উপরে বর্ষার মেঘে ঢাকা আকাশটাকে সাথে নিয়ে আরামবাগের নটরডেম কলেজের সামনে থেকে যখন সে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে এই বাসটিতে উঠলো, দরজার সামনে থেকেই শেষের দিক থেকে তিন চারটা সিট সামনে বসে থাকা মেয়েটিকে চোখে পড়লো। প্রথম দেখাতেই তেমন আহামারি কিছু মনে হয় নি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মেয়ে। অবশ্য দূর থেকে অন্ধকারে গায়ের রঙ ভালো নাও বুঝা যেতে পারে। আমিনুলের মাথায় প্রথমেই যে ভাবনা এসেছিল তা হলো মেয়েটির পাশে যেন বসতে না হয়। একটা মেয়ের পাশে বসে বসে পুরো রাস্তা জার্নি করার মত বিরক্তিকর ব্যাপার আর হয় না। জোরে কাশি দেয়া যাবে না, হাচি আসলে মন খুলে হাঁচি দেয়া যাবে না, মেয়ে হয়তো এমনভাবে তাকাবে যেন জীবনে কাউকে হাঁচি বা কাশি দিতে দেখে নি, এই প্রথম বার দেখলো। অতঃপর নাকে একটা রুমাল বা টিস্যু চেপে নাক সিটকানোর ভঙ্গীতে বসে থাকবে। কিন্তু মানুষ যা চায় বা ভাবে তাই পেয়ে যাবে, তা ভাবার কোন মানে হয় না। বাসের কন্ডাক্টর যখন টিকেটটি বাসের ক্ষীন আলোয় দেখে তার ব্যাগটি নিয়ে পিছন দিকে যাচ্ছিলো এবং অবশেষে ঐ মেয়েটির সিটের মাথার উপরে মালপত্র রাখার জায়গাতে ব্যাগটি রাখলো তখন আমিনুলের মনে হলো পুরোটা দিন তার জলে গেলো। আর এত সুন্দর টানা দশ ঘন্টার ঘুমটাও তার বঙ্গোপসাগরে পড়লো। বাসের মধ্যে আমিনুলের ঘুম ভালো হয়। আমিনুলের অবশ্য সবসময়ই ঘুম ভালো হয়। প্রচন্ড টেনশনে আমিনুলের ঘুম সবচেয়ে বেশী ভালো হয়। কিন্তু একটা মেয়ের পাশে বসে তো আর ঘুমানোর রিস্ক নেয়া যাবে না। হঠাৎ মাথা কাত হয়ে তার উপর পড়ে-টড়ে গেলে কেলেংকারী। তার চেয়ে বড় টেনশন সে ঘুম কিভাবে নিয়ন্ত্রনে রাখবে। বাসের চলার গতির মধ্যে কেমন যেন একটা রিদম আসে, সিটে গা এলিয়ে দিলেই আমিনুলের চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

আমিনুল এবার কাছ থেকে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করলো। চেহারায় আহামারি তেমন কিছু নেই। দূর থেকে যেমন শ্যামবর্ণ মনে হয়েছিল, তেমনি। আধুনিকতার কোন ছাপ নেই। কিন্তু কোথায় যেন কি এক ধরনের কোমল, মায়াময় একটা আকর্ষণ আছে, যা এড়ানো খুব কঠিন। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক কি আমিনুল ধরতে পারছে না। হয়তো তার চোখ, কিংবা নাক, অথবা ঠোট। অথবা সব মিলিয়েই সে পরিপূর্ণ কোমলতা। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী কেমন ছিল তা আমিনুল দেখেনি, তবে এই মেয়ের কাছাকাছি হবে বলেই ধারনা।

কিছু মনে করবেন না, কক্সবাজারে যাচ্ছেন?
জ্বী। অনেকটা সময় নিয়ে উত্তর দিয়ে আমিনুলের দিকে একবার তাকিয়ে মেয়েটি আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরালো।
আমিও কক্সবাজার যাচ্ছি।
মেয়েটি শুধু একবার তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
আসলে আমার একটা ছোট্ট সমস্যা আছে।
এবার মেয়েটিকে কিছুটা বিরক্ত এবং একই সাথে কৌতুহলী মনে হচ্ছে।
আমার হঠাৎ হঠাৎ বমির সমস্যা আছে। সব সময় না। কিন্তু রিস্ক না নেওয়াই ভালো। কিছু মনে না করলে আমি জানালার কাছে বসতে পারি কি?

কিছুটা সময় দ্বিধাগ্রস্থের একটা চাহনী দিয়ে মেয়েটি আমিনুলকে জায়গা করে দিল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আমিনুল ও ঢুলতে শুরু করেছে। কিন্তু সে প্রানপনে চাইছে যেন ঘুম না আসে। ঘুম না আসতে চাইলে কথা বলতে হবে।

আপনি কি কক্সবাজারে ঘুরতে যাচ্ছেন?
জ্বী না। এখন বর্ষা মৌসুম। বর্ষা মৌসুমে কেউ কক্সবাজার ঘুরতে যায় না।
আসলে আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি যাতে আমার ঘুম না আসে। বাসে আমার প্রচণ্ড ঘুম আসে। আর ঘুম আসলেই দেখা যাবে আমি আপনার উপর ঢুলে ঢুলে পড়ে যাচ্ছি, সেটা দুজনের জন্যেই বিব্রতকর হবে।
ও। তা আপনি কেন কক্সবাজার যাচ্ছেন? ঘুরতে যাচ্ছেন?
জ্বী ঘুরতে যাচ্ছি। আমার ঘুরতে-টুরতে বর্ষা –গ্রীষ্ম কিছু লাগে না। আচ্ছা, কক্সবাজারে ভালো কি পাওয়া যায়, জানেন?
অনেক কিছুই পাওয়া যায়। তবে আমি যখুনি আসি শুটকী কিনে নিয়ে যাই। আমার সব চাইতে পছন্দের খাবার শুটকী ভর্তা।
কি? শুটকীর ভর্তা?
হুম, শুটকীর ভর্তা। চ্যাপা শুটকীর ভর্তা সবচে বেশী। খুব বেশী ভাজা হলে চলবে না। একটু কাঁচা কাঁচা ফ্লেভার থাকতে হবে।
কাঁচা কাচা ফ্লেভার? (আমিনুলের কেন যেন মনে হতে লাগলো তার গায়ে পড়া কথায় বিরক্ত হয়ে মেয়েটি তার সাথে ফাযলামি করছে)
জ্বী, কাঁচা কাচা ফ্লেভার।
শুটকী আমার পছন্দ না। আমার কি মনে হচ্ছে জানেন? আপনার হাতে শুটকীর গন্ধ লেগে আছে। সেটা আমার নাকে আসলেই আমার পেট উলটে বমি আসবে। আর এমন পরিস্থিতিতে আমার সত্যি সত্যি বমি করার নজির আছে। আপনাকে তাহলে ঘটনাটা বলি। একবার আমি এক মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। মেয়েকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছিলো। একটু ফাযিল টাইপের মেয়ে ছিল যদিও। তারপর কথায় কথায় বেরিয়ে আসলো, সেই মেয়ের শুটকী খুব পছন্দ। এমনকি আসার আগেও শুটকী ভর্তা খেয়ে এসেছে। আমি বললাম, চারপাশে শুটকীর গন্ধ আসছে। সে বললো, না তো? শুটকীর গন্ধ নেই তো! আমি বললাম, আমি নিশ্চিত আপনার হাতে শুটকীর গন্ধ লেগে আছে। সেখান থেকে শুটকীর গন্ধ আসছে। মেয়ে বললো, অসম্ভব, আমি তিন তিন বার হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে এসেছি। দেখুন কোন গন্ধ নেই। বলেই সে আমার নাকের কাছে হাত নিয়ে এলো। কি ফাজিল মেয়ে, একবার ভাবুন।
গন্ধ পেয়েছিলেন?
হুম, আমি দৌড়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে হর হর করে বমি করে দিলাম।

ঘন্টা চারেক আগেও যে মেয়েটির পাশে আমিনুল বসতে চায়নি, তার সাথেই আলোচনা শুটকীর ভর্তা লেভেলে চলে যাবে আমিনুল ভাবেনি ।

আমিনুল কক্সবাজার যাচ্ছে তার জন্যে মেয়ে দেখতে। দেখতে দেখতে বয়স তো কম হলো না। মেয়ে দেখাও কম হলো না। কিন্তু বিয়েটা কিছুতেই করা হচ্ছে না। প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তীরে এসে তরী ডুবার অবস্থা। সব কিছু মিল মতো হয়, কিন্তু শেষ মুহুর্তে কিছু না কিছু এসে আমিনুলের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দেয়। কখনো আবিষ্কার হয় মেয়ে শুটকী খায়, কখনো আবিষ্কার হয় মেয়ের অন্য কারো সাথে ঝুলাঝুলি চলছে। এবার আগে ভাগেই খোজখবর নিয়ে রেখেছে। কক্সবাজারে আমিনুলের বড় বোনের জামাই আছে, ডাচ বাংলা ব্যাংকের ম্যানেজার, তার কলিগের শ্যালিকা। কোন ঝুলাঝুলি নেই, শুটকী খায়না, সব কনফার্ম। শুধু আমিনুলের দেখে পছন্দ হলেই বিয়ে পাকা। বিয়েটা আসলেই করা দরকার। এসব চিন্তা করতে করতে আমিনুল ঘুমিয়ে পড়লো। আমিনুল স্বপ্নে দেখছে, বিয়ের পর সে হানিমুনে যাচ্ছে। এস আলম পরিবহনে যাচ্ছে। ইচ্ছে ছিল বউকে নিয়ে বিমানে করে যাবে। কিন্তু বউ বলল, কি দরকার এতগুলো টাকা নষ্ট করে বিমানে যাবার। তার চেয়ে চল এস আলমে যাই, টাকাগুলো বেচে যাবে। খুবই লক্ষী বউ আমিনুলের। আমিনুল বউকে নিয়ে এস আলমে করে রওয়ানা দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো বাস উঠার পরেই আমিনুল ঢুলতে শুরু করেছে। ঢুলতে ঢুলতে একেবারে বউ এর গায়ের উপর পড়ে গিয়েছে। আশেপাশে থেকে দুই একজন অতি উৎসাহী উকি ঝুঁকি মারছে। স্বপ্ন দেখছে বলে ঘুমের মধ্যে থেকেও আমিনুল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ এই ঘুমের মধ্যে থেকেই আমিনুলের মেয়েটা এসে আমিনুলকে ধাক্কাতে শুরু করেছে। আমিনুল ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে মেয়েটার দিকে তাকায়। তার তো বিয়ের এক বছরো হয় নি। মেয়ে আসলো কোত্থেকে। মেয়েটা মা-মা বলতে বলতে আমিনুলের বউ এর কোলে বসে পড়লো। আমিনুলের ঘোর কাটে। কোথায় তার বউ। এতো সেই শুটকী খাওয়া বাসের মেয়েটা। তার মেয়ে?

আমিনুলের মন বিমর্ষ হয়ে গেলো। আমিনুল এই বিমর্ষতার কোন কারনই খুজে পেলো না।

আমি কি আপনার গায়ের উপর ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম?
জ্বী
স্যরি, আমি আসলে ঘুমালে কিছু খেয়াল করতে পারি না। আপনি কিছু মনে করেননিতো।
না, আমি কিছু মনে করি নি।
বাবুটা কি আপনার মেয়ে।
জ্বী, আমার মেয়ে।
আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হয়নি আপনার ৫ বছরের একটা মেয়ে আছে। এতক্ষন কোথায় ছিলো?
ওর বাবার কাছে। ওর বাবা পিছনে বসে আছে।

আমিনুলের একবার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করে, মেয়েটি তার স্বামীর পাশে বসছে না কেনো? আবার ভাবলো, প্রশ্নটা ভদ্রজনচিত হবে না। হয়তো ঝগড়া-ঝাটি হয়েছে। তবে এইবার আমিনুল একটু সংযত হয়ে বসলো। ছি ছি, কি লজ্জ্বার ব্যাপার। আমিনুল যে মেয়েটির উপর ঘুমের ঘোরে পড়ে গেলো, নিশ্চই তা মেয়েটির জামাই দেখেছে। কি ভাববে। লজ্জ্বায় আমিনুল আর পিছনের দিকে তাকালো না।
আপনার হাজব্যান্ড কি কক্সবাজারেই থাকেন?
আমার হাজব্যান্ড?
জ্বী, বাবুর বাবা।
ও, আচ্ছা, বুজেছি, ও আমার বোনের মেয়ে।
তখন যে বললেন আপনার মেয়ে?
বোনের মেয়ে কি নিজের মেয়ে হতে পারে না?

আমিনুল পিছনে তাকালো। বাচ্চার মা বাবা পিছনে বসে গল্প করছেন। হয়ত আমিনুলকে নিয়েই কোন চটুল কথা বার্তা হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা আমিনুলের মনে একটা খুশির ঢেঊ খেলে গেলো। যার কোন কারণই আমিনুল খুজে পেলো না। আমিনুল আরো খেয়াল করলো, যে মেয়েটির সাথে কথা বলতে তার আস্তে আস্তে ভালো লাগতে শুরু করেছে। মেয়েটিকের সাথে আরো কিছু একটা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে তার।

আচ্ছা, আপনি কক্সবাজার কেনো যাচ্ছেন?
আমার বিয়ে ।

আমিনুলের বুকে ধড়াস করে আবার কি যেনো কি যেনো একটা কম্পন হলো।

কক্সবাজারে বিয়ে? আপনি কি কক্সবাজারেই থাকেন?
জ্বী

মেয়েটি ফাযলামো করছে কিনা আমিনুল বুঝতে পারলো না। হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। হঠাৎ কোন কারন ছাড়াই আমিনুলের মনে হলো এই মেয়েটিকে বউ হিসেবে পেলে মন্দ হতো না। তার হাতের শুটকী মাখানো দুই-চার লোকমা ভাতও আমিনুল অনায়াসে খেয়ে ফেলতে পারবে।

বাস চলছে সুন্দর একটা রিদমে,আর আমিনুলের মনে হচ্ছে, এই মেয়ের সাথে বিয়ে হলে আমিনুল তার সব জায়গা জমি বেচে দিয়ে একটা বাস কিনে ফেলতো আর যাযাবরের মত পথে পথে ঘুরে বেড়াতো। একটু পর পর মেয়েটির গায়ের উপর ঘুমিয়ে পড়তো। কি সুন্দর জীবন হতো তার।

হঠাৎ করেই বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো।

আপনি বোধ হয় এখন কম্ফোর্টেবল ফিল করছেন, আমি কি এখন জানালার পাশে বসতে পারি? একটু বৃষ্টি ছুয়ে দেখব!

মেয়েটি জানালার বাইরে প্রসারিত হাতে বৃষ্টি ছুয়ে তার গালে মাখিয়ে নিল। আমিনুল নিমগ্ন নয়নে তাকিয়ে আছে। তার ইচ্ছে করলো মেয়েটির গাল ছুয়ে দেয়।

বাস চলছে তার রিদমে, সাথে বৃষ্টির মোহ জাগানিয়া সুর। আমিনুলের ঘুম পাচ্ছে। কোমল নরম একটা কিসের যেন দুঃখ আমিনুলের ভিতরে বরফের কাঠিন্যের মত জমে আছে। আধো ঘুমে আমিনুল দেখলো ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটি অদ্ভুত ভাবে শব্দ করে হেসে চলেছে। আর আমিনুল ছুয়ে আছে মেয়েটির কোমল হাত। তার হাত থেকে শুটকীর কোন গন্ধ আসছে না।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন