বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ৩০টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩ / ৩.০

জলকাণা ও টুকু টুকু

পার্থিব জুন ২০১৭

স্কুল

শিক্ষা / শিক্ষক নভেম্বর ২০১৫

বিস্ময় বিমান

কোমলতা জুলাই ২০১৫

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট ২৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৫ সঙ্গী

হাবিবুর রহমান
comment ৩২  favorite ০  import_contacts ৪৫০
এক.
: তোমর নাম?
: রেহনা
নাম পছন্দ হয়নি, মুখ ভেংচালো দিয়ান। ওর প্রাক্তন স্ত্রীর নাম ছিল রিহনা। তার প্রতি এতটা বিতৃষ্ণা জমেছে যে এরকমের নাম শুনলেই বিরক্ত হয়।
: আচ্ছা সে যাই হোক! তোমার নাম আমি বদলে দিব। তুমি এখন থেকে ইদিয়া। এখানেই থাকবে তুমি আর তোমার পুরানো সব স্মৃতি মুছে ফেল, ঠিক আছে?
ইদিয়া মাথা নাড়লো। ইদিয়ার চেহারায় মলিন ভাব ফুটে উঠলো। দিয়ান ইদিয়াকে ভাল করে লক্ষ্য করলো। মেয়েটার গঠন ভাল, কালো চুল, বড় বড় চোখ, হালকা বাদামি চোখের মনি। গায়ের রং বাদামি ফর্সা। মলিন চেহারা বানিয়ে রেখেছে,
: এরকম মলিন চেহারা বানাবে না। সব সময় হাস্যজ্জ্বল থাকবে। ঢং মার্কা চেহারা আমার একদম পছন্দ না।
: আচ্ছা।
: প্রয়োজন ব্যতিত কথা বলবে না।
: আচ্ছা।
: যাও আমার জন্য এক পেয়ালা চা করে নিয়ে আস।
: রং চা নাকি দুধ চা। চিনি কয় চামচ?
: রং চা, চিনি এক চামচ। কিচেনে যাও, কোথায় কি রাখা আছে ভাল করে দেখে নাও। কোন কিছু লাগলে অর্ডার করে বিল আমাকে ফরোয়ার্ড করে দিও, পেমেন্ট দিয়ে দেব।
ইদিয়া মাথা নেড়ে কিচেনে গেল। দিয়ান ভাবছে শাড়িতে মেয়েটাকে অনেক মানিয়েছে। একে সব সময় শাড়ি পড়ে থাকতে বলতে হবে। আজ কাল কোন মেয়ে শাড়ি পড়ে না। ভাল শাড়িও তাই খুব একটা পাওয়া যায় না। অন লাইনে খুঁজে কয়েকটা সুন্দর শাড়ি অর্ডার করতে হবে।

সংসার অসহ্য হয়ে উঠেছিল, দিয়ানের কাছে। রিহনার সাথে তালাক হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে এখন অনেক হাল্কা লাগছে। প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া করতো ওরা, কারনে অকারনে। গত মাসে আইনি জটিলতা শেষ হয়েছে ওদের। রিহনাও খুশি হয়েছে। মুক্তির আনন্দের সাথে নতুন সমস্যা জুটেছে, বাসার কাজ কর্ম। অনেক ভেবে চিন্তে সীদ্ধান্ত নিল দিয়ান, আর বোকামি নয়। আর কোন বন্ধনে জড়াতে চায় না ও। বাসার কাজ কর্মের জন্যই ইদিয়াকে কিনে নিয়ে আসলো। অনেক গুলো ইউনিট ব্যাংকে দিতে হলো।

: তোমার চা।
ইদিয়া সুন্দর করে সাজিয়ে চা পরিবেশন করছে। দিয়ান চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বুজলো।
: হুম্ ভাল হয়েছে, এই প্রিপারেশন কম্বিনেশনটা মনে রাখবে।
: আচ্ছা।
দিয়ান চুপচাপ চা টা শেষ করলো। ইদিয়া পাশেই দাড়িয়ে থাকলো।
: যাও তোমার রুমে যাও। কালকে সকাল সাড়ে ছয়টায় আমাকে ডেকে তুলবে। আগামীকাল দুইটার সময় আমার একটা মিটিং আছে মনে করিয়ে দেবে। আমি বাসা থেকে বের হবো সাড়ে সাতটার পর। নাস্তা রেডি রাখবে।
: কি নাস্তা করবে?
: টোস্ট, জেলি, ওমলেট, সালাদ আর কফি।
: টোস্ট কয়টা?
: তিনটা। এটা মনে রাখবে। আমি আলাদা কিছু না বললে সব সময় এটা রেডি রাখবে।
: লাঞ্চ বা ডিনার?
: আমি আজ বাইরে খাব। অন্যান্য দিন টেক্সট করে দেব। আলাদা করে জিজ্ঞেস করবে না।
: আচ্ছা।
: যাও।
: গুড নাইট।
দিয়ান মুখ বাঁকা করলো। কোন প্রতিউত্তর করল না।

ইদিয়া ওর ঘরে চলে আসল। এলোমেলো ঘরটা গুছিয়ে নিল। বিছানায় বসল। ওর সব স্মৃতি মুছে ফেলতে বলেছে ওর মালিক। ওর স্মৃতি বলতে ইরনের সাথে সময়। ইরন ওকে ওর ইচ্ছে মত গড়ে নিয়ে ছিল। ভালোবাসা জড়ানো একেকটা মূহুর্ত। ইরন তার হারানো অতীতকে ওর মাঝে বসিয়ে দিয়েছিল। একটা মানুষ কিভাবে একটা মানুষকে এমন ভাবে ভালবাসতে পারে? এখনো বুঝতে পারে না ইদিয়া। ইরন রোড এক্সিডেন্ট মারা গেল। ব্যাংকে বেশ কিছু দেনা ছিল ওর। ব্যাংক ওর সব সম্পত্তি ক্রোক করে নিলাম করে দিল। নিলাম থেকে ওকে কিনে নিয়ে এসেছে দিয়ান। দিয়ান চাইলে ওর পুরানো সব স্মৃতি মুছে ফলতে বাধ্য, কিন্তু কোন ভাবেই স্মৃতি গুলো মুছে ফেলতে চাইছে না ইদিয়া। এমন একজন মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা ঠিক নয়। স্মৃতি মুছে ফেলার বদলে স্মৃতি রোমন্থন করতে শুরু করল।

ইরন ওকে ওর সঙ্গীর মর্যাদা দিয়েছিল। ওর সব কষ্ট, আনন্দ ইদিয়ার সাথে সেয়ার করতো। মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে চলে যেত লং ড্রাইভে। নদী ছিল ইরনের সব চাইতে পছন্দের। শান্ত কুল-কুল বয়ে যাওয়া ছোট কোন নদী। নদীর তীরে বসে সূর্য ডুবার দৃশ্য উপভোগ করা ছিল ওর কাছে সবচাইতে আনন্দের। ইদিয়াকে পাশে বসিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতো। অনেক পুরোনো দিনের সব কবিতা।
তেমনি একটা দিনের কথা স্মৃতিতে ভাসছে ইদিয়ার। তখন সে রেহনা, ইরনের সঙ্গী। লং ড্রাইভ করে শান্ত একটা নদীর তীরে এসে বসেছে ওরা। হালকা বাতাসে শাড়ির আচল উড়ছে, চুল এসে পড়ছে মুখের উপর। সূর্য তখন অস্তাচলে। ঘাসের উপর বসে তুমুল সৌন্দর্য্য উপভগো করল ওরা, পাশাপাশি বসে। সূর্য ডুবে গেল, রক্তিম আকাশটার দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকল ইরন। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে, আবার নিঃশ্বাসটা ছেড়ে বলল,
: জানো, পরজনম বলে কিছু নেই। আগে মানুষ ভাবতো পরজনমে একজনের সাথে আরেক জনের আবার মিলন হবে। সব ফালতু কথা। এসব কিছু নেই। কিন্তু থাকলে কতই না ভাল হতো!
: থাকলে কি হতো?
: তাহলে পরজনমে আমার রেহনার সাথে দেখা হতো।
: মানুষতো এখনো পরজনম বিশ্বাস করে, তুমি করো না কেন? হয়তো সত্যি আছে।
: ইস তাই যদি হতো। কিন্তু তুমিতো জানো, সব কিছুর মূল হচ্ছে গণিত। গণিতের কোন সূত্রই পরকালের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।
: এসব ফালতু কথা রাখতো? একটা কবিতা বল।
উচ্চ স্বরে হাসলো ইরন, বাহ! এই রকম খুনশুটি কোথায় শিখলে? তোমার কবিতা ভাল লাগে? আবার হাসছে ও।
: হ্যাঁ অনেক ভাল লাগে। ইরনের একটা হাত তুলে নিয়ে ওর কোলের উপর রাখল। এই সব ছোট ছোট ভালবাসা শিখিয়ে ছিল ইরন। কোলের উপর হাতটা রেখেই চমৎকার একটা কবিতা আবৃত্তি করেছিল ইরন।

আরো কত সুন্দর সুন্দর সব স্মৃতি! কোনটাই মুছলো না ইদিয়া, সবগুলোকে একত্র করে স্মৃতির কোঠরে আলাদা করে রেখে দিল, চেষ্টা করলেও কেউ খুঁজে পাবেনা। সমস্যা হবে নামটা নিয়ে। দিয়ানের দেয়া নামটা সব জায়গায় বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। দিয়ানের ডাকে ঠিক ঠাক সাড়া দিতে পারবেতো?



দুই.
সকালে উঠে নাস্তার বন্দবস্ত করে, সাড়ে ছয় টায় দিয়ানকে ডেকে তুলল ইদিয়া। দিয়ান আড় মোড়া ভেঙ্গে ওর দিকে তাকালো। তোমার যেন কি নাম?
: রেহনা।
: ওহ! না। তোমাকে না বলেছি সব পুরানো স্মৃতি মুছে ফেলতে? আমি যেন কি নাম দিয়েছিলাম তোমার?
: ইদিয়া।
: হ্যাঁ, হ্যাঁ ইদিয়া। এই সব রেহনা, রিহনা মার্কা ফালতু নাম আমার সামনে বলবে না। মনে থাকবে?
: আচ্ছা।
: নাস্তা রেডি করেছো?
: হ্যাঁ।

দিয়ান গোছল সেরে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে এসে বসল। নাস্তা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে টেবিলের পাশে দাড়িয়ে আছে ইদিয়া। শাড়ি পড়েছে, সাড়ে পাঁচ ফিট ছিমছাম শরীর, যেন শাড়ি পড়ার জন্যই ওকে বানানো হয়েছে। নাস্তা খেতে খেতে ওকে লক্ষ্য করল দিয়ান, কোন কথা বলল না। তৃপ্তি নিয়ে নাস্তা শেষ করল। অফিসের জন্য বের হওয়ার সময় ইদিয়া বলল,
: তোমার দুই টায় একটা মিটিং আছে।
: ১৫ মিনিট আগে ম্যাসেজ রিমাইন্ডার দিবে।
: আচ্ছা।
: শোন তোমাকে শাড়িতে অনেক ভাল লাগে। সব সময় শাড়ি পড়বে। কয়েকটা শাড়ি, ব্লাউজ সিলেক্ট করে আমাকে ম্যসেজ করে দিও। রেঞ্জ ১০০০-১২০০ ইউনিট। আমি অর্ডার প্লেস করে দিব।
: আচ্ছা।
: আমি বের হলেই সিকিউরিটি লক্ট হয়ে যাবে। কোন চিন্তা নেই। সিকিউরিটি নিয়ে আমাকে বিরক্ত করবে না।
দিয়ান দরজার কাছে দাড়াতেই ওর চোখ স্কেন করে দরজা খুলে গেল।
: গুড বাই, দিয়ান।
দিয়ান চলে গেল, কোন উত্তর করল না। ফিরেও তাকালো না। ঘরের সব সিকিউরিটি লক সয়ংক্রিয় ভাবে চালু হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। ইরন ছিল এর ঠিক উল্টো। যাওয়ার সময় ওর হাত ধরতো। বিদায় সম্ভাষণ করতো। স্মৃতির মলাট খুলে আবার বই উন্মুক্ত হয়ে গেল।

ইদিয়া ওর ঘরে এসে স্মৃতির খোলা বই টা নিয়ে বসল। আজ সারা দিন আর কোন কাজ নেই। দিয়ান রাতের খাবার খেয়ে ফিরবে। কিচেনে, ফ্রীজে প্রয়োজনীয় জিনিষের তালিকা সকালেই সেরে ফেলেছে ও। অর্ডার স্লিপ রেডি করে অর্ডার করে দেয়া হয়েছে। ডেলিভারি রোবট গুলো নির্দিষ্ট সময়ে এসে ডেলিভারি করে যাবে। দুপুরের পরে শাড়ি সিলেক্ট করে দিয়ানকে পাঠিয়ে দেয়া হবে। মিটিং এর রিমাইন্ডার রেডি করে সময় সেট করা আছে, নির্দিষ্ট সময়ে ম্যাসেজ চলে যাবে দিয়ানের কাছে।

ইরন ওর পারিবারিক অনুষ্ঠান গুলোতেও ওকে নিয়ে যেত। একবার ওদের গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সবাই গিয়েছিল। ওদের পরিবারটা ছিল অন্যরকম। পরিবার প্রথা খুব একটা নেই পৃথিবীতে। এরমধ্যেও এরা বেশ আকড়ে ধরে আছে পুরোনো প্রথাকে। পরিবারের বন্ধন বাড়ানোর জন্য প্রায়ই আয়োজন করতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান। সেবার ছিল ক্যাম্প ফায়ার করে, বারবিকিউ এর আয়োজন। সেখানেও ওকে পাশে বসিয়ে রেখেছিল ইরন। পরিবারের সবাই খুব বিরক্ত আর অস্বস্তি বোধ করেছে। ওর বড় ভাই সবার সামনে বলেই ফেলল,
: এসব কি ইরন?
: কি হয়েছে দাদা?
: তুমি অসুস্থ মানুষের মত আচরণ করছো কেন?
: আমি সুস্থ আছি দাদা। আমিতো কারো কোন অসুবিধা করছি না।
: মানছি করছো না। কিন্তু একে নিয়ে এসেছো কেন? তুমি ওর সাথে যেমন ব্যবহার করছো তাতে আমরা সবাই অস্বস্তি বোধ করছি।
: ঠিক আছে, তোমরা অস্বস্তি বোধ করলে আমি চলে যাচ্ছি।
: আমরা তো তোমাকে চলে যেতে বলিনি। তোমাকে নিয়েও কোন অস্বস্তি নেই।
: দাদা ও রেহনা। রেহনা সব সময় আমার কাছে থাকবে।
ইরনের মা ইরনকে জরিয়ে ধরে কেঁদেছিল।
: কেন বাবা তুই সব ভুলতে পারছিস না? এত কষ্ট কেন তোর?
ইরন কোন কথা বলেনি কেবল ওর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে কয় ফোটা অশ্রু।
: ঠিক আছে রেহনা আমাদের সাথেই থাকবে। সবার দিকে তাকিয়ে শাসিয়েছিল ওর মা, তোমরা কেও ওকে বিরক্ত করবে না। ওকে ওর মত থাকতে দাও।
: কিন্তু মা!
: আমি যা বলছি শোন।
ওর মা এসে বসেছিল রেহনার পাশে। ওর কাধে হাত রেখে। সবাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়েছিল। পরক্ষণে সবাই সব কিছু ভুলে আনন্দে মেতে উঠেছিল। ক্যাম্প ফায়ারের আলো আধারিতে রেহনা বসে লক্ষ্য করছিল ইরনকে। ক্যাম্প ফায়ারের আলো এসে পড়েছে ওর মুখের উপর, আলোটা নড়ছে। চোখ ফিরেয়ে নেয়া সম্ভব নয়। ভালবাসাহীন এই যান্ত্রীক পৃথিবীতে একটা মানুষ একটা মানুষকে এত ভালবাসে কিভাবে?

দিয়ান ফিরল রাত এগারটায়। ওর রুমটা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। দিয়ান গোছানো ঘরটা দেখে পছন্দ করল। ফ্রেস হয়ে ঘুমের আয়োজন করল। কিন্তু ঘুম আসল না। এপাশ ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। এক সময় উঠে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল ঢকঢক করে। ইদিয়াকে ডাকলো ওর ঘরে। ইদিয়া আসতেই উঠে দাড়ালো। ওর কাছে এসে ইদিয়ার কাধের উপর ছড়িয়ে থাকা চুল গুলোকে এক হাতে পিঠের উপর সরিয়ে দিল। আচঁলটা নামিয়ে ব্লাউজ টা খুলে ওর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। জড়িয়ে ধারল, কিন্তু নিজের শরীরে কোন সাড়া পেল না। ইদিয়াকে ওর রুমে চলে যেতে বলল। ইদিয়া ওর রুমে চলে আসল। আবার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করল দিয়ান।

সকালে নিয়ম মাফিক নাস্তা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেল।



তিন.
এভাবেই কেটে গেল সাত মাস, একই রুটিন। সেদিন রাতে খাবার সময় দিয়ান বলল,
: কাল আমার একজন গেস্ট আসবে। মেনু পাঠিয়ে দেব রান্না করে রেখ।
: আচ্ছা।

খাবার খেয়ে দিয়ান তার রুমে চলে গেল। ইদিয়া ওর ঘরে এসে স্মৃতির বই খুলে বসল।
লং ড্রাইভে বেরিয়েছিল ওরা। ইরন বেপরোয়া গাড়ি চালাতো।
: সাবধানে গাড়ি চালাও ইরন।
: সাবধানেই তো চালাই। তাছাড়া আমার মৃত্যুর ভয় নেই। তোমার আছে নাকি?
হো হো করে শব্দ করে হেসেছিল ইরন। হাসতে হাসতে জানতে চাইল,
: আজকে কোথায় যাব? তুমি কোথায় যেতে চাও?
: তোমার যেখানে শান্তি লাগে, আমি সেখানেই যেতে চাই।
: আমার আজকাল কোথাও শান্তি লাগে না। চল, আজ পাহাড়ে যাই। মেঘের উপর বসে থাকবো।
: চল।
একটা পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ের চুড়ায় তৈরি করা একটা রিসোর্টে উঠেছিল ওরা। সকাল বেলায় রিসোর্টের বারান্দায় দাড়িয়ে নিচে মেঘের খেলা দেখেছিল পাশাপাশি দাড়িয়ে।
: মনে হচ্ছে আমরা স্বর্গে বসে আছি, তাই না রেহনা?
: স্বর্গ কি এরকম?
: কোন স্বর্গ টর্গ বলে কিছু নেই, সব মানুষের কল্পনা। তবে মানুষের কল্পনা এর থেকে সুন্দর হতে পারে না। তাই এটাই স্বর্গ।
: আমার একটা কথা রাখবে ইরন?
ইরন স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মুখে মিটি মিটি হাসি।
: বল।
: তুমি এখন থেকে গাড়ি অটো করে চালাবে প্লিজ?
: অটো করে গাড়ি চালাতে আমার ভাল লাগে না।
: তাহলে সাবধানে চালাও।
: ঠিক আছে সাবধানে চালাবো।
ওর হাতটা ধরে ইরন বলল, চল হেটে আসি। ওরা সেন্ডেল খুলে খালি পায়ে হাটতে বের হলো। সবুজ ঘাসে মিশে থাকা কুয়াশায় পা ভিজিয়ে হাটতে হাটতে মেঘের মাঝে মিশে গিয়েছিল ওরা দু’জন।

রাতে দিয়ান ওর গেস্ট নিয়ে এল। ওর দেয়া মেনু সব রেডি করে সুন্দর করে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দিয়ানের গেস্ট ওকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল। মেয়েটা কিছুটা স্থুলকায়। তবে গঠনের সাথে সেটা মানিয়ে গেছে। খাওয়া সেরে দুই জন সোফায় পাশাপাশি বসলো। ইদিয়াকে চোখের ইসারায় দেখিয়ে দিয়ানকে বলল,
: একে কেন রেখেছো?
: কেন সমস্যা কি?
: আমি যখন আসবো, একে কিন্তু রাখতে পারবে না।
: এ থাকলে তোমার সুবিধা হবে। কাজ কর্ম ওই দেখবে।
: সুবিধার দরকার নেই। আমার এলার্জি আছে। বাসার কাজ নিয়ে তোমার একদম চিন্তা করতে হবে না। ওটা আমি সামলাবো। ওকে আমার সামনে থেকে চলে যেতে বল। আমার বিরক্ত লাগে।
: ইদিয়া তোমার রুমে যাও।
ইদিয়া চলে গেল।
: তুমি কবে একে সরাচ্ছ?
: দেখি বিক্রী করা যায় কিনা।
: বিক্রী হোক বা না হোক। ওকে বিদায় কর।
: আচ্ছা ঠিক আছে।

দিয়ান ইদিয়াকে বিক্রী করার জন্য অন লাইনে বিজ্ঞাপন দিল। সাত দিনেও কোন ক্রেতা পাওয়া গেল না। শেষে বাধ্য হয়ে জঞ্জাল হিসাবে ইদিয়াকে জঞ্জালের ভাগারে দিয়ে দিল।

খোলা আকাশের নিচে ইদিয়াকে ফেলে রাখা হয়েছে। পানিতে কাদায় ওর পড়নের শাড়িটা মলিন হয়ে গেছে। মুখের চামড়া ছিড়ে ভেতরের যান্ত্রিক অংশ বেরিয়ে পড়েছে। ভাগারে সব রোবটিক আর ইলেক্ট্রিক জঞ্জাল। রোবটের ছিন্ন হাত, পা, মস্তক, কোনটা আস্ত রোবট। ইদিয়ার এখনো কিছু চার্জ অবশিষ্ট আছে। দিয়ান ওকে ফেলে দেয়ার পর ওর সব স্মৃতি মুছে ফেলেছে, মুছে ফেলেছে ওর দেয়া নাম। ওর স্মৃতিতে এখন একটাই নাম। রেহনা। ইরনের হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা রেহনা। সন্তান হওয়ার সময় ইরনের স্ত্রী রেহনা মারা যায়। রেহনাকে অনেক ভালবাসতো ইরন তাই ওকে ভুলতে পারেনি ইরন। রেহনার স্মৃতি দিয়ে রোবট কোম্পানিতে অর্ডার করে ওকে বানিয়েছিল ইরন। রেহনার নামেই ওর নাম রেখেছিল। রেহনার মত করে গড়ে নিয়েছিল। সেই একই ভালবাসা ছিল তার জন্যও।

রেহনা ওর যান্ত্রিক স্মৃতিতে সেই সময় গুলো গুছিয়ে রেখেছে। চার্জ থাকা পর্যন্ত সেই স্মৃতি গুলো রোমন্থন করে যেতে চায়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন