বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৫৯টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

অ্যাঞ্জেল

কামনা আগস্ট ২০১৭

শূন্য ঘর

নগ্নতা মে ২০১৭

তোমায় ভালো বেসেছিলাম বলে

অবহেলা এপ্রিল ২০১৭

গল্প - নগ্নতা (মে ২০১৭)

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৮ বেআব্রু

রীতা রায় মিঠু
comment ২১  favorite ০  import_contacts ৩১৯
সুজাতা আজকাল খুব ঠেকা না হলে মাস্টার বেডরুমে শোয় না। বরের প্রতি তীব্র অভিমান জমেছে ওর মনে, ইদানিং অভিমানগুলো মাঝে মাঝে আক্রোশ হয়ে বের হতে চায়। ইচ্ছে করে প্রদীপের উপর হামলে পড়ে সারা শরীর খামচে আঁচড়ে দিতে, চুলগুলো ছিঁড়ে ফেলতে মন চায়।
এই বাড়িতে চারখানা বেড রুম। মাস্টার বেডরুম ওদের স্বামী স্ত্রীর জন্য, মাস্টার বেডরুমের পাশের রুমটি একমাত্র মেয়ে কোমলের। একটি গেস্ট রুম হিসেবে রাখা আছে, চতুর্থটিতে সুজাতার শ্বশুর শাশুড়ি থাকেন। কোমল গত বছর কলেজে চলে যাওয়ার পর ওর রুমটা ফাঁকা আছে। গেস্ট রুমটা বছরের বেশির ভাগ সময় খালিই থাকে, থাকার মত গেস্ট কেউ আসেনা। বন্ধুবান্ধব যারা আছে, তাদের সকলেই কাছাকাছি থাকে। দূরের বন্ধু বছরে এক আধবার বেড়াতে এলে তবেই গেস্টরুমটা ব্যবহার হয়। আমেরিকায় সুজাতার দিক থেকে কোন আত্মীয়স্বজন নেই, প্রদীপের আত্মীয়স্বজন বেশ কিছু আছে আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে, অনেক দূর বলে তাদের সাথেও আসা যাওয়া নেই, যা কিছু কথা ফোনে হয়। তবে প্রদীপের বোন পাশের স্টেটেই থাকে, তিন ঘন্টার ড্রাইভিং দূরত্ব। বোন মাঝে মাঝে বেড়াতে এলে দুই এক দিন মা বাবার সাথে কাটিয়ে যায়।

প্রদীপের সাথে মানসিক দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পরেও সুজাতা মাস্টার বেডরুমেই থাকতো। কিন্তু এখন একা ঘুমায়। গেস্ট রুমটাকেই নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে। ওর বেডরুম থেকে ড্রেসিং টেবিলটাকে সরিয়ে গেস্টরুমে নিয়ে এসেছে। ড্রেসিং টেবিলটা ওর কাছে রূপকথার গল্পে পড়া যাদুর আয়নার মত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায়ই সুজাতা ছোটবেলার মত চোখ মুখ নাচিয়ে আয়নাকে জিজ্ঞেস করে, “ আয়না আয়না, এই পৃথিবীতে সবচে সুন্দরী কে?”
আয়না জবাব দেয়, “ এক নাম্বার কোমল, দুই নাম্বার সুজাতা”।
চার বছর আগেও আয়না বলতো, “ সুজাতা সবচে বেশি সুন্দর”। কিন্তু কোমল বড় হওয়ার পর থেকে বলে, “এক নাম্বার কোমল, দুই নাম্বার সুজাতা”। সুজাতার খারাপ লাগেনা, বরং কোমল তার মায়ের চেয়েও বেশি সুন্দরী হয়েছে দেখে ভাল লাগে। সুজাতার চেহারায় অবশ্য একটু আধটু গলদ আছে, এই যেমন দাঁত সুন্দর নয় বলে সুজাতা মুখ খুলে হাসতে পারে না, কিন্তু কোমলের সেই সমস্যা নেই। ওর সব সুন্দর। যদিও কোমলের ফিগার মায়ের মত ধারালো হয়নি। সুজাতার ফিগার দেখার মত।

সুজাতা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে। ঘাড় একবার ডানে হেলায়, একবার বাঁয়ে। চোখ সরু করে তাকায় একবার, মসৃণ গালে হাত বুলোয়, একটু উষ্ণ ঠোঁটস্পর্শ পেতে মন চায়। মাঝে মাঝেই সে এমন ছেলেমি করে, ছোটবেলার নেশা। “সুজাতা খুব সুন্দরী” ছোটবেলা থেকে এত বেশিবার শুনেছে যে নিজের রূপ সম্পর্কে অন্তরে আজও এক ধরণের অহঙ্কার বয়ে বেড়ায়। উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ ফিট, গৌড় বর্ণ। বয়স চল্লিশেও তার দেহ মজবুত, মাসল এখনও ঢিলে হয়নি কোথাও। পেটে মেদ নেই, কোমরে এখনও খাঁজ বুঝা যায়। সুডৌল স্তন, কোমলকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত ব্রেস্ট ফিডিং করিয়েও স্তন ঝুলে পড়েনি। মাথার চুল এই বয়সেও কোমর ছাড়িয়ে থাকে। চুলে এখনও পাক ধরেনি। চোখ দুটো ভ্রমর কালো নাহলেও বেশ ঝকঝকে, চাহনিতে অল্প স্বল্প জাদু আছে। অবশ্য দাঁত নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে থাকে, দাঁতগুলো সমান নয়। এজন্য মুখ খুলে হাসে না। ওর ধারণা ওর হাসিটা সুন্দর নয়। এই একটা ত্রুটিই যেন ওকে রেইস থেকে অনেকটা পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
তেমন কিছু খারাপও নয়, এমন অনেকেরই থাকে। সামনের পাটির দুই দাঁতের মাঝে কিছুটা ফাঁক আছে। স্কুলে পড়ার সময় বান্ধবীরা বলতো, ‘সুজাতা, তোর সামনের দাঁতে অতখানি ফাঁকা, তোর বর তোর আগে মারা যাবে”।
সুজাতার বুক কেঁপে উঠতো, অদেখা বরের জন্য মন খারাপ হতো, চোখে জল চলে আসতো। প্রতি সন্ধ্যায় মা যখন তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালতো, সুজাতা মাটিতে গড় হয়ে প্রণাম করে ঠাকুরের কাছে বলতো, “ ও ঠাকুর, তুমি আমার সামনের দাঁতের ফাঁকা বন্ধ করে দাও। আমার বর যেন মরে না যায়”।

সুজাতার বুক থেকে অনেক বড় দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। যে অদেখা বরের জন্য সুজাতা তুলসীতলায় গড় হয়ে প্রণাম করতো, ঠাকুরের কাছে বরের আয়ু চাইতো সেই বর দুয়োরাণীর কাছে চলে গেছে!
গতরাতের কথা মনে হতেই সুজাতার মুখের ভেতর তেতো লাগছে। গত রাতে প্রদীপের সাথে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়া একেবারে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সুজাতার বন্ধু বান্ধব সকলেই জানে, সুজাতার বর ঘরে সুন্দরী স্ত্রী রেখেও বন্ধুর বউয়ের সাথে পরকিয়া প্রেম করে। সুজাতার বরকে প্রায়ই অন্য এক নারীর সাথে কফি শপে দেখা যায়, থিয়েটার হলে দেখা যায়। বন্ধুরা আবার এসব গল্প সুজাতার কানে পৌঁছে দেয়। প্রথম প্রথম প্রদীপ বলতো যে ওর বন্ধুর সাথে বউয়ের বনছেনা, ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার অবস্থা। প্রদীপ চায়না ওদের ডিভোর্স হয়ে যাক, তাতে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বন্ধুর বউ বিপদে পড়বে। তাই প্রদীপ নাকি বন্ধু আর বন্ধুর বউকে আলাদা আলাদা বসে বুঝাচ্ছে যেন ডিভোর্স না করে।

সুজাতা আবার নারীবাদী, স্বামী হলেও ওর কাছে কোন ছাড়াছাড়ি নেই। ফেসবুকে স্বামীকে নিয়ে গরম গরম কথা বার্তা, ফেসবুকের সকল নারীকে স্বামীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হওয়ার বিপ্লবী আহবান জানায়। প্রচুর লাইক পায়, বন্ধুরা আরও শুনতে চায়। সুজাতা একেবারে ঘরের কথা উচ্চস্বরে প্রকাশ করে দেয়। ওর বরের জন্য ও কতখানি স্যাক্রফাইস করেছে, বিনিময়ে বর বন্ধুর বউয়ের সাথে ডেটিং করে। ফেসবুকে যারা এসব রসালো কথায় মজা পায়, ব্যাপারটাকে আরও রসালো করার জন্য সুজাতার স্বামী বিরোধী স্ট্যাটাস, পুরুষ বিদ্বষী স্ট্যাটাসের স্ক্রিন শট প্রদীপের ইনবক্সে পাঠিয়ে দেয়। স্ক্রিন শট পাঠায় কারণ সুজাতার বন্ধুরা জানে, সুজাতা এতটাই নারীবাদী যে “স্বামীকে পাত্তা দেইনা” বুঝাতে ব্লক করে রেখেছে।

গতকাল বোধ হয় প্রদীপের মেজাজ খুব বেশীই খারাপ ছিল। সে পুরুষ, তার সম্মান যাওয়ার ভয় নেই। কিন্তু বন্ধুর বউয়ের নামে বদনাম যেভাবে ছড়াচ্ছে সুজাতা, বন্ধুর সংসার জোড়া লাগবে কি করে? গতরাতে বাইরে থেকে ফিরে প্রদীপ সরাসরি সুজাতার ঘরে এসেছিল। ফোন থেকে ফেসবুকের স্ক্রিন শট দেখিয়ে প্রশন করেছিল, কেন সে ফেসবুকে এসব লিখে?
সুজাতাও ঝাঁঝিয়ে বলেছিল, পরস্ত্রির সাথে পরকিয়া করবে, আর আমি বললেই দোষ? আমাকে কি দিচ্ছো? আমাকে কোন সুখ দিয়েছো? এখন আমার মনে হয়, আমি তোমার রক্ষিতা ছাড়া আর কিছু ছিলাম না”।

এই কথা শুনেই প্রদীপ “ শাট আপ” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই সুজাতা প্রদীপের শার্ট খামচে ধরে ক্ষিপ্ত গলায় বলেছিল, “ কী করবে? কী করবে তুমি? বদলোক, দুশ্চরিত্র। নিজের স্ত্রীকে সামাল দিতে পারেনা, নিজের স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে পারেনা, সে যায় অন্যের বউয়ের কাছে ভিক্ষা চাইতে। কাপুরুষ, ইমপোটেন্ট কোথাকার!” তখনই দুটো বোতাম খুলে ছিটকে কোথায় পড়ে গেছে। প্রদীপও পালটা ওর গালে ঠাস করে এক চড় লাগিয়ে দেয়।

এই যে রাম রাবনের যুদ্ধ চলছিল, পাশের ঘরেই যে সুজাতার শ্বশুর শাশুড়ি আছেন, সেদিকে ছেলে বা ছেলে বউ কারোরই ভ্রূক্ষেপ ছিলনা।

প্রদীপকে সুজাতা বলে দিয়েছে যে সামনের মাসেই ও এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। প্রদীপ যেন তার আগেই তার মা বাবাকে বোনের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। অথবা সালেহাকে এই বাড়িতে পাকাপাকিভাবে নিয়ে আসে।

সালেহার নাম মনে আসতে সুজাতার মুখ ভর্তি করে থুতু জমলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে সরে এসে সোজা ডানদিকে বাথরুমে চলে গেলো। বেসিনে থুতু ফেললো একবার দুবার তিনবার। থুতু বের হচ্ছেনা তবুও থু থু করে সালেহার ঊদ্দেশ্যে বার বার থুতু ফেলতে লাগলো। কল ছেড়ে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে মুখে ছিটোলো, কুলকুচো করলো, তবুও যেন মুখের তেতো ভাবটা যাচ্ছিলো না। মুখ সোজা করে বেসিন লাগোয়া আয়নায় নিজেকে আবার দেখলো। কী নেই ওর মধ্যে যা সালেহার মধ্যে আছে! রূপ? সালেহার রূপ বলে কিছুই নেই, সালেহার বাবা দেশে পয়সাওয়ালা মানুষ ছিলেন। মেয়ে সুন্দর নয়, বিয়ের পাত্র জুটাছিলনা তাই সালেহার গৃহশিক্ষককে অনেক যৌতুক দিয়ে মেয়েকে ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছেন। এমনটাই বলেছিল একদিন সালেহার স্বামী জাভেদ হোসেন। জাভেদ হোসেন সম্পর্কে সালেহাদের দূর সম্পর্কের গরীব আত্মীয়, সালেহাদের বাড়িতে থেকে ঢাকা ইউনিভারসিটিতে পড়াশুনা করেছে। লেখাপড়ায় মেধাবী ছিল, অনার্স মাস্টার্স করে পিএইচডি করার চান্স পেয়ে গেছিলো। তখনই সালেহার বাবা মেয়েকে জাভেদ হোসেনের সাথে বিয়ে দিয়ে পাকাপাকি ঘরজামাই বানিয়ে ফেলে।
সালেহা আর জাভেদ সুজাতাদের বাড়ির দুই ব্লক দূরেই থাকে। প্রদীপ এবং জাভেদ হোসেন একই কোম্পানীতে চাকরি করার সুবাদে খুব বন্ধুত্ব হয়। দুই পরিবারে আসা যাওয়াও চলে, ওদের মেয়েটা কোমলের চেয়ে কিছু ছোট, আর ছেলেটা আরেকটু ছোট। কখন কি নিয়ে ওদের স্বামী স্ত্রীতে বিরোধ দেখা দিয়েছে কে জানে! গত দেড় বছর যাবৎ একই কথা শুনে আসছে সুজাতা, ওদের এত দিনের সংসারটা না জানি ভেঙ্গে যায়! সুজাতার কথা হলো, ভেঙ্গে গেলে যাবে। স্বামী ছাড়া কি কোন মেয়ে চলতে পারেনা? আমেরিকার মত দেশে? স্বামী মারা গেলেওতো একাই চলতে হয় বউকে, তাহলে ডিভোর্স হলে কেন পারবেনা?

সুজাতা শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে নীচে দাঁড়ালো! খুব অপমান লাগছে, ফেসবুকে কতটুকুইবা লিখেছে ও? ও কি লিখেছে যে ওর স্বামী আসলে ইমপোটেন্ট? ও কি লিখেছে, ওর স্বামী ওকে কখনও নগ্ন দেখতে চায় নি? ও কি লিখেছে, এক রাতে ও সংক্ষিপ্ত রাত পোশাক পড়ে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়াতেই স্বামী বলেছিল, “ তুমি গাউন চাপিয়ে আসো। তোমাকে এত ছোট পোশাকে দেখলে আমার কামভাব স্তিমিত হয়ে যায়”। বিয়ে হয়েছে কুড়ি বছর, ওরা কি কুড়ি দিন সহবাস করেছে? অথচ এই পুরুষই কিনা অন্যের স্ত্রীর সাথে পরকিয়া করে? যাক, একটা হেস্ত নেস্ত করে ছাড়বো। যা এতদিন বলা হয়নি, ফেসবুকে সবই বলে দেবো। শিখুক, মেয়েরা শিখুক। কিভাবে পুরুষের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হয়, মেয়েদের তা শিখতে হবে। আমাকে দেখেই শিখুক, আমার তো হারাবার কিছু নেই”।

সুজাতা বাথরুম থেকে বের হয়ে বিছানার এক কোণে শাশুড়িকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা অপ্রতিভ হলো। শাশুড়ি কি ওর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে এসেছেন? কিভাবে শুনলেন, ওতো বাথরুমের শাওয়ার, বেসিনের কল খুলে দিয়েছিল। জলের আওয়াজে ওর কান্না বাইরে থেকে শুনতে পাওয়ার কথা নয়। নাকি গতরাতের কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছেন?

নিয়তিবালা বিছানার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসেছিলেন। বৌমাকে নিয়তিবালা কেন জানি খুব ভয় পান, বৌমা অবশ্য নিয়তিবালার সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করেনা। তবুও বৌমাকে ভয়, এই বুঝি বৌমা রেগে যাবে, এই বুঝি বৌমা কটকট করে বাবুর নামে এতগুলো কথা শুনিয়ে দেবে। বৌমাকে নিয়তিবালা আগে ভয় পেতেননা, বরং বৌমার কাছে এটা ওটা আবদার করতেন। বৌমার মন পরিস্কার, মুখ ফুটে কিছু চাইলেই একটার জায়গায় দুটো নিয়ে হাজির হয়।

কিন্তু ইদানিং ভয় পান। বৌমাও এখন আর আগের মত নরম হয়ে কথা বলেনা। নিয়তিবালার এক ছেলে এক মেয়ে, দুজনেই আমেরিকা থাকে। বাংলাদেশে নিয়তিবালার ভরভরন্ত সংসার রেখে ছেলেমেয়ের কাছে আছেন। কি করবেন, ছেলেমেয়ে জোরজবরদস্তি করে। আমেরিকায় চিকিৎসা ভাল, ওদের বাবার ‘পস্টেট ক্যানসার’ হইছে, এখানে চিকিৎসা হচ্ছে। ছেলে যেমন চাকরি করে, বৌমাও চাকরি করে। কেউ কারোর চেয়ে কম নয়। মেয়ে আগে চাকরি করতো, দুই মাস আগে চাকরি চলে গেছে। এখন ঘরেই থাকে, জামাই চাকরি করে। নিয়তিবালা দেবীর কোথাও কোন অপূর্ণতা নেই, তবুও ছেলের বাড়িতে কুন্ঠিত হয়ে থাকেন। বুঝতে পারেন, ছেলে ছেলেবৌ সাহেব মেম হয়ে গেছে, খালি ইংলিশে কথা বলে আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে। আজকালের বৌ, স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করে। নিয়তিবালার সেই ক্ষমতা ছিলনা স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করার। গ্রাম দেশের মানুষ, পানের থেকে চুন খসলেই পিঠে পড়তো খড়মের বারি। পতি দেবতা, পতির খড়মের তলায় ইস্তিরির সুখ লুকানো থাকে। ছোটবেলায় এই মন্ত্র শিখে তবেই তিনি স্বামীর সংসারে এসেছিলেন। মন্ত্রতো ঠিকই শিখেছিলেন, সুখতো এখন আছেই। বৌমার মত যদি তিনিও তেড়ে উঠতেন, তাহলে কি আর সংসার টিকতো? ‘ডিভুস’ হইয়া যাইত না?

সুজাতা জিজ্ঞেস করলো, “ কী ব্যাপার মা, কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন? আমায় কিছু বলবেন?
-আইজ অপিস গেলানা? তোমার শইল কি খারাপ?
-আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, ছুটি নিয়েছি।

-বৌমা, বাবুরে কইতে ডর করে, যদি চেইত্তা যায়। তুমি ইট্টু বুঝাইয়া কইও। আমি আর তোমার শ্বশুর দেশে ফিরা যাইতে চাই।

-কেন, এখানে আপনাদের কি সমস্যা?

-কুন সমস্যা নাই, আসলে এই দেশের আবহাওয়া আর সহ্য হইতাছেনা।

-এটা কোন কথা হলো? আবহাওয়া সহ্য হচ্ছেনা বললেই হলো? আপনারা দুজনেই দিব্যি সুস্থ আছেন, তাহলে আবহাওয়া সহ্য হচ্ছেনা বলেন কেন?

-মা গো, দেহের সুস্থতাই সব কথা নয়, মনের সুস্থতাও দরকার আছে। এইখানে আমরা মনের দিক থিকা খুব কষ্টে আছি।

আমার জীবনের মূল্য কি আছে বলো? এক কানাকড়িও মূল্য নেই। তবুও তো তুমি আমার ছেলেকে হুমকি দিতে পারো সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার। আমি কারে হুমকি দিমু? সংসার ছাইড়া আমি কইবা যামু?

-এসব কথা আমাকে বলছেন কেন? সংসার ছেড়ে যাওয়ার কথা কি সাধে বলি? কি পেয়েছি আপনার ছেলের কাছে?

-তাতো আমি কইতে পারুমনা। আমার সাদা চোখে মনে হয়, তুমি সবই পাইছ। কিন্তু তোমার মনে হয় যে তুমি কিছুই পাও নাই। আমার কথা ভাবো, আমি কি পাইছি ? এক জীবনে স্বামী শাশুড়ির অত্যাচার সয়েছি, তবুও নীরবে সংসার করে গেছি। দেহের জ্বালা, মনের যন্ত্রণা সবই নিজের ভেতরেই চেপে রেখেছি। কেউ বুঝতেও পারেনি আমার বুকের গভীরে কত ব্যথা রাখা আছে। কোনদিন কারু কাছে যা প্রকাশ করি নাই, শেষ বয়সে সিন্দুক খুইলা ব্যথার কথাগুলি বিশ্বাস কইরা তোমাকে বলেছিলাম। ভালোর জন্যই বলছিলাম, কানে আসেতো তোমাগো নিত্য দিনের ঝগড়ার আওয়াজ।

-এত কথা বলছেন কেন? আসলে কি বলতে চাইছেন বুঝিয়ে বলুন।

-বৌমা, চইলাইত যামু, আর আসমু না। কোনদিন কই নাই তোমার মুখের উপরে কথা, আইজ দুইটা কথা কই, শোন। আমরা বুড়া বুড়ি এক বিছানায় ঘুমাই, আমাগো চোখের উপর দিয়া ছেলে ছেলে বৌ আলাদা ঘরে ঘুমায়। এই দৃশ্য মায়ের বুকে হাপরের বারি দেয়। কেন তোমরা এমুন হয়ে গেলা? তুমি একটু সইয়া নিলে কি হইত? পুরুষ মানুষ বাইরে যত হাড়ুম দুড়ুম, বুকের ভিতরে সব কয়টা শিশু। পুরুষ মায়ের কাছে যেই মমতা পায়, ইস্তিরির কাছেও সেই মমতা খুঁজে। বউ যদি একটু রয় সয়, তাইলেই স্বামী স্ত্রীতে ঝগড়া ঝাঁটি কম হয়।
-আর কিছু বলবেন?

-আর দুইটা কথা কমু। আমি ছেলেরে কইতে পারি নাই নিজের গোপন দুঃখের কথা। ছেলে হইলেই কি, জাতে পুরুষ। নারীর দুঃখ কতটুকু বুঝবো? তাই তোমার কাছে কইছিলাম নিজের জীবনের নাবলা কথা, এসব শুনেও যদি তোমার মন বদলায়। যদি ভাবো, থাক এর নামই সংসার। “আমার শাশুড়ি যদি পিঠে খড়মের বারি খেয়েও জাত কূল মান, স্বামী সন্তান সংসারের মায়ায় জীবন কাটাইতে পারলো, আমিতো শাশুড়ির চাইতে অনেক ভাল অবস্থায় আছি, আমি পারুমনা ক্যান?”

আমি কইছি তোমারে, তুমি আমার কথাগুলি গোপন রাখতে পারলে না। সারা জীবন যে কথা আমার ভেতর গোপনে রাখা ছিল, তুমি সেইসব কথা ‘ফেশ বুকে’ লিখা দিছ? দুনিয়ার মাইনষেরে জানায়ে দিলা।

-জানিয়েছি, আমি পুরুষদের মুখোশ খুলে দিতে চাই। আমিতো আপনার পক্ষেই লিখেছি যে সারা জীবন আপনি স্বামীর হাতে কিভাবে নিগৃহীত হয়েছেন, আপনাকে যে বাবা সারাজীবন পিটিয়েছে, তা কি খুব ভাল কাজ হয়েছে মনে করেন?

-বৌমা, এখন আমার জীবনটা হইয়া গেলো খোলা খাতা, সবাই পইড়া ফেলছে। তুমি ভাবতাছো কত বড় কাজ করছ, মাইয়ালোকের পক্ষে লিখছো। পুরুষের বিপক্ষে লিখছো। আর আমি দেখলাম কত ছুড কাজ করলা। আমার এই মুখটা দুইনার মানুষের কাছে পোড়াইয়া দিলা। আমেরিকায় থাকলে এই পোড়া মুখ লইয়া আর কুনদিন কারুর সামনে যাইতে পারুম?
ফেশ বুক’ সবতেই পড়ে। আমার জামাই পড়ছে, মাইয়া পড়ছে, পোলা পড়ছে, কোমল পড়ছে, তোমার বন্ধুরা পড়ছে, তাগো বাপ মায়েরা শুনছে, তারা সবাই আমারে কোথাও দেখলেই আঙ্গুল দেখায়ে বলবে, আহারে, উনার কথাই উনার বৌমা ‘ফেশ বুকে’ কইছে, সোয়ামীর খড়মের বারি খাইয়া জীবন কাটছে। কেউ তো আমার কাছে জানতেও চাইবোনা, যেই হাতে মানুষটা খড়ম তুলছে, সেই হাতেই তিনি আমার মত মূখ্যু সূখ্যু অবলা নারীর মাথায় ছাতা মেইলা রাখছে। যাক! মানুষের আসরে আর সার্কাসের জোকার হইতে চাইনা। তুমি ভাল কাজই করতে চাইছো, নারীগো বঞ্ছনার বিরুদ্ধে লিখতে চাইছো। কিন্তু এইটুকু নালিখেওতো নারী গো বঞ্চনার কথা বলা যাইতো। নারীর সম্মানজ্ঞান আছে, আমার মত বোকা নারীরও ইজ্জত আছে। যা কিছু অসম্মানের ছিল, তা পর্দার আড়ালে ছিল, তুমি নারীর মঙ্গল করতে গিয়া পর্দা খুইলা আমারে বেআব্রু কইরা দিলা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন