বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২১ / ৩.০

গো-বৎস

অসহায়ত্ব আগস্ট ২০১৪

চমক রিয়েল এস্টেট প্রাঃ লিঃ

পরিবার এপ্রিল ২০১৩

নেই কেন খরশোলা

পরিবার এপ্রিল ২০১৩

বৃষ্টি (আগস্ট ২০১২)

মোট ভোট ৫৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৮ বৃষ্টি যখন মৌচাকে

আরমান হায়দার
comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৬৫৬
মগবাজার থেকে মালিবাগ, রাজারবাগ চৌরাস্তার দিকে এগুতে থাকলে মৌচাক নামে একটি মার্কেট চোখে পড়ে। মার্কেটটি ছোট হলেও এ রাস্তায় যাতায়াতকারীদের জায়গাটি চিনতে তেমন কষ্ট হয় না । কারন এখানে এলে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে। হেঁটে এলে, জনসমুদ্র মনে হয় জায়গাটাকে। পথিক যে জনস্রোতে হাঁটতে হাঁটতে আসেন, সেই স্রোত এখানে এসে গতি হারিয়ে ফেলে। যারা প্রাইভেট কারে,ট্যাক্সিতে বা রিক্সায় চড়েন ,কোন এক যাদুর ছোঁয়ায় তাদের বাহনের চাকাগুলোও এখানে এসে থেমে যায়। যদি বাসে কেউ চেপে বসেন তাদের জন্যও অনেক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে। বিভিন্ন পদের হকার বাসে উঠে পড়ে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী মজমা জমানোর লেকচার শুরু করে। সবচেয়ে আকর্ষনীয় বক্তৃতা দেয় কৃত্রিম লিচু বিক্রেতা। সে ছন্দ মিলিয়ে তার পণ্যের গুনগান করতে থাকে। ভাইজান, চাচাজান! পকেট রাখেন সাবধান। আমার নাম বাচ্চু, বিক্রি করি লিচু। আহারে! কী মজার লিচু, নিয়ে যান কিছু। ছোট বেলায় খাইছেন গাছে, এখন পাইবেন বাসে, আমার মা গেছে মইরা , কম দামে লিচু দিছি ছাইরা। ------ ইত্যাদি। মোটামুটিভাবে এ ধরনের হকাররা যখন নাতিদীর্ঘ বয়ান করতে শুরু করে তখন যাত্রীরা ধারণা করে ফেলেন মগবাজার ওয়ারলেস ছেড়ে গাড়ি মৌচাকের কাছাকাছি এসেছে এবং এখন এই স্থানে ডিমসিদ্ধ হতে হবে অথবা পাশের দোকানগুলিতে তৈরী হতে থাকা পিয়াজু, বেগুনী, ঘুগনীর মত গরমে , ধূঁয়ায় ভাজাভাজা হতে হবে। তাই মৌচাক এলেই ছয় নম্বর বাসের বিশাল পেট থেকে যাত্রীরা ঝুপঝুপ করে একে একে নামতে থাকেন। জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই যেমন আগাম জাতের আমগুলো টুপ টুপ করে গাছ থেকে পড়তে থাকে তেমনি ভু্ক্তভোগী যাত্রীরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই যেন আগাম জাতের পাকা আম বনে যান, বাসে আর অপেক্ষা করেন না। শুধু মাত্র নতুন যাত্রীরা বসে থাকেন। তারা কৃত্রিম লিচু বিক্রেতা, তিনমাসে হরহর করে ইংরেজী বলার বই বিক্রেতা, খুসখুসে কাশির জন্য স্টেপসিল বিক্রেতা, ছোট সোনামনিদের জন্য যাদুর চক, তেলাপোকা মারার জন্য বিষের চক এসব বিক্রেতার একটানা মনকাড়া ক্যানভাস শুনতে থাকেন।

সাখাওয়াত সাহেবের এসব শুনতে মন্দ লাগে না, তবে বাসের মধ্যে অপেক্ষা করে করে ডিম সিদ্ধ, পটলসিদ্ধ হতে চান না । গাড়ি একটু স্লো হতেই তিনি গাড়ির ভিতর থেকেই মাথা উঁচু করে সামনে রাস্তার যানজটের অবস্থা অাঁচ করার চেষ্টা করেন। একাজে আরো অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হয় তাহলে যানজটের পরিমান ও সময় সম্পর্কে সঠিক ধারনা করা যায়। সাখাওয়াত সাহেবের মাথায় সহসাই এ হিসাবটাও খেলে গেল ,এখন মাসটা শ্রাবণ, দিনটা বৃহস্পতিবার, সময়টা অফিস ছুটির পরপর ।এ সময়ে এখানে গাড়ি এখানে দাঁড়ানো মানেই কমপক্ষে ত্রিশ মিনিট লাগবে এই সিগনাল ক্রস করতে আর প্রতিক্ষার ত্রিশ মিনিট তার কাছে তিন যুগ মনে হয়। প্রচন্ড গরম পড়েছে, আকাশে মেঘ জমছে, বৃষ্টি হতে পারে যেকোন সময়। সবকিছু ভেবে তিনি কোন কিছু কাউকে বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন না। মালিবাগ পর্যন্ত ভাড়া দিয়েছিলেন, সেই অতিরিক্ত ভাড়া ফেরৎও চাইলেন না, চাইলে কন্ডাকটরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না; তাই ঝুপ করে নেমে পড়লেন তিনি।

এখানে গাড়ি থেকে নেমেও শান্তি নেই। গাড়ির গা ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে রিক্সার সারি একসারি, দুই সারি, তিন সারি । সাখাওয়াত সাহেব ডানে কাত হয়ে পা দুটো একে একে ভাঁজ করে ভীষন অবাক করা সার্কাসি কায়দায় এক সারি রিক্সা পার হলেন, পরের সারি হেঁটে পার হওয়া যাবেনা দেখে সোজা একটি খালি রিক্সার ওপর উঠে ওপারে নেমে গেলেন এবং সর্বশেষ সারি পার হতে রিক্সাওয়ালাকে একটা ধমক দেওয়ার কৌশল নিতে হল। দুর্বল রিক্সাওয়ালা হলে ধমকে কাজ হয়, এক্ষেত্রেও হল। ধমক খেয়ে নিজের দোষ হয়েছে ভেবে বুড়া রিক্সাওয়ালা খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে রিক্সার হ্যান্ডেলটা ঝাঁকাঝাঁকি করে একটু জায়গা করে দেওয়ায় বহু কসরতের পর সাখাওয়াত সাহেব ফুটপাত পর্যন্ত পৌঁছালেন। ফুটপাতেও বহু গাড়ির সমাহার। এদিক ওদিক করে রাখা আছে। ও দিকে পেপার হাতে বসে আছে কেউ; বরিশালের আমড়া, বরিশালের আমড়া বলে চিল্লাচ্ছে এক হকার। কোন দিকে তাকাবার সময় নেই কারো। সাখাওয়াত সাহেবেরও নেই। তিনি ধাই ধাই করে হাঁটছেন, এর ওর সাথে ঠোক্কর খাচ্ছেন। যত দ্রুত সম্ভব তিনি তিনরাস্তার মোড় টপকে কোনভাবে যদি ওপারে মারুফ মার্কেটের পাশের গলিতে পে্Šছাতে পারেন তবে তিনি তার বাসার গলি আতরবিবি লেন পেয়ে যাবেন। এই লেনে এলে সাখাওয়াত সাহেব একটি বড় রকম তৃপ্তি পান। আত্মতৃপ্তিটা এই কারনে যে, এত কষ্ট করে হলেও হেঁটে মৌচাক থেকে আতরবিবি লেন পেয়ে গেলেন তিনি, অথচ এখনো তার ছয় নম্বর বাসটি নিশ্চিতভাবেই সেই মৌচাকের সিগনালেই দাঁড়িয়ে আছে। আজ এই মুহুর্তেও সাখাওয়াত সাহেব এসব কথা ভাবছেন এবং মনে মনে আনন্দ পাচ্ছেন । ভাবছেন বাঙালীর আনন্দ কিসে? যানজট থেকে নাকাল অবস্থায় কোন রকমে একে ওকে টপকে রীতিমত হাডুডু বা গোল্লাছুট খেলে যেন বাসার কাছাকাছি আসতে পারাটাই তার জীবনের চরম কৃতিত্ব,পরম সার্থকতা। হঠাৎ মামা ! মামা! ডাক শুনে তাকালেন সাখাওয়াত সাহেব। সালাম জানালো হাত তুলে এবিসি।


এই সেই দোকান, এই সেই মোড়, আতরবিবি লেনের এই মোড়কে নিজে নিজেই একটি নাম দিয়েছেন সাখাওয়াত সাহেব; এবিসির মোড়। এখানে এসে প্রায় প্রতিদিনই একটু থামেন সাখাওয়াত সাহেব। অফিস থেকে ফেরার পথে একবার, ছুটির দিনে অগ্নিমূল্যের বাজার থেকে আগুনের পরশমনি নিয়ে ফিরবার পথে একবার এবং যখনই একটু অবসর পান তখনই একবার তিনি আতরবিবি লেনের এই এবিসি মোড়টাতে একবার এসে দাঁড়ান। তেমন কেউ ছালাম দেয় না, দেয় শুধু ভিক্ষুক এবিসি। সাখাওয়াত সাহেব লক্ষ্য করেছেন ইদানীং সালাম দেওয়ার প্রথা কেমন যেন উঠে যাচ্ছে। ঠেকায় পড়ে অফিসে কাজের জন্য যারা আসেন তারা এবং এবিসির মোড়ে এই লুলা ভিক্ষুকটাই কেবল তাকে নিয়মিত সালাম দেয়। এই অপূর্ণ,অপূর্ণাঙ্গ,বিকৃতাঙ্গের লুলা,কুঁজো ভিক্ষুকটির নাম এবিসি। যদিও এবিসির মোড়ের মত ভিক্ষুকের নামের এই সংক্ষিপ্তকরনটিও সাখাওয়াত সাহেবের নিজেরই করা। এখানে এসে যাত্রাবিরতি দিয়ে সাখাওয়াত সাহেব একটা সিগারেট বের করে চায়ের দোকান থেকে এক কাপ চা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে এবিসির সাথে আলাপ জুড়ে দেন। তিনশত পয়ষট্টি দিনে একবছর, এভাবে কয়েক বছরে কয়েকটি শতক দিনের আলাপচারিতায় এবিসির কাহিনী তার অনেকটা মুখস্ত হয়ে গেছে। পুরো নাম আবু বকর সিদ্দিক। আবু বকর সিদ্দিকের শরীরটি এমন কিম্ভূতকিমাকার যে সেখানে একটি সাদাটুপি পড়া মাথা আর অতি সরু দুটি হাত ছাড়া তেমন কিছুই নেই । শারীরিক প্রতিবন্ধী সে। একেবারে অপুর্ণাঙ্গ দেহ, এক থেকে দেড় ফুট আকারের সংক্ষিপ্ত মানুষ। তাই সাখাওয়াত সাহেব তার নামও সংক্ষিপ্ত করে ডাকেন এবিসি।

গ্রামের বাড়ির কথা এবিসির তেমন একটা মনে পড়ে না। তবে পটুয়াখালী ও লেবুখালী শব্দ দুটো মনে আছে তার। পাশে একটা গাঙ আছে, নাম তার মনে নেই। জন্মের পর বাবা মাকে দেখে নাই বা দেখেছে কিনা মনে নেই আবুবকর সিদ্দিকের। তার এক মামা ছিল সে তাকে নিয়ে কিছুদিন লালন পালন করেছে। তারপর একদিন তার মামা আবুবকর সিদ্দিককে সামাদ লঞ্চে তুলে দেয় । আশা, ঢাকা শহরে এলে কিছু খেয়ে হয়তো ভাগ্নেটা বেঁচে থাকবে। সেই থেকে আবু বকর সিদ্দিক শহরের এই মৌচাকে আছে। এখন সে মৌচাকের পাশেই আতরবিবি লেনে বসে এবং মানুষের দেয়া দু ’এক টাকায় কোনরকমে খেয়ে-পরে বেঁচে আছে । সেই মামার কথা জিজ্ঞেস করলে আবুবকর সিদ্দিকের সেই হাসি মুখের জবাব,
-‘ মামা হয়তো বেঁচে নেই, থাকলে এতদিনে অন্তত একবার খোঁজ নিত। তবে বেঁচে থাকলে ঠিকই একদিন আসবে মামা।’ এই একটি বিশ্বাসের জায়গা বড় প্রবল এবিসির। এবিসি এখনো মনের একান্তে ভাবতে ভালবাসে তার মামা হয়তো একদিন হঠাৎ করেই এসে তাকে নিয়ে যাবে। যতবার সাখাওয়াত সাহেবের সাথে কথা হয়েছে এবিসি ততবারই এই একটি বিষয় এতটাই জোর দিয়ে বলেছে তাতে সাখাওয়াত সাহেবেরও মনে হয়েছে আবু বকর সিদ্দিকের জীবনে এক অকৃত্রিম স্নেহদাতা একমাত্র তার মামা। মা নয় বাবা নয় , সবই তার মামা। এ জন্য এবিসি যাকে দেখে তাকেই মামা বলে ডাকে; তা সে ছেলেই হোক, মেয়েই হোক। মামা বলেই সরু কঞ্চিবাঁশের মত দুটি হাত তুলে সালাম দেয়। মুখে চারটি বড় দাঁত বের করা হাসি। সাখাওয়াত সাহেবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। সেই প্রথম দিন থেকে আবু বকর সিদ্দিক তাকে মামা বলে ডাকে। লুলা দুটি হাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম করে।

সাখাওয়াত সাহেব আজও লক্ষ্য করলেন , এবিসি সেই হাত দুটির একটি কপালে ঠেকিয়ে তার সাখাওয়াত মামাকে সালাম করলো। সাখাওয়াত সাহেব সালামের জবাব মনে মনে দিয়ে এবিসির দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন, চোখের একটা ইশারা করলেন যার অর্থ, কেমন আছো ভাগ্নে? এই তো আমি এসে গেছি । এরকম আরো অনেক অন্তরঙ্গতার দৃষ্টি বিনিময় করেন সাখাওয়াত সাহেব ও এবিসি । একটি সুন্দর হাসি দেয় এবিসি। এই হাসিটুকুর বিনিময়ে তিনি প্রতিদিন দু’টাকার একটি কয়েন দেন। একটু খুশি করেন এবিসিকে। কিন্তু আজ এতো সব চিন্তা করে নিজের চলার গতিকে কমাতে চান না সাখাওয়াত সাহেব । তাড়াতাড়ি পৌঁছুতে হবে শান্তিবাগের বাসায়। অনেকক্ষন ধরেই আকাশে শ্রাবনের মেঘের সাজসাজ রব। যেকোন সময় বৃষ্টি শুরু হতে পারে। ঢাকা শহরের যে ড্রেইনেজ ব্যবস্থা তাতে এক ইঞ্চি বৃষ্টি হলেই তিন ফুট পানি জমে যাবে মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর,শান্তিবাগের ওলিতে গলিতে।&

আকাশে অনেকদিন পর ঘন কালো মেঘ জমেছে সেখান থেকে দু’ এক ফোটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। দ্রুত পা ফেলে হেঁটে যেতে থাকেন সাখাওয়াত সাহেব। পিছনে পড়ে থাকে লুলা ফকির এবিসি। সে এখানেই আতর বিবি লেনের রাস্তায় একটি বাড়ির পাশে এখন বসে থাকবে ; রাতটুকু কাটানো জন্য অপেক্ষা করবে। গেটের মুখেই শুয়ে বসে থাকে। শুয়ে বসে থাকে মানে শারীরিক গঠন শোয়ার উপযোগী নয়। তাই শোয়া হয় না এবিসির, আধশোয়া হয়ে বসে থাকে একটি বস্তায় হেলান দিয়ে। বাড়ির মালিক নাকি ভাল মানুষ । কিছু বলে না , পাহারায় থাকা কুকুরটিও এখন আর তেমন কিছু বলে না। ওকে বসে থাকতে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না। মাঝে মাঝে শুধু রাত্রে এসে গা শুঁকে ফিরে যায়।



এতকক্ষন কিছু আগাম শীতল বাতাস বৃষ্টির সংকেত দিয়ে আসছিল। এখন সাখাওয়াত সাহেব বাসায় হুড়মুড় করে ঢুকে মাথার চুলে হাত বুলাতেই বুঝলেন বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আরো আগেই। এসে বাসার দরজা বন্ধ করতে না করতেই যেন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল। মেঘের গর্জন। শা শা শব্দ। কাল বৈশাখাীতে যেমন হয়, তেমন ঝড়। কিন্তু বৃষ্টিটা শ্রাবণেরই অঝোর ধারার বৃষ্টি। ঋতু পরির্বন হচ্ছে। এখন এদেশে শেষ শ্রাবণেও কালবোশেখী হয়। আর আজ এই কালবোশেখীর ছুতো দেখিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের পোয়াবারো অবস্থা। একেবারে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে লোডশেডিংয়ে পরিপক্ক হাতের অধিকারী বিদ্যুৎ বিভাগ। কোন চিন্তা,দুঃশ্চিন্তা, দায়বদ্ধতা নেই। ঘুমের বড়ি খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে যেন ইলেকট্রিসিটির লোকজন। তারা একটা অজুহাত পেয়ে গেছে। ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যাতে কেউ দুর্ঘটনার শিকার না হন তার জন্য বৃষ্টির একটু ঠান্ডা হাওয়া পেয়েই ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে দেন, আজকেও দিয়েছেন। সাখাওয়াত সাহেব কিছু দেখতে পাচ্ছেন না, শুধু শুনতে পাচ্ছেন। চারিদিকে শুধু বৃষ্টির শব্দ , ঝড় ঝাপটার শব্দ। হঠাৎ বাইরে কোথাও হৈচৈ শোনা গেল। শা... শা, মা. . মা। বোধ হয় কোথাও কারো বস্তি ঘরের টিনের চালা উড়ে গেছে অথবা মহল্লার কোন গলির দোকানের বেড়া আছড়ে পড়েছে ঝড়-বৃষ্টিতে। সাখাওয়াত সাহেব একবার বারান্দা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন, ঝড়-বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ বিভাগের বদৌলতে কিছুই দেখতে পেলেন না তিনি। শুধু কানে এল শা . . . শা, মা. . . মা শব্দ।

সকালে সাখাওয়াত সাহেবের ঘুম ভাঙ্গলো বৃষ্টির মাঝে । জানালা ফাঁকে উঁকি দিয়ে নীচে তাকালেন তিনি। গলির রাস্তায় এক নদী পানি। যেন নুহের আমলের বন্যা । অনেকেরই কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে এখন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও এক হাঁটু জল ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে গার্মেন্টেসের কাজে যাচ্ছে মেয়েরা। আজ এমনদিনে বাসায় বসে থাকতে মন চাইলেও মানুষের হাঁকডাক শুনে আর পানিকে মারিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের পথচলা দেখে সাহস করে ছাতা মাথায় বের হলেন সাখাওয়াত সাহেব। হাঁটতে থাকলেন আতরবিবি লেনের এবিসি মোড়ের দিকে। কিছুদূর যেতেই দেখলেন আতর বিবি লেনে পানির মধ্যে মানুষের জটলা। সেখানে গিয়ে জানা গেল বৃষ্টির জমে ওঠা পানিতে ডুবে গতরাতে মারা গেছে এবিসি। একে-ওকে,দোকানীকে, বড়বাড়ির গেটের কুকুরটাকে জিজ্ঞেস করলেন, সাখাওয়াত সাহেব। কি হয়েছিল? কুকুরটা জবাব দিল ঘেউ ঘেউ। মানুষের মধ্যে তেমন সদুত্তর দিতে পারলো না কেউ । অনেক জিজ্ঞাসার পর চায়ের দোকানী বললো,
-‘ আমি কাল রাতে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতেই দোকান বন্ধ করে চলে গেছি । তখনও এই লুলাডা এইখানেই আছিল। ’ সাখাওয়াত সাহেব অনুযোগের সুরে বললেন,
- ‘ একটা অসহায় মানুষকে তুমি এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে ফেলে রেখে যেতে পারলে ?’
-‘ কি করবো স্যার। এত বড় ঝড়-বৃষ্টি বাপের জম্মে দেখি নাই। কোন রকমে দোকানটা বন্ধ করে জানে বেঁচেছি। বৃষ্টির মধ্যে যে যার মত চলে গেল, কত লোকই তো চলে গেল। কেউতো লুলাডার দিকে ফিরেও তাকালো না। আপনিও তো কাল অফিস থেকে ফেরার পথে ওকে দেখলেন । তারপর মেঘ দেখে বৃষ্টি আসবে বলে চলে গেলেন। আপনিও তো কিছু করলেন না ওর জন্য।’
দোকানদারের কথায় থতমত খেয়ে গেলেন সাখাওয়াত সাহেব। কয়েকমুহুর্ত নির্বাক কেটে গেল সাখাওয়াত সাহেবের । কি করবেন ,কি বলবেন,কাকে বলবেন, ভেবে পেলেন না। এটাতো ছয় নম্বর বাস থেকে নেমে মৌচাক পারি দেওয়ার মত বাহাদুরী কোন কাজ না যে সাখাওয়াত সাহেব সেই কাজটি করবেন এবং তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে সিগারেট ও চা হাতে দাঁড়াবেন এই এবিসি মোড়ে। গল্প করবেন এটা সেটা কত কি।
কেউ একজন জিজ্ঞেস বললো, এসব ভিক্ষুকদের দেখা শোনা করার জন্যতো লোক থাকে। ওরা কেউ ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে নিতে আসে নাই।
-‘ ওরও দেখার লোক আছে। হেই বেডা। গাড়িতে গাড়িতে লিচু বেচে। হেয় কাল আসে নাই। লূলাডা ডুবে ডুবে পানি খাওয়ার সময় আমি আছিলাম। হেই বেডারে দেখি নাই। ’ বললো কোন এক মহিলা কন্ঠ । সাখাওয়াত সাহেব তাকালেন তার দিকে। দেখলেন, এরই মধ্যে আতরবিবি লেনের নোঙরা পানিতে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে লাঠিতে ভর করে আবু বকর সিদ্দিকের কাছে চলে এসেছে বস্তিবাসী এক বুড়ি। সেও কাল রাতে এখানে বসে কাটা-ফাটা,ফেলনা তরকারী বেচছিল। কাল রাতে বৃষ্টি বাতাসের মধ্যে কোন রকমে প্রাণে বেঁচেছে। সে লুলাডাকে রক্ষার জন্য এগুনোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গায়ে শক্তি না থাকায় লুলাডার কাছে আসতে পারে নাই। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে কোন রকমে নিজের আশ্রয়ে পেঁŠছেছে। আজ সকালে দেখতে এসেছে। এখন সেই বুড়িমা এগিয়ে এসে আবু বকর সিদ্দিকের গায়ে হাত রেখে পরম মমতায় বলতে লাগলো,
-‘মরে ভালই করছিস রে লুলা। জ্বালা যন্ত্রণা একবারে গেছে। মরার আগে বানের মধ্যে গলা ফাটাইয়া হুদাই ডাকলি , মামা মামা। মোরে বাঁচাও। বৃষ্টি-বানে ডুবে মরলাম মামা। মোরে বাঁচাও! মামা, বাঁচাও! হুদাই ডাকলি , কারে ডাকলি ?’
বুড়ির কথা শুনে সাখাওয়াত সাহেবের মনে হল সে কারো মামা না। এই শহরে কেউ কারো মামা না। ঝড়বৃষ্টির নীচে সবাই লুলা,টুন্ডা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • Sisir kumar gain
    Sisir kumar gain সুন্দর গল্প।ভাল লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ১৩ আগস্ট, ২০১২
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ আরমান ভাই, অনেক ভালো গল্প লিখেছেন। এমন মমতাস্পর্শী মানবধর্মী লেখা হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ আগস্ট, ২০১২
  • মোঃ আক্তারুজ্জামান
    মোঃ আক্তারুজ্জামান বৃষ্টি সংখ্যায় প্রেম রোমাঞ্চ-এর মত অনেক কিছু উঠে আসবে এটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আন্দাজ করেছিলাম| আপনি একেবারই অন্যরকম দিয়েছেন ভাই| যে কথা বলা দরকার তেমনি দরকারী কথা বলে লেখাটাকে সার্থক করে তুলেছেন| অনেক অনেক ধন্যবাদ- খুব ভালো একটা গল্পের জন্যে|
    প্রত্যুত্তর . ২৬ আগস্ট, ২০১২